- মৃত্যুক্ষুধা: ১
- মৃত্যুক্ষুধা: ২
- মৃত্যুক্ষুধা: ৩
- মৃত্যুক্ষুধা: ৪
- মৃত্যুক্ষুধা: ৫
- মৃত্যুক্ষুধা: ৬
- মৃত্যুক্ষুধা: ৭
- মৃত্যুক্ষুধা: ৮
- মৃত্যুক্ষুধা: ৯
- মৃত্যুক্ষুধা: ১০
- মৃত্যুক্ষুধা: ১১
- মৃত্যুক্ষুধা: ১২
- মৃত্যুক্ষুধা: ১৩
- মৃত্যুক্ষুধা: ১৪
- মৃত্যুক্ষুধা: ১৫
- মৃত্যুক্ষুধা: ১৬
- মৃত্যুক্ষুধা: ১৭
- মৃত্যুক্ষুধা: ১৮
- মৃত্যুক্ষুধা: ১৯
- মৃত্যুক্ষুধা: ২০
- মৃত্যুক্ষুধা: ২১
- মৃত্যুক্ষুধা: ২২
- মৃত্যুক্ষুধা: ২৩
- মৃত্যুক্ষুধা: ২৪
- মৃত্যুক্ষুধা: ২৫
- মৃত্যুক্ষুধা: ২৬
- মৃত্যুক্ষুধা: ২৭
- মৃত্যুক্ষুধা: ২৮ (শেষ)
রুবি বলে উঠল, “শুধু একজনের জন্য ওই চা-টার ওপর লোভ হয়!”
রুবির অতিরিক্ত প্ৰগলভতায় ক্ষুব্ধ হয়ে লতিফা বলে উঠল, “এতই যদি তোর লোভ, তাহলে চা-খোর লোকটাকে বেঁধে রাখলিনে কেন ? তাহলে সেও বাঁচত, তুইও বাঁচতিস। আমরাও বাঁচতাম।”
রুবি বিনা-দ্বিধায় বলে উঠল, “একটা ভুল বললি ভাই বুঁচি। আমরা হয়তো বেঁচে যেতুম সত্যি, কিন্তু তোর দাদু বাঁচত না।”
রুবি লতিফার হাতে কটাস করে টিমটি কেটে দিয়ে বলল, “মর নেকি! তাও বুঝলিনে।” তারপর একটু থেমে বলল, “যে মরেনি তার আবার বাঁচা কি! তোর দাদু তো আমার মতন মরেনি। দিব্যি জ্বলজ্যান্ত বেঁচে থেকে কুলিমজুর নিয়ে মাঠে-ঘাটে চরে খাচ্ছে। আমার একটা বড়ো দুঃখ রইল ভাই, যার জন্যে মরলুম, তাকে মেরে যেতে পারলুম না।”
লতিফা কতকটা কূল পেয়ে হেসে ফেলে বললে, “বাপ রে! কী দস্যি মেয়ে তুই! শোধ না নিয়ে যাবিনে ! তা তোকে একটা খোশখবর দিচ্ছি ভাই। সে হয়তো মরেনি তোর মতো, কিন্তু ঘা খেয়েছে।”
রুবি একেবারে দাঁড়িয়ে উত্তেজিত স্বরে বলে উঠল, “না, না, এ হতেই পারে না! ও শুধু মানুষের বাইরের দুঃখকেই দেখেছে, ভিতরের দুঃখ দেখবার ওর ক্ষমতা নেই, হৃদয় বলেই কোনো কিছুর বালাই নেই ওর! ও শুধু তাদেরই দুঃখ বোঝে, যারা ওর কাছে কেবলই পেতে চায়। যে তাকে তার সর্বস্ব দিয়ে — চেয়ে নয়, সুখী হতে চায়, তার দুঃখ ও বোঝে না, বোঝে না।”
খুলে-পড়া এলোচুলের মাঝে রুবির চোখ আঁধার বনে সাপের মানিকের মতো জ্বলতে লাগল।
লতিফার চোখ দুঃখে, আনন্দে, গর্বে ছলছল করে উঠল। তার দাদুকে এমন করে ভালোবাসারও কেউ আছে। সে রুবিকে একেবারে বুকে চেপে ধরে শান্তস্বরে বলল, তোর অভিমানের কুয়াশায় কিছু দেখতে পাচ্ছিনে রুবি, আমিও তো মেয়ে মানুষ। আমি সত্যি বলছি, সে তোকে ভালোবাসে।”
রুবির চোখের বাঁধ ছাপিয়ে জল ঝরতে লাগল। জ্যৈষ্ঠ মাসের দগ্ধ দুপুরে বর্ষা নামার মতো।
লতিফা তার চোখ মুছিয়ে দিয়ে বলতে লাগল, “আমার দুঃখ হচ্ছে রুবি, ভালোবাসার এই অতলতার সন্ধান পেলে তার কারাবাসও বেহেশ্তের চেয়ে মধুর হয়ে উঠত। তুই ভালোবাসিস শুধু এইটুকুই সে জানে। তার তল যে এত গভীর, তা বোধহয় জানে না।” বলেই রুবির গাল টিপে হেসে বলল, “জানলে দেশসেবা ছেড়ে দিয়ে কোনদিন তোর পদসেবা শুরু করত।”
রুবি কিন্তু এর পরে একটি কথাও কইল না। অতল পাথরের ঝিনুক যেমন দিনের পর দিন ভেসে বেড়ায় ঢেউয়ে ঢেউয়ে, একবিন্দু শিশিরের আশায়, স্বাতী নক্ষত্রের শিশিরের আশায়, তারপর সেই শিশিরটুকু বুকে পেয়েই সে জলের অতল তলে ডুবে যায় মুক্তা ফলাবার সাধনায় – এ-ও তেমনই।
“সেও ভালোবাসে” শুধু এইটুকু সাত্ত্বনাতেই যেন রুবির বুক ভরে উঠল। শুধু এই একবিন্দু শিশিরের প্রতীক্ষাতেই যেন সে তার তৃষ্ণার্ত মুখ তুলে অনির্দেশ শূন্যের পানে তাকিয়ে ছিল। তার বুক ভরে উঠেছে। তার মুখের বাণী মূক হয়ে গেছে। সে আর কিছু চায় না। এইবার সে মুক্তা ফলাবে। সে অতল তলে ডুবে গেল।
ঝিনুকের মুখে একবিন্দু শিশির! নারীর বুকে একবিন্দু প্রেম!
আকাশের এক কোণে এক ফালি চাঁদ! কোন মাসের চাঁদ জানে না, তবু রুবির মনে হতে লাগল, ও যেন ঈদের চাঁদ! ওর রোজার মাস বুঝি শেষ হল আজ!
আকাশের কোলে একটুকু চাঁদ, শিশু-শশী। ও যেন আকাশের খুকি। সাদা মেঘের তোয়ালে জড়িয়ে আকাশ-মাতা যেন ওকে কোলে করে আঙিনায় দাঁড়িয়েছে।
অমনি খুকি…
লজ্জায় রুবির মুখ ‘রুবি’র মতোই লাল হয়ে উঠল। এ কী স্বপ্ন! এ কী সুখ!
মৃত্যুক্ষুধা: ২৪
বরিশাল। বাংলার ভিনিস!
আঁকাবাঁকা লাল রাস্তা। শহরটিকে জড়িয়ে ধরে আছে ভুজ-বন্ধের মতো করে।
রাস্তার দু-ধারে ঝাউগাছের সারি। তারই পাশে নদী। টলমল টলমল করছে – বোম্বাই শাড়ি-পরা ভরা-যৌবন বধূর পথ-চলার মতো। যত না চলে, অঙ্গ দোলে তার চেয়ে অনেক বেশি।
নদীর ওপারে ধানের খেত! তারই ওপারে নারিকেল-সুপারি কুঞ্জঘেরা সবুজ গ্রাম, শান্ত নিশ্চুপ। সবুজ শাড়ি-পরা বাসর-ঘরের ভয়-পাওয়া ছোট্ট কনে-বউটির মতো।
এক আকাশ হতে আর-আকাশে কার অনুনয় সঞ্চরণ করে ফিরছে, “বউ কথা কও। কথা কও।”
আঁধারের চাঁদর মুড়ি দিয়ে তখনও রাত্রি অভিসারে বেরোয়নি। তখনও বুঝি তার সান্ধ্য প্রসাধন শেষ হয়নি। শঙ্কায় হাতের আলতার শিশি সাঁঝের আকাশে গড়িয়ে পড়েছে। পায়ের চেয়ে আকাশটাই রেঙে উঠেছে বেশি। মেঘের কালো খোঁপায় তৃতীয়া চাঁদের গোড়ে মালাটা জড়াতে গিয়ে বেঁকে গেছে। উঠোনময় তারার ফুল ছড়ানো।
তিন-চারটি বাঙালি মেয়ে কালাপেড়ে শাড়ি পরা, বাঁকা সিঁথি, ‘হিল-শু’ পায়ে দেওয়া, ওই রাস্তারই একটা ভগ্নপ্রায় পুলের উপর এসে বসল! মাথার ওপর ঝাউ শাখাগুলো প্রাণপণে বীজন করতে লাগল।
মাঝে মাঝে স্থানীয় জমিদারদের দু একটি মোটর-ফিটন যেতে যেতে মেয়েগুলির কাছে এসে গতি শ্লথ করে আবার চলে যেতে লাগল !
একটি মেয়ে ছাড়া আর সকলে মশগুল হয়ে গল্প জুড়ে দিল। একলা মেয়েটি একটু দূরে নেমে ঘাসের ওপর বসে একদৃষ্টে নদীর দিকে তাকিয়ে কী দেখছিল, জিজ্ঞাসা করলে হয়তো সে নিজেই বলতে পারত না।
অনেকক্ষণ গল্প-গুজবের পর দলের একটি মেয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “মেজোবউ, ওখানে একলাটি বসে কার কথা ভাবছ ভাই?”
মেজোবউ উত্তর দিল না।
মেয়েটি তখন উঠে গিয়ে তাকে একটু জোর করেই নিজেদের কাছে এনে বসিয়ে হেসে বললে, “জান, মেম-সায়েবের হুকুম তোমাকে চোখে চোখে রাখার! সরে পোড়ো না ভাই যেন, তাহলেই গেছি!”
মেজেবিউ ম্লান হাসি হেসে বললে, “না, সে ভয় নেই। আর সরে পড়লেও তো ওই নদীর জল ছাড়িয়ে বেশি দূর যাব না!”
অস্তমান তৃতীয়া চাঁদের মুখ ম্লান হয়ে উঠল তার হাসিতে। ঝাউগাছগুলো জোরে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে লাগল।
যে মেয়েটি কথা বলছিল, তার নাম মিনতি।
মেজোবউয়ের প্রায় সমবয়সী। হিন্দুঘরের বউ ছিল সে। স্বামীর অত্যাচার সইতে না পেরে খ্রিস্টান হয়ে ডাইভোর্স নিয়ে খ্রিস্টধর্ম প্রচার করে বেড়ায়।
লেখাপড়া না-জানা মেয়েদের শিক্ষয়িত্রীরও কাজ করে।
এই মেয়েটিই মেজোবউয়ের একমাত্র বন্ধু। চোখের জল বদল-করা সই।
অন্য দুটি মেয়ের একজন বলে উঠল, “আচ্ছা ভাই, ওর মেজোবউ নাম কি আর ঘুচবে না?”
মেজেবিউ হেসে বললে, “তালগাছ না থাকলেও তালপুকুর নামটা কি বদলে যায় ?”
তেমনই জোর-করা হাসি! বুকের সলতে জ্বালিয়ে প্রদীপের আলো দেওয়ার মতো।
মিনতি মেজোবউকে আর কিছু বলবার অবসর না দিয়ে বলে উঠল, “তা ভাই, ওকে ওই নামে ডাকতেই আমার তো বেশ মিষ্টি লাগে। মনে হয় বেশ ঘরসংসার করে জা-ননদ মিলে সব আছি!”
অন্য মেয়েটি কৃত্রিম দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে সুর করে গেয়ে উঠল, “হায় গৃহহীন, হায় গতিহারা!” তারপর কথায় একটু নুন-লঙ্কা মিশিয়ে বললে, “তা ভাই, তোমাদের ঘরের সাধ এখনও মেটেনি। তা দুধ খাওয়ার সাধই যদি জেগে থাকে, এ ঘোল খেয়ে খামোখা সর্দি করছ কেন?”
মেজেবিউ ঝালটুকু সয়ে নিয়ে বলল, “তা ভাই, মাথায় ঘোল ঢালার চেয়ে পেটে ঘোল ঢালা বরং সইবে!”
মেয়েটির গোপন দুর্বলতায় ঘা দিল গিয়ে এই ওস্তাদি মারটুকু। সে মুখ বেঁকিয়ে বলে উঠল, “মেজোবউ কথা শিখেছে দেখছি।”
মেজোবউ হেসে বললে, “তার চেয়ে বলো মানুষ হয়ে উঠলাম। আমরা কৃষ্ণনগরের মেয়ে ভাই, আমাদের কথা শিখতে হয় না! মায়ের পেট থেকেই কথা শিখে আসে আমাদের দেশের মেয়ে! কিন্তু তুমি রেগো না ভাই, আমি সত্যিই তোমাদের সঙ্গে মিশতে পারবার মতো হইনি। এই তো জোর করে ফ্যাশন করে শাড়ি পরাচ্ছ, বাঁকা সিঁথি কেটে দিচ্ছ, জুতোও মিলল কপালে, কিন্তু ও জুতো-শাড়ি দিয়েও কি তোমাদের মতো করে তুলতে পারলে! মেম-সায়েবদের জুতো মেম-সায়েবদের মাথায় থাক ভাই, আমি সাদা কাপড় পরে থাকতে পারলেই নিশ্বাস ফেলে বাঁচি !”
মেয়েটি একটু তীক্ষ্ম স্বরে বলে উঠল, “তাহলে এখানে এলে কেন?” তার এই খাপছাড়া প্রশ্নে সে নিজেই অপ্রতিভ হয়ে উঠল এবং সেই কারণেই ততোধিক রেগে গেল।
মেজোবউ তেমনই হাসিমুখে বলল, “আমি তো মেম-সায়েব হতে আসিনি ভাই, মানুষ হতেই এসেছিলুম। আলো-বাতাস প্রাণের বড়ো অভাব আমাদের সমাজে, তাই খাঁচার পাখির মতো শিকলি কেটে বেরিয়ে পড়েছিলুম। কিছু যে ভালো হয়নি আমার, তা বলব না। এখন যা শিখেছি, তাতে করে যেখানেই থাকি দুটো পেটের ভাত জোগাড় করবার অসুবিধে হবে
