আছ জয়গুন?
ভেতর থেকে তীক্ষ্ণ কণ্ঠ ভেসে এল—আপনে কে?
‘আমার নাম হিমু।’
দরজা খুলে গেল। আমার সামনে জয়গুন দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর শাড়ি মোটেও এলোমেলো নয়। তার ব্লাউজের বোতামও ঠিক আছে। খুব রূপবতী মেয়ে দেখব বলে এসেছিলাম, দুধে আলতা রঙের একজনকে দেখছি—তাকে রূপবতী বলার কোনো কারণ নাই। দাঁত উঁচু। যথেষ্ট মোটা। থপথপ করে হাঁটছে। একেক জনের সৌন্দর্য একেক রকম। কুদ্দুসের কাছে জয়গুন হলো—হেলেন অভ ট্রয়। জয়গুন মধুর গলায় বলল, ও আল্লা, ভিতরে আসেন।
‘আমি সঙ্গে করে আমার এক ফুপাতো ভাইকে নিয়ে এসেছি। ওর নাম বাদল।’
‘অবশ্যই আনবেন। ছোট ভাই, আসো।’
জয়গুন হাত ধরে বাদলকে ভেতরে নিয়ে গেল। বাদল সংকুচিত হয়ে রইল। আমি বেশ আগ্রহ নিয়ে জয়গুনের ঘর দেখছি। সাজানো-গোছানো ঘর। রঙিন টিভি আছে। ভিসিআর আছে। এই মুহূর্তে ভিসিআর-এ হিন্দি ছবি চলছে।
জয়গুন লজ্জিত ভঙ্গিতে বলল, সময় কাটে না, এইজন্যে রোজ তিনটা-চাইরটা কইরা ছবি দেখি। আপনেরা আরাম কইরা বসেন। এসি ছাড়ি?
‘এসি আছে?’
‘জি আছে। ঠাণ্ডা বাতাসে শইল্যে বাত হয়, এইজন্য এসি ছাড়ি না। ফ্যান দিয়া কাম সারি।’
‘আমাদের জন্যে এসি ছাড়বে—এতে তোমার আবার বাত হবে না তো?’
‘কী যে কন হিমু ভাইজান! অল্প সময়ে আর কী বাত হইব!’
‘অল্প সময় তো না—আমরা সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকব। এসেছি যখন ঠাণ্ডায় ঠাণ্ডায় ভিসিআর-এ একটা ছবি দেখে যাই। অনেকদিন হিন্দি ছবি দেখা হয় না। তোমার অসুবিধা হবে?’
‘কী যে কন ভাইজান! আপনে সারাজীবন থাকলেও অসুবিধা নাই। ‘
‘তুমি একা থাক?’
‘হ, একাই থাকি।’
‘রান্নাবান্না কে করে?’
‘কেউ করে না। হোটেল খাইক্যা খাওন আসে। কাজকামের লোক রাখন আমার পুষায় না। খালি ভ্যানভ্যান করে। আমার হোটেলের সাথে কনটাক।’
‘ভালো ব্যবস্থা তো
‘ “কপি” খাইবেন?—কপি বানানির জিনিস আছে।’
‘হ্যাঁ, “কপি” খাওয়া যায়।
জয়গুন অতি ব্যস্ততার সঙ্গে “কপি” আনতে গেল। আমি জয়গুনের বিছানায় পা তুলে উঠে বসতে বসতে বললাম, বাদল আয়, কোলবালিশে হেলান দিয়ে আরাম করে বোস। একটা হিন্দি ছবি দেখি। দুদিন পর গায়ে কেরোসিন ঢেলে মরে যাবি—হিন্দি ছবি দেখে মনটা ঠিকঠাক কর।
‘তুমি কি সত্যিসত্যি ছবি দেখবে?’
‘অবশ্যই।’
‘এই মেয়েটাকে তুমি চেন কীভাবে?’
‘আমি চিনি না—কানা কুদ্দুস চেনে।’
‘কানা কুদ্দুস কে?’
‘ভয়াবহ খুনি। মানুষ মারা তার কাছে কোনো ব্যাপারই না। মশা মারার মতোই সহজ।’
‘এই ভদ্রমহিলা কি ওনার স্ত্রী?’
‘প্রায় সেরকমই। জয়গুন হচ্ছে কানা কুদ্দুসের বনলতা সেন।‘
‘ভদ্রমহিলা কী সুন্দর দেখেছ হিমুদা?’
‘সুন্দর?’
‘আমি এত সুন্দর মেয়ে আমার জীবনে দেখিনি।‘
‘তাই নাকি?’
‘হ্যাঁ, যতই দেখছি—ততই অবাক হচ্ছি।’
‘তোর মনে হচ্ছে না দাঁতগুলি বেশি উঁচু?’
‘তোমার দাঁতের দিকে তাকাবার দরকার কী?’
‘তাও তো বটে। দাঁতের দিকে তাকাব কেন? হাতি হলে দাঁতের দিকে তাকানোর একটা ব্যাপার চলে আসত। গজদন্ত বিরাট ব্যাপার। মানবদত্ত তেমন কোনো ব্যাপার না। মানবদন্তের জন্ম হয় ডেনটিস্টের তুলে ফেলার জন্যে।‘
‘তোমার কথা কিছু বুঝতে পারছি না।’
‘বোঝার দরকার আছে?’
‘না, দরকার নেই।’
জয়গুন মগে করে ‘কপি’ নিয়ে এসেছে। এক এক মগে এক এক পোয়া করে চিনি দিয়ে বানানো ঘন এক সিরাপজাতীয় বস্তু। আমি মুখে দিয়ে বললাম অপূর্ব! আমি যা করি বাদলও তা-ই করে। কাজেই বাদলও চোখ বড় বড় করে বলল, অপূর্ব!
জয়গুনের সুন্দর মুখ আনন্দে ভরে গেল। সে বলল, ছবি দেখবেন ভাইজান?
‘হ্যাঁ দেখব। ভালো একটা-কিছু দাও।’
‘পুরানো ছবি দেখবেন? দিদার আছে—দিলীপকুমারের ছবি।’
‘দিলীপকুমারের ছবি দেখা যেতে পারে।’
‘বেলেক এন্ড হোয়াইট।’
‘শাদা-কালোর কোনো অসুবিধা নেই—তারপর জয়গুন, কুদ্দুসের কোনো খবর জান?’
‘জি না। মেলা দিন কোনো খোঁজ নাই। বুঝছেন ভাইজান, মানুষটার জন্য অত অস্থির থাকি—হে বুঝে না। কোনদিন কোন বিপদে পড়ে! বিপদের কি কোনো মা-বাপ আছে? সবকিছুর মা-বাপ আছে বিপদের মা-বাপ নাই। তারে কে বুঝাইবে কন? আফনেরে খুব মানে। যখন আসে তখনই আফনের কথা কয়। ভাইজান!’
‘বলো।’
‘আফনে তার জন্যে এট্টু দোয়া করবেন ভাইজান।’
‘আমার দোয়াতে কোনো লাভ হবে না জয়গুন। সে ভয়ংকর সব পাপ করে বেড়াচ্ছে। সেই পাপের শাস্তি তো হবেই।’
‘মৃত্যুর পরে আল্লাহ্পাক শাস্তি দিলে দিব। এই দুনিয়ায় শাস্তি হইব এইটা কেমন বিচার?’
‘এটা হচ্ছে জনতার বিচার। আল্লাহ্পাক কিছু কিছু শাস্তি জনতাকে দিয়ে দেবার ব্যবস্থা করেন। মানুষ ভুল করে—জনতা ভুল করে না।’
জয়গুন ছবি চালিয়ে দিয়েছে। তার চোখভরতি পানি। কানা কুদ্দুসের মতো একটি ভয়াবহ পাপীর জন্যে জয়গুনের মতো একটি রূপবতী মেয়ে চোখের পানি ফেলছে—কোনো মানে হয়? হয় নিশ্চয়ই—সেই মানে বোঝার ক্ষমতা আমাদের নেই।
ছবি চলছে। আমি, বাদল এবং জয়গুন ছবি দেখছি। জয়গুন ছবি দেখছে গভীর আনন্দ ও বিস্ময় নিয়ে। আশ্চর্য। বাদলও তা-ই করছে।
শামসাদ বেগমের কিন্নরকণ্ঠের গান শুরু হলো—‘বাচপানকে দিন ভুলানা দেনা।’ বাদলের চোখে পানি। দুদিন পর গায়ে আগুন লেগে যার মরার কথা সে ছবি দেখে ফুঁপিয়ে কাঁদছে—কোনো মানে হয়?
‘বাদল!’
‘জি!’
‘তোর গায়ে কেরোসিন ঢালার ব্যাপারটা মনে হয় তাড়াতাড়ি সেরে ফেলা দরকার। আর দেরি করা যায় না।’
‘কেন?’
‘দেশ ঠিক হয়ে যাচ্ছে। সব স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে। যা করার তার আগেই করতে হবে।’
‘দেশ ঠিক হয়ে যাচ্ছে কে বলল?’
‘মাঝে মাঝে আমি ভবিষ্যৎ দেখতে পাই।’
বাদল কিছু বলল না। আমার কথা সে শুনতে পায়নি। তার সমস্ত ইন্দ্রিয় এখন দিলীপকুমারের কর্মকাণ্ডে নিবেদিত। আমি বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে পড়লাম। ঘুম-ঘুম পাচ্ছে। খানিকক্ষণ ঘুমিয়ে নেয়া যেতে পারে। হিন্দি আমি বুঝি না। ওদের কথাবার্তা কিছুই বুঝতে পারছি না। বাদল এবং জয়গুনের ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে—ছবি দেখার জন্যে হলেও হিন্দি শেখার দরকার ছিল। আমি শুনেছি হিন্দি খুব নাকি মিষ্টি ভাষা। আমার মনে হয় না। লেডিস টয়লেটের হিন্দি হচ্ছে—’দেবীও কী হাগন কুঠি’ অর্থাৎ ‘দেবীদের হাগাঘর’। যে-ভাষায় মেয়েদের বাথরুমের এত কুৎসিত নাম সেই ভাষা মিষ্টি হবার কোনো কারণ নেই। আমি পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়লাম।
৯
অনেকদিন পর বাবাকে স্বপ্নে দেখলাম। তিনি খুব চিন্তিত মুখে আমার বিছানায় বসে আছেন। গায়ে খদ্দরের চাদর। হাত দুটা কোলের উপরে ফেলে রাখা। চোখে চশমা। চশমার মোটা কাঁচের ভেতর থেকে তাঁর জ্বলজ্বলে চোখ দেখা যাচ্ছে। আমি বাবাকে দেখে ধড়মড় করে উঠে বসলাম।
বাবা বললেন, কেমন আছিস হিমু?
আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম, খুব ভালো আছি বাবা।
বাবা নিচু গলায় বললেন, তুই তো সব গণ্ডগোল করে ফেলেছিস। এত শখ ছিল তুই মহাপুরুষ হবি। এত ট্রেনিং দিলাম…
‘টেনিং দিয়ে কী আর মহাপুরুষ বানানো যায় বাবা?’
‘ট্রেনিং দিয়ে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বানাতে পারলে মহাপুরুষ বানানো যাবে না কেন? অবশ্যই যায়। ট্রেনিং ঠিকমতো দিতে পারলে..’
‘তা হলে মনে হয় তোমার ট্রেনিং-এ গণ্ডগোল ছিল।’
‘উহুঁ, ট্রেনিং-এ কোনো গণ্ডগোল নেই। তুই নিয়মকানুন মানছিস না। মহাপুরুষের প্রথম শর্ত হলো—কোনো ব্যক্তিবিশেষের উপর মায়া করবি না। মায়া হবে সর্বজনীন। মায়াটাকে ছড়িয়ে দিবি।’
‘তা-ই তো করছি!’
‘মোটেই তা করছিস না। তুই জড়িয়ে পড়ছিস। মারিয়াটা কে?
মারিয়া হচ্ছে মরিয়ম।’
‘তুই এই মেয়ের সঙ্গে এমন জড়ালি কেন?’
‘জড়াইনি তো বাবা! আমি ওর সাংকেতিক চিঠির জবাব পর্যন্ত দিইনি। ও চিঠি দেবার পর ওর বাসায় যাওয়া পর্যন্ত ছেড়ে দিয়েছি।’
‘এটাই কি প্রমাণ করে না তুই জড়িয়ে পড়েছিস? মেয়েটার মুখোমুখি হতে ভয় পাচ্ছিস।’
‘তুমি কি তার বাসায় যেতে বলছ?’
‘অবশ্যই যাবি।’
‘কিন্তু বাবা, একটা ব্যাপার কী জান? আমার ধারণা, এই যে স্বপ্নটা দেখছি এটা আসলে দেখছি আমার অবচেতন মনের কারণে। আমার অবচেতন মন চাচ্ছে আমি মারিয়ার সঙ্গে দেখা করি। সেই চাওয়াটা প্রবল হয়েছে বলেই সে তোমাকে তৈরি করে স্বপ্নে আমার কাছে নিয়ে এসেছে। তুমি আমাকে মারিয়ার বাসায় যেতে বলছ। তুমি আমার অবচেতন মনেরই একটা ছায়া। এর বেশি কিছু না।’
‘তা হতে পারে।’
‘আমার অবচেতন মন যা চাচ্ছে, তা-ই তোমাকে দিয়ে বলিয়ে নিচ্ছে।’
‘হুঁ, যুক্তির কথা।’
‘মহাপুরুষরা কি যুক্তিবাদী হন বাবা?’
‘তাঁদের ভেতর যুক্তি থাকে, কিন্তু তাঁরা যুক্তি দিয়ে পরিচালিত হন না।’
‘কেন?’
‘কারণ যুক্তি শেষ কথা
