চাঁপাডাঙার বউ

« <
/ 31
> »

শুনিয়ে নেয় নিশ্চয়।

–না। নেয় না। সেই তো! মা বললে কিসে যে সেতাবকে ও বশ করলে ভগবান জানেন। কাল দুশো টাকা দিয়ে এক জোড়া ফারফোরের অনন্ত বাধা রেখেছে। তার ভেতরে নাকি দুটো লোহার সরু সিক ভরা আছে। মা নিজের কানে শুনেছে। সে গয়না না ভাঙলে ধরা যাবে না।

চাঁপাডাঙার বউ বলিলবলব আমি তাকে। সে আসুক।

পুঁটি বলিল, আমার নাম কোরো না দিদি। দোহাই তোমার! তা হলে দাদা আমাকে–

–তোকে মারে নাকি পুঁটি?

পুঁটি হাসিল, বলিল, ও কথা ছেড়ে দাও। আর একটা কথা বলি–

চাঁপাডাঙার বউ সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে পুঁটির মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। পুঁটি বলিল—যা করে হোক তোমার স্বামীকে ওর সঙ্গ ছাড়াও। নইলে তোমাদের ঘর থাকবে না। ভেঙে দেবে। নিশ্চয়ই ভেঙে দেবে। বড় মোড়ল আমাদের বাড়ি যায়, গুজগুজ করে দাদার সঙ্গে। আমার ভাল লাগে না। হয় তোমার নিন্দে, নয় ছোট মোড়লের নিন্দে! বড় মোড়ল মধ্যে মধ্যে বলে, ইচ্ছে। হয় কি জান ঘেঁ,তন—ঘর ছেড়ে বিবাগী হয়ে যাই, নয়ত আগুন লাগিয়ে দিই ঘরে। তোমার স্বামী আর সে মানুষ নাই দিদি। তুমি সাবধান হও।

বড় বউ বিস্ফারিত নেত্ৰে সম্মুখের শরৎকালের গাঢ় নীল মধ্যাহ্ন আকাশের দিকে চাহিয়া রহিল। সেখানে ছোটবড় হালকা মেঘের পুঞ্জগুলি ভাসিয়া মন্থরগতিতে যাইতেছিল। পুঞ্জ পুঞ্জ হালকা দুধের মত রঙের নব লক্ষ গাভীর পাল। আকাশগঙ্গার অসীম-বিস্তার কোমল নীল তটভূমিতে স্বচ্ছন্দ চারণে মন্থরগতিতে ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। রৌদ্রে উজ্জ্বলতর হইয়া উঠিয়াছে। হঠাৎ দুই-একটার গায়ে একেবারে মাঝখানে হয়ত ঈষৎ কালো রঙের আমেজ। যেন দধিমুখী ধবলী গাইটার পিঠে টুকরাখানেক কালো রঙের বিচিত্র সমাবেশের মত। ছোট ছোট টুকরাগুলা যেন লাকী বাছুর, বড় মেঘের টুকরার চেয়ে ওইগুলা ছুটিতেছে দ্রুততর বেগে। প্রাণের আবেগে পিঠে লেজ তুলিয়া আকাশের অঙ্গনময় দাপাদাপি করিয়া ফিরিতেছে।

বাইরে একটা গাই ডাকিয়া উঠিল।

সেই ডাকে বউয়ের চমক ভাঙিল। পুঁটি তাহার মুখের দিকে তাকাইয়া ছিল। গরবিনী চাঁপাডাঙার বউয়ের নিজের মনে হইল—সে এক মুহূর্তে যেন কত গরিব হইয়া গিয়াছে। পুঁটি তাহার সে মুখের দিকে চাহিয়া থাকিতে পারি না, তাড়াতাড়ি বলিল—আমি যাই, দিদি।

সে ঘর হইতে বাহির হইয়া যাইতেছিল। চাঁপাডাঙার বউ তাড়াতাড়ি আসিয়া তাহার হাত চাপিয়া ধরিয়া বলিল, পুঁটি!

পুঁটি তাহার দিকে সবিস্ময়ে তাকাইয়া বলিল—কি? চাঁপাডাঙার বউয়ের দৃষ্টি যেন কেমন! ভদ্রের ভরা দিঘির মত তাহার চেহারা। কূলে কূলে ভরা অথৈ জলতল হইতে যেন কোন একটা জলচারী নড়িয়া উঠিতেছে। সে নড়ার উপরটায় কাপন জাগিয়াছে।

চাঁপাডাঙার বউ বলিল—অত্যন্ত চাপা স্বরে, আমার স্বামী আর সে মানুষ নাই? আমার নিন্দে করে? কি নিন্দে করে পুঁটি? আমি কি করেছি? কি বলে?

পুঁটি তাহার মুখের দিকে তাকাইয়া ছিল, সে ভয় পাইয়া গিয়াছিল; সভয়ে হাত টানিয়া লইয়া সে ঘাড় নাড়িয়া বলিল, জানি না চাঁপাডাঙার দিদি, আমি জানি না।

সে একরকম ছুটিয়াই পলাইল। যাইতে যাইতে থমকিয়া দাঁড়াইয়া কাতর কণ্ঠে বলিল, গুজগুজ করে কথা বলে দিদি। শুনতে পাই না। শুনতে পাই না। কিন্তু অনেক কথা অনেক কথা।

সপ্তম পরিচ্ছেদ: পূজা আসিয়া পড়িয়াছে

ইহার পর প্রায় এক মাসের উপর চলিয়া গিয়াছে। পূজা আসিয়া পড়িয়াছে। ষষ্ঠীর দিন। চণ্ডীমণ্ডপে যথানিয়মে ঢাকের সঙ্গে ঢোল সানাই কঁসি আসিয়া পূজার সুর জমাইয়া তুলিয়াছে। দেশে অন্নের অভাব, কাপড়চোপড় দুমূল্য, এসব সত্ত্বেও পূজার সুর একেবারে কাটিয়া যায় নাই। আগেকার কালে এর সুর একটা দেশব্যাপী ঐকতানের ঝঙ্কার তুলিত, গ্রাম হইতে গ্রামান্তরে পৌঁছিয়া সে গ্রামের বাজনার সঙ্গে সুর মিলাইত। আজ সুর ওঠে, কিন্তু সে সুর ঐকতান তুলিতে পারে না; গ্রামের প্রান্তদেশ পর্যন্ত গিয়া গ্রামান্তরের মধ্যবর্তী মাঠের সীমানার মুখেই এলাইয়া পড়ে। সেদিন বেলা তখন প্রহরখানেক, নবগ্রামের বাজারে কাপড় কিনিতে গিয়াছিল সেতাব। কেনাকাটা শেষ করিয়া ফিরিবার পথে ঘোঁতনের দলিজায় উঠিল। পুঁটি সত্য সংবাদই দিয়াছিল; ঘোঁতনের সঙ্গে সেতাবের এখন খুব মাখামাখি। নবগ্রামের মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক শ্রেণীর অর্থাভাব ক্রমশই দারুণ হইতে নিদারুণ হইয়া উঠিয়াছে। সকলের আগে এ অবস্থায় তাহারা গহনা বন্ধক দিয়া অর্থ সংগ্রহ করে। প্রাণ ধরিয়া বিক্রয় করতে পারে না। ঘোত। এই কারবারটায় সেতাবকে ঢুকাইয়া দিতে সাহায্য করিতেছে।

ঘোঁতন বসিয়া বিড়ি টানিতেছিল। কোথায় পূজামণ্ডপে সানাই বাজিতেছে। দাওয়ার পাশেই একটা শিউলিগাছের তলায় শিউলি ঝরিয়া পড়িতেছে।

সেতাব আসিয়া দাওয়ায় উঠিতেই সে সমাদরের সহিত অভ্যর্থনা করিয়া তাহাকে বসাইল। বিড়ি দিল। সেতাবের বগলে একটি বান্ডিল, হাতে একটি পোটলা। বিনা ভূমিকাতেই সে ঘোঁতনের হাতে দিয়া বলিল, দেখ দিকি, ছেলেগুলার গায়ে হয় কি না।

পোটলা খুলিয়া ঘোঁতন দেখিল, কয়েকটা ফ্ৰক জামা, দুইখানা শাড়ি, একখানা ধুতি, একখানা থান কাপড়, দুইটা ব্লাউজ ও একটা শার্ট। ঘোঁতন বুঝিল, এগুলি তাহার জন্যই লইয়া আসিয়াছে। সে দন্ত বিস্তার করিয়া বলিল, দাঁড়াও, দিয়ে আসি বাড়িতে, বুঝলে।

পোঁটলাটা লইয়া সে ভিতরে চলিয়া গেল।

সেতাবের উবু হইয়া বসা অভ্যাস। সে হাঁটুর উপর কনুই রাখিয়া মাথায় এক হাত দিয়া অন্য হাতে বিড়ি টানিতে লাগিল।

পথের উপর দিয়া কয়েকটা গরু লইয়া একটা রাখাল চলিয়া গেল। তাহার পিছনে বহুবল্লভ বাউল একতারা এবং কোমরে গামছা বাঁধিয়া টুটুং শব্দ তুলিতে তুলিতে যাইতেছিল। বহুবল্লভ সেতাবকে দেখিয়া বলিল, বড় মোড়ল এখানে বসে?

সেতাব বলিল, বলি তার কৈফিয়ত তোকে দিতে হবে নাকি?

বহু বলিল, কাপড় কিনতে এসেছিলে?

সেতাব বিড়িতে টান দিয়া ধোঁয়া ছাড়িতে ছাড়িতে বলিল, উঁহুঁ, আকাশের তারা গুনতে এসেছিলাম।

বহু বৈষ্ণব মানুষ, রাগ তাহার নাই; সে হা-হা করিয়া হাসিয়া বলিল, দিনের বেলায়?

সেতাব বলিল, রেতের বেলা পথে সাপ-খোপ শেয়াল কুকুর; রেতের বেলা নিজের বাড়িতে তারা গুনি। নবগেরামের আকাশের তারা দিনে গুনতে আসাই ভাল!

—তা দিনে তারা দেখবার সময় তোমাদের বটে! যা ধান জমেছে তোমাদের! আঃ, যেমন কালো কষকষে রঙ, তেমনি গোছ! তা মহাতাপ একটা মরদ বটে! ক্ষ্যামতা ধরে বটে।

সেতাব তাহার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। তাহার পর ফতুয়ার পকেট হইতে একটা পয়সা বাহির করিয়া ফেলিয়া দিয়া বলিল, যা যেখানে যাবি চলে যা। বকর বকর করে কানের পোকা মারিস না আমার। মেজাজ খারাপ করে দিস না।

–হরিব-ল–হরিব-ল!—বলিয়া পয়সাটি কুড়াইয়া কপালে ঠেকাইয়া আকাশের দিকে চাহিয়া বলিল, তা মেজাজ খারাপ হবার কথা বটে! আঃ, আকাশ খখা করছে। মেঘের চিহ্ন নাই। তোমার উ মাঠে এখনও ক্যানেল আসে নাই। জল না হলে এমন বাহারের ধান সব মরে যাবে। আঃ! একটু চুপ করিয়া থাকিয়া আবার বলিল, তা ভেবো না, জল হবে। এই পুজোতেই হবে জল।

–না, হবে না।

বহু চমকাইয়া উঠিল কথার সুর শুনিয়া।

সেতাব আবার বলিল, একেবারে শুকিয়ে খড় হয়ে যাবে। জ্বলে যাবে।

বহু বলিল, না না না। হবে। ভগবান তা করবেন না। না না। দেবেন দেবেন। মা ভগবতী আসছে–ভোগ খাবেন, মুখ ধোবেন না, এই হয়? হে মা, জল দাও। জল দিয়ে সৃষ্টি রাখ মা।

সেতাব বিরক্ত হইয়া উঠিয়া দাওয়ার উপর ঘরের দরজার মুখে গিয়া ডাকিল, ঘোঁতন! ও ঘোঁতন!

বহু আর দাঁড়াইল না, সে চলিয়া গেল।

ঘোঁতন তাড়াতাড়ি বাহির হইয়া আসিল। সে ইহার মধ্যে নতুন জামাটা পরিয়া ফেলিয়াছে। হাসিয়া বলিল, দেরি হয়ে গেল। চা করতে বললাম। দুধ নাই ঘরে, পুঁটি গেল দুধ আনতে।

—জামাগুলো গায়ে হল ছেলেগুলার?

–হয়েছে। তোমার চোখ আছে হে!

–তা বউয়ের, পুঁটির কাপড় পছন্দ হয়েছে?

—বউয়ের হয়েছে, পুঁটির কথা জানি না। ঝাঁটাখাগী আবার কথা বলে না। ওই এক রকম। বড় বজ্জাত হে।

—না না। বড় কাজের মেয়ে। ভাল মেয়ে।

–বউ কিন্তু হাসছিল।

–ক্যানে, হাসির কথাটা কি এর মধ্যে?

—সেই চাঁপাডাঙার বউয়ের সঙ্গে আমার ছেলেবেলায় বিয়ের সম্বন্ধ হয়েছিল, সেই নিয়ে ঠাট্টা করছিল। সতীনের আড়ি প্রেম হল শেষে!

সেতাব একটু হাসিল, তারপর সহসা গম্ভীর হইয়া বলিল, তুই ভাগ্যিবান ঘোঁতন। তোর ভাগ্যি ভাল। অনেক ভাগ্যি তোর।

তারপর একটু চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল, ওই ওর সঙ্গে তার বিয়ে হয় নি ঘোঁতন, তুই বেঁচে গিয়েছিস।

ঠিক এই সময় ঘোঁতনের মা বাহির হইয়া আসিয়া বলিল, ধনে পুত্ৰে তোমার লক্ষ্মীলাভ হোক বাবা, কিন্তু এত টাকার জিনিস তুমি না দিলেই

« <
/ 31
> »