- মৃত্যুক্ষুধা: ১
- মৃত্যুক্ষুধা: ২
- মৃত্যুক্ষুধা: ৩
- মৃত্যুক্ষুধা: ৪
- মৃত্যুক্ষুধা: ৫
- মৃত্যুক্ষুধা: ৬
- মৃত্যুক্ষুধা: ৭
- মৃত্যুক্ষুধা: ৮
- মৃত্যুক্ষুধা: ৯
- মৃত্যুক্ষুধা: ১০
- মৃত্যুক্ষুধা: ১১
- মৃত্যুক্ষুধা: ১২
- মৃত্যুক্ষুধা: ১৩
- মৃত্যুক্ষুধা: ১৪
- মৃত্যুক্ষুধা: ১৫
- মৃত্যুক্ষুধা: ১৬
- মৃত্যুক্ষুধা: ১৭
- মৃত্যুক্ষুধা: ১৮
- মৃত্যুক্ষুধা: ১৯
- মৃত্যুক্ষুধা: ২০
- মৃত্যুক্ষুধা: ২১
- মৃত্যুক্ষুধা: ২২
- মৃত্যুক্ষুধা: ২৩
- মৃত্যুক্ষুধা: ২৪
- মৃত্যুক্ষুধা: ২৫
- মৃত্যুক্ষুধা: ২৬
- মৃত্যুক্ষুধা: ২৭
- মৃত্যুক্ষুধা: ২৮ (শেষ)
অদ্ভুত গল্প সব শুনবার জন্য। ও যেন আলেফ-লায়লার কাহিনীর বাদশাজাদা, যেন পুথির হরমুজ, মনু-চেহের! আজ তাকেই সামনে দেখে মর্মাহত সাপিনির মতো সে কেবলই মুখ লুকাবার চেষ্টা করতে লাগল!
আনসার মেজোবউকে আবছা এক-আধটু দেখে থাকবে হয়তো! আর দেখে থাকলেও তার মনে নেই। তার কর্মময় জীবনে নারীমুখ চিন্তা তো দূরের কথা, দেখবারও ফুরসত নেই। সে জানে শুধু কার্ল-মার্কস, লেনিন, ট্রট্সকি, স্টালিন, কৃষক, শ্রমিক পরাধীনতা, অর্থনীতি। পীড়িত মানবাত্মার জন্য বেদনাবোধ ছাড়াও যে অন্যরকম মর-বেদনাবোধ থাকতে পারে – এ প্রশ্ন তার মনে জেগেছে এই সেদিন। নারীকে সে অশ্রদ্ধাও করে না, নারীর প্রতি তার কোনো আকর্ষণও নেই। নারী সম্বন্ধে সে উদাসীন মাত্র।
আজ সে মুক্তাবগুণ্ঠিতা মেজোবউকে প্রথম চোখ মেলে চেয়ে দেখল। তাকে দেখামাত্র তার হঠাৎ যেন মনে হল, এর যেন কোথায় রুবির সঙ্গে মিল আছে। রুবির কথা মনে হতেই বুকের কোনো এক কোমল পর্দায় যেন চিড় খেয়ে উঠল। আনসার কেমন যেন অসোয়াস্তি অনুভব করতে লাগল।
মিস জোন্স ইংরেজিতে বললে, “মনে হচ্ছে আপনি একে চেনেন না। চিনলে অন্যের কথা শুনে এর কাছে আসতেন না।”
আনসারও ইংরেজিতে বললে, “ওকে জানি, তবে চিনিনে সত্য। ভয় নেই, আমি ওকে ফিরিয়ে নিতে আসিনি, শুধু জানতে এসেছি, স্বেচ্ছায় ক্রিশ্চান হয়েছে কি-না। আশা করি, এ প্রশ্ন করলে, আপনারা ক্ষুব্ধ হবেন না।”
মিস জোন্স তারাগ্রমের ‘জি’সুরের মতো মিহিন তীক্ষ্ণকণ্ঠে বলে উঠল, “কখনোই না! আপনি অনায়াসে জিজ্ঞাসা করতে পারেন।”
ধন্যবাদ দিয়ে আনসার হঠাৎ প্রায়-প্রকম্বিতা মেজোবউয়ের দিকে ফিরে জিজ্ঞাসা করলে, “আচ্ছা বলুন তো আপনার হঠাৎ খ্রিস্টান হওয়ার কারণ কী?
মেজোবউ তার আনতনয়ন আনসারের মুখে তুলে ধরেই আবার নামিয়ে ফেলে বললে, “আমি তো হঠাৎ খ্রিস্টান হইনি।”
আনসার হেসে ফেলে বললে, “তার মানে, আপনি একটু একটু করে খ্রিস্টান হয়েছেন, এই বলতে চান বুঝি?”
মেজোবউ তার সেই জাদুভরা হাসি হেসে বললে, “জি না। আপনারা একটু একটু করে আমায় খ্রিস্টান করেছেন!”
আনসার বিস্ময়-বিস্ফারিত চক্ষু মেলে এই রহস্যময়ী নারীর দিকে অনেকক্ষণ চেয়ে দেখল। তারপর সহানুভূতিমাখা কণ্ঠে বলে উঠল, ‘বুঝেছি, আমাদের ধর্মান্ধ সমাজ কত বেশি অত্যাচার করে আপনার মতো মেয়েকেও খ্রিষ্টান হতে বাধ্য করেছে!”
দুঃখিনী মেজোবউয়ের দুই চক্ষু এই দুটি দরদভরা কথাতেই অশ্রুতে পুরে উঠল। একটু পরেই টসটস করে তার গণ্ড বেয়ে অশ্রুর ফোঁটা গড়িয়ে পড়তে লাগল।
মিস জোন্স এবং পাদরি সাহেবের নিমেষে দৃষ্টি বিনিময় হয়ে গেল। তা আনসারের নজর এড়াল না।
মিস জোন্স কিছু বলবার আগেই আনসার বলে উঠল, “ভয় করবেন না, আমি আমার হৃদয়হীন সমাজে এই ফুলের প্রাণকে নিয়ে গিয়ে শুকিয়ে মারতে চাইনে। আমার শুধু একটি অনুরোধ, একে আপনারা মানুষ করে তুলবেন, তাহলে বহু মানুষের কল্যাণ সাধিত হবে এর দ্বারা।”
মিস জোন্স ও পাদরি সাহেব দুজনেই অতিমাত্রায় খুশি হয়ে বললে, “ডেখুন বাবু, ইহারই জন্যে – এই মানুষেরই মুকটির জন্যেই তো আমাদের জিশু প্রেরণ করেছেন। আপনায় ঢন্যবাড, আমরা খ্রিস্টান হওয়ার আগে ঠেকেই হেলেনকে বালো বালো কাজ শেকাচ্ছে।”
মেজোবউ হঠাৎ অশ্রু-সিক্ত কণ্ঠে বলে উঠল “আমি কি আপনার সাথে দেখা করতে পারি – যদি কোনোদিন ইচ্ছে হয়?” –– বলেই সে তার অশ্রুসিক্ত আঁখি দুটি পূজারিনির ফুলের মতো আনসারের পানে তুলে ধরল।
আনসারের বুক কেন যেন দোল খেয়ে উঠল! এ কোন মায়াবিনী? সে তাড়াতাড়ি বলে উঠল, “নিশ্চয়ই, যখন ইচ্ছা দেখা করবেন। আমাকে আপনার কোনো ভয় নাই। আপনার এই ধর্ম-পরিবর্তনে আমি অন্তত এতটুকু দুঃখিত নই। আপনার মতো মেয়েকে তার যোগ্যস্থান দেওয়ার মতো জায়গা আমাদের এই অবরোধ-ঘেরা সমাজে নেই। – এ আমি আপনাকে দেখে এবং দুটি কথা শুনেই বুঝেছি!” –বলেই একটু থেমে আবার বললে, “আপনি যে ধর্মে থেকে শান্তিলাভ করেন। –করুন, আমার শুধু একটি প্রার্থনা, আপনারই চারপাশের এই হতভাগ্যদের ভুলবেন না –আপনার হাত দিয়ে যদি ওদের একজনেরও একদিনের দুঃখও দূর হয় – তবে আমার চেয়ে বেশি খুশি আর কেউ হবে না। আপনার মতো সাহসী মেয়ে পেলে যে কত কাজই করা যায়?”
মেজোবউ তার চোখমুখ মুছে ভরা কণ্ঠে বলে, উঠল, “আমায় দিয়ে আপনার কোনো কাজের সাহায্য যদি হয় জানাবেন, আমি সব করতে পারব আপনার জন্য!” –কিন্তু ওই ‘আপনার জন্য’কথাটা বুঝি তার বেরিয়ে এসেছে। ওই কতাটা বলবার পরই তার চোখমুখ লজ্জায় রাঙা টকটকে হয়ে উঠল।
আনসারের মনে হল, সে যেন কোন নদী আর সাগরের মোহনাট উত্তাল তরঙ্গ-মধ্যে এসে পড়েছে! সে তাড়াতাড়ি উঠে পড়ে বললে, “আমায় হয়তো আপনি ভালো করে চেনেন না, লতিফা আমারই বোন। যদি ওখানে কোনোদিন যান, আমার সব কথা শুনবেন। আর দেখাও ওখানেই করতে পারেন – ইচ্ছা করলে।”
মেজোবউ ঠোঁটে হাসি চেপে বলে উঠল, “আপনাকে আমি ভালো করেই চিনি। আমি ওখানেই দেখা করব গিয়ে। কিন্তু যেতে দিবেন তো ওখানে খ্রিস্টাননিকে?”
আনসার কিছু উত্তর দেওয়ার আগেই মেজোবউয়ের ছেলেমেয়ে দুটি কোথা থেকে দৌড়ে এসে মাকে জড়িয়ে ধরে বলে উঠল, “মা, তুই ইখেনে এয়েছিস আর আমরা খুঁজে খুঁজে মরছি!”
মেজোবউ তাদের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে ভারি গলায় বলে উঠল, “এই দুটোই আমার শত্রু। এখানে এসে তবু দু বেলা দুটো খেতে পাচ্ছে! ওদের উপোস করা সহ্য করতে না পেরেই আমি এখানে এসেছি।”
আনসার তার বলিষ্ট বাহু দিয়ে মেজোবউয়ের ছেলেমেয়েকে একেবারে তার বুকে তুলে চুমো খেতে খেতে বললে, “তোরা কী খেতে ভালোবাসিস বল তো!” দুই শিশুতে মিলে তারস্বরে যে-সব ভালো জিনিসের লিস্টি দিলে, তা শুনে ঘরের সকলেই হেসে উঠল। কিন্তু হাসলেও আনসারের এই ব্যবহার সকলের বিস্ময়ের আর অবধি রইল না। অতি সামান্য ঘরের ছেলেমেয়েদের কোলে তুলে সম্ভ্রান্ত শিক্ষিত যুবকের এই এত সহজভাবে চুমো খাওয়া তারা যেন দেখেও বিশ্বাস করতে পারছিল না।
জাদুকরি মেজোবউয়ের মনে হতে লাগল, তার এতদিনের এত অহংকার আজ ধুলোয় লুটিয়ে পড়ল। তাকে শ্রদ্ধা করবার মতো মানুষও আছে জগতে! সে তার চেয়েও বড়ো জাদুকর। তার কেবলই ইচ্ছা করতে লাগল, দু হাত দিয়ে, এই পাগলের পায়ের ধুলো নিয়ে চোখে-মুখে মেখে ধন্য হয়, কিন্তু লজ্জায় পারল না। আর কেউ না থাকলে হয়তো সে সত্যি-সত্যিই তা করে ফেলত।
শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা এবং তারও অতিরিক্ত কিছু সুন্দর চক্ষুকে সুন্দরতর করে তুলেছিল। তার সারা মুখে যেন কীসের আভা ঝলমল করছিল।
আনসারের দুই চক্ষুর পরিপূর্ণ দৃষ্টি দিয়ে সে মাধুরী যেন বুভুক্ষুর মতো পান করতে লাগল। কিন্তু পরক্ষণেই সে সচকিত হয়ে মেজোবউয়ের ছেলেমেয়েদের হাতে দুটো টাকা গুঁজে বললে, “এখন আসি!” বলে সকলের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে বেরিয়ে এল।
আশ্চর্য, এবার মেজোবউও সলজ্জ হাসি হেসে হাত বাড়িয়ে দিল! আনসারের উষ্ণ করস্পর্শে তার সমস্ত শরীরে যেন তড়িৎ-প্রবাহ বয়ে গেল। মনে হল, এই নিমিষের স্পর্শ বিনিময়ে সে আজ ভিখারিনি হয়ে গেল! সে তার সর্বস্ব লুটিয়ে দিল!
মিস জোন্স এবং পাদরি সাহেব এ সবই লক্ষ করছিল। এইবার পাদরি সাহেব একটু অসহিষ্ণু হয়েই মেজোবউয়ের ছেলেমেয়েকে আদেশের স্বরে বলে উঠল, “এই! টোমরা ও টাকা এখনই ফিরিয়ে ডিয়ে এসো।”
সঙ্গে সঙ্গে মেজোবউ বলে উঠল, “না, তোরা চলে আয়। তোদের ফিরিয়ে দিতে হবে না।” – বলেই ছেলেমেয়েদের হাত ধরে সেও বেরিয়ে গেল।
পাদরি সাহেব বজ্রাহতের মতো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর মিস জোন্সকে ইঙ্গিতে ডেকে বহু পরামর্শের পর স্থির হল, মেজোবউকে শিগগিরই অন্য কোথাও পাঠিয়ে দিতে হবে।
মেজোবউ রাস্তায় এসে দাঁড়াতেই দেখল, একপাল ছেলেমেয়ে নিয়ে আনসার বিস্কুট কিনছে সামনের দোকান থেকে। সে একটু হাসল, সেই জাদুভরা হাসি। তারপর যেতে যেতে বলল, “কাল সন্ধ্যায় বাড়ি থাকবেন, আমি যেমন করে পারি যাব।”
আনসার হেসে বললে, “ধন্যবাদ, মিসেস হেলেন!”
মেজোবউ তিরস্কার-ভরা চাউনি হেনে চলে গেল।
আনসারের আজ পথ চলতে চলতে মনে হল, এই ধরণির দুঃখ-বেদনা-অভাব – সব যেন সুন্দর সুমধুর! এই পৃথিবীতে দুঃখ বলে কিছুই নেই, ও-যেন আনন্দেরই একটা দিক। সুরার মতো এর আনন্দ তিক্ত জ্বালাময়। এ সুরা যারা পান করেছে, তাদের আনন্দ সুখী মানব কল্পনাও করতে পারে না।
