- প্রথম পরিচ্ছেদ: দেবগ্রামের পথে
- দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: মহাতাপ কথাটা মিথ্যা বলে নাই
- তৃতীয় পরিচ্ছেদ: দিন কয়েক পরের কথা
- চতুর্থ পরিচ্ছেদ: দেখিতে দেখিতে বৰ্ষা নামিয়া পড়িল
- পঞ্চম পরিচ্ছেদ: ভাদ্র মাস পড়িয়া গিয়াছে
- ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ: ভাদ্র শেষ হইয়া গিয়াছে
- সপ্তম পরিচ্ছেদ: পূজা আসিয়া পড়িয়াছে
- অষ্টম পরিচ্ছেদ: পরদিন সপ্তমীর সকাল
- নবম পরিচ্ছেদ: নবমীর রাত্রিকাল
ভেবেছ কি? বলি ভেবেছ কি?
কথা বলিতে বলিতেই তাহার কথার তাপ বাড়িতে লাগিল।
ও-দিকের ঢাকের বাজনা ক্রমশ স্পষ্ট হইয়া উঠিতে লাগিল।
বড় বউ কাদম্বিনী বলিল, ঝগড়া? কে ঝগড়া করছে? কার সঙ্গে? কোথায় দেখলে তুমি ঝগড়া? আমাদের দুই জায়ে একটু জোরে কথা বলছি। তার নাম ঝগড়া? অমনি তুমি আড়ি পেতে শুনতে গিয়েছ?
—শুনব না? ছোট বউমা বললে না—টাকা বলে কি বললে বল? তুমি ঢাকলেনা, টাকা নয়, তারিখ তারিখ বলে? আমি তোমার স্বামী, বল তো পায়ে হাত দিয়ে?
—হায় হায় হায়! খুট করে কোনো শব্দ উঠলে বেড়াল ভাবে ইদুর। চোর ভাবে পাহারাওয়ালা। আর টাকার কথা শুনলে তোমার টনক নড়ে। ওই শুনেই তুমি আড়ি পাততে গিয়েছ।
—যাব নাঃ টাকা কত কষ্টে হয়, কত দুঃখের ধন, জান? কই, সাত হাত মাটি খুঁড়ে টাকা তো টাকা—একটা পয়সা আন দেখি! আমি বহু কষ্টে গড়েছি সংসার। বাবার দেনা শোধ করেছি, দশ টাকা নাড়াচাড়া করছি। মা-লক্ষ্মীকে পেসন্ন করেছি। সেই টাকা আমার তছনছ করে দেবে। তোমরা? তার চেয়ে তার চেয়ে–
—তার চেয়ে টাকার মাপে তোমার চামড়া কেটে দিতে কম দুঃখ পাও তুমি, তা আমি জানি। কিন্তু নিশ্চিন্ত থাক, তোমার টাকা কেউ অপব্যয় করে নি।
—না, করে নি! আমি জানি না, বুঝি না কিছু? বেশ তো, টাকা টাকা করে কি বলছিলে, বল না শুনি?
–বলছিলাম মানুর বাপের অসুখ, ঠাকুরপো চাঁপাডাঙা দেখতে গেল—সঁচটা টাকাও তো দিতে হত পথ্যির খরচ বলে। তাই মানুকে বললাম, ভাসুর না দেক সোয়ামি না দেক তুই তো নিজে নাকছবি বেচেও দিতে পারতি? তোরই তো বাপ। তাই বেঁজে উঠল মানু।
–উঁহুঁ। গড়ে বললে কথা। মিথ্যে বললে। বল আমার পায়ে হাত দিয়ে।
–তুমি অতি অবিশ্বাসী, অতি কুটিল। ছি-ছি-ছি—
–আমি অবিশ্বাসী কুটিল?
–হ্যাঁ, শুধু তাই না। তুমি কৃপণ, তুমি অভদ্র।
–কাদু।
ছোট বউয়ের বাপের অসুখে দশ টাকা তত্ত্ব বলে দেওয়া উচিত ছিল না তোমার? ভিখিরিকে ভিক্ষে দিতে তোমার মন টনটন করে। ছি তোমার টাকা-পয়সাকে।
ঢাকের আওয়াজ খুব জোর হইয়া উঠিল।
বড় বউ ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল।
সেতাব উঠিয়া দাঁড়াইয়া বলিল, এই মরেছে। ঢাক আবার বাড়িতে কেন রে বাবা? এই মরেছে।
সে দরজা খুলিয়া উঁকি মারিল।
দেখিল, দাওয়ায় বড় বউ ও ছোট বউ দাঁড়াইয়া আছে।
ওদিকে দরজা দিয়া উঠানে গাজনের সঙ প্রবেশ করিতেছে।
শিব সাজিয়া মহাতাপ নাচিতেছে। লম্বা-চওড়া বলিষ্ঠ শরীর।
শিব তাহাকে খুব ভাল মানাইয়াছে। দাড়ি-গোঁফ-জটায় তাহাকে চেনা যায় না।
সঙের দল গান গাহিতে গাহিতেই প্রবেশ করিল। তাহারা গাহিতেছে—গাহিতেছে পার্বতীর সখী, জয় বিজয়া।
শিবো হে, শিবো হে, অ শিবো শঙ্কর হে।
হাড়মালা খুলে ফুলোমালা পরো হে,
অ শিব শঙ্কর হে।
হায়—হায়—হায়—হায়—
ফুল যে শুকিয়ে যায়–
গলায় বিষের জ্বালায় শিবো জ্বরত্বর হে!
অ শিবো শঙ্কর হে।
শিব :- তা থৈ থৈ তা থৈ থৈ–বম্ বম্
হর হর—সব হর হে।– (নাচন)
জয় বিজয়া :-
হায় রে হায় রে–
মদন পুড়ে ছাই রে–
লাজে কাদে পার্বতী
ঝর ঝর হে–।
গাজনে নাচন শিবো সম্বর হে।
শিব শঙ্কর হে।
গান শেষ হইবামাত্র শিব-বেশী মহাতাপ ভিক্ষার থালাটা পাতিয়া ধরিল। ঘরের ভিতর হইতে সেতাব বাহির হইয়া আসিয়া বলিল, কি? বলি এসব আবার কি?
বড় বউ বলিল, থাম তুমি। দাঁড়াও, এনে দিই আমি।
–না, যত সব অনাছিষ্টি কাণ্ড! আমাদের গায়ে গাজন নাই, তা ভিন গা থেকে গাজনের সঙ! দিন দিন নতুন ফ্যাচ্যাং।
বড় বউ ফিরিয়া আসিয়া শিবের হাতের থালাটা টানিয়া লইয়া তাহাতে দুইটা টাকা দিয়া অন্যদের দিকে বাড়াইয়া ধরিল।
সেতাব বলিল, ও কি? দু টাকা? দু টাকা কি ছেলেখেলা নাকি?
—থাম বলছি। ও টাকা তোমার নয়। নাও গো, নিয়ে যাও তোমরা। বলিয়া শিব ছাড়া অন্য একজনের হাতে দিল। তারপর সঙ্গে সঙ্গেই শিবের হাতখানা চাপিয়া ধরিয়া বলিল, না। আর তোমার যাওয়া হবে না। ঢের নাচন হয়েছে। অনেক ভাঙ খাওয়া হয়েছে। চাঁপাডাঙা। যাই বলে পাঁচ দিন নিরুদ্দেশ। ছাই মেখে, ভস্ম মেখে, নেচে বেড়াচ্ছ! ছি-ছিছি! যাও, তোমরা যাও বলছি। ঢের সঙ হয়েছে। যাও। এই নাও তোমার জটা-দাড়ি-গোঁফ নাও।
দাড়ি-গোঁফ-জটা টানিয়া খুলিয়া দিল।
মহাতাপ বার-দুই চাপিয়া ধরিয়া অবশেষে কাতরভাবে অনুরোধ করিল, বড় বউ! বউদিদি! পায়ে পড়ি তোমার, পায়ে পড়ছি আমি।
মানদা দাঁড়াইয়া দেখিতেছিল। মহাতাপের স্বরূপ প্ৰকাশ হইতেই ঘোমটা টানিয়া বলিল, মরণ। বলিয়া ঘরে চলিয়া গেল।
—তাতে আমার পাপ হবে না। কিন্তু এমনি করে সঙ সেজে বেড়াতে তোমাকে আমি দেব না।
তারপর দলের লোকদের লক্ষ্য করিয়া বলিল, যাও না তোমরা। কথা বললে শোন না কেন? সঙ দেখাতে এসে সঙ দেখতে লাগলে যে! সংসারে সঙের অভাব? কারও বাড়িতে কি এমন সঙ হয় না? সকলের বাড়িতেই হয়—আমরা যাই দেখতে সে সঙ?
মহাতাপও এবার চেঁচাইয়া উঠিল, যাও যাও, সব বাহার যাও। নেহি যায়েগা; হাম নেহি যায়েগা। ভাগো। ভাগো।
সেতাব ওদিকে বারান্দায় আপন মনেই পায়চারি করিতেছিল এবং বলিতেছিল, হুঁ!! যত সব কেলেঙ্কারি! হু! মানসম্মান আর রইল না। হুঁ!
ধমক খাইয়া সঙের দল বাহিরে চলিয়া গেল।
রাস্তার উপর আসিয়া দলের মধ্যে বসা শুরু হইয়া গেল। নন্দী নিজের জটা খুলিয়া ফেলিয়া ক্ৰোধভরে বলিয়া উঠিল, তখুনি বলেছিলাম—পাগলাকে দলে নিও না! তখন সব বললে—দশ টাকা চাঁদা দেবে। চেহারা ভাল, গানের গলা ভাল। এখন হল তোর।
বিজয়া খিলখিল করিয়া হাসিয়া বলিল, অঃ, বেচার এবার শিব সাজতে না পেয়ে রাগ খুব!
–খবরদার বলছি, চ্যাংড়া ছেড়া। একটি চড়ে তোমার বদনখানি বেঁকিয়ে দেব।
—চুপ চুপ, ঝগড়া কোরো না! চল, বাড়ি চল সব। রাস্তাতে বেচাকে শিব সাজিয়ে নেব চল। উ যে এমন করবে তা কে জানে!কথাটা বলিল—জামাকাপড়ে আধুনিক ম্যাট্রিক-ফেল চাষীর ছেলে ঘোঁতন ঘোষ।
—তা–কে জানে–! কেন, মহাতাপের মাথা খারাপ সেই ছেলেবেলা থেকে, কেউ জান না, নাকি?
বিজয়া সাজিয়াছিল যে ছেলেটা, সেটা দেখিতে কুৎসিত, খুব ঢাঙা, রঙ কালো। সে আবার আসিয়া বলিল, বেচা শিব সাজলে আমি দুগ্গা হব। রমনা হবে বিজয়া। মুখে কাপড় দিয়া সে হাসিতে লাগিল।
হঠাৎ উচ্চ কাঁচ শব্দ করিয়া মণ্ডলবাড়ির বাহিরের দরজা খুলিয়া গেল। গলা ঝাড়িয়া সেতাব বাহির হইয়া আসিল।
জনতা স্তব্ধ হইয়া গেল। এ উহার মুখের দিকে চাহিল। দলপতি ঘোঁতনই ভ্রূ কুঁচকাইয়া বলিল, চল চল। বলিয়া সে সর্বাগ্রে হনহন করিয়া চলিতে শুরু করিল।
তাহার পিছনে পিছনে সকলে। সেতাব ডাকিল, এই ঘোঁতন, এই! এই! এই! দলের একজন বলিল, ঘোঁতনদা ডাকছে যে বড় মোড়ল!
—ডাকুক। মরুক চেঁচিয়ে গলা ফাটিয়ে। বেটা আমার কাছে ধান পাবে। চলে আয়। সে। হনহন করিয়া চলিতে লাগিল।
সেতাব রাস্তায় নামিল।
ঘোঁতন তাহার কথা শুনিল না দেখিয়া রাগিয়া গেল এবং চিৎকার করিয়া বলিল, নালিশ করব আমি।
ঘোঁতন এবার ফিরিয়া দাঁড়াইয়া বলিল, কর। মহাতাপ পাওনা ধান ছেড়ে দেবে আমাকে কড়ার করায় তবে ওকে আমি শিবের পাট দিয়েছি। লোকে সাক্ষি দেবে। বোঁচা বল্ না রে!
সেতাব চমকিয়া উঠিল।
ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে কয়েক মুহূর্ত চাহিয়া থাকিয়া হনহন করিয়া ঘরের দিকে চলিয়া গেল।
বাড়ির মধ্যে ঢুকিয়া দেখিল—উঠানে একটা জলচৌকির উপর মহাতাপ বসিয়া আছে এবং কৃষাণ নোটন উঠানের কোণের পাতকুয়া হইতে জল উঠাইতেছে, রাখালটা মাথায় ঢালিতেছে। মহাতাপ খুব আরাম করিয়া স্নান করিতেছে; মধ্যে মধ্যে মুখে জল লইয়া ফু-ফু করিয়া উপরে আশপাশে ঘুড়িতেছে। বড় বউ দাওয়ায় দাঁড়াইয়া আছে। তাহার হাতে গামছা। পাশে দড়ির আলনায় কাপড়। বড় বউয়ের কোলে মহাতাপের পাঁচ বছরের হৃষ্টপুষ্ট ছেলে মানিক।
বাপের জল-কুলকুচার রকম দেখিয়া সে খুব হাসিতেছে।
সে বলিল, বাবা কি করছে? ব-মা?
কাদু বলিল নোটন ও রাখালকেওই হয়েছে, ঢের হয়েছে। আর থাক।
মহাতাপ বলিল, উঁহুঁ। হয় নাই, এখনও হয় নাই। ঢাল্, নোট্না ঢাল্।
বলিয়াই জল ছুঁড়িল—ফু!
মানিক বলিল, বাবা কি করছ?
–গঙ্গা ঝরতা হ্যায় রে বেটা। শিবকে শির পর গঙ্গা ঝরতা হ্যায়। গান ধরিয়া দিল—
ঝর ঝর ঝর ঝর গঙ্গা ঝরে
শিরোপরে গঙ্গাধরের রে!
