- প্রথম পরিচ্ছেদ: দেবগ্রামের পথে
- দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: মহাতাপ কথাটা মিথ্যা বলে নাই
- তৃতীয় পরিচ্ছেদ: দিন কয়েক পরের কথা
- চতুর্থ পরিচ্ছেদ: দেখিতে দেখিতে বৰ্ষা নামিয়া পড়িল
- পঞ্চম পরিচ্ছেদ: ভাদ্র মাস পড়িয়া গিয়াছে
- ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ: ভাদ্র শেষ হইয়া গিয়াছে
- সপ্তম পরিচ্ছেদ: পূজা আসিয়া পড়িয়াছে
- অষ্টম পরিচ্ছেদ: পরদিন সপ্তমীর সকাল
- নবম পরিচ্ছেদ: নবমীর রাত্রিকাল
বউ গলায় আঁচল দিয়া প্ৰণাম করিল।
সমস্ত চণ্ডীমণ্ডপটা কয়েক মুহূর্তের জন্য এমন হইয়া রহিল যে সুচ পড়িলেও শোনা যায়।
প্ৰণাম সারিয়া উঠিয়া বড় বউই নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করিল। বলিল-আমাদের পুজোর সামগ্রী। দেখে নাও, কে দেখছ?
এবার টিকুরীর খুড়ী মুখ খুলিল। সে বলিল, আমি দেখে নিচ্ছি, তা–ডালাটার দিকে একবার তাকাইয়া আবার পুঁটির দিকে চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিলাপাডাঙার বউকে খুঁয়েছিস নাকি পুঁটি?
বড় বউ দাঁড়াইয়া বলিল—মোড়লবাড়ির ভাড়ার এখনও আমার হাতে টিকুরী খুড়ী। সেখানে লক্ষ্মী পেতে নিজে হাতে সামগ্রী বার করে সাজিয়ে নিজেই নিয়ে আসছিলাম। পুঁটি হঠাৎ এসে পড়ল। তুলে নাও! তোমাদের না বলায় হবে না। না বলতে হয় বলবেন ওই দেবতা। বসিয়া নিজেই সমস্ত সামগ্রী প্রতিমার সামনে নামাইয়া দিয়া বলিল—না বলতে হয় তুমি বল মা। আর কারুর কথা আমি শুনব না। আমার হাতের পুজো অশুদ্ধ যদি হয় তবে বজ্ৰাঘাত কর। আমার মাথায়; না হয় সর্পাঘাত হোক আমার। না হয় নিজের হাতের খাড়াটা দিয়ে আমার বুকে মার!
সকলে স্তব্ধ হইয়া গেল। শুধু বিপিন চিৎকার করিয়া উঠিল—বউমা! বউমা! বউমা!
বড় বউ কোনো দিকে দৃকপাত না করিয়া পুঁটিকে বলিলচ পুঁটি। তাহারা দুই জনে চলিয়া গেল।
টিকুরীর খুড়ী বলিল গঙ্গাজলের ঘটিটা কই? অ ইন্দেশের বউ।
সেতাব রাস্তার উপর হইতে উঠিয়া আসিয়া বিপিনকে বলিল-আজ সন্ধেবেলা তা হলে আমার ভাগের কাজটা সেরে দেন।
—আজ? সেতাব—
–না জ্যাঠা, আজই! আই! আই! এ কেলেঙ্কারি আমি আর সইতে পারছি না।
তাহাই হইল।
পঞ্চায়েত বসিয়া সেতাবের বিষয় ভাগ করিয়া দিল। সেতাবের হিসাবের কাজ বড় পরিষ্কার, কাগজপত্রে খুঁত ছিল না; এবং জমিগুলির মধ্যে কোন্ জমি কেমন ইহাও মোড়লদের কাহারও অজ্ঞাত ছিল না। জমি পুকুর ভাগ কাগজ লইয়া বসিয়া অল্প সময়ের মধ্যেই হইয়া গেল।
শেষের দিন বাসন-কোসন ভাগ হইল এবং বাড়ির উঠানে দড়ি ধরিয়া মাপিয়া ঘর ভাগ করিয়া দিল পঞ্চায়েত মণ্ডল। পঞ্চায়েতরা বাড়ির উঠানে দাঁড়াইয়া ছিল। সেতাব মহাতাপ দুই জনে দুই দিকে দাঁড়াইল। মানিক বাঁশিটা বাজাইয়া ফিরিতেছে—পু-পু-পু! বউয়েরা দুই জনেই ঘরের ভিতর।
ভাগের ব্যাপারে সেতাব কথা বলিল না। গোড়াতেই সে বলিয়াছে—আগে ও-ই বেছে নিক। শেষে আমি ঠকিয়েছি—এ কথা শুনব না।
উঠানে দড়ি ধরিয়াছিল একদিকে রামকেষ্ট, অন্যদিকে আর একজন। বিপিন বলিলবল। এখন কে কোন্ দিকে নেবে? এ দিকের ঘরখানা ভাল, তেমনি ওদিকে, রান্নাঘর করে নিতে হবে। সেতাব–?
মহাতাপ উঠিয়া আসিয়া বলিল—ভাল ঘর আমি নোব।
সেতাব হাসিয়া বলিল—তাই নেক। আমি পুরনো ঘরই নিলাম।
মহাতাপ নূতন ঘরের দাওয়ায় সঙ্গে সঙ্গে উঠিয়া আসিয়া বলিল–বাস।
সেতাব বলিল, আপনারা একটু দাঁড়ান। আমি কাঁচা ইট, রাজ-মজুর ঠিক করে রেখেছি। মাটির দেওয়াল দিতে দেরি হবে। ইটের গাঁথনি আজই দেবে।–আয় রে! ওরে! শুনছিল।
কয়েক জন মজুর আসিয়া ঢুকিল। সেতাব বলিল–ওর মুখ আর আমি দেখব না।
মহাতাপ হঠাৎ উঠিয়া আসিয়া বলিল–গয়না যা বাধা নিয়েছে তার হিসেব কই? বিপিন জ্যাঠা!
সেতাব বলিল—সে তো আমার যৌতুক।
—সে তো বড় বউয়ের গয়না। বড় বউকে তো ও নেবে না।
–সে আমি বুঝব। তা নিয়ে তোর ওকালতি করতে হবে না।
–আলবৎ হবে।
বিপিন বলিল মহাতাপ, তুমি মিছে চেঁচামেচি কোরো না।
ঠিক এই সময়েই বড় বউয়ের ভাই মণিলাল আসিয়া বাড়ি ঢুকিল। মহাতাপ চিৎকার করিয়া বলিল—ওই, ওই বড় বউয়ের ভাই এসেছে। নোটন আনতে গিয়েছিল।
মণিলাল আসিয়া সেতাবকে প্রণাম করিল। বয়সে বড় বউ অপেক্ষা বছর তিনেকের ছোট। বেশ স্বাস্থ্যবান। চাষীর ছেলে। প্ৰণাম করিয়া বলিল—এ সব কি বললে নোটন, জামাই-দাদা?
—তোমার ভগ্নীকে নিয়ে আমার ঘর করা অসম্ভব মণিলাল। বিপিন আসিয়া হাত ধরিয়া বলিল—সেতাব, এ কাজ তুমি হঠাৎ কোরো না। সেতাব!
–না। সে আর হয় না জ্যাঠা। মণিলাল, তুমি তোমার ভগ্নীকে নিয়ে যাও। গাড়ি আমি ঠিক করে রেখেছি।
মহাতাপ ঘাড় নাড়িয়া বিজ্ঞের মত বেশ উল্লাসের সঙ্গেই বলিল—আমিও রেখেছি, গাড়ি ঠিক করে আমিও রেখেছি। হাঁ, আমিও মহাতাপ! হাঁ!
সে বেশ অহঙ্কারের সঙ্গেই, যাহাকে বলে দর্পভরে পদক্ষেপ, তেমনি পদক্ষেপে, কর্মরত মজুরওয়ালার কাটা দেওয়ালের ভিতরটার চারিদিকে বেড়াইয়া আসিল। যেন লাঠি খেলোয়াড় পায়তারা জিতেছে। সেই ভজিবার মুখে তাহার চোখে পড়িল মানদা কখন ঘর হইতে বাহির হইয়া আসিয়া এক ভাগ লইয়া গুছাইতেছে। মহাতাপ থমকিয়া দাঁড়াইল। তারপর বলিল—নেহি নেহি নেহি।
মানদা থমকিয়া গেল। তারপর ঘোমটা টানিয়া চাপা গলায় বলিল—কোটা আমাদের?
–এইটাই। ওটাই মহাতাপ নিয়েছে।—বলিল বিপিন।
–তবে?
মহাতাপ কাছে আসিয়া বলিল—তোকে ছুঁতে হবে না আমার ভাগ। তুই তোর, কাপড়চোপড় গুছিয়ে নে। হাঁ! গাড়ি ঠিক করে রেখেছি আমি। তোর সঙ্গে আমার ঘর করা নেহি। চলেগা। হাঁ!
মানদার হাত হইতে বাসন কয়েকখানা পড়িয়া গেল।
সকলেই চমকিয়া উঠিল। বিপিন বলিল, ওরে মুখ্য, আধপাগল, বলছিস কি! ক্ষেপলি নাকি?
–অন্যায় কি বললাম? ক্ষেপব কেন?
–তবে এসব কি বলছিস? নিজের পরিবারকে নিবি না ক্যানে?
–ও নেবে না ক্যানে? ও পাঠিয়ে দেবে ক্যানে?
সকলে অবাক হইয়া গেল।
মহাতাপ বলিল, ওকে পাঠিয়ে দোব আমি দিয়ে সেই গাড়িতে বড় বউকে নিয়ে আসব আমি। আর নইলে শিবকেষ্ট-রামকেষ্টদের টিকুরীর খুড়ী ইন্দেশের খুড়ীর মত বড় বউকে ছোট বউকে ভাগ করে দাও তোমরা। বড় বউয়ের সঙ্গে ওর বনে না, আমার ছোট বউয়ের সঙ্গে বনে না। ছোট বউ ওর ভাগে যাক, বড় বউ আমার ঘরে থাকবে।
বিপিন বলিল, ছিছিছি! মহাতাপ তুই চুপ কর্। কেলেঙ্কারি বাড়াস নে। বাড়াস নে।
মহাতাপ চিৎকার করিয়া উঠিল—না-না-না, বড় বউকে আমি যেতে দেব না। বড় বউ ছাড়া আমার চলবে না।
সেতাব এক টুকরা ভাঙা ইট লইয়া সজোরে ছুঁড়িল।
মহাতাপকে লক্ষ্য করিয়া নয়। ছুঁড়িল বড় বউকে লক্ষ্য করিয়া। বড় বউ কখন আসিয়া সিঁড়ির দরজার মুখে দাঁড়াইয়া ছিল, কেহ লক্ষ্য করে নাই। সেতাব দেখিয়াছিল। কাঁচা ইটের টুকরাটা বড় বউয়ের পাশে দেওয়ালে লাগিয়া চুরমার হইয়া গেল। বিপিন সেতাবের হাত ধরিয়া টানিয়া বলিল, এস বাইরে এস। তাহাকে টানিয়া সে লইয়া গেল। খামার-বাড়িতে আসিয়া সেতাব বলিল, আমি নতুন করে সংসার করব। আবার বিয়ে করব আমি।
–করবে। আর আপত্তি আমি করব না।
–ঘোঁতনের বোন পুঁটির কথা আমি ঘোঁতনকে বলেছি।
নবম পরিচ্ছেদ: নবমীর রাত্রিকাল
নবমীর রাত্রিকাল। মণ্ডলবাড়ির সম্পত্তি ঘর-দুয়ার আজ দিনের বেলা ভাগ হইয়া গিয়াছে।
বাড়ির বাহিরে টাপর দেওয়া গরুর গাড়ি সাজানো রহিয়াছে। সকালেই বড় বউ চাঁপাডাঙা যাইবে চিরকালের মত হয়ত যাইবে।
বাড়ির উঠানে এক কোমর উঁচু কাঁচা ইটের দেওয়াল গাঁথা হইয়া গিয়াছে। ভারা বাধা রহিয়াছে। কাল বাকিটা শেষ হইবে।
সেতাব সর্বসমক্ষে ঘোষণা করিয়াছে তাহার সন্তান চাই। সে আবার বিবাহ করিবে। তবু তাহার বুকে যেন আগুন জ্বলিতেছে। কাদম্বিনীর উপর একটা কঠিন আক্রোশ বুকের মধ্যে আগুনের মত জ্বলিতেছে।
রাত্রি প্রথম প্রহর পার হইয়াছে, জ্যোত্সা ঝলমল করিতেছে। আকাশে আজ মেঘ দেখা দিয়াছে।
শুইবার ঘরে বড় বউ শুইয়া ছিল। সেতাবও শুইয়া ছিল, কিন্তু ঘুম তাহার আসে নাই। বড় বউকে বিদায় দিব, বিদায় দিব বলিয়া কয়দিন মাতিয়া উঠিয়াছিল; কাল বড় বউ চলিয়া যাইবে, আজ রাত্রে তাহার অন্তর কেমন অধীর হইয়া উঠিয়াছে। ক্রোধ, ক্ষোভ, জ্বালা, বেদনা, দুঃখ-—সে যেন সবকিছুর একটা সংমিশ্রণ। যেন আগ্নেয়গিরির গর্ভে ফুটন্ত বহু ধাতুর আলোড়ন। সে হঠাৎ উঠিয়া বসিল, কত দিন থেকে তুমি আমার চোখে এইভাবে ধুলো দিয়ে আসছ, বলতে পার? কত দিন?
বড় বউ উত্তর দিল না। সেতাব ঘরের মধ্যে একবার পায়চারি করিয়া আসিয়া কাছে। দাঁড়াইল। বলিল, আমার মুখে ক্যানে এমন করে চুনকালি মাখালে, ক্যানে? বলিয়াই দ্রুতপদে জানালার ধারে গিয়া দঁাড়াইল। সঙ্গে সঙ্গে ফিরিয়া আসিয়া বলিল, তুমি তো বিষ খাইয়ে আমাকে মেরে যা খুশি তাই করতে পারতে। তারপরই বলিল, গয়না, ওই গয়না কটা দিয়ে বিষয় বাঁচিয়ে তুমি আমায় ঠকিয়েছ। আমি কানা, আমি অন্ধ। তোমাকে তার একটি পয়সা আমি দোব না।
সে আসিয়া বিছানায় শুইয়া পড়িল। সঙ্গে সঙ্গে উঠিয়া কাছে গিয়া বসিল, বলিল, তোমাকে যেতে আমি দোব না! তোমার গলা টিপে মেরে ফেলব আমি।
বলিতে বলিতেই সে অস্থির হইয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। এক পাক ঘুরিয়া আসিয়া
