মৃত্যুক্ষুধা

« <
/ 28
> »

ঠেলতে তাকে একবার আড় নয়নে দেখে নিলে। মনে হল, লোহা পেটার সঙ্গে সঙ্গে সে যেন হাসি গোপন করছে।

প্যাঁকালে রোতোর চেয়েও বেশি ঘামতে লাগল, আগুন হতে অনেক দূরে থেকেও।

রোতো নেহাই-এর উপর একটা জ্বলন্ত লোহার ফাল রেখে প্যাঁকালের দিকে চেয়ে বললে, “দেখেছিস মাইরি, আগুন নিয়ে খেলার ঠেলা! হাতের কতটা পুড়ে গিয়েছে দ্যাখ!” বলেই প্রাণপণে হাতুড়ি দিয়ে লোহা পেটায় আর হাসে। প্যাঁকালে বুঝতে না পেরে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে।

রোতো ফলাটা আবার আগুনে সেঁদিয়ে হাপর ঠেলতে ঠেলতে বলে, “মেয়েমানুষ আর আগুন – এই দু-ই সমান বুঝলি, দু-টাতেই হাত পোড়ে।”

এতক্ষণ কুর্শি কোথায় দাঁড়িয়েছিল, সে-ই জানে; হঠাৎ তার কণ্ঠস্বর শোনা গেল, “মুখও পোড়ে রে মুখপোড়া।”

প্যাঁকালে তাড়াতাড়ি উঠে পুকুরের দিকে চলে গেল। তখনও রোতার স্বর শোনা যাচ্ছিল, “উ–ই প্যাঁকালে রে! তুই একটু আমার হাপরটা ঠেল ভাই, আমি একটু জলে ডুবে ঠাণ্ডা হসে আসি!”

কুর্শি কতকগুলো সাজি-মাটি-সেদ্ধ কাপড়ের বোঝা নিয়ে পুকুরের দিকে যেতে যেতে একবার টেরা চাউনি দিয়ে অভ্যর্থনা করে গেল রোতোকে। যাবার সময় বলেও গেল, “যাসনে মিনসে, এক্কেবারে ঠাণ্ডা মেরে যাবি। জলে ডুবলে আর উঠতে হবে না।”

রোতো হয়তো তখন মনে মনে বলছিল, এ আগুনের তাতে মরার চেয়েও শীতল জলে ডুবে মরায় ঢের আরাম।

রোতোর কিন্তু হাতই পুড়েছে, কপাল পোড়েনি। কুর্শি তাকে দেখতে না পারলেও ঘেন্না করে না।

গোলপুকুরে অন্য যারা চান করে, তাদের কেউই এ অসময়ে – বেলা দুটোয় চান করতে আসে না। কাজেই এই সময়টাই তাদের পক্ষে প্রশস্ত, যারা শুধু গা ধুতেই আসে না, প্রাণ জুড়াতেও আসে।

কুর্শি এসে দেখে, প্যাঁকালে তখন ঘাটের বটগাছটার শিকড়ের উপর বসে সিগারেট টানছে। প্যাঁকালে মাঝে মাঝে থিয়েটারে ইয়ার বাবুদের কাছে দু-একটা সিগারেট চেয়ে রাখে এবং সেটা কুর্শির কাছ ছাড়া আর কারুর কাছেই খায় না। আজও স্নান করতে আসার সময় কালকে চাওয়া সিগারেটটা কোঁচড়ে গুঁজে আনতে ভোলেনি।

কুর্শি প্যাঁকালের দিকে না চেয়েই ঘাটে ধপাস করে কাপড়ের রাশ আর পিঁড়িটা ফেলে বেশ করে কোমরে আঁচলটা জড়িয়ে নিলে। তারপর কারুর দিকে না চেয়ে জোরে জোরেই বলতে লাগল, “ঘাটের মড়া! রোজ রোজ আমার পেছনে লাগবে! দেব একদিন মুখে বাসি চুলোর ছাই ঢেলে, তখন বুঝবে মজাটা!”

প্যাঁকাল আর চুপ করে থাকতে পারলে না। এ উত্তরে হাওয়া তার দিকে না রোতোর দিকে বইছে, তাও সে বুঝতে পারল না। সে ফস করে নেমে এসে পাশের ঘাটের পচা খেজুর গুঁড়িটাতে বসে একটা খোলামকুঁচি নিয়ে পায়ের মরা মাস ঘষতে ঘষতে বললে, “তুই আজ রাগ করেছিস না কি কুর্শি? দেখছিসই তো শালারা কীরকম চোখ লাগাতে শুরু করেছে!”

কুর্শি একটা কাপড় একটু ভিজিয়ে কাচবার জন্য দাঁড়িয়ে বলে, “বয়ে গেছে আমার! এখন তোর কুর্শিকে না হলেও চলবে। তোর ওই মেজোভাবি তো আমার মতন কালো নয়। তা হোক না ছেলের মা।”

এইবার প্যাঁকালে হাওয়ার কতকটা দিক নির্ণয় করতে পারলে। সে পা ঘষা থামিয়ে তাড়াতাড়ি বলে উঠল, “আল্লার কিরে কুর্শি, খোদার কসম, আমি ও নিকে করছিনে। আমাকে কয়েছিলো মা, তা আমি আচ্ছা করে শুনিয়ে দিয়েছি মুখের মতন। আমি বলেছি, এ শালার গোয়াড়িতেই থাকব না। রানাঘাট চলে যাব কাজ করতে।”

কুর্শির হাতের কাপড় জলে পড়ে গেল। সে ম্লান করে বললে, “সত্যি চলে যাবি নাকি?”

ওষুধ ধরেছে দেখে প্যাঁকালে খুশি হয়ে বলে উঠল, “যাবই তো! তা না হলে যদি মেজোভাবির সঙ্গে নিকে দিয়ে দেয় ধরে?”

কুর্শি কাপড়টা তুলে অনেকক্ষণ ধরে কাচে। প্যাঁকালে তার কাপড় কাচার বিচিত্র গতিভঙ্গি চোখ পুরে দেখে। চোখে তার ক্ষুধা আর মোহ নেশার মতো করে জমাট বেধেঁ ওঠে! বুকের স্পদন দ্রুত হতে দ্রুততর হতে থাকে।তার যেন নিজেরই নিজেকে ভয় করে। অকারণে পুকুরের চারপাশে ভীত-ত্রস্ত দৃষ্টি দিয়ে দেখে –সে যেন কী চুরি করছে। মাথায় তার খুন চড়ে যায়। সে উঠে গিয়ে কুর্শির হাত চেপে ধরে। পা তার ঠক ঠক করে কাঁপতে থাকে। চোখে কীসের শিখা লকলক করে ওঠে। সে শুষ্ককণ্ঠে ডাকে, ‘কুর্শি!’

কুর্শি হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলে, “যা মাইরি, এখুনি কেউ দেখে ফেলবে। একটু হুঁশ নেই! – আগে বল, তুই রানাঘাটে চলে যাবিনে।”

প্যাঁকালে সাহস পেয়ে বলে, “এই দেখ মজিদের দিকে মুখ করে বলছি, আল্লার কিরে কুর্শি, আমি যাব না কোথাও তুই না বললে।”

কুর্শি খুশি হয়ে বলে, “উহু! আমার গা ছুঁয়ে বল!”

প্যাঁকালে গা ছুঁয়ে বলে, “মজিদের চেয়েও বুঝি তুই বড়ো হলি?”

কুর্শি খুব মিষ্টি করে হাসে। বলে, “হলুমই তো।” সে হাসিতে রাজাবাদশা বিকিয়ে যায়। প্যাঁকালে থাকতে না পেরে একটা অতি বড়ো দুঃসাহসের কাজ করে বসে।

কুর্শি খুশি হয়, রাগও করে। মুখটা সরিয়ে দিয়ে বলে, “যা, ভালো লাগে না, কেউ দেখে ফেলবে এখনই।”

প্যাঁকালেও জানে, যে কোনো লোক যে কোনো সময়ে দেখে ফেলতে পারে। কিন্তু ওই হাসি! ওই চোখ! ওই ঠোঁট! ওই দেহের দোলান। দেখুকই না লোকেরা ! প্যাঁকালে যেন মাতাল হয়ে পড়ে। হুঁশ থাকে না।

স্নান করে সে বাড়ি ফেরে। সারা শরীর তার ঝিম ঝিম করতে থাকে। যেন তাড়ি খেয়েছে। মাথার দু পাশের রগ টিপটিপ করে। বিশ্ব-সংসার মুছে যায় তার চোখের সামনে থেকে। সে কেবল ভীত মিষ্টি কণ্ঠের আকুলতা শোনে আর শোনে, “কেউ দেখে ফেলবে, দেখে ফেলবে!” –তার তাকে লজ্জা নাই, লজ্জা শুধু দেখে ফেলার লোককে।

ওদের লজ্জা যেন ওদের জন্য নয়, অন্যের জন্য।

তারা দুজনে চলে – চির-চলা রক্ত-রাঙা পথে। যে-পথ ফরহাদ-মজনুঁ, লায়লি-শিরি, গোলে-বকৌলি, মহাশ্বেতা-পুণ্ডরীক, আরও কতজনের বুকের রক্তে রাঙা হয়ে আছে। চির-যৌবনের চির-কণ্টকাকীর্ণ পথ। চিরকালের রোমিও-জুলিয়েট দুষ্মন্ত-শকুন্তলা যেন ওরা!

মৃত্যুক্ষুধা: ১১

 “ঝড় আসে নিমেষের ভুলে।”

জীবনের কোন পথ দিয়ে কখন বিপর্যয় আসে, মুহূর্তের জন্যে – নিমেষে সব ওলট-পালট করে দিয়ে যায় –বন্ধনের দড়াদড়ি কখন যায় টুটে, –কেউ জানে না।

‍এক দিঘি ফোটা পদ্মবনের উপর দিয়ে – ঝড় নয় – শুধু একটা ঘূর্ণি হাওয়ার চলে-যাওয়া দেখেছিলাম। সেই অসহায় পদ্ম-দিঘির ,স্মৃতি আজও ভুলিনি। হয়তো কখনও ভুলবও না। জলের ঢেউ তার তেমনই রইল – কিন্তু পদ্মবন গেল আগাগোড়া ওলট-পালট হয়ে! কোথায় গেল রাঙা শতদলের সে শোভা, কোথায় উড়ে গেল তার পাশের মরাল-মরালী! শুধু কাঁটা-ভরা মৃণাল আর পদ্মের ছিন্নপত্র। ছিন্নদল পদ্মের পাপড়িতে দিঘির মুখ আর দেখাই যায় না।

ও যেন মূর্ছিতা ত্রস্তকুন্তলা বিস্রস্ত-বসনা অভিমানিনী! ওকে কে যেন দু পায়ে দলে পিষে চলে গেছে।

নিমেষের ঝড়।…

ঘরে কাঁদে মেজোবউ, বাইরে কাঁদে কুর্শি। একজন ঘৃণায়, রাগে –আর একজন অভিমানে, বেদনার অসহায় পীড়নে।

প্যাঁকালে কোথায় চলে গেছে।

মেজোবউ রাগে নিজের হাত নিজে কামড়ে মরে নিষ্ফল আক্রোশে। এই আবার পুরুষ, বেটাচেলে! এত বড়ো মিথ্যার ভরকে সে উপেক্ষা করে চলতে পারল না! যে মিথ্যা-কলঙ্কের ঢিল লোকে তাদের ছুঁড়ে মারলে, সেই ঢিল কুড়িয়ে সে তাদের ছুঁড়ে মারতে পারলে না। অন্তত অবহেলায় হাসি হেসে বুক চিতিয়ে তাদেরই সামনে দিয়ে পথ চলতে পারল না। শেষে কিনা পালিয়ে গেল! হার মেনে! কাপুরুষ! মেজোবউ ভাবে, আর কী একটা সংকল্প করে। অমন সুন্দর মুখ পাথরের মূর্তির মতো কঠিন হয়ে ওঠে।

পুরুষ যেখানে হার পালিয়ে গেল, সেইখানে দাঁড়িয়ে সে যুদ্ধ করবে তবু হটবে না।

শাশুড়ি কাঁদে, বড়োবউ হা-হুতাশ করে, ছেলেমেয়েরা রোজ সাঁঝে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়ায়। এমনই সন্ধে হব-হব সময় সে আসত ওই শিশুগুলির জন্যে একটা-না একটা কিছু নিয়ে!’ কোনোদিন ‘লেবেঞ্জুস’কোনদিন বা বোয়াল মাছ।

মেজোবউয়ের আনমনা ছেলেটি আকাশের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকে। তারপর আপন মনেই বলে, “তোমায় কিছু আনতে হবে না ছোটো কাকা, তুমি অমনি এসো।” মাকে বলে, “আচ্ছা মা, ছোটো-চা বুঝি বা-জানের কাছে চলে গিয়েছে? উখেনে থেকে বুঝি আর ছেড়ে দেয় না?”

মা ছেলেকে বুক চেপে ধরে। বলে, “বালাই! ষাট! উখেনে যাবে কেন? হুই রানাঘাট চলে গেছে টাকা রোজগার করতে।”

শিশু থামে না। বলে, “রানাঘাট বুঝি বা-জান যেখেনে থাকে, তার চেয়েও

« <
/ 28
> »