- মৃত্যুক্ষুধা: ১
- মৃত্যুক্ষুধা: ২
- মৃত্যুক্ষুধা: ৩
- মৃত্যুক্ষুধা: ৪
- মৃত্যুক্ষুধা: ৫
- মৃত্যুক্ষুধা: ৬
- মৃত্যুক্ষুধা: ৭
- মৃত্যুক্ষুধা: ৮
- মৃত্যুক্ষুধা: ৯
- মৃত্যুক্ষুধা: ১০
- মৃত্যুক্ষুধা: ১১
- মৃত্যুক্ষুধা: ১২
- মৃত্যুক্ষুধা: ১৩
- মৃত্যুক্ষুধা: ১৪
- মৃত্যুক্ষুধা: ১৫
- মৃত্যুক্ষুধা: ১৬
- মৃত্যুক্ষুধা: ১৭
- মৃত্যুক্ষুধা: ১৮
- মৃত্যুক্ষুধা: ১৯
- মৃত্যুক্ষুধা: ২০
- মৃত্যুক্ষুধা: ২১
- মৃত্যুক্ষুধা: ২২
- মৃত্যুক্ষুধা: ২৩
- মৃত্যুক্ষুধা: ২৪
- মৃত্যুক্ষুধা: ২৫
- মৃত্যুক্ষুধা: ২৬
- মৃত্যুক্ষুধা: ২৭
- মৃত্যুক্ষুধা: ২৮ (শেষ)
পোকা-খাওয়া বুকের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়ে গেল। শুনলাম, সে-পোকা নাকি আমারই কাঁটার বেড়া থেকে উড়ে গিয়ে সেখানে বাসা বেঁধেছে।
বড়ো দুঃখ হল। কিন্তু আমার কোনো হাত ছিল, না! থাকলেও সে-হাত বন্ধক রেখেছিলাম পুলিশের হাত-কড়ার কাছে, কাজেই ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে বসে থাকতে হল।
কিন্তু প্রভুভক্ত পোকা আমায় ভুলতে পারলে না। এত সি. আই. ডি., এত পুলিশ প্রহরীর নজর এড়িয়ে – সমুদ্দুর ডিঙিয়ে পোকা আমার বুকে ফিরে এল। অন্যের বুক কতটা খেয়ে এসেছে, তা তার হৃষ্টপুষ্ট চেহারা এবং সতেজ দংশন থেকেই বুঝতে পারলাম।
অবশ্য আমার আর কোনো পোকাকেই ভয় নেই। বিলিতি পোকা, দিশি পোকা, বুকের পোকা, দুঃখের পোকা – তা সে যে পোকাই হোক। কিন্তু আমার না থাকলেও কর্তাদের আছে। তাঁরা আমায় নিয়ে বিব্রত হয়ে পড়েছেন। সাপের ছুঁচো গেলা-গোছ – ছাড়তেও পারে না, গিলতেও পারে না।
আজ ঘুম থেকে উঠেই খোশ-খবর শোনো গেল। আমায় নাকি কাল ছেড়ে দেওয়া হবে। অবশ্য ছেড়ে দেওয়া মানে, দম নিতে দেওয়া। মরিস যদি বাবা, তো ঘরে গিয়ে মর, আমাদের দায়ি করে যাসনে – এই মনোভাব আর কী!
এরা সত্যই সিংহের জাত। পশু হয়েও পশুরাজ স্পেসিসের। আধ-মরা রোগ-জীর্ণ শিকার এরা খায় না।
আবার পুরুষ্টু হয়ে উঠলেই ক্যাঁক করে ধরবে!…
আমি ঠিক করেছি, ছাড়া পেলেই ওয়ালটেয়ারে ছুড়ে যাব। আমি চাই – এই বন্ধনের পরে নিঃসীম মুক্তি। মাথায় অনাবৃত আকাশ, চোখের সামনে কূলহারা তটহারা জলধি, মনের সামনে নিরবিচ্ছিন্ন অনন্ত একা – একা আমি!
মাঝে মাঝে মনে হয় –মনে হয় ঠিক না, লোভ হয় – যাওয়ার আগে এই অদ্বিতীয় মনের দ্বিতীয় জনকে দেখে যাই – জেনে যাই! আমার মরুভূমির ঊর্ধ্বে সাদা মেঘের ছায়া নয়-কালো মেঘের ছায়া-ঘন মায়া দেখে যাই।
তোরই চিঠিতে জেনেছি, সে-মেঘ নাকি তোরই দেশে গিয়ে জমেছে। তোর হাতের কাছে যদি খুব খানিকটা উত্তুরে হাওয়া থাকে, দিতে পারিস তাকে দক্ষিণে পাঠিয়ে? তুই হয়তো বলবি এবং শুনে মেঘও হয়তো বিদ্যুৎহাসি হেসে বলবে, হাতের কাছে যার থাকবে সমুদ্দুর, সে চায় দু-ফোঁটা মেঘের জল! সংস্কৃত কবিদের একটা চির-চলিত উপমার কথা মনে পড়ছিল, তা আর লিখলাম না! না লিখলেও বুঝবি বলে।
মানুষ যখন প্রগলভ হয়-অর্থাৎ সোজা কথায় বিকারগ্রস্ত হয়ে বকতে থাকে, তখন তার যে মৃত্যু ঘনিয়ে এসেছে – এ-কথা ডাক্তার না বললেও সকলে বোঝে। আমার বেলায়ই বা তার ব্যতিক্রম হবে কেন?
আমার যাবার বেলায় আমার শেষ কথা বলে গেলাম এইজন্যে যে, বলবার অসর জীবনে হয়তো আর হবে না।
আমি জীবনে কোনো-কিছুতেই নিরাশ হইনি। জীবনের বেলাতেও হতাম না – যদি না বুঝতাম যে, বাঘে ধরেও যাকে উগলে দেয় – তার দুরবস্থা কতদূর গিয়ে পৌঁচেছে! রক্ত মাংসের পরিমাণ তার কত কমে এসেছে! – কিন্তু এ কী ক্ষুধা আমার? এই কি মৃত্যু-ক্ষুধা?
আমি যদি না-ই ফিরি, দুঃখ করিসনে ভাই। আমরা তো ফেরার সম্বল নিয়ে বেরোইনি। তাই ফেরারি আসামি হয়েই কাটিয়ে দিলাম। আমাদেরই পথের পথিক যারা রয়ে গেল – তাদের মাঝেই আমায় দেখতে পাবি। এই কারায়, এই ফাঁসিমঞ্চে আমরা তো আজই এসে দাঁড়াইনি, আমাদের কন্ঠে শত লাঞ্ছনার রক্ত-লেখা হয়তো আজও মুঝে যায়নি। নইলে এমন সুখের নীড়ে আমার মন বসল না কেন? পিঞ্জরের দ্বার ভেঙে মুক্ত লোকের ঊর্ধ্বে উড়ে গান গাওয়ার এ সাধ কেন জাগল? জীবনকে আমরা জীবিতের মতোই ব্যয় করে গেলাম, মৃতের মতো কার্পণ্য করে কাক-শকুনের খাদ্য করিনি! আমার যা সম্ভবনা, তা যেন কোনোদিন তোর অগৌরবের না হয়ে ওঠে।
অন্যলোকে গিয়ে যদি এ-লোকের প্রিয়জনকে মনে রাখবার মতো অবসর থাকে, সেথা গিয়ে অনশন-কারাবন্দী না হই, তাহলে বিশ্বাস করিস – তুই আমার মনে থাকবি।
খোকাদের চুমু দিস! নাজির সাহেবকে ফাইন্যাল গুঁতো! তুই আদর-আশিস নে। রুবি ও মেজোবউ আমার নমস্কার জানাস। ইতি –
তোর দাদু
চিঠি পড়ে মেজোবউ যে ঊর্ধ্বে তুলে ধরলে, তা মানুষের মুখ নয়। ও যেন ঝরার একটু আগের শিশির-সিক্ত রক্ত-কমল!
লতিফা মুগ্ধনয়নে দেখতে লাগল। রুবির চোখ যেন পুড়ে গেল!
মেজোবউয়ের কিছু বলবার আগেই রুবি লে উঠল, “আমি ঠিক করেছি বুঁচি, আমি ওয়ালটেয়ারে যাব। মা আমায় বলেন উল্কা। উল্কাই যদি হই, তাহলে শূন্যে আর ঘুরতে পারিনি! ধরায় যে মানুষ আমায় নিরন্তর টানছে, মুখ থুবড়ে তার দেশেই পড়বে নিবে। তবু ওই আমার মহান মৃত্যু! – কী বল মেজোবউ? তুমি আমার সঙ্গে যাবে? লুকিয়ে পালাতে হবে কিন্তু। অভিসারিকা সেজে, বুঝেছ?
রুবির চোখ যেন সোনার আংটিতে বসানো রুবির মতোই জ্বলতে লাগল।
মেজোবউ একটুও অপ্রতিভ না হয়ে বলে উঠল, “আমার যাওয়ার ইচ্ছা থাকলে তোমার বহু আগেই সেখানে গিয়ে উঠতাম ভাই রুবি বিবি! দু মাস আগে এ-খবর পেলে কী করতাম জানি না? কিন্তু আজ আর আমাকে নিয়ে আমার কোনো ভয়-ডর নেই। খোকাকে যদি না হারাতাম, এই খোকাদের যদি না পেতাম, তাহলে আমি সব-আগে গিয়ে তাঁকে সেবা করে ধন্য হতাম।”
রুবি মেজোবউয়ের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলে, উঠল, “অর্থাৎ তুমি রুবি হলে এতক্ষণ বেরিয়ে পড়তে।”
মেজোবউ হেসে ফেলে বললে, “হুঁ। তুই।”
রুবি এক মুহূর্তে দাঁড়িয়ে বললে, “ভাই মেজোবউ, তুমি একটু আগে আমায় উদ্দেশ করেই বোধ হয় নমস্কার করেছিলে, আমার প্রতি-নমস্কার নাও। তুমিই আমায় পথ দেখালে।”
বলেই লতিফার দিকে চেয়ে বললে, “ভাই বুঁচি, সময় হয়েছে নিকট, এখন বাঁদন ছিঁড়িতে হবে। আমার পথের সন্ধান পেয়েছি। ভাই মেজোবউ, আমি বুঁচির কাছে পাঠিয়ে দেব তোমার খোকাদের পাঠশালা তৈরির খরচা, গ্রহণ কোরো।”
মেজোবউ, লতিফা কিছু বলবার আগেই রুবির কণ্ঠস্বর শোনা গেল, “সোফার! গাড়ি লে আও!”
মৃত্যুক্ষুধা: ২৮ (শেষ)
ভাই বুঁচি, আমি যদি আজ আমার পরিচয় দিই-আমি তোদের সেই রুবি, তাহলে বিশ্বাস করবি? আমার বাপ মাও জানেন আর তোরাও হয়তো জানিস, আমি মরেছি! অথবা যদি না মরে থকি, তাহলে আমার মরণই মঙ্গল বা একমাত্র গতি!
তোরা – অন্তত তুই শুনে সুখী হবি, না দুঃখিত হবি জানিনে, যদি আমি লিখি যে, আমি আজও মরিনি। আমি বেঁচে গেছি বুঁচি, বেঁচে গেছি – তোদের চেয়েও বড়ো করে বেঁচে গেছি।
আজ তোকে সব কথা বলব খুলে, “তারপর সামনে রয়েছে কূলহারা সমুদ্র। কূলহারা জীবনকে আর কেউ নিতে না পারে, সে তো রয়েছে!
তোর কাছে যখন জানালাম, তোর আনু ভাই রেঙ্গুন জেল থেকে মৃত্যুর নোটিশ হাতে ওয়ালটেয়ারে যাচ্ছে, তখনই আমার কর্তব্য ঠিক করে ফেললাম। তোর-কাছে-লেখা তার চিঠির প্রতিটি অক্ষর যেন আমার দিকে তাকিয়ে বলছিল, “তোমায় চায়, সে তোমায় চায়!” রাজার লাঞ্ছনা-তিলক তার কপালে, শ্যাম সমান মরণের বাঁশি তার হাতে, ওই যে রাজপুত্র! আমি অভিসারে বেড়িয়ে পড়লাম।
আমি জানতাম, আমার বাপ-মার অদেশ-অনুরোধ ও স্নেহের বিপুল বাধাকে ডিঙিয়ে কিছুতেই বুঝি তার সান্নিধ্য লাভ করতে পারব না। কিন্তু সে যখন তার মৃত্যু-মলিন চোখ নিয়ে আমার দিকে তাকাল, তখন তার কাছে আমার সম্মুখের এত বড়ো বাধা যেন বাধা বলেই মনে হল না।
মনে হল এত বড়ো যে বাধা, এর বড়ো যে অন্তরায় – সে তার চেয়েও বড়ো, তার চেয়েও বিপুল! আকাশ ডাক দিল, আমার পাখা চঞ্চল হয়ে উঠল, আমি নীড়ের মায়া ভুললাম।
যে পর্বতে জন্মগ্রহন করেছি আমি স্রোতস্বিনী, তার এত পাথর এত বন-জঙ্গল পথ আগলে আমায় ধরে রাখতে পারলে না, আমি সমুদ্রের উদ্দেশে ছুটে এলাম। সমুদ্রের নাগাল পেয়েছি, আজ আমার মনে হচ্ছে, এই আমার শেষ, এই আমার পরিণতি, এই আমার সার্থকতা। কূল হারিয়েছে অকূলের বন্ধুকে পেলাম।
আমার বাপ-মার মনে – তোদের মনে কত ব্যথা দিয়েছে জানি। তোরা পাহাড়ের মতো সংস্কারের পর সংস্কারের পাথর চড়িয়ে উঁচু হয়ে আছিস, তোরা হয়তো তাকেই বলিস মহিমা। কিন্তু ওই মহিমার অচলায়তনে নিশ্বাস রোধ করে বেঁচে থাকার মায়া অন্তত আমার ছিল না কোনোদিন। ও জীবন আমার নয়। নিজেকে হারিয়ে দেওয়া, ছড়িয়ে দেওয়াই আমার জীবনের গতি। পথে চলে, ভুল করে, পথ হারিয়েই আমার মুক্তি। জানি, ও জীবন আমার কাছে যেমন সত্য,
