চাঁপাডাঙার বউ

« <
/ 31
> »

চোখের সম্মুখেও ভাসিতেছে। সে যে তাহার সাক্ষী। মায়ের মৃত্যুকালে মা যখন কথাগুলি বলে তখন সেও যে দাঁড়াইয়া ছিল সেখানে।

একটা গাছের তলায় দা হাতে সেতার দাঁড়াইয়া কথাগুলি শুনিতেছিল; থরথর করিয়া সে কাঁপিয়া উঠিল। মনে পড়িল সবশেষে মা তাহাকে ডাকিয়া বলিয়াছিল—তুমি আমার বটবৃক্ষ। ঝড় বাজ অনেক সহ্য করে পোড়ড়া মণ্ডলবাড়িকে খাড়া করেছ। তোমার হায়ার তলায় এই দুটিকে দিয়ে গেলাম। মহাতাপ পাগলাটে, তাকে বউমা দেখবে। তুমি বড় বউমাকে দেখো। সাক্ষাৎ লক্ষ্মী আমার। ওর পয়েই সব। ওর অপমান কোরো না কখনও। ও আমার বড় অভিমানী।

এই নিশীথে গাছের ছায়ার মধ্যে সেই ছবি যেন স্পষ্ট ভাসিয়া উঠিল।

ওদিকে আকাশে শনশন করিয়া মেঘ উঠিতেছিল, কখন মেঘ জমিয়াছে—পাক খাইয়াছে; গুমট ধরিয়াছে তাহার পর মৃদু বাতাস উঠিয়াছে, মৃদু বাতাস প্রবল হইয়া উঠিয়াছে। মেঘ ধাবমান হইয়াছে—আকাশ ঢাকিয়া অসীম বিস্তারে প্রসারিত হইতেছে। মেঘে মেঘে সংঘর্ষ বাঁধিয়াছে। বিদ্যুৎ চমকাইয়া একটা মেঘগর্জন ধ্বনিত হইয়া উঠিল। গম্ভীর গুরু গুরু দীর্ঘায়িত মনোহর মেঘধ্বনি।

মহাতাপ বড় বউকে বলিল, তুমি তাই মর মা; মা-ই বলছি আজ। তুমি মর আমিও চলে যাচ্ছি—এই পথেই যাব। একেবারে গঙ্গাসাগর।

বড় বউ বলিল, মহাতাপ! না। সে কোরো না ভাই!

—না নয়! আমি ঠিক করে রেখেছি। তুমিই কি কম দুঃখ দিলে আমাকে? আমাকে নিয়ে তো ছেলের সাধ মেটে নাই তোমার! কত কবচ পরলে, কত উপোস করলে! গঙ্গাসাগরে ড়ুবে মরব আমি। যেন আসছে জন্মে তোমার কোলেই জন্যই আমি।

বড় বউ চিৎকার করিয়া উঠিল, আমার মাদুলি আমি ছিঁড়ে জলে ফেলে দিয়েছি।

একবারে বাধাবন্ধনহীন চিৎকারওই মেঘের ডাকের মত।

সঙ্গে সঙ্গে কোথা হইতে শিশুকণ্ঠের স্বর ধ্বনিত হইল–ব-মা! ব-মা!

বড় বউ চকিত হইয়া বলিয়া উঠিল—মানিক!

ওদিকে একটা গাছের ছায়ার তলা হইতে মানদা চিৎকার করিয়া উঠিল, মানিক!

মানিককে যে সে ঘরে একলা রাখিয়া আসিয়াছে! বাড়ির দরজাগুলা যে খোলা হাট হইয়াছে! মানিক!—বড় বউ উঠিতে লাগিল। কিন্তু পায়ের বাঁধনের জন্য পারিল না, পড়িয়া গেল। সে বলিল, মহাতাপ, মানিককে দেখ। মহাতাপ! আঃ, আমার পায়ের বাঁধনটা, আঃ!

দা হাতে গাছতলা হইতে ছুটিয়া বাহির হইয়া আসিল সেতাব।

মহাতাপ চিৎকার করিয়া উঠিল, না—না—

সেতাব বলিল, তোর পায়ে পড়ি। মহাতাপ। তোর পায়ে পড়ি। কেলেঙ্কারি বাড়াস নে। যা মানিককে দেখ! ওরে ছোট বউমা আমারই মত বাগানে এসে দাঁড়িয়ে ছিল। মানিক একলা ছিল। দেখ। আমি ওর পায়ের বাঁধন কেটে নিয়ে যাচ্ছি। যা।

সে বড় বউয়ের পায়ের বাঁধন কাটিয়া দিতে বসিল। বলিল, ছি-ছি-ছি!

ওদিকে বাড়ির ভিতর হইতে মানদার কণ্ঠস্বর ভাসিয়া আসিল–মানিক! মানিক!

একা মানিক ঘরে শুইয়া ছিল। বিদ্যুতের আলোয় মেঘের ডাকে তাহার ঘুম ভাঙিয়া গিয়াছিল। সে মাকে ঘরে পায় নাই। বাহিরে আসিয়াও কাহাকেও পায় নাই। দরজা খোলা হাট। অল্প ছিলকে মেঘ অবশ্য আকাশময়ই কুয়াশার মত দাগিয়া উঠিয়াছে। তাহাতে জ্যোত্সা ঢাকা পড়ে নাই, ম্লানও ঠিক হয় নাই, একটু রহস্যালোকের চেহারা পাইয়াছে। সে সেই আশোয় খোলা দরজার বাহির হইয়া পড়িয়াছে। হঠাৎ বড় বউয়ের উচ্চকণ্ঠের মহাতাপ ডাকের মধ্যে বড়মায়ের সাড়া পাইয়া বড়মা বলিয়া ডাক দিয়া পথে বাহির হইয়া পড়িয়াছে। কোথায় বড়মা! সকলেই তাহাকে ফেলিয়া গিয়াছে।

মানদা ঘরে ছুটিয়া আসিয়া ডাকিল, মানিক!

কিন্তু কই মানিক?

সে দিশাহারা হইয়া ওই বাগানের খিড়কির পথেই বাহির হইয়া ডাকিল, মানিক!

মহাতাপ ছুটিয়া আসিল—কই—মান্‌কে?

—জানি না-মানদা কাতরভাবে স্বামীর দিকে চাহিল।

মহাতাপ দাঁতে দাঁতে ঘষিয়া বলিল, কথা শুনতে গিয়েছিলে, ছেলেকে একা রেখে?

মানদা একবার ডাকিল, দিদি!

বাগানের ভিতর হইতে বড় বউ সাড়া দিল—মানু! মানিক!

–বাড়িতে নাই।–সে কাঁদিয়া উঠিল।

বড় বউ আসিয়া দাঁড়াইল। সে পাইতেছিল। তাহার পিছনে সেতাব। বড় বউ চিৎকার করিয়া ডাকিল-মানিক!

সেই মুহূর্তের ঘন কালো ঈশান কোণের মেঘে চাঁদ ঢাকিয়া দিল। সঙ্গে সঙ্গে আসিল বাতাস–একটা দমকা বাতাস। বাতাসের প্রথম ঝটকাটা চলিয়া গেল। তাহার পর সমান বেগ লইয়া ঠাণ্ডা বাতাস বহিতে লাগিল। সেই বাতাসের মধ্যে শোনা গেল একটা রঙিন বাঁশির ক্ষীণ আওয়াজ–পু পু!

বড় বউ বলিল, সদর রাস্তায়। ওই মানিকের বাঁশি।

সদর রাস্তাতেই বাহির হইয়াছিল মানিক। তাহার শিশুমনে চণ্ডীমণ্ডপে পূজাসমারোহের স্মৃতি। ধারণা জন্মিয়াছিল, তাহাকে ঘুম পাড়াইয়া রাখিয়া সকলে পূজা দেখিতে গিয়াছে। সেই পথেই তাহার বাঁশিটি বাজাইতে বাজাইতে চলিয়াছিল—পু-পু-পু-পু!

অকস্মাৎ জ্যোৎস্না মেঘে ঢাকিয়া অন্ধকার হইয় গেল।

মানিক ছুটিতে শুরু করিল।

সেও শুনিতে পাইতেছে বড়মা ডাকিতেছে, বাবা ডাকিতেছে, জ্যাঠা ডাকিতেছে, মা। ডাকিতেছে মানিক! মানিক! মানিক! মানিক!

চণ্ডীমণ্ডপ হইতেই তাহারা ডাকিতেছে তাহাতে তাহার সন্দেহ নাই। সে ছুটিতে ছুটিতে পথের বাঁকে দাঁড়ায়, রাস্তাটা চিনিয়া লয়, আবার চলিতে শুরু করে, একবার দুইবার হাতের বাঁশিটা বাজাইয়া লয়।

চণ্ডীমণ্ডপের প্রান্তে সে আসিয়া উপস্থিত হইল।

চণ্ডীমণ্ডপে তখন বড় বউ মাথা ঠুকিতেছে।–আমার মানিককে ফিরে দাও। আমার মানিককে ফিরে দাও।

মানিক উল্লাসের সঙ্গে বাঁশিতে ফুঁ দিয়া চণ্ডীমণ্ডপে বড় মায়ের কাছে দাঁড়াইল।

ওদিকে ঝুমঝম করিয়া বৃষ্টি নামিয়া আসিল।

 

পরদিন সূর্য উঠিলেন মনোহররূপে।

বর্ষণসিক্ত রাত্রির শেষে কাটাকাটা মেঘের ফাঁকে উঁকিঝুঁকি মারিয়া পূর্বাকাশ লালে লাল করিয়া পশ্চিম আকাশে রামধনু ঝাঁকিয়া পৃথিবীকে বরবর্ণিনীর মত সাজাইয়া দিয়া দিনের ঠাকুর হাসিতে হাসিতে আবির্ভূত হইলেন।

মণ্ডলবাড়ির সামনে তখন মণিলাল বিদায় লইতেছে।

যে টোপর-দেওয়া গাড়িখানায় বড় বউয়ের যাইবার কথা, সেই গাড়িখানাতেই মণিলাল একা বাড়ি ফিরিতেছিল।

সেতাব তামাক খাইতেছিল। মণিলাল হাসিয়া বলিল, মাকে কি বলব? শুধাবে তো কি হল? কাদু এল না ক্যানে?

সেতাব বলিল, বলবে! একটু ভাবিয়া লইয়া বলিল, তেনার জামাইকে ভূতে পেয়েছিল। আর কি বলবে? ভূত ছেড়ে গেল। পাঠালে না।

বড় বউ বাড়ির ভিতর হইতে মানিককে কোলে করিয়া আসিয়া বলিল, যাব রে যাব। বলবি মাকে, এই কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর পরই যাব; আমি, তোর জামাইদাদা দুজনাতেই যাব। লসম্বন্ধ করতে যাব। তোর বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে যাব। বলবি, কনে খুব ভাল। বেশ ডাগর। মায়ের সইয়ের মেয়ে। পুঁটি! তোর জামাইদাদা তো পাগল—

সেতাব বলিল, এই দেখ! এই দেখ! রাধে-রাধে-রাধে! কি যে বল!

বড় বউ হাসিতে লাগিল।

ঠিক এই সময়ে মহাতাপ আসিয়া হাজির হইল। তাহার সর্বাঙ্গে কাদা। মাথায় ব্যান্ডেজ ভিজা, চুল ভিজা, কাঁধে কোদাল। সে ইহার মধ্যে কখন মাঠে গিয়াছিল। সে নিজে মাঠের আল ভাঙিয়া দিয়াছিল; সেই কথা মনে পড়িয়া সে স্থির থাকিতে পারে নাই।

কৰ্কটে ছরকট, সিংহে শুকা, কন্যা কানে কান,
বিনা বায়ে তুলায় বর্ষে কোথা রাখিবি ধান।

কৰ্কট অর্থাৎ শ্রাবণে জলে জল ছরকট করিয়া দিলে, সিংহ অর্থাৎ ভাদে শুকা–রৌদ্র হইলে, কন্যা অর্থাৎ আশ্বিনে আল ভরিয়া কানায় কানায় জল থাকিলে ও তুলা অর্থাৎ কার্তিকে বিনা বাতাসে বর্ষণ হইলে ধান রাখিবার জায়গা কুলায় না খামারে। আশ্বিনে জমির আল কাটা থাকিলে চলে?

ওই খনার বচনটাই চাষীরা এমন দিনে গানের সুরে গাহিয়া বলে—

কৰ্কট ছরকট, সিংহে শুকা, কন্যা কানে কান,
বিনা বায়ে তুলা বর্ষে কোথায় রাখবি ধান,
বউ কনে যতন করে নিকাও অঙনখান।

 

« <
/ 31
> »