- প্রথম পরিচ্ছেদ: দেবগ্রামের পথে
- দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: মহাতাপ কথাটা মিথ্যা বলে নাই
- তৃতীয় পরিচ্ছেদ: দিন কয়েক পরের কথা
- চতুর্থ পরিচ্ছেদ: দেখিতে দেখিতে বৰ্ষা নামিয়া পড়িল
- পঞ্চম পরিচ্ছেদ: ভাদ্র মাস পড়িয়া গিয়াছে
- ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ: ভাদ্র শেষ হইয়া গিয়াছে
- সপ্তম পরিচ্ছেদ: পূজা আসিয়া পড়িয়াছে
- অষ্টম পরিচ্ছেদ: পরদিন সপ্তমীর সকাল
- নবম পরিচ্ছেদ: নবমীর রাত্রিকাল
সন্তান জিউ পায়। রণে গোনে অরুণ্যে মা ষষ্ঠী বুক দিয়ে রক্ষা করেন।
চাঁপাডাঙার বউ একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল এবং দরজার চৌকাঠে একটি ফোঁটা দিল। ষষ্ঠীর প্রসাদী হলুদতেলের ফোঁটা।
একটি মেয়ে বলিল, দরজার মাথায় কাকে ফোঁটা দিচ্ছ চাঁপাডাঙার বউ?
বিষণ্ণ হাসিয়া বড় বউ বলিল, দেওরকে ভাই! সে তো মাঠে। শাউড়ি বলে গিয়েছে। বউমা, ওকে ফোঁটা তুমি চিরকাল দিয়ো।
মেয়েরা বাহির হইয়া চলিয়া গেল।
এবার চাঁপাডাঙার বউ ডাকিল, মানিক? মানু, মানিক কই?
মানু কাছে আসিয়া বলিল, তাকে পুরে রেখেছি ঘরে। কোথায় বেরিয়ে পালাবে। বলিয়াই সে চাঁপাডাঙার বউয়ের হাতের হলুদতেলের বাটি হইতে খানিকটা হাতের তেলোয় তুলিয়া লইয়া বন্ধ ঘরের দরজা খুলিয়া ঘরে ঢুকিল।
বড় বউ চকিত বিস্ফারিত দৃষ্টিতে তাহার দিকে চাহিল। এটা সন্দেহ তাহার মনে সাড়া দিয়াছে। পাছে সে আগে মানিককে ফোটা দেয়, এই ভয়েই কি মানু এই কৌশল অবলম্বন করিয়াছে?
মানু মানিককে কোলে লইয়া বাহির হইয়া আসিল এবং বড় বউয়ের সামনে দাঁড়াইল।
বড় বউ মানিকের মুখের দিকে চাহিয়া বিচিত্ৰ হাসি হাসিয়া বলিল, এই যে ফোঁটা দিয়েছিস তুই? বলিয়া সেও ফোঁটা দিল মানিকের কপালে।
মানু ভ্রূ কুঞ্চিত করিয়া প্রশ্ন করিল, কিন্তু তুমি হাসলে ক্যানে বড়দি?
–আমি পাছে আগে ফোঁটা দিই, তাই তুই আগে ফোঁটা দেবার জন্যেই ওকে ঘরে বন্ধ করে রেখেছিলি। তাই হাসলাম। তা আমাকে আগে বললেই পারসি!
মানু তাহার মুখের দিকে চাহিয়া একটু চুপ করিয়া রহিল, তারপর বলিল, তোমাতে আর ভাসুরে সেদিন ঘরে কথা বলছিলে, সেসব কথা আমি শুনেছি বড়দি। মানিক নিয়েও তো তোমাদের বুক ভরে না।
মানু মানিককে লইয়া ঘরে ঢুকিয়া গেল। চাঁপাডাঙার বউ দেওয়ালে ঠেস দিয়া দাঁড়াইল। দেহখানা তার অবশ হইয়া গিয়াছে। সে তাহার গলায় সুতার ড়ুরিতে বাধা কয়েকটা মাদুলি টানিয়া বাহির করিয়া নাড়িতে-চাড়িতে লাগিল।
দিন কয়েক পর সেতাব বাড়িতে আসিয়া ঢুকিল। হনহন করিয়া ঘরের ভিতরে ঢুকিয়া গেল। মিনিটখানেক পরেই ডাকিল, শোন তো একবার! বলি শুনছ?
বড় বউ আসিয়া ঘরে ঢুকিল।
সেতাব তাহার কোঁচড়ে কিছু গুঁজিতেছিল। দেখিয়া বুঝিতে কষ্ট হয় না যে বস্তুটা টাকা। বড় বউ আসিয়া দাঁড়াইতেই সেতাব বলিল, দেখ ঘোঁতন ঘোষ এয়েছে। বুয়েচ? একে বলে বলছে, নবগ্রামের রাখহরি দত্তর ছেলে চার-পাঁচ ভরির সোনার হার বাধা রেখে টাকা নেবে। বলেছে তিনশো, তা আমি বলছি, দুশো! মেরে কেটে আড়াইশো। সুদ টাকায় মাসে ছ পয়সা। দোব? বলব তাকে আসতে?
বড় বউ বলিল, মহাতাপকে শুধাও।
—তুমি ক্ষেপেছ নাকি?
–না। তাকে না শুনিয়ে কোনো কাজ তুমি করতে পাবে না।
স্ত্রীর মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকাইয়া থাকিয়া সেতাব বলিল, এ তো ভ্যাল আবদার রে বাবা। মহাতাপ, মহাতাপ, মহাতাপ করে আমাকে জ্বালিয়ে খেলে তুমি। বলি মহাতাপ তো আমার মায়ের পেটের ভাই। নাকি? তুমি এত হাঁপাও ক্যানে?
বলিয়াই সে বাহিরে চলিয়া গেল।
সে যখন দাওয়ায় বাহির হইল, তখন মানদা এদিক হইতে ওদিকে চলিয়া যাইতেছিল।
বাহিরে ঘোঁতন দাওয়ার উপর মোড়ায় বসিয়া পা নাচাইতেছিল এবং ছোট একটা আয়নাচিরুনি লইয়া চুল অ্যাঁচড়াইতেছিল। সঙ্গে সঙ্গে শিস দিতেছিল।
কাছে দাঁড়াইয়া ছিল গোবিন্দ—সেই রাখাল ছেলেটি।
সেতাব আসিতেই গোবিন্দ পলাইল।
সেতাব বলিল, এই লাও। বলিয়া পাঁচটি টাকা ঘোঁতনকে দিল এবং বলিল, দোব, তাই দোব। বুঝলে, বলে দিয়ে।
ঘোঁতন আয়না-চিরুনি পকেটে রাখিয়া টাকা পাঁচটা রুমাল বাহির করিয়া খুঁটে বাঁধিল। বলিল, তোমাকে লোকে খারাপ লোক বলত বুয়েচ, আমিও বলতাম। কিন্তু তুমি তা লও। বুয়েচ, এ আমি বুঝেচি। বুয়েচ! মুখখুতে বলবে, কিন্তু আমি মুখখু লই। তুমি গুড ম্যান, তবে হ্যাঁ, স্ট্রিকট্ ম্যান–
সেতাব বুদ্ধি ধরে বিচক্ষণ, সে চ্যাংড়াও নয়। তাহার উপর সে পঞ্চায়েতের মণ্ডল। সে বলিল, তুই বড় ফাজিল ঘোঁতন। বড় বেশি বকিস। যা, বাড়ি যা। রাখহরির ছেলেকে পাঠিয়ে দিস। আর শো, আর একটা কথা বলি। নিজে একটু খাঁটিস। এত বড় আইবুড়ো বোনটাকে অমন করে খাটাস না। বুঝলি?
ঘোঁতন বিচিত্র মুখভঙ্গি করিয়া বলিল, ওরে বানাস্ রে! তা এক কাজ কর না। সঙ্গে সঙ্গে কণ্ঠস্বর নিম্ন করিয়া বলিল, তুমি পুঁটিকে বিয়ে কর না। তোমার তো ছেলেপুলে হল না।
সেতাব প্রথমটা অত্যন্ত চঞ্চল হইয়া উঠিল ইয়েকে বলে, ইয়েকে বলে। তারপর অকস্মাৎ চিৎকার করিয়া উঠিল, ঘোঁ-ত্-না-
—এই দেখ, রাগ করছ ক্যানে? ঘোঁতনা হাসিল।–ও-বউয়ের ছেলেপুলে হবে না তোমার। আর তোমার উপর টানও নাই তার। সে যা কিছু–
সেতাব আবার আরও জোরে চিৎকার করিয়া উঠিল, ঘোঁ-ত্-না–
ঘোঁতন আরও কি বলিতে যাইতেছিল, কিন্তু সেই মুহূর্তেই মহাতাপের গলা শোনা গেল রাস্তার বাঁকে। সে গান গাহিতে গাহিতে আসিতেছিল—
কাজুলী কাজুলী ও আমার আখের
বনের আদুরী, কালো বরণ কাজুলী–
তোর পয়ে হরে আমার বউয়ের
আমার হবে মাদুলী।
ঘোঁতন চমকিয়া উঠিয়া প্রায় লাফ দিয়া নামিল রাস্তায়। বলিল, চলো। পাঠিয়ে দোব রাখহরির ছেলেকে।
সে দ্রুতপদে পলাইয়া গেল।
সেতাবের উঁকা ধরা হাতখানি থরথর করিয়া কাঁপিতেছিল। চোখে তাহার বিচিত্র দৃষ্টি ফুটিয়াছে। মুখ কেমন হইয়া গিয়াছে।
মহাতাপ ওদিক হইতে দুই জন ব্যবসায়ীকে সঙ্গে লইয়া প্রবেশ করিল, বলিল; এই লাও। গুড় কিনতে এসেছে। আলুর বীচন কিনবে। সাহজী, এই হামারা দাদা। ওই দামদর করো।
চমকিয়া উঠিল সেতাব। একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া হ্রকায় টান দিতে লাগিল।
মহাতাপের সর্বাঙ্গে কাদা। সে জমি নিড়াইতেছিল। বাড়ি ফিরিবার পথে গুড়ের পাইকারদের সঙ্গে দেখা হইয়াছে। তাহাদের সঙ্গে লইয়া আসিয়াছে।
তাহাদের বসাইয়া সে হাঁকিতে হাঁকিতে বাড়ি ঢুকিল, বড় বউ! ও বড় বউ! সুর করিয়া। আবদারের ডাক।
ছোট বউ দাওয়ায় বসিয়া ময়দা মাখিতেছিল। সে বলিল, অ মাগো। ডাকের ঢঙ দেখ একবার।
মহাতাপ গ্রাহ্য করিল না। বলিল, কোথা গেল বড় বউ?
ছোট বউ বলিল—উত্তাপের সহিতই বলিল, তার শরীর খারাপ! ঘরে শুয়ে আছে।
মহাতাপ বলিল, শরীরের কিছু না বলেছে! রোজ শরীর খারাপ! রোজ শরীর খারাপ! অ বড় বউ! বড় বউ!
বড় বউ বাহির হইয়া আসিল। বলিল, কি বলছ?
–বলি ফোঁটা দেবে না আমাকে? ষষ্ঠীর ফোঁটা?
বড় বউ হাসিয়া বলিল, দেব বৈকি। চৌকাঠে দিয়েও মন তো মানে নি। জল না খেয়েই বসে আছি।
—আর একটি কথা শোন।
–বল।
–গুড়-আলুর খরিদ্দার নিয়ে এসেছি। হিন্দুস্থানি পাইকার।
–তা বেশ তো। বেচ দুই ভাইয়ে যুক্তি করে।
—সে যুক্তি তুমি তার সঙ্গে কর গিয়ে। ওসব আমি জানি না। আমার কৃষাণের ভাগের দশ। মণ গুড় চাই। আমি বিক্রি করেগা। সে কথা হয়ে আছে। তুমি সাক্ষী। সে টাকা হাম লেঙ্গে। ১৮ করে মণ। ১৮০ রুপেয়া।
–আচ্ছা পাগল তুমি। সবেরই তো অর্ধেক ভাগ তোমার। নাও না দাদার কাছে।
–উঁহুঁ। উ সব নেহি মাংতা। এই আমার কৃষাণের ভাগটা চাই।
–মানু বলিয়া উঠিল, পাগল লোক সাধে বলে না! মরণ!
—চুপ রহো, চুপ রহো, আরে দুষ্ট সরস্বতী, চুপ রহে। ওহি টাকাসে হম হার গড়ায়েগা। বড়া বহুকে লিয়ে আর তুমহারা লিয়ে। কেয়া দুটু সরস্বতী, এরে ময়না—বোলো রাধা কিষণ, বোলো মিঠি বাত। সেনেকা হার। সেনেকা হার।
মানু বলিয়া উঠিল, একশো আশি টাকায় দুজনের সোনার হার! এ যে সেই দু পয়সার মণ্ডা কিনলাম, আমি খেলাম, আমার দাদা খেলে, তারপর ফেলে দিলাম, কুকুরে খেলে, তাও শেষ করতে পারলে না, পড়ে থাকল। নব্বই টাকা সোনার ভরি।
মহাতাপ এবার হুঙ্কার দিয়া উঠিল—এ, তু মু সামালকে বাত কহো—আশি রুপেয়াকে হারসে মন উঠতা নেহি; অঃ, তেরা লিয়ে পাঁচশো আশি রুপেয়াকে আর চুরি করকে আনেগা হম। দেখো বড়া বহু–
চাঁপাডাঙার বউ বলিল, চুপ কর মহাতাপ। ছি, কতবার বলেছি তোমাকে, এমন কথা বোলো না মানুকে। আর মানু, মানুষটা বড় মুখ করে কথা বললে, তাকে কি ওই ভাবে কথা বলে?
–না, বলে না! আশি টাকার হার—তাও রুপোর না সোনার! সেই পাঁচ সিকের জমিদারি!
–বেশ তো, হার শুধু তোর জন্যেই হবে।
–নেহি। কভি নেহি। কখনও না।
–আমি হার পরব না। আমার চাই না ভাই।
মানু এবার হঠাৎ খুব ভাল মানুষ হইয়া গেল; একেবারে একমুখ হাসিয়া অত্যন্ত
