মৃত্যুক্ষুধা

« <
/ 28
> »

ধরেছে, একটু চা দিতে পারবি?”

লতিফা হেসে বললে, “না, পারব না! কী হল দাদু ওদের সভায়, বললে না যে!”

আনসার তিক্তস্বরে বলে উঠল, “ঘোড়ার ডিম! মেজোবউ হল খ্রিষ্টান, লাভ হল পির আর মওলানা সাহেবদের। আর মরার ওপর খাঁড়ার ঘা –বেচারি প্যাঁকালের মা-র কপাল তো এমনিই পুড়েছে, যেটুকু বাকি ছিল – মোল্লাজি তা শেষ করে গেলেন। এরপরে যদি কাল শুনি যে, প্যাঁকালেরা ঘরগুষ্টি মিলে খ্রিস্টান হয়ে গেছে বুঁচি, তাহলে আমি কিছু বলব না।”–একটু থেমে আনসার বিষাদঘন কণ্ঠে বলে উঠল, “বুঝলি বুঁচি, প্যাঁকালের মা এত কেঁদে বেড়িয়েছে আজ, কিন্তু আজ মউলুদ শরিফ হয়ে যাওয়ার পর এবং পাড়ার মোল্লা-মোড়লদের সিদ্ধান্ত শোনার পর থেকে তার কান্না একেবারে থেমে গেছে! আহা বেচারি! ওই ছাগল কটাই তো ওর সম্বল – তাই তাকে কাল বিক্রি করতে হবে। নইলে ওর জাত যাবে পাড়ার লোকের কাছে!”

আনসার উঠে অস্থিরভাবে পায়চারি করতে লাগল। লতিফার চোখ-মুখের দুষ্টুমির দীপ্তি কখন ম্লান হয়ে কান্না-সজল হয়ে উঠেছিল, তা সে নিজেও টের পায়নি। হঠাৎ সে আকুল কণ্ঠে বলে উঠল, “দাদু লক্ষ্মীটি, তুমি একবার কাল মেজোবউয়ের আর মেম-সায়েবের সাথে দেখা করতে পার? তোমার ভরসা পেলে ও খ্রিস্টান থাকবে না –এ আমি জোর করে বলতে পারি। আমরা অল্পদিন হল কৃষ্ণনগর এসেছি, এর মধ্যেই ওর সাথে যে কয়টা দিন আলাপ হয়েছে, তাতে বুঝেছি – ও আর যাই হোক, খারাপ মেয়ে নয়। ও বড্ড অভিমানিনী। পাড়ার লোকের যন্ত্রণাতেই সে খ্রিস্টান হল। জানো দাদু, ও মেম-সায়েবের কাছে একটু যাওয়া-আসা করত বলে পাড়ার লোকে ওদের একঘরে করবে বলে কেবলই ভয় দেখাচ্ছিল। শেষে এমন বদনাম দিতে লাগল যে-বদনাম ওর ওপর দেওয়ার মতো মিথ্যা আর কিছু হতে পারে না। মানুষ দুঃখ-অভাবে পড়লে তার কি এমনই অধঃপতন হয় দাদু সকল দিক দিয়ে?…”

আনসার গভীর দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে রাত্রির তারা-খচিত আকাশের দিকে রইল। তার কেবলই মনে হতে লাগল – ওই রাত্রির আকাশের মতোই অসীম দুর্জ্ঞেয় রহস্য-ভরা এই পৃথিবীর মানুষ।

লতিফা চা করবার জন্য উঠে যাচ্ছিল, হঠাৎ আনসার বলে উঠল, “সত্যিই রে বুঁচি, ক্ষুধিত মানুষ – অভাব-পীড়িত মানুষের মতো সকল-দিক দিয়ে অধঃপতিত আর কেউ নয়! ক্ষুধা আছে বলেই ওরা কেবলই পরস্পরের সর্বনাশ করে। দু মুঠো অন্নের অভাবে ওদের আত্মা আজ সকল রকমে মলিন। তুই বুঝবিনে বুঁচি, ওদের অভাব কত অতল অসীম, ওদের দুঃখ কত অপরিমেয়! আমি দেখেছি, ওই হতভাগ্যদের দুর্দশার নিত্যকার ঘটনা – তাই তো আমার মুখের অন্ন এমন তেতো হয়ে উঠেছে। এক মুঠো ডাল-মাখা ভাত যখন খাই, তখন গলার ও-ধারে যেন ও আর পেরোতে চায় না, আটকে যায়! মনে হয় আকাশের ওই তারার মতোই ক্ষুধিত চোখ মেলে কোটি কোটি নিরন্ন নর-নারী আমার ওই এক গ্রাস ভাতের দিকে চেয়ে আছে! ওদের দুঃখ তুই বুঝবিনে বুঁচি। দু মুঠো অন্নের জন্য ওরা মেথর হয়ে তোদের ঘরে-বাইরের সকল রকম ময়লা-নোংরা মাথায় করে বয়ে নিয়ে যায়। ধাঙড় হয়ে –ভোর না হতেই তোদের গাঁয়ের ধুলো দু মহাত দিয়ে পরিষ্কার করে পথে পথে। তাদের কথা বলিসনে বুঁচি –অন্তত ওদের দোষ দিসনে আমার কাছে কখনও! তুই তো মা, তুই কি বিশ্বাস করবি, যে ক্ষুধার জ্বালায় মা তার ছেলের হাত থেকে কেড়ে খাচ্ছে? নিজের ছেলেমেয়েকে নরবলির জন্য বিক্রি করছে দু মুটো অন্নের জন্য? খোদা তোকে সুখে রাখুন, কিন্তু ক্ষুধার জ্বালা যে কী জ্বালা, তা যদি একটা দিনের জন্যও বুঝতিস, তাহলে পৃথিবীর কোনো পাপীকেই ঘৃণা করতে পারতিসনে! শুনবি একটা সত্যি ঘটনার কথা?”…

লতিফা চোখে হাত দিয়ে আর্তকণ্ঠে বলে উঠল, “দোহাই দাদু, তোমার দু পায়ে পড়ি, আর বোলো না। এতেই আমার দম ফেটে যাচ্ছে।”

সে তাড়াতাড়ি সেখান থেকে টলতে টলতে উঠে গেল।

আনসার হেসে বললে, ‘তোর সুখের অন্নকে এমন বিষিয়ে তোলা ভালো হয়নি রে বুঁচি! যাক, কাল আমি সত্যিই মেজোবউ আর মিস জোন্সের সাথে দেখা করব গিয়ে….!”

পরদিন সকাল চা খেতে খেতে নাজির সাহেব আনসারকে বলে উঠলেন, “কি হে! আজ নাকি শিকারে বেরুচ্ছ? দেখ দাদা, বাঘিনির কাছে যাচ্ছ মনে রেখ!”

আনসার হেসে বললে, “আমি শিকার করতে যাচ্ছিনে বেকুফ, আমি যাচ্ছি সুন্দরবনের বাঘকে – সুন্দরবনে ফিরিয়ে আনতে, সভ্য শিকারীর ফাঁদ থেকে রক্ষা করতে।”

নাজির সাহেবও হেসে বললেন, “অন্য শিকারীর হাত থেকে বাঁচিয়ে শেষে নিজেই বাণ হেনে বোসো না। দেখো, ও বড়ো শক্ত বাঘিনি হে, শেষে বাঘিনিই তোমায় শিকার করে না ফেলে।”

আনসার লতিফার দিকে আড়-চোখে চেয়ে একটু গলা খাটো করে বললে, “রক্ষে কর ভাই, বাঘের বাচ্চা পুষবার সখ হয়নি এখনও আমার, এ আমার বাঘ শিকার নয়, এ শুধু কষ্ট স্বীকার!”

নাজির সাহেব একটু জোরেই হেসে বললেন, “তোফা! তোফা! ওগো, আর এক কাপ চা দাও তোমার রসরাজ ভাইটিকে! কিন্তু দাদা, বাঘিনির না হয় বাচ্চা আছে, কিন্তু ওই সিংহী – যে ঘরে নিয়ে গেছে?”

আনসার হেসে উঠে বলে, “ওকে সিংহী বোলো না মূর্খ, ও হচ্ছে নীলবর্ণ শৃগালিনী। হাঁ, ওর কাছে আমায় একটু সাবধানেই যেতে হবে। ওদের নখ-দন্তকে ভয় করিনে, ভয় করি ওদের ধূর্তামিকে। মিশনারির মেম!”

নাজির সায়েব ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “বাপ রে! মিশনারি! একে মিস, তাহে নারী! উঃ! একটা মিসফর্চুন না হয়ে যায় আজ! আই মিন ফরচুন ফর মিস!”

লতিফা ধমক দিয়ে বলে, “দোহাই! তোমার আর রসিকতা করতে হবে না! বুড়োকালে ওঁর রস উথলে উঠল! তোমার আজ হল কী বলো তো!”

আনসার হেসে বললে, “বুঝলিনে বুঁচি, ওঁর হিংসে হচ্ছে। একটুখানি মেম-সাহেবের সঙ্গে আলাপ করব গিয়ে, এ আর ওঁর সহ্য হচ্ছে না! তুই থাকতে তো ওঁর আর ওদিক পানে যাওয়ার ভরসা নেই!”

লতিফা উঠে যেতে যেতে বললে, “আমি আজই দিগ‍্‍দড়ি দিয়ে ছে্ড়ে দিতে রাজি আছি দাদা-ভাই, কিন্তু ভয় নেই, ওঁকে কেউ ছোঁবে না।”

নাজির সাহেবও উঠে যেতে যেতে বললেন, “পেতনিতে পেলে আর কেউ ছুঁতে সাহস করে!”

আনসার উঠে পড়ে বললে, “তোমরা এখন কলহ করো, আমি এখন চললাম।…”

গির্জায় গিয়ে আনসার শুনলে, মিসবাবাদের সঙ্গে দেখা করবার নিয়ম নেই। কিন্তু সে হাল ছাড়বার পাত্র নয়। পাদরি সাহেবের সঙ্গে ঘণ্টা-খানিক তর্কের পর সে এই শর্তে রাজি হল যে, হেলেন ওরফে মেজোবউকে আনসার শুধু জিজ্ঞেস করবে, সে স্বেচ্ছায় ক্রিশ্চান হয়েছে কি-না। তাকে প্রলোভন দেখিয়ে বা অন্য কোনো উপায়ে যে মিশনারিরা ক্রিশ্চান করে নাই, এ-সম্বন্ধেও আনসার যথেচ্ছ প্রশ্ন করতে পারে। অবশ্য আনসারের খদ্দরের বহর ও তার ‘এজিটেটর’নামের জন্যই সে এই সুযোগটুকু পেল। আনসারও সাহেবদের স্পষ্টই বললে, “দেখো পাদরি সাহেব, আমি গেঁয়ো মোল্লা-মউলবি নই, যে, ধমকে তাড়িয়ে দেবে! মেজোবউ যদি স্বেচ্ছায় তোমাদের ধর্ম নিয়ে থাকে, আমি কিচ্ছু বলব না। আর যদি অন্য কোনো উপায়ে ওর সর্বনাশ করে থাক, তাহলে এই নিয়ে দেশময় একটা হইচই বাঁধিয়ে দেব।”

সাহেব একটু ঘাবড়ে গিয়ে বললে, “নো মিস্টার! আপনে যঠেচ্ছ প্রশ্ন করেন আমাদের ভোগ্নি হেলেনকে, আঠাট ভূটপূর্ব মেজোবউকে। ডেখিবেন, টাহাকে স্বয়ং ঈশ্বর সটপঠে ডাকিয়াছেন! আমরা কেহ নয়!”

আনসার মনে মনে সাহেবের ‘সৎপথের’নিকুচি করে বললে, “সাহেব, এখন একটু ডাকতে পার শ্রীমতী হেলেনকে?”

সাহেব নিজে উঠে গিয়ে একটু পরেই মিস জোন্স ও মেজোবউকে নিয়ে ঘরে ঢুকল!

আনসার চেয়ার ছেড়ে হাত বাড়িয়ে বলে উঠল, “গুডমর্নিং মিস জোন্স! গুডমর্নিং মিস – আই মিন মিসেস হেলেন!”

মিস জোন্স স্মিতহাস্যে আনসারের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করল, কিন্তু মেজোবউ বেচারি লজ্জায় এতটুকু হয়ে আধোবদনে দাঁড়িয়ে রইল! মিস জোন্সের সরোষ ইঙ্গিতেও সে কোনো রকমেই একটা নমস্কারও করতে পারল না।

মেজোবউ আনসারকে চিনত এবং একটু ভালো করেই চিনত। কতদিন দূর হতে তার দৃপ্ত চরণে তারই বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়া-আসা করবার সময় বেড়ার ফাঁক দিয়ে দেখেছে। এমনি কেন যেন ওর ভালো লেগেছিল এই অদ্ভুত লোকটিকে! কতদিন সে বিনা কাজে লতিফার কাছে গিয়ে বসে থাকত এই লোকটিকে দেখবার জন্য – ওর জীবনের অদ্ভুত

« <
/ 28
> »