মৃত্যুক্ষুধা

« <
/ 28
> »

না। কিন্তু কী করি, চিরজন্মের অভ্যেস, ওই জুতোটুতোগুলো পরলে মনে হয় পায়ে এ এক নতুন রকমের শিকলি পড়ল!”

মিনতি উঠে পড়ে বলল, “আচ্ছা, এইবার থেকে তুমি লুঙ্গি পরে থেকে, আমি বলে দেব গিয়ে! জুতোটুতো তোমার পোড়া কপালে সইবে না! এখন চলো, রাত্তির হয়ে যাচ্ছে।”

সকলে উঠে পড়ল। …

একটু না যেতেই প্যাঁকালের সঙ্গে দেখা হল। সে পাদরি সাহেবের সুপারিশের জোরে এখানে এসেই ম্যাজিস্ট্রেট অফিসের পিয়োন পদ লাভ করেছে। এখন আর সে প্যাঁকালে নয়, তার নাম এখন জোসেফ ! ম্যাজিস্ট্রেট ডাকে, ‘জোসেফ আনন্দে প্যাঁকালে প্রায় কেঁদে ফেলে! ‘হুজুর’ বলে পড়ি কি মরি বলে ছুটে এসে আড়াই হাত লম্বা এক কুর্নিশ ঠোকে। শ্রীমতি কুর্শি ওরফে মিসেস প্যাঁকালে মিশনারি মেমদের ফাই-ফরমাশ খেটে দেয়, তার জন্য কুড়ি টাকা করে পায়। প্যাঁকালের পনেরো আর কুশির কুড়ি, মোট পঁয়ত্রিশ। দিব্যি হেসেখেলে সংসার চলে। কুর্শি প্যাকালেকে বড়ো একটা কেয়ার করে না, সে পাঁচ টাকা বেশি রোজগার করে। প্যাঁকালে কিছু বললে বলে, “আমি তোর খাই নাকি রে মিনসে? বেশি টকখাই টকখাই করিসনে।” বলে গরব করে চলে যায়।

প্যাঁকালে না খেয়েই আফিসে চলে যেতে চায়। বলে, “আমি ম্যাজিস্টারের পিয়োন। তোর মতন কত বিশ টাকা আমার কাছার তলায় ঝোলে। তোর মেমসায়েবকে শুধোয় কে!”

ঘরের বাইরে পা দিতেই কুর্শি কোমরে কাপড় জড়াতে জড়াতে বলে, “যা দিকিন দেখি !” বলেই খপ করে কোঁচাটা ধরে ফেলে। বলে, “আর এক পা এগুবি তো কেলেঙ্কারি বাধিয়ে দেব। কাপড় কেড়ে নিয়ে ছেড়ে দেব!” বলেই কোঁচায় হ্যাঁচক টান দেয়।

প্যাঁকালে অসহায় অবস্থায় সেখানে বসে পড়ে, বলে, “ছেড়ে দে বলছি শালি ! নইলে দিলুম ধুমাধুম। … হেই কুর্শি, তোর পায়ে পড়ি। কেউ দেখতে পাবে এখুনি! আল্লার কিরে! জিশুখ্রিস্টের কিরে! মাইরি বলছি, আর কখনও কিছু বলব না।” বলেই নাকে কানে হাত দেয়।

কুর্শি কোঁচা ছেড়ে দিয়ে হাসতে হাসতে বসে পড়ে। বলে, “চল, খাবি! খেয়ে তোর ম্যাজিস্টর খসমের কাছে গিয়ে রাগ দেখাস।”

বারো-আনা দিগম্বর প্যাঁকালে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে । তারপর খেয়েদেয়ে গুড়গুড় করে আফিসে যায়। যাওয়ার সময় বলে যায়, “শালার মেয়ে-মানুষকে বিয়ে করার মতন গুখুরি কাজ আর নেই! তোকে যদি আর কখনও বিয়ে করি, আমার বাপের —”

কুর্শি হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে। বলে, “আসতে যদি পাঁচ মিনিট দেরি করবি, তাহলে আজ মেম-সায়েবদের কাছে গিয়ে শুয়ে থাকব।”

সেদিন রাস্তায় মেজোবউকে দেখে পূর্ব অভ্যাসমতো বলে উঠল, “মেজো-ভাবি, তোমাকেই খুঁজছি আমি।”

মেজেবিউ হেসে বললে, “কেন, কুর্শি কি আজও তাড়িয়ে দিয়েছে? আচ্ছা কুকুরে-ভালোবাসা তোমাদের যা-হোক!” বলেই পুরানো দিনের মতো মিষ্টি করে হাসে। অন্ধকার মেঘে বিজলির ক্ষণিক ছটা!

ওই হাসির মানে আগে প্যাঁকালে বুঝত না। কিন্তু এখন সে ঝানু হয়ে না গেলেও ডাঁশিয়ে উঠেছে, কাজেই ও হাসিতে, বেশ একটু যেন চমকে ওঠে। আঁধার রাতে বিজলি আর সাপ দুটোই চমকে দেয়।

প্যাঁকালে একটু থেমে তার পাশের মেয়েগুলোর দিকে আধা-কটাক্ষে চেয়ে নিয়ে বললে, “বাড়ির থেকে একটা চিঠি এসেছে, বিকেলে তুমি যদি একটু পড়ে দিয়ে আসো।”

মেজোবউকে কে যেন হঠাৎ চাবুক মারলে, চমকে উঠল সে! মুখ কেমন হয়ে গেল, আবছা আঁধারে ভালো দেখা গেল না। কিন্তু গলার স্বর শুনে মনে হল, কে যেন তার টুঁটি টিপে ধরেছে।

মেজেবউ শক্ত মেয়ে। তবু সে আজ আর সামলাতে পারল না। কম্পিত দীর্ঘ কণ্ঠে বলে উঠল, “চলো, এখনই তোমার বাড়ি চলো।”

প্যাঁকালে বলতে যাচ্ছিল, “আজ আর না-ই গেলে, কাল —”

তাঁকে কোনো কথা বলতে না দিয়ে মেজেবিউ প্রায় চেঁচিয়ে উঠে বলল, “না, না, এক্ষনি চলো !” বলেই সে প্রায় ছুটে প্যাঁকালের বাড়ির দিকে চলতে লাগল। তার সঙ্গে যে আর কেউ ছিল, বা তাদের কোনো কিছু বলবার দরকার, সেসব ভাববারও যেন অবসর ছিল না তার।

মিনতি প্যাঁকালেকে বলে দিল, সে যেন মেজোবউয়ের চিঠি পড়া হলেই তাকে সঙ্গে করে রেখে দিয়ে যায়।

দূরে থেকে দেখা গেল, মেজেবিউ তেমনই বেগে ছুটেছে ঘরের পথে।

হাউই যেমন বেগে আকাশে ওঠে, তেমনই বেগেই মাটির পৃথিবীতে ফিরে এসে মুখ থুবড়ে পড়ে।

মৃত্যুক্ষুধা: ২৫

মেজোবউ ঝড়ের মতো প্যাঁকালের ঘরে এসে ডেকে উঠল, ‘কুর্শি’!

মেজোবউয়ের এমনতর স্বর কুর্শি কখনও শুনে নাই। সে ভয় পেয়ে বেরিয়ে এসে দাঁড়াতেই মেজেবিউ বললে, “কী চিঠি এসেছে দেখি!”

কুর্শি নিঃশব্দে চিঠি এনে দিল। তারও তখন পা কাঁপছে! তারা আসা অবধি এই এক বছরের মধ্যে কারুর কোনো চিঠি পায়নি। হঠাৎ আজ বিয়ারিং চিঠি দেখে সকলেই মনে করছিল, না জানি কার কোনো দুঃসংবাদ আছে এতে!

মেজেবিউ হেরিকেনের কাছে গিয়ে কাঁপতে কাঁপতে চিঠি খুলে খানিকটা পড়েই একেবারে মাটিতে পড়ে চিৎকার করে উঠল, “খোকা! খোকা! বাপ আমার!”

ততক্ষণ প্যাঁকালে এসে পড়েছিল। সে আসতেই মেজোবউ একেবারে তার পায়ের উপর হুমড়ি খেয়ে বলে উঠল, “আমার খোকা বুঝি আর বাঁচে না ভাই! সে তার এই পোড়াকপালি মাকে দেখতে চায়। আমায় নিয়ে চলো, তোমার পায়ে পড়ি ভাই, আমায় নিয়ে চলো!” বলেই সে মূৰ্ছিতা হয়ে পড়ল।

প্যাঁকালে, কুর্শি বহু কষ্টে মূৰ্ছা ভাঙালে।

আজ এক বৎসর ধরে বরিশাল এসেছে ওরা। এর মধ্যে কেউ কোনো চিঠি দেয়নি। মেজোবউ কীসের যেন আতঙ্কে কৃষ্ণনগরের নাম পর্যন্ত শুনলে পালিয়ে যেত। তার কেবলই মনে হত, এই বুঝি তার খোকা-খুকির অসুখের খবর এসে পড়ল। সে দিনরাত প্রার্থনা করত, ওরা ভালো থাক, বেঁচে থাক, কিন্তু কোনো চিঠি যেন কোনো দিন না আসে। কিন্তু সোয়াস্তিও ছিল না তার, সে ঘুমে-জাগরণে – সব সময় যেন তার ক্ষুধাতুর শিশুদের কান্না শুনতে পেত। সে রাক্ষুসী! ইচ্ছা করেই ছেলেমেয়েদের ফেলে এসেছিল। চলে আসার দিন তাকে যেন ভূতে পেয়েছিল! তাকে এদেশ ছেড়ে যেতে হবে, শুধু এই কথাই তার মনে হচ্ছিল। সে যে মা, সে-কথা সেদিন সে ভুলে গিয়েছিল।

একটু প্রকৃতিস্থ হয়ে মেজেবউ আবার সমস্ত চিঠিটা পড়ল। প্যাঁকালের মা চিঠি লিখছে – লিখছে মানে কাউকে দিয়ে লিখিয়েছে। খোকার অর্থাৎ মেজোবউয়ের ছেলের ভয়ানক অসুখ, টাইফয়েড। বোধ হয় বাঁচবে না। যে ছেলে এক বছর ধরে ভুলেও তার মায়ের নাম মুখে আনেনি, সে আজ বিকারের ঘোরে কেবলই বলছে, “আমাকে মায়ের কাছে নিয়ে চল!” প্যাঁকালের মাও মৃত্যুশয্যায়। কিন্তু মরবার আগে সে যেন যার ছেলে তার হাতেই দিয়ে যেতে পারে। ছেলের কান্না শুনে গাছের পাতা ঝরে পড়ে, আর ওর রাক্ষুসী মা-র মন গলবে না!

সেইদিন রাত্রেই মেজোবউ, প্যাঁকালে, কুর্শি কৃষ্ণনগর যাত্রা করল। যাওয়ার আদেশ পেতে তাদের বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। কিন্তু স্থানীয় মিশনারি কর্তারা মেজোবউকে ভালো করেই চিনতেন! কাজেই তারা আপত্তি করলেও যাওয়া বন্ধ করতে সাহস করলেন না।

পরদিন সন্ধ্যায় অন্ধকার যখন গাঢ়তর হয়ে আসছে, সেই সময় তারা কৃষ্ণনগর স্টেশন এসে পৌঁছল। এই একটা বছরের মধ্যে কত পরিবর্তনেই না হয়ে গেছে এর! মেজোবউয়ের শোকাচ্ছন্ন চোখের মলিন দৃষ্টির ম্লানিমা লেগে স্টেশনের কয়লা-রঞ্জিত পথ যেন আরও কালো হয়ে উঠল। তার মনে হল, কে যেন তার স্থূল হাতের কর্কশ পরশ বুলিয়ে সেই পূর্বের কৃষ্ণনগরের সব সৌন্দর্য মুছে নিয়ে গেছে।

একটা ছ্যাকড়া গাড়িতে উঠেই মেজোবউ বললে, “খুব জোরে হাঁকাও।” এতক্ষণ এত দুর পথে আসতে যে হৃৎস্পন্দনের চঞ্চলতা তাকে অধীর করে তোলেনি, স্টেশনে নেমেই তার চঞ্চলতা যেন শতগুণে বেড়ে উঠল। একবার মনে হল, এ রাস্তায় যেন শেষ না হয়। এই গাড়ি যেন এই রকম করে অনন্তকাল ধরে ছুটতে থাকে।…হয়তো এতক্ষণে তার খোকার মুখে ‘মা’ডাক নিঃশেষিত হয়ে গেছে!

কোচোয়ানের চাবুক খেয়ে ঘৃত-পক্ক অশ্বিনীকুমারদ্বয় যেটুকু স্পিড বাড়ালে, তাকে ঘোড়া-দৌড় ঠিক বলা চলে না, সে কতকটা খোঁড়া-দৌড়! তাতে যেমনই হাসি পায়, তেমনই অসহায় জীব গুলির প্রতি করুণায় মন ভরে ওঠে। কিন্তু ঘোড়ার চেয়েও আর্তনাদ করতে লাগল গাড়ির চাকাগুলো। তারা যেন আর গড়াতে পারে না। পথের বুকে মুখ ঘষে ঘষে যেন তাদের প্রতিবাদ-ক্রন্দন জানাতে থাকে। রাস্তাও তেমনই। যেন দাঁত বের করে মিউনিসিপ্যালিটিকে মুখ ভ্যাংচাচ্ছে!

ঢিকুতে ঢিকুতে

« <
/ 28
> »