মৃত্যুক্ষুধা

« <
/ 28
> »

হয়ে বলে উঠল, “রুবি কী বললে, বলো না দাদু!”

আনসার হেসে ফেলে বললে, “বলছি থাম। রুবির বিয়ে হয়েছিল একটি আই.সি.এস. পরীক্ষার্থী ছেলের সাথে। ছেলেটি আমারই সহপাঠী ছিল – অবশ্য আমার বন্ধু ছিল না – নাম তার মোয়াজ্জম। বিলেতে যাওয়ার আগেই বিয়ের এক মাসের মধ্যেই সে মারা যায়। সে আজ এক বছরেরও বেশি হল। বিয়ের আগেই রুবি ম্যাট্রিক পাশ করেছিল। এবার প্রাইভেটে আই.এ.দেবে। মনে হল ওর বাপ-মায়ের ইচ্ছা, ওকে এই লেখাপড়ার মধ্যেই ডুবিয়ে রাখেন। এর জন্য যথেষ্ট খরচও করছেন তাঁরা। রুবিও খুব মন দিয়ে পড়ছে শুনলাম।”

বলে খানিক চুপ করে থেকে আনসার বললে, “রুবির অন্তরের কথা অন্তর্যামী জানেন, তবে এই বৈধব্য তাকে বড়ো বেদনা দিতে পারেনি – এটা বেশ বোঝা গেল। স্বামীকে সে চেনেনি – আমার যেন মনে হল, তাকে সে চিনবার চেষ্টাও করেনি। তার পড়বার ঘরে তার স্বামীর একটা ফটো পর্যন্ত নেই। অথবা সে যে বিধবা, একটু চেষ্টা করেই সে এ-কথা যেন জানাতে চায় তার আচার-ব্যবহার পোশাক-পরিচ্ছদে। তার মা-বাবা কিছুতেই তাকে পাড়ওয়ালা কাপড় বা গয়না পরাতে পারেনি। পরে সাদা থান, জুতা পরে না, পান খায় না, –যাকে বলে সর্বপ্রকারে নিরাভরণা, কিন্তু এই নিরাভরণা, রুক্ষবেশে তাকে যে কী সুন্দর দেখায় রে বুঁচি, তা যদি একবার দেখতিস! বৈধব্যের এত রূপ আর আমি দেখিনি!”

বলেই নিজের এই প্রশংসা-উক্তিতে লজ্জিত হয়ে সে নিম্নস্বরে বললে, “কিন্তু বুঁচি, ও রূপকে ভক্তি করা যায়, ভালোবাসা যায় না!”

নাজির সাহেবফোঁস করে একটা কৃত্রিম দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাঁর ক্লিনসেভড গালের চিবুকের কল্পিত দাড়িতে বামহাত বুলোতে বুলোতে বলে উঠলেন, “সোবহান-আল্লাহ্! সোবহান-আল্লাহ্!’

লতিফা ও আনসার দুজনেই এক সঙ্গে হেসে উঠল। আনসার নাজির সাহেবের ঘাড়ে এক রদ্দা মেরে বলে উঠল, “আরে বে-অকুফ! এর মধ্যে লভটভের কিছু গন্ধ নেই!”

নাজির সাহেবের ঘাড়ে হাত বুলোতে বুলোতে বলেলেন, “দেখ ভাই তারকেশ্বরের ষাঁড়! এ ঘাড়ে এমন করে ধাক্কা মেরো না! এই ঘাড়ই হচ্ছে তোমার বোনের সিংহাসন। এ-ঘাড়ই যদি ভাঙে তা হলে উনি চড়বেন কোথায়?”

লতিফা হেসে বললে, “শ্যওড়া গাছে! বেস, আমি পেতনিই হলাম। এখন গোলমাল যদি কর, সত্যিই ভেঙে দেব! বলো ভাই দাদু, ,তারপর কী হল?”

আনসার বললে, “জানিস, একদিন আমি সোজা রুবিকে বললাম যে, এতটা বাড়াবাড়ি না করলেও সে যে বিধবা, তা বুঝবার কষ্ট হত না কারুর। সে বললে কী, জানিস? সে বললে, যে, সে তার বাপ-মাকে শাস্তি দেওয়ার জন্যই অমন করে থাকে। তার ঘোর আপত্তি সত্ত্বেও নাকি তার বিয়ে দিয়েছিলেন তাঁরা, এবং আবারও বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন তলে তলে – তার মতামতের অপেক্ষা না রেখেই। সে একদিন তার মায়ের সামনেই আমায় বললে, “দেখ আনু ভাই, যাকে কোনোদিনই জীবন স্বীকার করিনি কোনো-কিছু দিয়ে হতভাগ্যের মৃত্যু-স্মৃতি আমায় বয়ে বেড়াতে হবে সারাটা জিন্দেগি ভরে – নিজেকে এই অপমান করার দায় থেকে কী করে মুক্তি পাই, বলতে পার?”

আমি শিউরে ,উঠলাম। বললাম, “তাই যদি সত্যি হয় রুবি, তবে এ-অপমান শুধু তোমাকে নয় – সেই মৃত হতভাগ্যকেও গিয়ে লাগছে। এ-নিষ্ঠুরতা করে কারুর কোনো মঙ্গল হবে না রুবি।”

রুবি তিক্তকণ্ঠে বলে উঠলে, “একে শুধু তুমিই নিষ্ঠুরতা বলতে পারলে। কিছু মনে কোরো না আনু ভাই – অতি বড়ো নিষ্ঠুর ছাড়া আর কেউ এত বড়ো কথা আমায় বলতে পারত না। তুমি শুধু এর নিষ্ঠুর দিকটাই দেখলে? যে নিষ্ঠুর করে তুলেছে আমায় তাকে দেখলে না!”

বলেই সে চলে যেতে যেতে বলে গেল, “ফুল শুকিয়ে গেছে, কিন্তু কাঁটা তো আছে! ফুল থাকলে বুকে মালা হয়ে থাকত, এখন কাঁটা – কেবল পায়ের তলায় বিঁধবে!”

“এর পরেও কত দিন দেখা হয়েছে, কথাও হয়েছে – কিন্তু আমি আর সাপের ন্যাজে পা দিতে সাহস করিনি। একেবারে কাল-কেউটে!”

লতিফা একটু উত্তেজিত স্বরেই বলে উঠল, “কিন্তু তুমি চিনবে না দাদু, তুমি সত্যিই লক্ষ্মীছাড়া! ছোবল মারলেও ওর মাথায় মণি আছে। সাপের মাথার মণি সাতরাজার ধন, তা কি যে-সে পায়?”

বলেই সে চোখ মুছল! আনসার কেমন যেন নেতিয়ে পড়ল।

আজ কেন যেন তার প্রথম মনে হল সে সত্যিই দুঃখী। মানুষের শুধু পরাধীনতারই দুঃখ নাই, অন্য রকম দুঃখও আছে – যা অতি গভীর, অতলস্পর্শী! নিখিল-মানবের দুঃখ কেবলই মনকে পীড়িত, বিদ্রোহী করে তোলে, কিন্তু নিজের বেদনা – সে যেন মানুষকে ধেয়ানী স্বস্থ করে তোলে। বড়ো মধুর, বড়ো প্রিয় সে-দুঃখ!

সে হঠাৎ বলে উঠল, “যেদিন আমি চলে আসি, বুঁচি, সেদিন সে স্টেশনে এসেছিল। ট্রেন যখন ছাড়ে, তখন আমার হাতে একটা জিনিস দিয়ে বললে, “এইটে বিয়ের রাতে – তোমায় মনে করে গেঁথেছিলাম। আজ শুকিয়ে গেছে, তবু তোমায় দিলাম।” – বলেই সে টলতে টলতে চলে গেল!

“ট্রেন ছাড়লে দেখলাম, একটি শুকনো মালা!”

নাজির সাহেব বলে উঠলেন, “কী করলি ভাই, সে মালটা?”

আনসার ধরা গলায় বলে উঠল, “পদ্মার জলে ফেলে দিয়েছি।”

লতিফা একটি কথাও না বলে আস্তে আস্তে উঠে গেল।

মৃত্যুক্ষুধা: ১৯

চাঁদসড়কে সেদিন ভীষণ একটা হইচই পড়ে গেল, মেজোবউ তার ছেলেমেয়ে নিয়ে খ্রিস্টান হয়ে গেছে।

সত্যি-সত্যিই সে খ্রিস্টান হয়ে গেছে। তবে তার একটু ইতিহাসও আছে।

মেজোবউ কিছুদিন থেকে খ্রিস্টান মিশনারি মিস জোন্সের কাছে গিয়ে একটু সেলাই ও লেখাপড়া শিখছিল। মিশনারিরা ওদের ধর্মপ্রচারের জন্য হয়তো একটু গায়ে পড়েই দরিদ্র মুসলমান ও হিন্দুদের অসুখ-বিসুখে ওষুধ-পত্তর দিয়ে সাহায্য করে এবং তারা অনেককে তাদের ধর্মে দীক্ষিতও করতে পরেছে। কিন্তু মেজোবউয়ের ব্যাপার একটু অন্য রকম।

মিস জোন্সের কীজন্য জানি না, প্রথম দেখাতেই মেজোবউকে চোখে ধরে গিয়েছিল। শুধু চোখে নয়, হয়তো মনেও। মেজোবউয়ের নামে পাড়ায় একটা বদনামও আছে যে, ওকে একবার দেখলে ভালো না বেসে পারা যায় না।

মেজোবউ সুন্দরী! কিন্তু ওই সৌন্দর্যটুকুই ওর সব নয়। এক একজন মানুষের চোখে-মুখে এক একটা জিনিস থাকে, যার জন্য তাকে দেখামাত্রই মনটা খুশি হয়ে ওঠে, ‘তুমি’বলে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে। শ্রী, লাবণ্য, সুষমা –এর কোনো-একটা নাম দিয়ে ওর মানে করা যায় না। অমনই মায়া-মাখানো চোখ-মুখ মেজোবউয়ের!…

পাড়ায় পুরুষ মেয়ে সবাই বলতে লাগল, এইবার মাগিরা মেজোবউকে ‘আড়কাঠি’করে সব বউ-ঝিকে ‘খেরেস্তান’করে তুলবে।

প্যাঁকালের মা-র চিৎকার ও কান্নায় সমস্ত পাড়া সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল। সে কান্না-চিৎকারে দিবারাত্রির মধ্যে বিরাম ছিল না। কখনও তা অচল হয়ে তাদের ঘরের আঙিনা থেকেই দিগ্-দিগন্তরে পরিব্যাপ্ত হতে লাগল, কখনও বা সচল হয়ে চাঁদসড়ক থেকে কুর্শিপাড়া – কুর্শিপাড়া থেকে কাঠুরেপাড়া – কাঠুরেপাড়া থেকে হাটবাজার ঘুরে – গির্জা-মসজিদ প্রদক্ষিণ করে ফিরতে লাগল।

মেম-সায়েবদেরে সে যে-ভাষায় আপ্যায়িত করতে লাগল তার তুলনা মেলা ভার।

ভাগ্যিস মেম-সায়েবরা আমাদের বাংলা ভাষার সব মোক্ষম-মোক্ষম গালির অর্থ বোঝে না, বুঝলে তারা মেজোবউকে কাঁধে করে তার বাড়ি বয়ে রেখে যেত!

কলকাতায় প্যাঁকালেকে খবর দেওয়া হল। কুর্শি বিশেষ করে তাগিদ ও পরামর্শ দিতে লাগল ওদের বাড়ি এসে যে, এ সময় প্যাঁকালে এসে একটা ‘ধুমখাত্তর’কাণ্ড বাঁধিয়ে দেবে! চাই কী – সে যা পুরুষ মর্দ, মেম-সায়েবকেও ধরে নিয়ে আসতে পারে ইচ্ছে করলে।

পাড়ার মসজিদের মোল্লা সাহেব সেদিন মগরেবের নামাজের পর নিজে যেচে প্যাঁকালেদের বাড়ি মউলুদের ও তৎসঙ্গে বেইমান নাসারাদের বজ্জাতি সম্বন্ধে ওয়াজের জলসা বসালেন। পুরুষ-মেয়েতে বাড়ি সরগরম হয়ে উঠল। মউলুদ ও ওয়াজের পর স্থির হল যে, কালই মওলানা হযরত পির গজনফর সাহেব কেবলা ও মওলানা রুহানী সাহেবকে এই গোমরাহ্ বেদীনদের নসিহত ও দরকার হলে ‘বহস’ করার উদ্দেশ্যে আনবার জন্য লোক পাঠাতে হবে এবং তার সমস্ত খরচ বহন করবে পাড়ার লোকেরা। প্যাঁকালের মা আপাতত তার বাড়ির ছাগল কয়টা বিক্রি করে পনেরো টাকা জোগাড় করে দেবে। নইলে সে সমাজে ‘পতিত’থাকবে।

আনসার সব শুনেছিল তার বোনের কাছে। কাজেই সে বেশ একটু উৎসাহ নিয়েই এ নিয়ে পাড়ায় কী হয় শুনতে এসেছিল মউলুদের জলসাতে। সব শোনার পর একটি কথাও না বলে নাজির সাহেবের বাসায় ফিরে গেল।

বাসায় গিয়েই ইজিচেয়ারটাতে শুয়ে বললে, “ওরে বুঁচি, বড্ড মাথা

« <
/ 28
> »