চাঁপাডাঙার বউ

« <
/ 31
> »

ঘোতনের মা, এক গ্রামের মেয়ে, বাল্যসখী সই। গোপালের ছেলে ঘোঁতন ভূমিষ্ঠ হওয়ার ফলে উমেশের স্ত্রী বলিয়াছিল—আমার মেয়ে হলে তোমার ছেলেকে আমি জামাই করব। উমেশের প্রথম দুই সন্তান পুত্র, তৃতীয় সন্তান কন্যা কাদম্বিনী। কাদম্বিনী ভূমিষ্ঠ হইলে উমেশের স্ত্রী সইকে খবর পাঠাইয়াছিল যে…মেয়ে হইয়াছে। কথা যেন পাকা থাকে।

উমেশ পাল খুঁতখুঁত করিয়াছিল। কারণ গোপাল ঘোষ পাইকার অর্থাৎ দালাল মানুষ। ধানের দালালি করে। চাষবাস আছে কিন্তু ধানের দালালিতে ঝোঁক বেশি। সেই সূত্রে আধাশহুরে মানুষ। সদগোপ হইয়াও চাষ করে না, করে ধানের পাইকারিঅর্থাৎ ধান-চালের দালালি। দালালিতে কাজের চেয়ে কথা বেশি। কাজের চেয়ে যেখানে কথা বেশি সেখানে কথার সবই ভুয়া অর্থাৎ মিথ্যা। তবুও স্ত্রীর কথার প্রতিবাদ করে নাই। বাই যখন দিয়াছে মেয়ের মা, তখন না মানিলে উপায় কি? মেয়ের জন্মের পর কিছুদিন বেশ উৎসাহের সঙ্গে মধ্যে মধ্যে দুই বাড়িতে খবরাখবরের আদানপ্রদান চলিল। তত্ত্বতল্লাশও চলিল। তারপর ধীরে ধীরে সব কমিয়া আসিল। তারপর কাদুর বয়স হইল এগার। ওদিকে বাজারে গুজব টিল—নতুন আইন হইতেছে যে, মেয়ে যুবতী হওয়ার আগে বিবাহ দিলে জেল হইবে। বিবাহ নাকচ হইবে। কেহ বলিল চোদ্দ বছর, কেহ বলিল ষোল, কেহ বলিল আঠার বছর বয়স না হইলে মেয়েদের বিবাহ চলিবে না। ভীষণ আইন, সারদা আইন না কি আইন!

ওদিকে গোপাল ঘোষের ছেলে ঘোঁতন নাকি ম্যাট্রিক দিয়াছে। বিবাহের বাজারে ছেলের দর। খুব। গোপাল ঘোষ নাই, মরিয়াছে; উমেশ লোক পাঠাইল ঘোঁতনের মায়ের কাছে, অর্থাৎ স্ত্রীর সইয়ের কাছে। বিবাহ এক মাসের মধ্যেই শেষ করিতে অনুরোধ জানাইল। উত্তর দিল ঘোঁতন। সে বলিয়া পাঠাইল—বিবাহ করিতে সে এখন আদৌ ইচ্ছুক নয় এবং পরবর্তীকালেও সে যখন বিবাহ করিবে তখন লেখাপড়া-জানা মেয়ে বিবাহ করিবে। এগার বৎসর বয়সের মেয়েকেও সে বিবাহ করিবে না। ঘোতনের মা লোকের সামনে ঝরঝর করিয়া কাঁদিয়া ফেলিয়া বলিল,—আমার দশা দেখে যাও বাবা। সইকে বোলো, সয়াকে বোলো, আমি নিরুপায়। দিনরাত চোখের জল সার হয়েছে আমার। আমার কোনো হাত নাই।

জবাব পাইয়া উমেশ পাল খানিকক্ষণ গুম হইয়া মাটির দিকে চাহিয়া রহিল, তারপর মুখ তুলিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। ঠিক সেই মুহূর্তটিতেই পালের বাড়িতে প্রবেশ করিল সেতাব। তাহার সঙ্গে একজন ভারী। তাহার কাঁধের ভারে দুই দিকে বীজের বস্তা। উমেশ পালের মুখটা প্রসন্ন। হইয়া উঠিল। হ্যাঁ, পাত্র সে পাইয়াছে। ঠিক হইয়াছে। সেদিন গণকার কাদুর হাত দেখিয়া বলিয়াছিল—এ মেয়ের পাত্র পায়ে হেঁটে তোমার বাড়ি এসে উঠবে পাল। তুমি দেখে নিয়ো।

কথাটা শুনিয়া উমেশ পালও হাসিয়াছিল। ভাবিছিল,ভারি চতুর এই গণকার মশাই। ঘোঁতনের সঙ্গে কাদুর বিবাহের সম্বন্ধের কথা এখানে মোটামুটি সবাই জানে। সেই কথাটি সে তাকমাফিক চমৎকার ঝাড়িয়া দিয়াছে। আজ কিন্তু সে সেই কালো বামুনকে মনে মনে প্ৰণাম করিল। প্রতাপ মণ্ডল এ অঞ্চলের নামি মানুষ ছিল। তাহার ছেলে সেতাব। বংশ উচ্চ। ছেলের যোগ্যতা ছেলে নিজে প্ৰমাণ করিয়াছে। যে ছেলে ড়ুবন্ত নৌকাকে ভাসাইয়া তুলিতে পারে, সে নাই বা হইল ম্যাট্রিক পাস। উমেশ পাল পরের দিনই সেতাবের বাড়ি আসিয়া তাহার মায়ের কাছে কথা পাড়িল। এবং এক মাসের মধ্যেই বিবাহ শেষ করিয়া নিশ্চিন্ত হইল। সেতাবের মা বউ দেখিয়া খুশি হইল। মহাতাপ বউয়ের ঘোমটা খুলিয়া দিয়া বলিল-এঃ-এই আবার বউ হয়? এইটুকুন মেয়ে।

মা বলিয়াছিলেন—হয়। ওই বউ বড় হবে। তোমার বড় ভাজতোমার মায়ের তুল্য হবে। আমার ঘরের লক্ষ্মী।

সেতাব তাহার পর ধুলার মুঠা ধরিয়াছে, সোনার মুঠায় পরিণত হইয়াছে সে ধুলা। আবার সোনার মুঠা চোখের উপর ধুলায় পরিণত হইতে বসিয়াছে। সাধে সে হায় হায় করে।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ: দিন কয়েক পরের কথা

দিন কয়েক পরের কথা।

ভোরবেলা। সূর্য উঠি-উঠি করিতেছে। গোয়াল-বাড়িতে বলদ জোড়াটার কাঁধে হাল চাপাইয়া বাঁধিতে বাঁধিতে মহাতাপ গান ধরিয়া দিয়াছিল।

মালসা মারিয়া কাপড় পরিয়াছে। মাথায় রঙিন গামছা বধিয়াছে। পাশে ওধারে লাঙল নামানো। একটা ধানের বীজের ঝুড়ি। দুইখানা কোদাল। কো-কক্কে। একটা ছোট চটের থলে।

কৃষাণ নোটন সাহায্য করিতেছে।

হাল জোতা হইলে মহাতাপ বার দুই সস্নেহে গরু দুইটার গায়ে হাত বুলাইয়া দিল। তারপর একটা ছোট টুকরিতে কিছু খইল লইয়া একটার মুখের কাছে ধরিল। গান চলিয়াছে। একটার মুখের কাছে খইল ধরিতেই অপরটা গন্ধে চঞ্চল হইয়া উঠিল স্বাভাবিকভাবে। মহাতাপ সমের মাথায় ধমক দিল তাহাকে ধ্যাৎ তেরি!

ইতিমধ্যে বাড়ির ভিতর হইতে বধূ দুইটি, দুইটি ঘড়া কাখে লইয়া কাঁধে গামছা ফেলিয়া স্নানে বাহির হইল।

বড়চাঁপাডাঙার বউ যাইতে যাইতে দাঁড়াইল। হাসিয়া বলিল, ঘরদোর চাষবাস বলে তা হলে মনে পড়ল ছোট মোড়লের এত দিনে? চার দিন গাজননাচন নেচে–পাঁচ দিন ঘুম।

মানদা বলিল, ক ঘটি ভাঙ খেয়েছিল শুধাও।

মহাতাপ বলিল, ফের ব্যাড়ব্যাড় করে। একদিন কেবল ওই কথা, ব্যাড় ব্যাড়—ব্যাড়র ব্যাড়রক ঘটি ভাঙ খেয়েছ? ভাঙ কেউ হিসেব করে খায় নাকি?

চাঁপাডাঙার বউ বলিল, তা খায় না, কিন্তু ছেলেবেলায় অসুখ করে যার মাথা দুর্বল, সে ভাঙ খায় কেন? কথাটা মনে থাকে না কেন?

মহাতাপ বলিল, এই কান মলছি। বুয়েচ কিনা। সত্যই সে কান মলিয়া বসিল—ওই ঘোঁতনা শুয়ার, আর ওই বেচা শেয়াল, ওই ওরাই—ওরাই যত অনিষ্টের মূল।

কথার উপরে কথা কহিয়া মানদা বলিল, ওরাই যত অনিষ্টের মূল। কচি খোকা। ওরা ঝিনুকে করে খাইয়ে দিয়েছিল।

—দেখ বউদিদি, দেখ। তুমি দেখ। তুমি বল ওকে—এমন করে কেন? কেমন করে দেখ। দেব আষিঢ়ে কিল পিটে বসিয়ে, হাঁক লেগে যাবে।

বলিয়া আগাইয়া গিয়া লাঙলটা কাঁধে তুলিয়া লইল।–চল্ রে চল, নোটন?

নোটন ইতিমধ্যে তামাক সাজিতে গোয়ালের ভিতর ঢুকিয়াছিল। তাহাকে না পাইয়া সে চিৎকার করিয়া ডাকিল, নোটনা। বলি অ—বুড়ো হনু।

বড় বউ বলিল, দাঁড়াও, দাঁড়াও, মানুর ওপর রাগ করে পালিয়ে গেলে হবে না। আমার একটা কথার জবাব দাও তো। ঘোঁতনাকে ধানটা ছেড়ে দিয়ে এলে, ঘোঁতনার মায়ের কথায় দয়া হল, তা বুঝলাম। কিন্তু একবার জিজ্ঞাসাও তো করে। দাদা রয়েছে। কি কথা বল না যে?

—কি বলব কি? বলতে গেলে, তোমার স্বামীর নিন্দে করতে হবে।

–কার?

–তোমার ইয়ের, বরের। আবার কার!

খিলখিল করিয়া হাসিয়া উঠিল চাঁপাডাঙার বউ।

মহাতাপ ওদিকে নাকে ঘড়াত শব্দ করিয়া গরু দুটার পিঠে হাত দিয়া তাহাদের চালাইয়া দিল।

বাড়ির বাহিরের দাওয়ায় রাস্তার সামনে সেতাব বসিয়া চেঁড়া ঘুরাইয়া শণের দড়ি পাকাইতেছিল। তাহার সামনে রাস্তার উপর দিয়া মহাতাপ হালগ লইয়া চলিয়া যাইতেছিল। দাওয়ার উপর মানিক একটা মাটির পুতুল লইয়া খেলা করিতেছে। রাখালটা কল্কেতে তামাক সাজিয়া ফুঁ দিতেছে। একটা খুঁটিতে একটা ছাগল বাধা, পাতা খাইতেছে। বাচ্চা দুইটা পাশে ঘুরিতেছে। সেতাব বলিল, কতটা বীজ ফেলবি আজ?

—জোলের দু আড়াতে ফেলাব।

–দু আড়া?

–হাঁ তো কি! তোমার মত মরা খেটে নাকি আমি?

–তা না হয় তু ভীম ভৈরবই হলি! কিন্তু এক দিনে এত ক্যানে?

–বাত চলে যাবে।

–বাত চলে যাবে সে জ্ঞানটা ভাঙ খাবার সময় থাকলে ভাল হত।

–ফ্যাঁচফ্যাঁচ কোরো না বেশি। এই বেটা গরু, চল না ক্যানে। আবার নাকে ঘড়াত শব্দ করিয়া গরু দুইটার পিঠে পাঁচনের টিপ দিল এবং চলিয়া গেল।

সেতাব ডাকিল, মানকে!

–উঁ!

–বাবার মত খবরদার হবারাম হবি নে বেটা। লোককে পাওনা ছেড়ে দিয়ে আসবি না।

–আমি ছিব হব।

–না। হবি না। খবরদার!

–কি হব?

–আমার মত হবি।

–না, তুমি ছাই। রোগা—

–ওরে বেটা, বুদ্ধিতে আমার মত হবি। অঙ্ক শিখবি। কাউকে এক পয়সা ছাড়বি না।

–পয়সা দাও।

–ওরে বেটা, অনেক পয়সা জমিয়েছি তোর জন্যে। সব তোর জন্যে, বুঝলি?

–কাউকে দেব না।

–হ্যাঁ। কেউ আমাকে দেয় নি, কেউ ছাড়ে নি মানকে। বাবা দেনা করেছিল, কেউ ছাড়ে নি। বুঝলি? আর পরিবারের কাছে টাকা নিবি না। তোর বড়মা দেনার সময় গয়না দিয়েছিল দেনা শোধ করতে। তার পাপ আমাকে আজ ভুগতে হচ্ছে। খবরদার মানকে। হাঁ।

রাখালটা হুঁকা-কল্কে সেতাবের হাতে দিল।

সেতাব বলিল, শোন, তু একবার ঘোঁতন ঘোষের বাড়ি যাবি, বুঝলি? বলবি পঞ্চায়েত মোড়লেরা একবার ডেকেছে। বুঝলি?

রাখালটা বলিল—সে আসবে না গো। বড় ত্যাঁদড় নোক ঘোঁতন।

—তা হোক, তু যাবি। আমি বলছি—তু যাবি। আসে না-আসে

« <
/ 31
> »