- প্রথম পরিচ্ছেদ: দেবগ্রামের পথে
- দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: মহাতাপ কথাটা মিথ্যা বলে নাই
- তৃতীয় পরিচ্ছেদ: দিন কয়েক পরের কথা
- চতুর্থ পরিচ্ছেদ: দেখিতে দেখিতে বৰ্ষা নামিয়া পড়িল
- পঞ্চম পরিচ্ছেদ: ভাদ্র মাস পড়িয়া গিয়াছে
- ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ: ভাদ্র শেষ হইয়া গিয়াছে
- সপ্তম পরিচ্ছেদ: পূজা আসিয়া পড়িয়াছে
- অষ্টম পরিচ্ছেদ: পরদিন সপ্তমীর সকাল
- নবম পরিচ্ছেদ: নবমীর রাত্রিকাল
চাঁপাডাঙার বউ | Champadangar Bou
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রথম পরিচ্ছেদ: দেবগ্রামের পথে
দেবগ্রামের পথে পাশের বড় গ্রাম হইতে গাজনের সঙ আসিয়া হাজির হইয়াছে। একজন ঢাকী বড় একখানা ঢাক নাচিয়া নাচিয়া বাজাইতেছে। তাহার সঙ্গে কাসি ও শিঙা। দলটাকে অনেক। দূরে দেখা যাইতেছে। দেবগ্রামে গাজন নাই। নবগ্রামের গাজনও এ গ্রামে আসে না। এবার। ব্যাপারটা নতুন।
দক্ষিণ পাড়ার মণ্ডলবাড়ি হইতে বাহির দরজায় বধূ দুটি ছুটিয়া আসিয়া দাঁড়াইল।
গ্রামের সবচেয়ে সমৃদ্ধ মণ্ডলবাড়ি। মাটির ঘর টিনের চাল, পাকা মেঝে। বারান্দায় সুন্দর গড়নের কাঠের খুঁটি। সেতাব ও মহাতাপ মণ্ডলের বাড়ি। বধূ দুইটি দুই ভায়ের স্ত্রী কাদম্বিনী ও মানদা। কাদম্বিনী ঈষৎ দীর্ঘাঙ্গী, তন্বী এবং শ্যামবৰ্ণে চমৎকার লাবণ্যময়ী মেয়ে। মানদা মাথায় খাটো, একটু লাঙ্গী। কাদম্বিনী নিঃসন্তান, বয়স চব্বিশ-পঁচিশ, মানদার বয়স সতেরআঠের—একটি সন্তানের জননী মানদা।
ওদিকে গাজনের সঙের দল অন্য একটা রাস্তায় ভাঙিয়া ঢুকিয়া যাইতে শুরু করিল। ঢাকের বাজনার শব্দ বাঁকের আড়ালে পড়িয়া কম হইয়া আসিল।
মানদা বলিল, মরণ! ওরাস্তায় ঢুকে গেল যে মড়ার দল।
কাদম্বিনী গবেষণা করিয়া বলিল, বোধহয় ও-পাড়ায় মোটা মোড়লের বাড়ি গেল।
—মোটা মোড়লের বাড়ি? কেন? আমাদের বাড়ির চেয়ে মোটা মোড়লের খাতির বেশি। নাকি?
—তা বয়সের খাতির তো আছে। তা ছাড়া দিতে-থুতে মোটা মোড়লর নাম যে খুব।
ঠোঁটে পিচ কাটিয়া মানদা বলিল, নাম! বলে যে সেইভেতরে ছুঁচোর কেন, বাইরে কোচার পত্তন, তাই। এদিকে তো দেয় শুনি একগলা জল। ইরে দেওয়া-থোয়ার নাম।
কাদম্বিনী একটু শাসনের সুরেই বলিল, ছি, এমন করে কথা বলে না। হাজার হলেও মান্যের লোক। এখন চল, হাতের কাজ সেরে নিই। গায়ে যখন এসেছে তখন এদিকেও আসবে।
তাহারা বাড়ির মধ্যে ঢুকিয়া গেল।
প্রথমেই গোশালা। গরুগুলি চালায় বাঁধা। দ্বিপ্রহরের রৌদ্রের মধ্যে শুইয়া আছে, রোমন্থন করিতেছে, একটা রাখাল গরুর গায়ে তাকিয়ার মত হেলান দিয়া ঘুমাইতেছে।
তাহার পর খামার-বাড়ি।
খামার-বাড়িতে ঢুকিতেই এক কলি গান ও দুপদুপ শব্দ শুনিতে পাওয়া গেল। গমের উপর বাঁশ পিটিয়া গম ঝরাইতে ঝরাইতে কৃষাণটা গান করিতেছে–
চাষকে চেয়ে গোরাচাঁদরে মান্দেরী ভাল।
গমের চারিপাশে পায়রা জমিয়া গম খাইতেছে।
কাদম্বিনী ফিক করিয়া হাসিয়া বলিল, কেন রে নোটন, এত আক্ষেপ কেন?
জিভ কাটিয়া নোটন বলিল, আজ্ঞে মুনিব্যান?
–চাষের চেয়ে মান্দেরী ভাল বলছিস?
–আজ্ঞে মুনিব্যান, মান্দেরী হলে কি আজ আর গম ঝরাতাম গো। চলে যেতাম গাজনের ধুম দেখতে।
মানদা বলিল, এবার গাজনের ধুম যে দেখি খুব নোটন। দুখানা গেরাম পার হয়ে আমাদের গাঁয়ে এল।
—সে তো আমাদের ছোট মোড়লের কাও গো। তুমিই তো ভাল জানবে ছোট মুনিব্যান। কাদম্বিনী সবিস্ময়ে প্রশ্ন করি, কার? মহাতাপের?
–হাঁ গো। আজ কদিন সে হোথাকেই রয়েছে।
–সে কি? সে যে গেল শ্বশুরকে দেখতে! মানুর বাপের অসুখ
মানদা তাহার দিকে অগ্নিদৃষ্টি হানিয়া বলিল, শাক দিয়ে মাছ ঢাকা যায় না বড়দি। শুধু শুধু আর মিছে কথাগুলো বোলো না তুমি!
–মানু! কি বলছিস তুই?
–ঠিক বলছি গো, বড় মোল্যান। সে যে যায় নাই, তা তুমি জান।
–আমি জানি।
–জান না? যদি না জান তবে আমার যাওয়া তুমি বন্ধ করলে ক্যানে?
—এই গরমে ছ ক্ৰোশ পথ থোকাকে নিয়ে যাবি, খোকার অসুখবিসুখ করবে, তাই বারণ করলাম। বললাম-ঠাকুরপো দেখে আসুক।
মিছে কথা। আমি জানি, আমি বুঝি। বুঝেছ, আমি সব বুঝি। আমার বাপের বাড়ি যাবে? তার চেয়ে চার দিন গাজনে নেশাভাঙ করুক, ভূতের নাচন নাচুক, সেও ভাল। আমি সব বুঝি।
মানদা হনহন করিয়া চলিয়া গেল খামার-বাড়ি পার হইয়া বাড়ির ভিতর দিকে। খামারবাড়ির ও-দিকে পাচিলের গায়ে একটা দরজা। সেই দরজাটাকে সবলে ঠেলিয়া দিয়া ভিতরে ঢুকিয়া গেল। কাদম্বিনী দাঁড়াইয়া রহিল। খানিকটা ভাবিয়া দেখিয়া বলিল, তুই ঠিক জানিস নোটন, ঘোট মোড়ল আজ কদিন নবগ্যেরামের গাজনে মেতে সেইখানেই রয়েছে?
–এই দেখ! আমি নিজে চোখে দেখে এসেছি গো। রোজ দেখা হচ্ছে।
–বলিস নাই ক্যানে?
—তার আর বলব কি বল? আর কি বলে, ছোট মোড়ল বললে—নোটন, বলিস না বাড়িতে, তা হলে দেব কিল ধমাধম। ছোট মোড়লের কিল বড় কড়া, তেমুনি ভারি, আষিঢ়ে তাল।
–হুঁ। কাদম্বিনী বাড়ির দিকে অগ্রসর হইল।
নোটন পিছন হইতে বলিল, বড় মোল্যান!
–কি?
–ছোট মোড়ল কিন্তু চাঁপাডাঙা গিয়েছিল।
–গিয়েছিল? গিয়েছিল তো নবগ্রামে থাকল কি করে?
–ওই দেখ! ছ কোশ ছ কোশ বার কোশ রাস্তা ছোট মোড়লের কাছে কতক্ষণ! যেদিন সকালে গিয়েছে, তার ফেরা দিন ফিরেছে। এসে নবগ্যেরামেই জমে যেয়েছে। ভাঙ খেয়েছে, বোম্বোম্ করছে; আর পড়ে আছে। শোনলাম, দশ টাকা চাঁদা দিয়েছে।
—দশ টাকা?
–হ্যাঁ।
–দশ টাকা?
–হ্যাঁ গো। ছোট মোল্যান তিরিশ টাকা দিতে দিয়েছিল বাপের বাড়িতে। তা থেকে দশ টাকা ছোট মোড়ল খয়রাত করে দিয়েছে।
—তোকে কে বললে?
—কে আবার! খোদ ছোট মোড়ল নিজে। সে সেই প্রথম দিনের কথা। যে দিনে যায় সেই দিনের। নবগ্যেরামে চাঁদা দিয়েটিয়ে ভাবছে-কি করি! আমার সাথে দেখা। বলে—দশ টাকা তু ধার এনে দে নোটন। বলে দোব, বড় বউ তোকে দেবে। তা কি করব? এনে দেলাম।
বড় বউ কাদম্বিনীর মুখে একটু হাসি ফুটিয়া উঠিল। হাসিয়াই সে বলিল, আর কাউকে এ কথা বলিস না নোটন, তোর টাকা আমি দোব।
বলিয়া সে বাড়ির ভিতর ঢুকিয়া গেল।
বাড়ির উঠানে ছোলা কলাই মেলিয়া দেওয়া রহিয়াছে। পাশে দুইটা ঝুড়িতে কতক তোলা হইয়াছে। বধূ দুইটি ছোলা তুলিতে তুলিতেই উঠিয়া গিয়াছিল, দেখিয়াই বোঝা যায়।
একটা ছাগল সেগুলো নির্বিবাদে খাইতেছে। দুইটি ছানা পিছনে দাঁড়াইয়া আছে, লাফাইতেছে।
ছোট বউ মানদা একটা দাওয়ায় দেওয়ালে ঠেস দিয়া ফুঁপাইয়া কাঁদিতেছে।
বড় বউ ঘরে ঢুকিয়াই ছাগলটাকে তাড়াইল—মর ম সব্বনাশী রাক্ষসী, বেরো, দূর হ।
ছাগলটা পলাইল।
বড় বউ ঝুড়ি টানিয়া লইয়া বলিল, তুই বসে বসে দেখলি মানু? তাড়ালি না?
–আমার ইচ্ছে।
–আমার খুশি।
–তোর খুশি?
–হ্যাঁ। খুশি। বলি, কেন তাড়াব? কি গরজ? এ সংসারে আমার কি আছে? কি হবে?
বড় বউ তুলিতে তুলিতে বলিল, এত রাগ করে না। দিনে-দুপুরে কঁদে না, কাঁদতে নাই। আর তার কারণও নাই। নোটনকে তুই জিজ্ঞাসা করে আয়, ঠাকুরপো চাঁপাডাঙা গিয়েছিল। তবে হ্যাঁ, এক দিনের বেশি থাকে নাই। সেখান থেকে এসে নবগ্যেরামে ডেরা নিয়েছে। আয়, ছোলা কটা তুলে নে।
–পারব না আমি।
–পারতে হবে। আয়।
–তুমি মহারানী হতে পার, আমি তোমার দাসী নই। সংসার চুলোয় যাক, আমার কি?
একটা ঝুড়ি ইতিমধ্যে পূর্ণ হইয়া গিয়াছিল। সেটাকে কাঁধে তুলিয়া ঘরে লইয়া যাইবার পথে মানদার কাছে থমকিয়া দাঁড়াইয়া মৃদু স্বরে বলিল, টাকা তিরিশটা চাঁপাডাঙায় তালুয়ের হাতে পৌচেছে মানু। ঠাকুরপো দিয়ে এসেছে। সংসার চুলোয় গেলে, সে আর কখনও পাঠানো চলবে না। যা কলাইগুলো তুলে নে। কেলেঙ্কারি বাড়াস নেয়।
সে ঘরের মধ্যে ঢুকিয়া গেল।
মানদা চমকিয়া উঠিল। ঘরের দিকে মুখ ফিরাইয়া বলিল, কি বললে? তুমি কি বললে?
ঘরের ভিতর হইতেই কাদু জবাব দিল, কিছু বলি নাই। বলছি, ছোলাগুলো তুলে ফেল্।
মানদা ঘরের দিকে আগাইয়া গেল–না, টাকা বলে কি বললে তুমি বল?
কাদম্বিনী বাহির হইয়া আসিয়া হাসিয়া বলিল, বলছি টাকা নয় রে–তারিখ, তারিখ–আজ মাসের ক তারিখ বলতে পারিস? বলিয়াই সে মুখে আঙুল দিয়া চুপ করিবার ইঙ্গিত দিয়া আঙুল দিয়াই দেখাইয়া দিল। নিজে জানালা দিয়া উঁকি দিল।
ঘরের মধ্যে সেতাব খাতাপত্ৰ লইয়া হিসাব করিতেছিল। বয়স বছর বত্রিশেক। শুকনা শরীর, বিরক্তি-ভরা মুখ। এক জোড়া গোঁফ আছে। সে ঘাড় উঁচু করিয়া কান পাতিয়া কথা শুনিতেছে। কথা বন্ধ হওয়ায় সে সন্তৰ্পণে উঠিয়া দাঁড়াইল এবং পা টিপিয়া আসিয়া জানালার পাশে আড়ি পাতিল। ওদিকে পাশের দরজা ঠেলিয়া বড় বউ ঢুকিয়া দাঁড়াইল এবং বলিল, ও কি হচ্ছে কি?
সেতাব চমকিয়া উঠিল এবং উত্তরে প্রশ্ন করিল, কি?
–তাই তো জিজ্ঞাসা করছি। ওখানে অমন করে আড়ি পাতার মত দাঁড়িয়ে কেন?
–আড়ি পাতব কেন?
–তবে করছ কি?
–কিছু না। সে ফিরিয়া আসিয়া তক্তপোশে বসিল। তারপর বলিল, ভত্তি দুপহরে তোমরা দুই জায়ে ঝগড়া লাগিয়েছ কেন বল তো? পয়লা বোশেখ… শুভদিন, বলি তোমরা
