- প্রথম পরিচ্ছেদ: দেবগ্রামের পথে
- দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: মহাতাপ কথাটা মিথ্যা বলে নাই
- তৃতীয় পরিচ্ছেদ: দিন কয়েক পরের কথা
- চতুর্থ পরিচ্ছেদ: দেখিতে দেখিতে বৰ্ষা নামিয়া পড়িল
- পঞ্চম পরিচ্ছেদ: ভাদ্র মাস পড়িয়া গিয়াছে
- ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ: ভাদ্র শেষ হইয়া গিয়াছে
- সপ্তম পরিচ্ছেদ: পূজা আসিয়া পড়িয়াছে
- অষ্টম পরিচ্ছেদ: পরদিন সপ্তমীর সকাল
- নবম পরিচ্ছেদ: নবমীর রাত্রিকাল
মিষ্টি ভাষায়। অতি মোলায়েম করিয়া ঘাড় নাড়িয়া বলিল, আশি টাকার হার পরে, না, মানায় দিদিকে। পাঁচশো আশি টাকার হার পুরবে দিদি, হারের বায়না হয়ে গেল। বুঝেছ?
বলিয়াই সে ময়দার থালাটা হাতে লইয়া অত্যন্ত দ্রুত উঠিয়া চলিয়া গেল।
বড় বউ আৰ্তকণ্ঠে ডাকিল–মানু—হুঁ। তাহার মুখ বিবর্ণ হইয়া গিয়াছে এক মুহূর্তে কে যেন তাহাকে অতর্কিতে নিষ্ঠুর আঘাতে চাবুক হানিয়াছে মুখের উপর।
ছোট বউ ঘরে ঢুকিবার মুখে ঘুরিয়া দাঁড়াইয়া বলিল, চার পাঁচ ভরির হার দুশো আড়াইশো টাকায় খুব সস্তা বড়দিজলের দর। ওতে তুমি এতটুকু খুঁতখুঁত কোরো না, বড় ভাল মানাবে তোমাকে।
বলিয়াই ঘরে ঢুকিয়া গেল।
মহাতাপ কিন্তু উল্লসিত হইয়া উঠিল; সে পরমোল্লাসে বলিয়া উঠিল, সত্যি কথা? বড় বউ আমার দিব্যি, বল? আরে বাপ রে বাপ রে। চামদড়ি কিপটের এ কি সুমতি! সেদিন পুঁটি আসবামাত্র বীচন দিয়ে দিলে। আজ তোমাকে সোনার হার! বলিহারি বলিহারি! আজ দাদাকে পেনাম করেগা, পায়ের ধুলো লেখা।
সে পরমানন্দেই বাহির হইয়া চলিয়া গেল।
বাহির-বাড়ির রাস্তার ধারের দাওয়ার উপর হিন্দুস্থানি দুই জন বসিয়া পিতলের থালায় ছাতু ভিজাইছে, লঙ্কা-নুন রাখিয়াছে। লোটার জলে হাতমুখ ধুইতেছে। সেতাব বসিয়া কা টানিতেছে। তখনও সে যেন কেমন হইয়া আছে। মাথাটা তাহার কেমন করিতেছে।
মহাতাপ আসিয়া হঠাৎ গড় হইয়া প্ৰণাম করিয়া বসিল।
সেতাব চমকিয়া উঠিল—ওই! ওই! এ কি রে বাপুঃ ও কি!
—পরনাম। তোমাকে পেনাম করলাম।
–ওই। হঠাৎ পেনাম ক্যানে রে বাপু?
—তুমি—। তারপর ওই হিন্দুস্থানি দুই জনের কথা মনে করিয়া চুপ করিয়া গেল। বলিল, শুনেছি, আমি শুনেছি। হাসিতে লাগিল।
কি?
–বলব, বলব। দাও, হুঁকোটা দাও।
সে কোটা প্ৰায় টানিয়াই লইল সেতাবের হাত হইতে এবং পিছন ফিরিয়া হুঁকা টানিতে গিয়া থমকিয়া দাঁড়াইল ওই গুড়ের পাইকারদের কাছে। ভিজানো ছাতুর দিকে তাহার দৃষ্টি
পড়িল। ভিজানো ছাতু বেশ ফুলিয়া উঠিয়াছে। সে বলিল, ই কেয়া হ্যায়? ছাতু? সাহজী?
সাহুজী উত্তর দিল, হুঁ, সন্তু!
মহাতাপ বলিল, হুঁ হুঁ! বহুত আচ্ছা চিজ! নুন-লঙ্কা দিয়ে আচ্ছা লাগতা হ্যায়, না!
সাহু হাসিল। বলিল, বাঙালিকে হজম নেহি হোতা।
বিকালের দিকে ওজন করিয়া গুড় বিক্রয় হইতেছিল। খামারে একটা কাঁটা-ওজন খাটাইয়া টিনবন্দি করিয়া গুড় ওজন করিতেছিল রাখাল পাল। সেতাব দাওয়ায় বসিয়া খোলার কুচিতে করিয়া মাটির উপর একটার পর একটা দাগ দিয়া হিসাব রাখিতেছিল। পাশেই একটা গামলা। গামলায় আধ-গামলা গুড় রহিয়াছে। টিনে গুড় বেশি হইলে তাহার ভিতর হইতে হাতায় করিয়া গুড় তুলিয়া গামলায় রাখিতেছিল, আবার কম হইলে পূরণ করিয়া দিতেছিল। কাটার ওজন করিতে রাখালের দক্ষতার খ্যাতি আছে। সে খ্যাতি—খোল বাজানোর খ্যাতির সমান। রাখালের ওজন-করা জিনিস কখনও কম-বেশি হয় না। আর তেমনি দ্রুত ওজন করে।
একদিকে একটা আধ মণ, অন্যদিকে টিন।
কাঁটাটা দুলিতেছিল। রাখাল কাটার উপরে একটা হাত রাখিয়া কাঁটার দিকে তাকাইয়াছিল, আর সুর করিয়া বলিতেছিল, তের রাম তেরতের রাম, তের রামতের রাম–
খানিকটা গুড় তুলিয়া লইয়া বলিল, তের রামে চৌদ্দ। চৌদ্দ। ওঠাও।
নোটন টিনটা নামাইয়া রাখিল। তেরটা টিন আগে হইতেই সাজানো ছিল। এটা রাখিতেই চৌদ্দ হইল। রাখাল বলিল, চৌদ্দ, চৌদ্দ, চাপাও।
নোটন আর একটা টিন চাপাইল।
চৌদ্দ রাম। চৌদ্দ রাম। চৌদ্দ রাম।
ওদিকে ককালে একটা, মাথায় একটা, দুইটা টিন লইয়া বাড়ির ভিতর হইতে আসিয়া হাজির হইল মহাতাপ।
—ধর্ নোটনা ধরা। আগে কাঁকালেরটা।
নোটন ককালেরটা ধরিতেই সে নিজেই মাথারটা নামাইল। তাহার গায়ে হাতে গুড় লাগিয়াছে। রাখাল হাকিল, চৌদ্দ রাম, চৌদ্দ রামপনের। পনের। পনের।
মহাতাপ নিজের হাতটা লইয়া গিয়া গরুটার মুখের কাছে ধরিলালে, চেটে লে। গরুটাকে চাটাইয়া লইয়া বাড়ির ভিতর চলিয়া গেল।
রাখাল হাকিতেছিল—পনের পনের পনের।
ওদিকে বাড়ির ভিতরে জালার ভিতর হইতে বাটিতে করিয়া গুড় বাহির করিয়া টিনে ঢালিতেছিল বড় বউ। গাছকোমর বাঁধিয়া সে কাজ করিতেছে।
দাওয়ায় বসিয়া মানিক মুড়ি ও গুড় খাইতেছে। পাশেই তাহার বাঁশিটি পড়িয়া আছে। মধ্যে মধ্যে পু করিয়া দিতেছে।
মানদা টিনের পাশে বসিয়া টিনের গায়ে যে গুড় পড়িতেছে সেই গুড় চাচিয়া লইয়া একটা পাত্রে জমা করিতেছে।
মহাতাপ ঘরে আসিয়া ঢুকিল। টিনে ভরা হয় নাই দেখিয়া অপেক্ষা করিয়া রহিল, বলিল, আরে রাম রাম, এখনও টিন ভরে নাই?
চাঁপাডাঙার বউ বলিল, দিচ্ছি, দিচ্ছি, হাত তো আমাদের দুটো, চারটে তো নয়। চতুর্ভুজো দেখে বউ আনলেই তো পারতে তোমরা! সবুর কর, ঘোড়াটা বাঁধ।
এখন কাজের মধ্যে চাঁপাডাঙার বউয়ের সে বিষণ্ণতাটুকু আর নাই। এই সময়ই বাহির হইতে রাখাল ডাকিল, এক ঘটি জল দেবে বউমা? বড় তেষ্টা পেয়েছে।
মানদা বলিল, গুড়ের লোভে আবার জল খেতে এসেছে গেঁজাল। ওজন করবার আর লোক পেল না।
বাহির হইতে রাখাল বলিল, শুনছ, অ বড় বউমা!
চাঁপাডাঙার বউ একটা বাটিতে গুড় লইয়া বাহির হইয়া গেল। মহাতাপকে বলিল, তুমি বার কর হে ততক্ষণ।
রাখাল বলিল, গুড় কিন্তু ফাস্টো কেলাস মা। কি সুবাস! আর কি তার! সুন্দর! সে বলিয়া। হাত চাটিতেছিল। চাঁপাডাঙার বউকে দেখিয়া হাতখানা পাতিয়া বলিল, তা দেব নাকি একটুকুন? তা দাও।
চাঁপাডাঙার বউ বাটিটা নামাইয়া দিয়া অন্য ঘরে জল আনিবার জন্য চলিয়া গেল। রাখাল লম্বা জিভ বাহির করিয়া বাটি হইতে চাটিয়া চাটিয়া গুড় খাইতে লাগিল। হঠাৎ মহাতাপ ঘর হইতে বাহির হইয়া আসিল—যেন পলাইয়া আসিল এবং খিলখিল করিয়া হাসিতে লাগিল।
ঘরের ভিতর হইতে প্রায় কাঁদিতে কাঁদিতে মানদাও পিছন পিছন বাহির হইয়া আসিয়া বলিল, দেখ দেখ, কি করল দেখ! কাণ্ড দেখ! কথাগুলির মধ্যে আদরের সুর। ছলনা করিয়া মিছামিছি কান্নার ভান। মহাতাপ তাহার দুই গালে গুড় মাখাইয়া দিয়াছে। পুলকিত হইয়াই মানু কাঁদিতেছে।
সেই কৌতুকে মহাতাপ খিলখিল করিয়া হাসিতেছে।
রাখালও কৌতুকে খুখুক করিয়া হাসিতে লাগিল। বড় বউ আসিয়া জলের ঘটিটা নামাইয়া দিয়া বলিল, মানিককে বল চেটে খেয়ে নেবে, পরিষ্কার হয়ে যাবে। যাও তো বাবা মানিক, মায়ের গালের গুড় চেটে—
এই রঙ্গ দেখিয়া মানিকও উৎসাহিত হইয়া উঠিল। সে খুব জোরে জোরে বাঁশি বাজাইতে লাগিল, পু—পু—পু–পু—
পাগল মহাতাপ এই কথা শুনিয়া যাহা করিল তাহাকে অসম্ভব কাণ্ড ছাড়া আর কিছু বলা চলে না। সে অতর্কিতে তাহার দুই হাতের গুড় বড় বউয়ের গালে মাখাইয়া দিয়া বলিল, তা হলে তোমার গালের আমি চেটে খেয়ে লোব।
রাখাল অট্টহাস্যে ফাটিয়া পড়িল।—বলিহারি—বলিহারি—বলিহারি।
ঠিক এই মুহূর্তেই গলা পরিষ্কারের শব্দ তুলিয়া সেতাব বলিল, বলি সব হচ্ছে কি? অ্যাঁ! প্রথমেই সে চটিয়া উঠিল রাখালের উপর। বলিল, বলি গুড় খাওয়া হল কবার? রাখাল! বলি হাহা-হা-হা হাসিই বা কিসের?
রাখাল অপ্রতিভ হইয়া বলিল, মহাতাপ, বুঝলে কিনা সেতাব, ও আমাদের কি বলেও ভারি আমুদে। ওঃ–
সেতাব রুদ্ধ রোষে ভাঙাইয়া বলিল, ওঃ! ও! ভারি আমুদে। দায়ে করে নিজের গলায় কুপিয়ে আমারও আমোদ করতে ইচ্ছে হচ্ছে। আমোদ, আমোদ–
মানদা মহাতাপকে বলিল, তুমি মুর তুমি মর।
মহাতাপ দুই হাত নাড়িয়া বলিল, কেয়া, হুয়া কেয়া? আরে, হল কি?
বড় বউ স্বামীর দিকে একটা তীব্র দৃষ্টি হানিয়া বলিল, কিছু হয় নি, এস, গুড় বের করে বিক্রির কাজটা শেষ কর। বাইরে লোকেরা বসে আছে। সে ঘরে ঢুকিয়া গেল।
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ: ভাদ্র শেষ হইয়া গিয়াছে
ভাদ্র শেষ হইয়া গিয়াছে। আশ্বিনের প্রথম সপ্তাহ। পূজার ঢাক বাজিতেছে। পূজার ঢাক বাঁজা কথাটার মানে পূজার কাজ পড়িয়াছে। পূজার ঢাক সত্য সত্য বাজে বোধনের দিন হইতে। অবশ্য বোধন কোথাও এক মাস আগে হয়, কোথাও বা পনের দিন, কোথাও বা শুক্লপক্ষের পূর্ববর্তী অমাবস্যায় অর্থাৎ মহালয়ার দিন হইতে। যেখানে যেমন নিয়ম। এখানে বোধনের ঘট আসে মহালয়ার দিন। গ্রামের মধ্যে একখানি পূজাওই চণ্ডীমণ্ডপে হইয়া থাকে। কয়েক শরিকের পূজা। বোধনের দেরি আছে। তবুও আশ্বিন পড়িতেই পূজার কাজের ধুম পড়িয়া গিয়াছে। পল্লীতে পল্লীতে। কিন্তু আজ ঢাক সত্যই বাজিতেছে। আজ ইদপূজা বা ইন্দ্ৰপূজা। সকালবেলাতেই ইদপূজার স্থানটায় ঢাকী ধুমুল দিতেছে। ইদপূজা সরকারি পূজা অর্থাৎ আইনমতে জমিদার মালিক। আইনমতে জমিদার মালিক হইলেও আসল মালিক গ্রামের মণ্ডলেরা। পঞ্চমণ্ডলে পূজার কাজ চালাইয়া থাকে। তাহারাই তত্ত্বাবধান করে, তাহারাই খরচ যোগায়, পরে খরচ জমিদারের খাজনা হইতে হিসাব করিয়া
