হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম

হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম

হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম

« <
/ 26
> »

সারারাত জেগে থাকলাম মনসুরের জন্যে। তার আর দেখা পেলাম না। এই হচ্ছে হিমু ভাই ঘটনা।’

‘এটা কোনো ঘটনা না—এটা স্বপ্ন। স্বপ্ন দেখেছেন।’

‘জি না ভাইসাহেব, স্বপ্ন না। স্পষ্ট চোখের সামনে দেখা। মনসুর আগের মতোই আছে, তার কোনো পরিবর্তন হয় নাই। ‘

‘আসগর ভাই, মনসুর মরে ভূত হয়ে আপনার কাছে ছুটে এসেছে? আপনার কথা তার মনে আছে, অথচ পরিবারের নাম-ঠিকানা ভুলে গেছে—এটা কি হয়? হয় না। এই ধরনের ঘটনা স্বপ্নে ঘটে। আপনাকে ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়েছে—আপনি তার মধ্যে স্বপ্নের মতো দেখেছেন।’

‘স্বপ্ন না হিমু ভাই।’

‘আচ্ছা ঠিক আছে, যান, স্বপ্ন না।’

‘আমার মৃত্যুর পর আপনাকে কয়েকটা কাজ করতে হবে হিমু ভাই।’

‘যা বলবেন করব।’

‘কাজগুলি কী, বলব?’

‘আপনি নিশ্চয়ই দুএকদিনের মধ্যে মারা যাচ্ছেন না। কিছু সময় তো হাতে আছে!’

‘কী করে বলব ভাইসাহেব—হায়াত-মউত তো আমাদের হাতে না।’

‘কিন্তু আপনি যেভাবে বলছেন তাতে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, মৃত্যু আপনার নিজের হাতে। শুনুন আসগর সাহেব, আপনাকে এখন মরলে চলবে না—আমাকে একটা চিঠি লিখে দিতে হবে। আপনার মুক্তার মতো হাতের লেখায় আপনি আমার হয়ে একটা চিঠি লিখবেন।’

‘কাকে লিখব?’

‘একটা মেয়েকে লিখবেন। তার নাম মারিয়া। খুব দামি কাগজে খুব সুন্দর কালিতে চিঠিটা লিখতে হবে।’

‘অবশ্যই লিখব হিমু ভাই। আনন্দের সঙ্গে লিখব।’

‘সমস্যা হলো কী জানেন? অসহযোগের জন্যে দোকানপাট সব বন্ধ। দামি কাগজ যে কিনব সেই উপায় নেই। কাজেই অসহযোগ না কাটা পর্যন্ত যেভাবেই হোক আপনাকে বেঁচে থাকতে হবে—এটা মনে রাখবেন। আমাকে যদি চিঠিটা লিখে না দিয়ে যান তা হলে আমার একটা আফসোস থাকবে।

‘আপনার চিঠি আমি অবশ্যই লিখে দেব হিমু ভাই।’

‘তা-হলে আজ উঠি।’

‘আরেকটু বসেন।’

‘অসুস্থ মানুষের পাশে বসে থাকতে ভালো লাগে না।’

আসগর সাহেব নিচু গলায় বললেন, আমার শরীরটা অসুস্থ, কিন্তু হিমু ভাই মনটা সুস্থ। আমার মনে কোনো রোগ নাই।

আমি চমকে তাকালাম। মৃত্যুর-লক্ষণ বলে একটা ব্যাপার আছে। মৃত্যুর আগে—আগে এইসব লক্ষণ প্রকাশ পায়। মানুষ হঠাৎ করে উচ্চস্তরের দার্শনিক কথাবার্তা বলতে শুরু করে। তাদের চোখের জ্যেতি নিভে যায়। চোখে কোনো প্রাণ থাকে না। শরীরের যে-অংশ সবার আগে মারা যায়—তার নাম চোখ।

‘হিমু ভাই!’

‘জি?’

‘ডাক-চলাচল কি আছে?’

‘কিছুই চলছে না—ডাক চলবে কীভাবে?’

‘আমার আত্মীয়স্বজনদের একটু খবর দেয়া দরকার। ওদের দেখার জন্য যে মনটা ব্যস্ত তা না—অসুস্থ ছিলাম এই খবরটা তারা না পেলে মনে কষ্ট পাবে।’

‘ডাক-চলাচল শুরু হলেই খবর দিয়ে দেব।’

‘মানুষ খুব কষ্ট করছে, তাই না হিমু ভাই?’

‘বড় বড় নেতারা যদি ভুল করেন তা-হলে সাধারণ মানুষ তো কষ্ট করবেই!’

‘আমরা যারা ছোট মানুষ আছি হিমু ভাই—আমরাও ভুল করি। মানুষের জন্মই হয়েছে ভুল করার জন্য। তবে হিমু ভাই, ছোট মানুষের ভুল ছোট ছোট। তাতে তার নিজের ক্ষতি, আর কারোর ক্ষতি হয় না। বড় মানুষের ভুলগুলোও বড় বড়। তাদের ভুলে সবার ক্ষতি হয়। আমরা ছোট মানুষরা নিজেদের মঙ্গল চাই। বড় মানুষরাও তাঁদের মঙ্গল চান। কিন্তু হিমু ভাই, তাঁরা ভুলে যান, যেহেতু তাঁরা বড় সেহেতু তাঁদের নিজেদের মঙ্গল দেখলে হবে না। তাঁদের দেখতে হবে সবার মঙ্গল। ঠিক বলেছি?’

‘ঠিক বলেছেন। আমাকে এইসব ঠিক কথা বলে লাভ কী? যাঁদের বলা দরকার তাঁদের বললে তো তাঁরা শুনবেন না।’

‘একটা কি ব্যবস্থা করা যায় হিমু ভাই—আমি বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে দুটা কথা বলব, শেখ হাসিনার সঙ্গে দুটা কথা বলব—এরশাদ সাহেবের সঙ্গে তো কথা বলা যাবে না। উনি জেলে।’

‘কারও সঙ্গেই কথা বলা যাবে না—নেতারা সবাই আসলে জেলে। নিজেদের তৈরি জেলখানায় তাঁরা আটকা পড়ে আছেন। সেই জেলখানার পাহারা দিচ্ছে তাঁদেরই প্রিয় লোকজন। তাঁরা তা জানেন না। তাঁরা মনে করেন তাঁরা স্বাধীন মুক্ত বিহঙ্গ… আসগর সাহেব!’

‘জি হিমু ভাই?’

‘উচ্চস্তরের চিন্তাভাবনা করে কোনো লাভ নেই। আপনি ঘুমাবার চেষ্টা করেন।‘

‘জি আচ্ছা। আপনাকে একটা কথা বলব হিমু ভাই, যদি মনে কিছু না করেন।’

‘জি না, মনে কিছু করব না।’

‘আপনি যে-চিঠিটা আমাকে দিয়ে লেখাবেন সেই চিঠির কাগজটা আমি কিনব।’

‘সেটা হলে তো খুবই ভালো হয়। আমার হাত একেবারে খালি।’

‘বাংলাদেশের সবচে দামি কাগজটা আমি আপনার জন্যে কিনব হিমু ভাই।’

‘শুধু কাগজ কিনলে তো হবে না—কলমও লাগবে, কালিও লাগবে। সবচে দামি কাগজে দুটাকা দামের বল পয়েন্টে লিখবেন তা তো হয় না। দামি কাগজে লেখার জন্যে লাগে দামি কলম।’

‘খুবই খাঁটি কথা বলেছেন হিমু ভাই—কলম আর কালিও আমি কিনব। আমি যে আপনাকে কী পছন্দ করি আপনি জানেন না হিমু ভাই।’

‘জানব না কেন, জানি। ভালোবাসা মুখ ফুটে বলতে হয় না। ভালোবাসা টের পাওয়া যায়। আজ যাই আসগর সাহেব! দেশ স্বাভাবিক হোক। দোকানপাট খুলুক—আপনাকে সঙ্গে নিয়ে কাগজ-কলম কিনে আনব।’

‘অবশ্যই। অবশ্যই।’

‘আর ইতোমধ্যে যদি মনসুর এসে আপনাকে বিরক্ত করে তা হলে কষে ধমক লাগবেন। মানুষ হয়ে ভূতদের হাংকিপাংকি সহ্য করা কোনো কাজের কথা না।’

.

আজ হরতালের কত দিন চলছে? মনে হচ্ছে সবাই দিন-তারিখের হিসেব রাখা ভুলে গেছে। নগরীর জন্ডিস হয়েছে। নগরী পড়ে আছে ঝিম মেরে। এই রোগের চিকিৎসা নেই—বিশ্রামই একমাত্র চিকিৎসা। নগরী বিশ্রাম নিচ্ছে। আগের হরতালগুলিতে মোটামুটি আনন্দ ছিল। লোকজন ভিডিও ক্যাসেটের দোকান থেকে ক্যাসেট নিয়ে যেত। স্বামীরা দুপুরে স্ত্রীদের সঙ্গে ঘুমানোর সুযোগ পেত। স্ত্রীরা আঁতকে উঠে বলত—এ কী! দিনে-দুপুরে দরজা লাগাচ্ছ কেন? বাড়িভরতি ছেলেমেয়ে। স্বামী উদাস গলায় বলত, আজ হরতাল না?

এখনকার অবস্থা সেরকম না, এখন অন্যরকম পরিবেশ। জন্ডিসে আক্রান্ত নগরী রোগ সামলে গা-ঝাড়া দিয়ে উঠতে পারবে তো—এটাই সবার জিজ্ঞাসা। নাকি নগরীর মৃত্যু হবে? মানুষের মতো নগরীরও মৃত্যু হয়।

আমি হাঁটছি। আমার পাশে পাশে হাঁটছে বাদল। আমি বললাম—দীর্ঘ হরতালের কিছু-কিছু উপকারিতা আছে। বল তো কী কী?

‘রোড অ্যাক্সিডেন্ট হচ্ছে না।’

‘গুড—হয়েছে। আর কী?’

‘পলিউশন কমেছে—গাড়ির ধোঁয়া, কার্বন মনক্সাইড কিচ্ছু নেই।’

‘ভেরি গুড।’

‘লোকজন বেশি হাঁটাহাঁটি করছে, তাদের স্বাস্থ্য ভালো হচ্ছে। ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা কমছে।‘

‘হয়েছে—আর কী?’

‘আরবদের কাছ থেকে আমাদের পেট্রোল কিনতে হচ্ছে না। কিছু ফরেন কারেন্সি বেঁচে যাচ্ছে।’

‘হুঁ।’

‘আমরা পরিবারের সঙ্গে বেশি সময় কাটাতে পারছি। পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় হচ্ছে।’

‘হুঁ।’

‘পলিটিক্স নিয়ে সবাই আলোচনা করছি—আমাদের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশ নিয়ে সবাই ভাবছি।’

‘আর কিছু আছে?’

‘আর তো কিছু মনে পড়ছে না!’

‘আরও অনেক আছে। ভেবে ভেবে সব পয়েন্ট বের কর, তারপর একটা লিফলেট ছাড়ব।’

‘তাতে লাভ কী?’

‘আছে, লাভ আছে।’

‘তোমার ভাবভঙ্গি আমি কিছুই বুঝি না। তুমি কোন দলের লোক বলো তো! আওয়ামী লীগ, না বিএনপি?’

‘আওয়ামী লীগ যখন খারাপ কিছু করে তখন আমি আওয়ামী লীগকে সমর্থন করি। আর বিএনপি যখন খারাপ কিছু করে তখন বিএনপির সমর্থক।’

‘এর মানে কী?’

‘ভালো কাজের সমর্থন সবসময়ই থাকে। খারাপ কাজগুলির সমর্থনের লোক পাওয়া যায় না। আমি সেই লোক। খারাপ কাজের জন্যেও সমর্থন লাগে। কারণ সব খারাপের মধ্যেও কিছু মঙ্গল থাকে।’

আমরা যাচ্ছি কোথায় হিমুদা?’

‘একটা মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি।’

‘কে? মারিয়া?’

‘উহুঁ, তার নাম জয়গুন।

‘জয়গুন কে?’

‘তুই চিনবি না—খারাপ ধরনের মেয়ে।’

‘ও আচ্ছা।’

বাদল চমকাল না বা বিস্মিত হলো না। সে আমার আদর্শ ভক্ত। দলপতির কোনো সিদ্ধান্তের বিষয়ে কিছু বলবে না। বিস্মিত হবে না, চমকাবে না। অন্ধের মতো অনুসরণ করবে। একদল মানুষ কি শুধু অনুসরণ করার জন্যেই জন্মায়?

.

প্রথম তিনটা টোকা, তারপর একটা, তারপর আবার তিনটা। এরকম করতে থাকলে জয়গুন নামের অতি রূপবতী এক তরুণীর এসে দরজা খুলে দেবার কথা। যার শাড়ি থাকবে এলোমেলো। যার ব্লাউজের দুটা বোতাম নেই—।

বেশ কয়েকবার মোর্স কোডের ভঙ্গিতে তিন এক তিন এক শব্দ করার পর দরজা সামান্য খুলল। সামান্য ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে না দরজা কে খুলেছে। কানা কুদ্দুস বলে দিয়েছিল, দরজা খুলবে জয়গুন। সেই ভরসাতে আন্দাজের উপর বললাম, কেমন

« <
/ 26
> »