- প্রথম পরিচ্ছেদ: দেবগ্রামের পথে
- দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: মহাতাপ কথাটা মিথ্যা বলে নাই
- তৃতীয় পরিচ্ছেদ: দিন কয়েক পরের কথা
- চতুর্থ পরিচ্ছেদ: দেখিতে দেখিতে বৰ্ষা নামিয়া পড়িল
- পঞ্চম পরিচ্ছেদ: ভাদ্র মাস পড়িয়া গিয়াছে
- ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ: ভাদ্র শেষ হইয়া গিয়াছে
- সপ্তম পরিচ্ছেদ: পূজা আসিয়া পড়িয়াছে
- অষ্টম পরিচ্ছেদ: পরদিন সপ্তমীর সকাল
- নবম পরিচ্ছেদ: নবমীর রাত্রিকাল
জায়ের উপর। ওই তাহার অদৃষ্টকে ওই মহাতাপের মত পাগলের অদৃষ্টের সহিত জড়াইয়া দিয়াছে। গরিবের মেয়ে সে। সেই দারিদ্রের সুযোগ লইয়া তাহার পিতৃকুলের জ্ঞাতিকন্যা হিসাবে হিতৈষিণী সাজিয়া সচ্ছল অবস্থার লোভ দেখাইয়া মহাতাপের সঙ্গে বিয়ের সম্বন্ধে তাহার পকে রাজি করাইয়াছিল। প্রথম প্রথম বড় বউয়ের স্নেহ যত্ন, মহাতাপের সঙ্গে তাহার অন্তরঙ্গতা মানদার ভালই লাগিত। ক্রমে ক্রমে চোখ খুলিয়া সে আজ দিব্য দৃষ্টি পাইয়াছে। বুকের ভিতর তাহার আগুন জ্বলিয়াছে। সেই আগুন চোখের দৃষ্টির মধ্য দিয়া বাহির হইয়া সব কিছুকে জ্বালাইয়া পুড়াইয়া খাক করিয়া দিতে চাহিতেছে! আজ এই দুর্গাষষ্ঠীর দিন তাহার নাড়-ছেঁড়া ধন, একটি সন্তান তাহার, তাহাকে মহাতাপ দান করিয়া দিল ওই বন্ধ্যা নারীকে! বন্ধ্যা নারীর দৃষ্টি-আকাঙ্ক্ষা বড় প্রবল, আকর্ষণ দুর্নিবার। ইহার জন্য যদি–
সে আর ভাবিতে পারিল না। ছুটিয়া গিয়া মানিককে জড়াইয়া ধরিয়া কাঁদিতে কাঁদতে অস্ফুটস্বরে বলিল, হে মা ষষ্ঠী! পাগল মানুষ মায়াবিনীর মায়ায় ভুলে বলেছে—দান করলাম ছেলে। আমি বলি নাই মা, আমি বলি নাই! হে মা! রক্ষা করো তুমি।
সে ছেলেকে বুকে জড়াইয়া ধরিয়া বালিশে মুখ গুঁজিল।
আপন ঘরে সেতাব উত্তেজিত মনে অন্ধকারের মধ্যে চালের কাঠের দিকে চাহিয়া জাগিয়া ঘুমন্তের মত পড়িয়া ছিল। মনে মনে তাহার অনেক আলোড়ন, অনেক চিন্তা, অনেক কল্পনা।
বাহিরের পথে চৌকিদারের হক উঠিল। ও–ওই–
কয়েক মিনিট পর চৌকিদারটা বাড়ির দরজায় আসিয়া ডাকিল-বড় মোড়ল! বড় মোড়ল!
সেতাব হাঁকিল–হ্যাঁ, জেগেছি।
চৌকিদারটা বলিল, তোমাদের ছোট মোড়ল, ওই খিড়কির পুকুরের গাছের তলায় বসে কাঁদছে।
-কাঁদুক। তুই যা।
তবু সেতাব উঠিয়া বসিল।
কথাগুলা মানদাও শুনিয়াছিল। সেও উঠিয়া বসিল।
সিঁড়ি বাহিয়া নামিবার মুখেই শুনিল, একটা দরজা খুলিয়া গেল।
দরজা খুলিয়া সেতাব দাওয়ায় আসিয়া দেখিল, বাহিরের দরজাটা খোলা।
দরজা খুলিয়া বড় বউই বাহির হইয়াছে। কি করিবে সে? দুর্নিবার প্রাণের আকর্ষণ লঙ্ন করিতে সে পারিয়া ওঠে নাই। সেই গভীর রাত্রে একাকিনী নারী অন্ধকার পথ অতিক্রম করিয়া পুকুরের ধারের গাছতলাটিতে আসিয়া মহাতাপের হাত ধরিয়া টানিয়া বলিল, ওঠ।
মহাতাপ বলিল, না—না। আমাকে তোমার দরকার নাই! তোমার সব মিছে কথা।
–না–না। কোনো মিছে কথা নয়। মিছে নয়—নয়-নয়। হল তো? ওঠ এখন।
–আমাকে ধর। আমি নেশা করেছি। মদ খেয়েছি।
–শুনেছি। নোটন বলেছে আমাকে।
–আমাকে বকবে না?
-–তোমার দোষ কি? সবই আমার অদৃষ্ট। ওঠ, আমার কাঁধ ধরে ওঠ।
মহাতাপকে সে ধরিয়া তুলিল। মহাতাপ তাহার কাঁধে ভর দিয়া উঠিয়া দাঁড়াইয়া বলিল, জান, আমি বিবাগী হয়ে চলে যেতাম। কিন্তু ফিরে এলাম
বড় বউ অন্ধকারের মধ্যে একটু হাসিল।
পাগল বলিল, তোমার জন্যে ফিরে এলাম–
আর একপাশের অন্ধকার হইতে সেতাব বলিয়া উঠিল, তুমি আর আমার বাড়ি ঢুকো না, আমি বারণ করছি। ঠাঁই না থাকে তো গাছের ডালে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে মর।
বড় বউ থরথর করিয়া কাঁপিয়া উঠিল এবং পরমুহূর্তেই সংজ্ঞা হারাইয়া পড়িয়া গেল।
অষ্টম পরিচ্ছেদ: পরদিন সপ্তমীর সকাল
পরদিন সপ্তমীর সকাল।
সুখের রাত্রি সোনার নূপুর বাজাইয়া চঞ্চলা বিলাসিনীর মত অকস্মাৎ পোহাইয়া যায়। কেমন করিয়া কোন দিক দিয়া চলিয়া গেল বোঝা যায় না, ফুরাইয়া গেলে চমক ভাঙে। দুঃখের রাত্রিও। দাঁড়াইয়া থাকে না; বিষণ্ণ ক্লান্তি অসহনীয় হইয়া ওঠে, মনে হয় রাত্রির পার নাই, শেষ নাই; কিন্তু সেও এক সময় ফুরাইয়া যায়। রাত্রি শেষ হয়। সকাল হয়। মণ্ডলবাড়ির সেই দুঃখের ষষ্ঠীর রাত্রিও শেষ হইল। বড় বউ অচেতন হইয়া পড়িয়া গিয়াছিল। জ্ঞান হইয়াছে এই সকালবেলা। বাড়ি ঢুকো না এ কথা বলিয়াও সেতাব এই অবস্থায় তুলিয়া না আনিয়া পারে নাই। পথে পড়িয়া মরিতে দিবার মত অমানুষ সে নয়। অবশ্য পথে পড়িয়া মরিবার কথা নয়। মহাতাপ থাকিতে বড় বউ পথে পড়িয়া কখনও মরিবে না। মহাতাপকে সে কাদুকে তুলিয়া আনিতে দিবে না। কখনও না। একদিন সে বড় সাধ করিয়া ঘরে আনিয়া ছল। নিজেকে ভাগ্যবান ভাবিয়াছিল।
সকালবেলা চাঁপাডাঙার বউ চোখ মেলিয়া চাহিল।
মাথার শিয়রে সেতাব দাঁড়াইয়া ছিল, বসিয়া ছিল রাখাল ও বিপিন মণ্ডল। জ্ঞান হইতেছে না দেখিয়া রাখাল এবং বিপিনকে সেবই ডাকিয়া আনিয়াছে। রাখাল ভাল হাত দেখিতে পারে, বাজনায় যেমন তাহার দক্ষতা, নাড়িজ্ঞানও তাহার তেমনি সূক্ষ্ম। রাখাল তাহার হাতখানি দেখিতেছিল, চাঁপাডাঙার বউয়ের জ্ঞান হইতে দেখিয়া সে হাতখানি নামাইয়া দিল। বলিল–জ্ঞান হয়েছে, ভয় নাই। কি মা, চিনতে পারছ সব? মনে পড়ছে?
বড় বউ একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া মাথায় ঘোমটা টানিয়া দিল।
রাখাল বলিল—এই দেখ। তবে নাড়ি বড় দুর্বল। যেন কদিন খায়টায় নাই। বুয়েচ না? ভাল করে খেতে দাও। এক বাটি গরম দুধ করে দাও দেখি।
অবগুণ্ঠনের অন্তরাল হইতে বড় বউ মৃদুস্বরে বলিল—মোড়ল জ্যাঠার কাছে আমার একটা নিবেদন আছে।
—আমার কাছে? বিপিন মোড়ল এ কথা শুনিবার জন্য প্রস্তুত ছিল না।
–আপনার কাছেই। হ্যাঁ।
–বল মা বল! কি বলছ বল!
–আমাকে একখানি গাড়ি ডেকে আমার মায়ের কাছে পাঠিয়ে দেন।
–ক্যানে মা? এই পূজার দিন।
সেতাব আর আত্মসংবরণ করিতে পারিল না। সে বলিয়া উঠিল—যাবে যাবে, তার জন্যে মোড়ল জ্যাঠাকে ক্যানে? আমিই পাঠিয়ে দোব। হ্যাঁ, দোব। হবে। হবে।
বড় বউ সে কথা গ্ৰাহ্য করিল না। বলিল—আর আপনারা পাঁচজনে থেকে, ওই মহাতাপকে তার ভাগ বুঝিয়ে দেন। সে পাগল। বিষয়-আশয় হাতে পেলে হয়ত বুঝবে, ঘরে থাকবে, নইলে ও ঘরে থাকবে না। বিবাগী হয়ে যাবে।
সেতাব বলিল, হবে, তাও হবে। এই পুজোর ভেতরেই চুলচেরা করে ভাগ করে দেব। পঞ্চায়েত ডেকেছি।
বিপিন বলিল, আঃ সেতাব! ছিঃ, তুমিও কি পাগল হলে?
–হয়েছি। হয়েছি। আপনারা সব ভাগ করে দেন। নইলে গলায় দড়ি দিতে হবে আমাকে। বলিতে বলিতে ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল।
রাখাল ও বিপিন তাহার পিছনে পিছনে চলিয়া গেল।
দাওয়ার উপর তখন মহাতাপ টলিতে টলিতে উঠিয়া দাঁড়াইয়াছে। গত দিনের মাথার। আঘাতের ফলে এবং সারাদিন অনাচারের ফলে তাহার জ্বর হইয়াছে। এই দেহ লইয়াই কখন। বড় বউয়ের চেতনা হইবে—এই প্রত্যাশায় সে দাওয়ায় বসিয়া ছিল। সেখানে বসিয়াই ঘরের কথাগুলি সব শুনিয়াছে। ক্রুদ্ধ উৎসাহে উঠিয়া দাঁড়াইয়াছে।
সেতাব এবং বিপিন বাহির হইয়া আসিতেই সে বলিল হ্যাঁ, আমার বিষয় আমাকে বুঝিয়ে দাও! ভাগ করে দাও। ভাগ করে দাও।
সেতাব তাহার দিকে কঠোর দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিল। বিপিন সে দৃষ্টি দেখিয়া শঙ্কিত হইয়া সেতাবকে ডাকিল-সেতাব! বাবা!
সেতাব মহাতাপকে বলিল, দোব। সেতাব না থাকলে পেতাপ মোড়লের জমিজেরাত সব দেনার দায়ে নিলেম হয়ে যেত। ভিক্ষা করে খেতে হত। তা হোক। আমার কর্তব্য আমি করেছি। তোর ন্যায্য ভাগ তুই পাবি।
–ঘোঁতন ঘোষের সঙ্গে শলা করে কত টাকার গয়না বাধা নিয়েছ—সেসব হিসেব আমাকে দিতে হবে।
—সে টাকার একটা পয়সা পেতাপ মোড়লের বিষয়ের টাকা নয়। সে আমার পরিবারের গয়না বিক্রি করা টাকা। গায়ের পঞ্চায়েত জানে বিয়ের সময় পাঁচশো টাকার অলঙ্কার দিয়েছিল শ্বশুর। সে গয়না বেচে দেনা শোধ করেছি। তাকেই আমি বাড়িয়েছি। সে আমার বিয়ের যৌতুক। আমার নিজস্ব।
মহাতাপ বলিল, বড় বউ সে টাকা তোমাকে দেবে না।
—মহাতাপ!–চিৎকার করিয়া উঠিল সেতাব।—বড় বউয়ের নাম তুই মুখে আনিস না। তোকে আমি বারণ করছি। তোকে আমি বারণ করছি।
সে হনহন করিয়া বাড়ি হইতে বাহির হইয়া গেল। তাহার সঙ্গে বিপিন চলিয়া গেল। শুধু রাখাল হতভম্ব হইয়া দাঁড়াইয়া সব দেখিতেছিল।
মহাতাপ সেতাবের শেষ কথাটায় খানিকটা দমিয়া গিয়াছিল; কেন সে বড় বউয়ের নাম মুখে আনিবে না? কেন? হঠাৎ সেই প্রশ্নটা তুলিয়া সে উঠানে নামিল-ক্যানে? ক্যানে শুনি? ক্যানে আমি বড় বউয়ের নাম মুখে আনতে পাব না, শুনি?
ঘর হইতে বাহিরে আসিয়া মানদা তাহার হাত ধরিল না, যেতে পাবে না।
উপর হইতে বড় বউয়ের কণ্ঠস্বর ভাসিয়া আসিল—মহাতাপ, যেয়ো না, ঘরে গিয়ে শোও। আমার দিব্যি, আমার মরা মুখ দেখবে।
মহাতাপ দাঁড়াইয়া গেল।
এতক্ষণে রাখাল বলিল–ঘোট বউমা, চাঁপাডাঙার বউকে একটু দুধ গরম করে দাও বাপু।
ছোট বউ সে কথায় কর্ণপাত করিল না। সে মহাতাপের পায়ের কাছে প্রায় পাগলের মত হাঁটু গাড়িয়া বসিয়া বলিল, মাথা খুঁড়ে মরব আমি।
রাখাল ধীরে ধীরে বাহির হইয়া গেল।
