চাঁপাডাঙার বউ

« <
/ 31
> »

পরিবারের গালের জন্যে কিছু মনে কোরো না। আমি ঠাণ্ডা, সেও ঠাণ্ডা। বুয়েচ? আমি চললাম। সে আসবে, কাল মহাতাপের বউ-ছেলেকে আশীর্বাদ করতে আসবে। বুয়েচ! বলিয়া পুলকিত হাস্যে স্মিতানন হইয়া উঠিল।

সে চলিয়া গেল। ওদিক হইতে আসিয়া মহাতাপ ঘরে ঢুকিল।

মহাতাপ হাঁকিয়া বলিল, বলি কানমে কেতনা ভরি সোনা পিধা হ্যায় বড় মোল্যান? বলি, আকের গোড়ায় দেবার খোল কোটা হয়েছে?

মানদা বলিয়া উঠিল, বিত্যেব দেখ! ষাড়ের মত চেঁচানি দেখ?

কথাটা অবশ্য সে চাপা গলাতেই বলিল, কারণ ভাসুর রহিয়াছে। কিন্তু কথাগুলা কাহারও কান এড়াইল না। এড়াইবার জন্য বলেও নাই সে।

মহাতাপ ফাটিয়া পড়িল, অ্যাও! কিল মেরে দাঁত ভেঙে দোব। সে আগাইয়াও গেল।

বড় বউ বাহিরে ছিল না। সে ঘর হইতে বাহির হইয়া আসিয়া মহাতাপের সামনে দাঁড়াইয়া বলিল, কি হচ্ছে, হচ্ছে কি?

মহাতাপ থমকিয়া দাঁড়াইয়া গেল। বড় বউ বলিল—মারবে। কেন মারবে শুনি?

মহাতাপ বলিল, তোমাকে নয়। ওই দুটু সরস্বতীকে।

মানদা বলিয়া উঠিল, বটে! আমি বুঝি বানে ভেসে এসেছি?

আরে তুই আমাকে ষাড় বলি কেনে?

বড় বউ বলিল, তুমি ওকে দুষ্টু সরস্বতী বলবে কেন? আর বাঁড় তো ভাল কথা। বাবা শিবের বাহন। মা দুৰ্গার সিংহ তার কাছে পারে না।

—আমাকে বোকা বোঝাচ্ছ তুমি!

–না। তাই পারি? বোসো, ঠাণ্ডা হয়ে বোসো। এখন কি বলছিলে বল? কানে কত ভরি সোনা পরেছি, নাকি?

মানদা বলিয়া উঠিল, শুধাও না, কত ভরি দিয়েছে?

মহাতাপ বলিল, সে ওই কেপনকে বলবে। কেবল ধান বেচেছে, গুড় বেচেছে আর টাকা করেছে।

সেতাব আর পারিল না। বলিল, তুমি দাতাকৰ্ণ হয়ে লোককে পাওনাগণ্ডা ছেড়ে দিয়ে আসছ! এমনি করলে, খাবে—দু হাতের বদলে চার হাতে খাবে।

মহাতাপ উত্তর না পাইয়া হঠাৎ মাটিতে চাপড় মারিয়া চেঁচাইয়া উঠিল, আমার খোল কোটা হয় নাই কেনে? আমার আকের জমিতে হেঁচন দিতে হবে। তার আগে খোল না দিলে, আবার সেই এক মাস পর ভিন্ন হবে না। কেনে খোল কোটা হয় নাই?

সেতাব বলিল, হবে রে হবে। ব্যস্ত হোস না! দু-তিন দিন দেরি হলে মহাভারত অশুদ্ধ হবে না।

কাদম্বিনী বলিল, কাল পরশু দুদিনে আমি কুটিয়ে দোব। তুমি ক্ষেপো না। আর ঘেঁচন দেবার জন্যে তাড়াতাড়ি কোরো না। জল নামবে। দু-তিন দিনের মধ্যেই নামবে।

–নামবে। তোমার হুকুমে নামবে। আকাশ খাঁখাঁ করছে। জ্বলে গেল সব।

–নামবে। গরম দেখছ না? তারপর ওই দেখ। লণ্ঠনটা হাতে লইয়া সে দেওয়ালের গায়ে আলো ফেলিয়া অন্য হাতের আঙুল দিয়া দেখাইল—মেঝে থেকে পিঁপড়েরা ডিম মুখে করে ওপরে উঠে যাচ্ছে।

দেখা গেল, সারি বাঁধিয়া লক্ষ পিঁপড়া উপরে উঠিয়া চলিয়াছে।

বড় বউ বলিল, শুধু এক জায়গায় না, আজ আমি পাঁচ-সাত জায়গায় দেখেছি।

–আ—ত তেরি তোম তেরে না। বলিয়া মহাতাপ একটা লাফ দিয়া উঠিল; তারপর বলিল, দাদা, বোসস বোসো। তামুক সাজি।

বলে কলকে লইয়া তামাক সাজিতে বসিল।

বড় বউ ডাকিল, মানু আয় খেয়ে নিবি।

 

বড় বউয়ের দেখায় ভুল হয় নাই। রাত্রে সত্য সত্যই জল নামিল। গুরু গুরু শব্দে মেঘগৰ্জনে মহাতাপের ঘুম ভাঙিয়া গেল। সে ধড়মড় করিয়া উঠিয়া বসিল।

মানু তখন উঠিয়া পড়িয়াছে। সে ঘরের জানালা বন্ধ করিতে ব্যস্ত।

মহাতাপ সদ্য-ঘুম-ভাঙা চোখে বিহ্বলের মত চাহিয়া বলিল, জল? মেঘ ডাকছে?

মানু বলিল, ছাটে সব ভিজে গেল।

মহাতাপ বলিল, যাক যাক। বন্ধ করিস না মানু, বন্ধ করি না।

–বন্ধ করব না?

–না। আহা-হ্যাঁ, কেমন জল নেমেছে দেখ দেখি!

উঠিয়া গিয়া মানুর হাত ধরিল। বলিল, বোস এইখানে। বসে বসে জল দেখি।

মানু ঠোঁট বাঁকাইয়া বলিল, জল দেখব?

–হ্যাঁ। আমার কোলে মাথা রেখে শো। আমি জল দেখি আর তোকে দেখি। হঠাৎ এই বর্ষার আমেজে তাহার আবেগ উথলিয়া উঠিল। সে দুই হাতে মানুর মুখখানি ধরিয়া বলিল, পাগলি পাগলি পাগলি! তোকে আমি খুব ভালবাসি।

–ছাই বাস। দিনরাত মারব, মারব আর অকথা কুকথা!

–আরে! সে কথা তোকে না মানু, তোকে না। তোর ক্যাঁটকেঁটে কথাকে–

–হুঁ। বড় মোল্যানের কথাগুলা তো মিষ্টি লাগে! তার বেলা?

আরে বাপ রে! দুই হাত জোড় করিয়া কপালে ঠেকাইয়া মহাতাপ বলিল, আরে বাপ রে, বড়কী বহু, উ তো ঘরকে লছমী হ্যায়।

মহাতাপ মানদাকে সজোরে বুকে চাপিয়া যেন পিষিয়া ফেলিল।

ওদিকে চাঁপাডাঙার বউয়ের ঘরে চাঁপাডাঙার বউ আপন ঘরের জানালায় একা বসিয়া বাহিরের বর্ষণের দিকে চাহিয়া রহিয়াছে।

সেতাব মুড়িসুড়ি দিয়া ঘুমাইতেছে। দুর্বলদেহ সেতাবের অল্পেই শীত লাগে। গ্রীষ্মকালেও সে একখানা চাদর পায়ের তলায় রাখিয়া তবে ঘুমায়। চাঁপাডাঙার বউ স্বামীর জড়োসড়ো ভাব দেখিয়া একটু হাসিয়া চাদরখানা তাহার গায়ে চাপাইয়া দিল। ও ঘরে মানিক কাঁদিয়া উঠিল। চাঁপাডাঙার বউ একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিল।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ: দেখিতে দেখিতে বৰ্ষা নামিয়া পড়িল

দেখিতে দেখিতে বৰ্ষা নামিয়া পড়িল। জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষেই। কি যে হইয়াছে দিন-কালের সে কথা কৃষিজীবী সাধারণ মানুষগুলি বুঝিতে পারিতেছে না। চিরকালের প্রবাদখনার বচন চৈতে মথর মথর, বৈশাখে ঝড়পাথর, জ্যৈষ্ঠ মাটি ফাটে—তবে জেনো বর্ষা বটে। অর্থাৎ চৈত্রে আধা শীত আধা গরম, বৈশাখে কালবৈশাখী, জ্যৈষ্ঠে প্রখর গ্রীষ্ম—এই হইলে জানিবে সুবর্ষা অবশ্যম্ভাবী। আর এ ফাল্গুনের শেষ হইতেই গরম উঠিতেছে; চৈত্রে বৈশাখে মারাত্মক রৌদ্র, কালবৈশাখী নাই! কদাচিৎ এক-আধ পসলা বর্ষা ঝড়; শিলাবৃষ্টি তো নাই। তারপর জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষে হঠাৎ বর্ষার মেঘ গুরু গুরু ডাকিয়া চলিয়া আসিতেছে। চাষীদের বীজ পাড়া হইতেছে না। বর্ষা তাহাদিগকে বেকুব করিয়া দিয়া বিদ্যুতের মৃদু মৃদু চমকে যেন সকৌতুকে হাসিয়া তামাশা করিতেছে। মহাতাপ বর্ষার মেঘকে নিত্য গালি পাড়ে। সে বিপুল বিক্ৰমে মাঠে ঝাঁপাইয়া পড়িয়াছে। শুকনা ধুলার বাতে বীজ পাড়া হইয়াছে সামান্য। বাকি বীজ আছাড়া করিয়া ফেলিতে হইবে। দশ দিনের মধ্যে সে কাজ শেষ করিয়া মহাতাপ জমিতে জল বাঁধিয়া লাঙল চালাইতে লাগিয়াছে। সেতাবও এখন মাঠে। সে কখনও খানিকটা কোদাল চালায়। কখনও এক-আধবার লাঙলের মুঠা ধরে। আলের উপর বসিয়া তামাক সাজে, নিজে খায়। মহাতাপকে ডাকিয়া হাতে হুঁকা দিয়া তাহার লাঙলটা গিয়া ধরে।

মহাতাপ বলে—ক্ষ্যাপামি কোরো না। মোষের লেজের বাড়িতে তুমি পড়ে যাবে। মহাতাপ দুইটি বিপুলকায় মহিষ লইয়া লাঙল চালায়।

নোটন কৃষাণ মুখ টিপিয়া হাসে। মিথ্যা বলে নাই ছোট মনিব। বড় মনিব তাহার তালপাতার সেপাই।

সেদিন আষাঢ়ের পনেরোই। গত দুই-তিন দিন মুষলধারে বৃষ্টি নামিয়াছিল। মাঠ-ঘাট প্রায় ভাসিয়া গিয়াছে। সকালবেলাটাও ঘনঘটা হইয়া রহিয়াছে। টিপিটিপি বৃষ্টি পড়িতেছে। চাঁপাডাঙার বউ দাওয়ার উপর আঁচল বিছাইয়া শুইয়া অলস দৃষ্টিতে মেঘাচ্ছন্ন আকাশের দিকে চাহিয়া রহিয়াছে। মানিক একটা বাটিতে মুড়ি খাইতেছে।

মানদা ভিজিতে ভিজিতে এক পাজা বাসন লইয়া বাড়িতে ঢুকিল। দুম করিয়া দাওয়ার উপরে রাখিয়া দিয়া আবার প্রায় ছুটিয়া বাহির হইয়া যাইবার উদ্যোগ করিল।

চাঁপাডাঙার বউ বলিল, মানু–

—আসছি।

–যাচ্ছিস কোথা নাচতে নাচতে?

–মাছ।

—মাছ!

–মাছ উঠেছে পুকুর থেকে! ঘোট ঘোট পোনা।

–পোনা বেরিয়ে যাচ্ছে? গোবিন্দকে পুকুরের মুখে বার দিতে বল্‌।

–তুমি বল। আমি মাছ ধরে নিয়ে আসি। শো-শো করে নালার জলে ছুটছে সারবন্দি। সে বাহির হইয়া গেল।

মানিক দাঁড়াইয়া উঠিল—আমি যাব। সে তাহার সাধের বাঁশিটা লইয়া একবার বাজাইয়া দিল–পু!

বড় বউ তাহাকে কোলে লইয়া মাথায় মাথাল দিয়া উঠানে নামিল। নহিলে যে দুরন্ত ছেলে জলে ভিজিয়া নাচিয়া-কুঁদিয়া একাকার করিবে। মহাতাপের ছেলে তো! খামারবাড়িতে আসিয়া ডাকিল, গোবিন্দ! গোবিন্দ।

মানিক বাঁশি বাজাইল—পু-পু। খামারে গোবিন্দ নাই। নিশ্চয় বর্ষার আরামে গোয়ালের দাওয়ায় খড়ের গাদা বিছাইয়া শুইয়া ঘুম দিতেছে। ঘোড়াটা ইদানীং বড় কাজে ফাঁকি দিতেছে। কোনোদিন সন্ধ্যার সময় থাকে না। সন্ধ্যার আগেই গরু গোয়ালে ঢুকাইয়া পালায়। তাও দুটাএকটা বাছুর বাহিরে ফেলিয়া যায়।

সে গোয়াল-বাড়িতে আসিয়া ঢুকিল।

গোবিন্দ ঘুমায় নাই। সে গরুর চালায় দাঁড়াইয়া কোমরে হাত দিয়া নাচ প্র্যাকটিস করিতেছিল। সে ইহারই মধ্যে ঘোতনের যাত্রার দলে ভর্তি হইয়াছে। আপন মনেই সে–এক দুই তিন, এক দুই তিন চার গনিয়া গনিয়া নাচিতেছিল।

চাঁপাডাঙার বউ ডাকিল, গোবিন্দ!

তালভঙ্গের অপরাধে অপরাধীর মত গোবিন্দ দাঁড়াইয়া গেল।

চাঁপাডাঙার বউ বলিল, ও কি হচ্ছে? অ্যাঁ?

গোবিন্দ জিভ কাটিয়া মাথা হেঁট করিল। মানিক বাঁশিটা বাজাইয়া দিল–পু।

—বলি ক্ষেপলি নাকি? নাচছিস

« <
/ 31
> »