কোনো সমস্যা না।’
‘অবশ্যই!’
ফুপা অল্প সময়ে যে-পরিমাণ মদ্যপান করেছেন তা তাঁর জন্যে বিপজ্জনক। তাঁর আশেপাশে যারা আছে তাদের জন্যেও বিপজ্জনক। এই অবস্থায় ফুপার প্রতিটি কথায় ‘অবশ্যই’ বলা ছাড়া উপায় নেই।
আমরা বসেছি ছাদে। বাদল আগুনে আত্মহুতি দিচ্ছে না এই আনন্দ সেলিব্রেট করা হচ্ছে। ফুপা মদ্যপানের অনুমতি পেয়েছেন। ফুপু কঠিন গলায় বলে দিয়েছেন—শুধু দুই পেগ খাবে। এর বেশি একফোঁটাও না। খবর্দার! হিমু, তোর উপর দায়িত্ব, তুই চোখে—চোখে রাখবি।
আমি চোখে-চোখে রাখার পরেও ফুপার এখন সপ্তম পেগ যাচ্ছে। তাঁর কথাবার্তা সবই এলোমেলো। একটু হিক্কার মতোও উঠছে। বমিপর্ব শুরু হতে বেশি দেরি হবে না।
‘হিমু!’
‘জি ফুপা?’
‘দেশটাকে আমাদের ঠিক করতে হবে হিমু।’
‘অবশ্যই!’
‘দেশমাতৃকা অনেক বড় ব্যাপার।’
‘জি, ঠিকই বলেছেন। দেশপিতৃকা হলে দেশটাকে রসাতলে নিয়ে গেলেও কোনো ক্ষতি ছিল না।’
‘দেশপিতৃকা আবার কী?
‘ফাদারল্যান্ডের বাংলা অনুবাদ করলাম।’
‘ফাদারল্যান্ড কেন বলছিস? জন্মভূমি হলো জননী। জননী জন্মভূমি স্বর্গাদপী গরিয়সী।’
‘ফুপা, আর মদ্যপান করাটা বোধহয় ঠিক হচ্ছে না।’
‘খুব ঠিক হচ্ছে। তোর চেখে দেখার ইচ্ছা থাকলে চেখে দ্যাখ। আমি কিছুই মনে করব না। এইসব ব্যাপারে আমি খুবই লিবারল।’
‘আমার ইচ্ছা করছে না ফুপা।’
‘ইচ্ছা না করলে থাক। খেতে হয় নিজের রুচিতে, পরতে হয় অন্যের রুচিতে। ঠিক না?’
‘অবশ্যই ঠিক।’
‘বুঝলি হিমু, দেশ নিয়ে নতুন করে এখন চিন্তাভাবনা শুরু করতে হবে। ভারতের আগ্রাসন-বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে।’
আমি গম্ভীর গলায় বললাম, জাতীয় পরিষদে আইন পাশ করতে হবে যে, কেউ তাদের ছেলেমেয়দের ভারতে পড়তে পাঠাতে পারবে না, কারণ ভারতীয়রা আমাদের সন্তানদের ব্রেইন ওয়াশ করে দিচ্ছে, তাই না ফুপা?
ফুপা মদের গ্লাস মুখের কাছে নিয়েও নামিয়ে নিলেন। কঠিন কোনো কথা বলতে গিয়েও বললেন না—কারণ তিনি তাঁর পুত্র বাদলকে ভরতি করেছেন দার্জিলিং-এর এক বিশ্ববিদ্যালয়ে।
‘হিমু!’
‘জি ফুপা?’
‘রাজনীতি বাদ দিয়ে চল অন্যকিছু নিয়ে আলাপ করি।’
‘জি আচ্ছা। কী নিয়ে আলাপ করতে চান? আবহাওয়া নিয়ে কথা বলবেন?’
‘না।’
‘সাহিত্য নিয়ে কথা বলবেন ফুপা? গল্প-উপন্যাস?’
‘আরে ধ্যুৎ, সাহিত্য! সাহিত্যের লোকগুলিও বাদ। এরা আরও বেশি বদ।’
‘তা হলে কী নিয়ে কথা বলা যায়? একটা কোনো টপিক বের করুন।’
ফুপা মদের গ্লাস হাতে নিয়ে চিন্তিত মুখে টপিক চিন্তা করতে লাগলেন। আমি ছাদে শুয়ে পড়লাম। আকাশে নাকি নতুন কী-একটা ধূমকেতু এসেছে—‘হায়াকুতাকা’, বেচারাকে দেখা যায় কি না। নয় হাজার বছর আগে সে একবার পৃথিবীকে দেখতে এসেছিল—এখন আবার দেখছে। আবারও আসবে নয় হাজার বছর পর। নয় হাজার বছর পর বাংলাদেশকে সে কেমন দেখবে কে জানে!
ধূমকেতু খুঁজে পাচ্ছি না। সপ্তর্ষিমণ্ডলের নিচেই তার থাকার কথা। উত্তর আকাশে সপ্তর্ষিমণ্ডল পাওয়া গেল। এক বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্ন হিসেবে জ্বলজ্বল করছে সপ্তর্ষি।
ফুপা জড়ানো গলায় বললেন, কী খুঁজছিস হিমু?
‘হায়াকুতাকা’-কে খুঁজছি।’
‘সে কে?’
‘ধূমকেতু।’
‘চাইনিজ ধূমকেতু না কি? হায়াকুতাকা—নামটা তো মনে হয় চাইনিজ।’
‘জাপানিজ নাম।’
‘ও আচ্ছা, জাপানিজ… একটা দেশ কোথায় ছিল, এখন কোথায় উঠে গেছে দ্যাখ… ধূমকেতু-ফেতু সব নিয়ে নিচ্ছে—আমরা কিছুই নিতে পারছি না। বঙ্গোপসাগরে তালপট্টি সেটাও চলে গেল। চলে গেল কি না তুই বল হিমু?’
‘জি, চলে গেছে।’
‘বেঁচে থেকে তা হলে লাভ কী?’
‘বেঁচে থাকলে আনন্দ করা যায়। মাঝেমধ্যে মদ্যপান করা যায়…’
‘এতে লিভারের ক্ষতি হয়।’
‘তা হয়।’
‘পরিমিত খেলে হয় না। পরিমিত খেলে লিভার ভালো থাকে ‘
ফুপার কথা আমি এখন আর শুনছি না। আমি ধূমকেতু খুঁজছি। ধূমকেতুও আমার মতোই পরিব্রাজক—সেও শুধুই হেঁটে বেড়ায়…।
১১
‘আসগর সাহেব কেমন আছেন?’
আসগর সাহেব চোখ মেলে তাকালেন। অদ্ভুত শূন্য দৃষ্টি। আমাকে চিনতে পারছেন বলে মনে হলো না।
‘দেশ তো ঠিকঠাক হয়ে গেছে। আপনার অপারেশন কবে হবে?’
‘আজ সন্ধ্যায়।’
‘ভালো খুব ভালো।’
‘হিমু ভাই!’
‘বলুন।’
‘আপনার চিঠির জন্যে কাগজ কিনিয়েছি,-কলম কিনিয়েছি। রেডিওবন্ড কাগজ, পার্কার কলম।
‘কে কিনে দিল?’
‘একজন নার্স আছেন, সোমা নাম। তিনি আমাকে খুব স্নেহ করেন। তাঁকে বলেছিলাম, তিনি কিনেছেন।’
‘খুব ভালো হয়েছে। অপারেশন শেষ হোক, তারপর চিঠি লেখালেখি হবে।’
‘জি না।’
‘জি না মানে?’
‘আম বাঁচব না হিমু ভাই, যা লেখার আজই লিখতে হবে।’
‘আপনার যে-অবস্থা আপনি লিখবেন কীভাবে? আপনি তো কথাই বলতে পারছেন না!’
আসগর সাহেব যন্ত্রের মতো বললেন, যা লেখার আজই লিখতে হবে!
তিনি মনে হলো একশো ভাগ নিশ্চিত, অপারেশনের পরে তাঁকে আর পাওয়া যাবে না। বিদায়ের ঘণ্টা তিনি মনে হয় শুনতে পাচ্ছেন।
‘হিমু ভাই।’
‘বলুন, শুনছি।’
‘আপনার জন্যে কিছুই করতে পারি নাই। চিঠিটাও যদি লিখতে না পারি তা হলে মনে কষ্ট নিয়ে মারা যাব।‘
‘মনে কষ্ট নিয়ে মরার দরকার নেই—নিন, চিঠি লিখুন। কলমে কালি আছে?’
‘জি, সব ঠিকঠাক করা আছে। হাতটা কাঁপে হিমু ভাই—লেখা ভালো হবে না। আমাকে একটু উঠিয়ে বসান।’
‘উঠে বসার দরকার নেই। শুয়ে শুয়ে লিখতে পারবেন। খুব সহজ চিঠি। একটা তারা আঁকুন, আবার একটু গ্যাপ দিয়ে চারটা তারা, আবার তিনটা। এইরকম—দেখুন আমি লিখে দেখাচ্ছি—’
.
আসগর সাহেব হতভম্ব হয়ে বললেন, এইসব কী!
আমি হাসিমুখে বললাম, এটা একটা সাংকেতিক চিঠি। আমি মেয়েটার কাছ থেকে একটা সাংকেতিক চিঠি পেয়েছিলাম। কাজেই সাংকেতিক ভাষায় চিঠির জবাব।
‘তারাগুলির অর্থ কী?’
‘এর অর্থটা মজার—কেউ ইচ্ছা করলে এর অর্থ করবে I love you. একটা তারা I, চারটা তারা হলো Love, তিনটি তারা হলো You. আবার কেউ ইচ্ছা করলে অর্থ করতে
পারে—I hate you.’
আসগর সাহেব কাঁপা-কাঁপা হাতে স্টার এঁকে দিলেন। আমি সেই তারকাচিহ্নের চিঠি পকেটে নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম—আসগর সাহেবের দিকে তাকিয়ে সহজ গলায় বললাম, আপনার সঙ্গে তা হলে আর দেখা হচ্ছে না?
‘জি না।’
‘মৃত্যু কখন হবে বলে আপনার ধারণা?’
আসগর সাহেব জবাব দিলেন না। আমি বললাম, রাতে একবার এসে খোঁজ নিয়ে যাব। মরে গেলে তো চলেই গেলেন। বেঁচে থাকলে কথা হবে।
‘জি আচ্ছা।’
‘আর কিছু কি বলবেন? মৃত্যুর পর আত্মীয়স্বজনকে কিছু বলা কিংবা…
মনসুরের পরিবারকে টাকাটা পাঠিয়ে দেবেন ভাইসাব। মনসুর এসে পরিবারের
ঠিকানা দিয়ে গেছে।
‘ঠিকানা কী?’
‘কাগজে লিখে রেখেছি—পোস্টাপিসের কিছু কাগজ, পাশবই সব একটা বড় প্যাকেটে ভরে রেখে দিয়েছি। আপনার নামে অথরাইজেশন চিঠিও আছে।’
‘ও আচ্ছা, কাজকর্ম গুছিয়ে রেখেছেন?’
‘জি-যতদূর পেরেছি।’
‘অনেকদূর পেরেছেন বলেই তো মনে হচ্ছে—ফ্যাকড়া বাধিয়েছে মনসুর—সে যদি ভূত হয়ে সত্যি সত্যি তার পরিবারের ঠিকানা বলে দিয়ে যায় তা হলে বিপদের কথা।’
‘কিসের বিপদ হিমু ভাই?’
‘তা হলে তো ভূত বিশ্বাস করতে হয়। রাত-বিরাতে হাঁটি, কখন ভূতের খপ্পরে পড়ব!’
‘জগৎ বড় রহস্যময় হিমু ভাই।’
‘জগৎ মোটেই রহস্যময় না। মানুষের মাথাটা রহস্যময়। যা ঘটে মানুষের মাথার মধ্যে ঘটে। মনসুর এসেছিল আপনার মাথার ভেতর। আমার ধারণা, সে তার পরিবারের ঠিকানা ঠিকই দিয়েছে। আপনার মাথা কীভাবে কীভাবে এই ঠিকানা বের করে ফেলেছে।’
‘আপনার কথা বুঝতে পারছি না হিমু ভাই। ‘
‘বুঝতে না পারলেও কোনো অসুবিধা নেই। আমি নিজেও আমার সব কথা বুঝতে পারি না।’
আমি আসগর সাহেবের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে এলাম। গফুরের মেয়েটার সঙ্গে দুটা কথা বলার ইচ্ছা ছিল। মেয়েটাকে দেখলাম না। গফুর তার বিছানায় হাঁ করে ঘুমাচ্ছে। তার মুখের উপর একটা মাছি ভনভন করছে, সেই মাছি তাড়াবার চেষ্টা করছেন বয়স্কা এক মহিলা। সম্ভবত গফুরের স্ত্রী। স্বামীকে তিনি নির্বিঘ্নে ঘুমুতে দিতে চান।
রিকশা নিয়ে নিলাম। মারিয়ার বাবাকে দেখতে যাব। পাঁচ বছর পর ভদ্রলোককে দেখতে যাচ্ছি। এই পাঁচ বছরে তিনি আমার কথা মনে করেছেন। আমি গ্রেফতার হয়েছি শুনে চিন্তিত হয়ে চারদিকে টেলিফোন করেছেন। আমি তাঁর কথা মনে করিনি। আমি আমার বাবার কঠিন উপদেশ মনে রেখেছি—
প্রিয় পুত্ৰ,
মানুষ মায়াবদ্ধ জীব। মায়ায় আবদ্ধ হওয়াই তাহার নিয়তি। তোমাকে আমি মায়ামুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়া বড় করিয়াছি। তার পরেও আমার ভয়—একদিন ভয়ংকর কোনো মায়ায় তোমার সমস্ত বোধ, সমস্ত চেতনা আচ্ছন্ন হইবে। মায়া কূপবিশেষ, সে-কূপের গভীরতা মায়ায় যে আবদ্ধ হইবে তাহার
