- প্রথম পরিচ্ছেদ: দেবগ্রামের পথে
- দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: মহাতাপ কথাটা মিথ্যা বলে নাই
- তৃতীয় পরিচ্ছেদ: দিন কয়েক পরের কথা
- চতুর্থ পরিচ্ছেদ: দেখিতে দেখিতে বৰ্ষা নামিয়া পড়িল
- পঞ্চম পরিচ্ছেদ: ভাদ্র মাস পড়িয়া গিয়াছে
- ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ: ভাদ্র শেষ হইয়া গিয়াছে
- সপ্তম পরিচ্ছেদ: পূজা আসিয়া পড়িয়াছে
- অষ্টম পরিচ্ছেদ: পরদিন সপ্তমীর সকাল
- নবম পরিচ্ছেদ: নবমীর রাত্রিকাল
বাহিরে আসিয়া সে দেখিল, সেতাব বসিয়া পত্ৰ লিখিতেছে। দাঁড়াইয়া আছে নোটন। চিঠিখানা শেষ করিয়া সে পড়িয়া লইল—
শ্ৰীমণিলাল পাল কল্যাণবরেষু,
অত্র পত্রের ব্যাপার জরুরি জানিবে। তুমি পত্রপাঠ লোক মারফত চলিয়া আসিবে। এখানে তোমার ভগ্নী কিছুতেই থাকিতে পারিতেছে না। আমরা ভায়ে ভায়ে পৃথকা হইতেছি। এ সময় চাঁপাডাঙার বউকে ওখানে লইয়া না গেলে কোনো মতেই চলিবে না। তুমি পত্রপাঠ আসিবে। অন্যথায় চাঁপাডাঙার বউকে হয়ত একাই পাঠাইয়া দিতে হইবে। সে ক্ষেত্রে আমাকে দোষ দিলে চলিবে না। ইতি–
শ্ৰীসেতাবচন্দ্র মণ্ডল
পড়িয়া দেখিয়া চিঠিখানি মুড়িয়া নোটনের হাতে দিয়া বলিল, চলে যা। কাল মণিকে সঙ্গে করে নিয়ে আসবি। খবরদার, কোনো কথা ভাবি না।
নোটন চিঠিখানা লইতে হাত বাড়াইল।
রাখাল বলিল, সেতাব!
—ফ্যাচফাচ করিস না রাখাল। পিছু ডাকিস না। বাড়ি যা।
–ওহে, চাঁপাডাঙার বউমাকে–
–রাখাল, তু বাড়ি যা।
রাখাল থামিয়া গেল। ভয় পাইল।
সেতাব চিঠিখানা নোটনের হাতে দিয়া বলিল—তু সব বলবি। যা ঘটেছে মুখে বলবি। বুঝলি?
রাখাল চলিয়া গেল এবার।
সেতাব আবার বলিল—যাবার পথে ঘোঁতনকে ঘোঁতনকে বলবি, আমি ডেকেছি। আমি ডেকেছি।
নোটন তবু চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল।
সেতাব বলিল—কি? দাঁড়িয়ে রইলি যে?
ওদিকে চণ্ডীমণ্ডপে সানাই ঢোল ঢাক বাজিয়া উঠিল। সপ্তমী পূজার ঘট আনিবার সময় হইয়াছে।
সেতাব আবার বলিল, নোটন!
এবারে নোটন বলিল, ওই শোন, পূজার ঢাক বাজছে। ঘট আসছে মোড়ল। সে সব বুঝিয়াছে।
সেতাব রূঢ়কণ্ঠে বলিল, নোটন।
নোটন পুরনো লোক, এই ঘরের সুখদুঃখের সঙ্গে তাহার জীবনটা জড়াইয়া গিয়াছে শত পাকে সহস্ৰ বয়নে। সে বলিল, যা করবে পূজার পরে কোরো। মোড়ল, আজ সপ্তমী পুজোর দিন; ঠাকুরুনের ঘট আসবে, সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ্মী পাতবে, আজ ঘর ভাঙার ধুয়ে তুলো না। বেসজ্জনের বাজনা বাজিও না।
সেতাব তাহার হাতের চিঠিটা লইতে উদ্যত হইল। বলিল, তুই যাবি কি না বল?
নোটন তাহার হাতখানা সরাইয়া লইয়া বলিল, যাব। তুমি মনিব। কথা শুনতে হবে আমাকে। চললাম আমি। কিন্তু মাঠে ধান মরছে, শো-শে ডাক ধরেছে মাটিতে। জল নাই। জল হবে না। আকাশের জল হবে না। এ আমি বললাম তোমাকে। যা হয় কোরো।
সে চলিয়া গেল।
পথে একটি বাড়ির দরজায় দাঁড়াইয়া তখন বহুবল্লভ বাউল একতারা এবং বায়া বাজাইয়া গান ধরিয়াছিল–
কমল-মুখ শুকায়ে গেছে, আয় মা আয় মুছায়ে দি,
মায়ের কোলে শয়ন কর মা, শীতলপাটি বিছায়ে দি।।
বল বল মা কানে কানে
কি দুঃখ পেলি কোমল প্ৰাণে
শ্মশান-তাপে জ্বলছে দেহ,
আঁচল-বায়ে ঘুচায়ে দি।
আয় মা মুখ মুছায়ে দি।
আগমনী গানের বাৎসল্য রস অনাবৃষ্টি—শুষ্ক শরতের আকাশের উত্তপ্ত নীলিমাকে সকরুণ করিয়া তুলিয়াছিল।
বড় বউয়ের কানে ওই গানের সুর ভাসিয়া আসিতেছিল। এ গান যেন দূর চাঁপাডাঙায় বসিয়া তাহারই মা গাহিতেছে। সে তো যাইবে। এ বাড়ির মেয়াদ তাহার ফুরাইয়াছে। সে কথা সে জানিয়াছে। তাহার নিজের চিত্তের সকল মায়া সব মমতাই কাটিয়াছে। তাহার স্বামীরও কাটিয়াছে। সব ভালবাসা মায়ানদীর মত শুকাইয়া গিয়া মরুভূমিতে পরিণত হইয়াছে। সেই মরুভূমির বুকের মধ্যে সেতাবের অন্তরের রূপটা ফুটিয়া উঠিয়াছে। সে চায় নূতন ঘর, নূতন সংসার, নূতন–
হাসি ফুটিয়া উঠিল তাহার মুখে। তাহার প্রতি এই কদর্য সন্দেহ একান্তভাবেই মিথ্যা। এতকাল এইভাবেই তো ঘর করিয়া আসিল সে। এমনিভাবেই তো সে মহাতাপকে স্নেহ করিয়াছে, এমনিভাবেই তো মহাতাপ আবদার করিয়াছে। কই, এতকালের মধ্যে এমন সন্দেহ তো হয় নাই? হঠাৎ আজ, আজ কেন হইল? ওই তাহার নূতন গোপন সাধটা তাহার চোখে ফুলি পরাইয়া দিয়া সংসারটাকে কালো করিয়া দেখাইয়া তাহাকে জোর দিতেছে।
ঠিক এই সময়েই কে ডাকিল, বউমা!
চমকিয়া উঠিল চাঁপাডাঙার বউ। সে সবিস্ময়ে প্রশ্নভরা দৃষ্টিতে সিঁড়ির দিকে চাহিয়া রহিল।
সিঁড়ির নিচে হইতে আগন্তুক কথা বলিল, আমি মা, রাখাল।
চাঁপাডাঙার বউ ধীরে ধীরে উঠিয়া বসিল।
রাখাল উঠিয়া আসিল; সে একা নয়, তাহার সঙ্গে একটি আট-নয় বছরের মেয়ে। তাহার হাতে এক বাটি দুধ। রাখাল বলিল, তোমার জন্যে দুটুকু নিয়ে এলাম মা। খাও তুমি। দে মা দেী, খুড়ীমাকে দুধের বাটিটা দে।
চাঁপাডাঙার বউ মাথার ঘোমটাটা বাড়াইয়া দিয়া বলিল, পূজার ঘট আসছে। আমাকে লক্ষ্মী পাততে হবে। তার আগে তো খাব না!
–মা, এই দেহে তুমি মাথা ঘুরে আবার পড়ে যাবে।
–না! পারব আমি। খুব পারব।
সে ধীরে ধীরে দেওয়াল ধরিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। বলিল, তুই রাষ্য দেী, আমি লক্ষ্মী পেতে এসে খাব।
রাখাল বলিল, খেঁদী, তুই সঙ্গে যা। বুঝলি, সঙ্গে যা।
ওদিকে ঢাক ঢোল সানাই কঁসির শব্দ উচ্চ হইয়া উঠিল। চণ্ডীমণ্ডপে ঘট আসিল। শাঁখ বাজিল, উলু পড়িল।
চণ্ডীমণ্ডপে এবার পূজার আয়োজন সবই হইয়াছে; কিন্তু তাহাতে প্ৰাণ নাই, সমারোহ জমিয়া উঠিতেছে না। সব যেন বিষণ্ণ চিন্তাভারক্লিষ্ট। আকাশে জল নাই, চাষীর দৃষ্টি আকাশের দূর-দিগন্তে, চিত্ত উদ্বেগকাতর। তাহার উপর সেতাবদের এই কলহটাও একটা বেদনাতুর প্রভাব বিস্তার করিয়াছে। ছেলেরা শুধু ছুটাছুটি করিতেছে। তাহার মধ্যে মানিকও রহিয়াছে। তাহাকে আনিয়াছে গোবিন্দ। খালি গা, জামাও কেহ একটা পরাইয়া দেয় নাই। সে একটা রঙিন বাঁশি লইয়াই খুশি আছে। সেইটাই সে বাজাইতেছে–পু-পু! পু-পু! বাজাইতেছে আর ঘুরিয়া বেড়াইতেছে।
মণ্ডলেরা বসিয়া আছে, তামাক টানিতেছে, কিন্তু আসর ঝিমাইয়া গিয়াছে। কেহ বড় একটা কথা বলে না। চেঁচাইতেছে শুধু টিকুরীর খুড়ী।
—অবিশ্বেস, অনাচার, অবিচার-বলি এর চেয়ে পাপ আর কি হবে? বলি ইয়েতে কি ধৰ্ম থাকে, না দেবতা তুষ্ট হয়। মোড়লেরা কি সব ধর্মজ্ঞান চিবিয়ে খেয়েছে নাকি? বলি পূজা করা কেনে?
বিপিন মণ্ডল সোজা হইয়া বসিল। বলিল—টিকুরীর বউ, তুমি এমন করে ফেঁচাও ক্যানে গো? বলি এমন করে চেঁচাও ক্যানে গো?
—চেঁচাবে না? বলি মোড়লেরা যে চোখ-কানের মাথা খেয়েছে। বলি সেতাবের থেকে এখনও পুজো এল না, সেদিকে নজর আছে?
পাঁচ আনার অংশীদার সেতাব চণ্ডীমণ্ডপের সম্মুখে রাস্তার উপর ঘোঁতনের সঙ্গে কথা বলিতেছিল।
বিপিন মণ্ডল বিস্মিত এবং ব্যস্ত হইয়া উঠিল। প্রতি বৎসর পূজায় চাঁপাডাঙার বউ ষষ্ঠীর সন্ধ্যা হইতে দশমী পর্যন্ত চণ্ডীমণ্ডপে সারাক্ষণ হাজির থাকিয়া সকল অনুষ্ঠান নিখুঁত করিয়া দেয়। সেতাবের দৃষ্টিও এদিকে খুব প্রখর। ভাগের ব্যাপারে সে সকল ভাগীর পূজা বুঝিয়া লয়, নিক্তির ওজনে মাপিয়া বুঝিয়া লইয়া ছাড়ে। একুশ সের আতপের নৈবেদ্য বরাদ্দ আছে। সেতাব চণ্ডীমণ্ডপে মাপের সের হাতে করিয়া বসিয়া থাকে। সর্বাগ্রে চাঁপাডাঙার বউ তাহাদের একের তিন অংশের সাত সের আতপ, সোয়া-পাঁচ গণ্ডা রম্ভার ভাগ সাতটা রম্ভা, সোয়া-পাঁচ পো চিনির সাত ছটাক চিনি, তাহার সঙ্গে আনুষঙ্গিক পূজার জিনিসগুলি একটি ডালায় গুছাইয়া সাজাইয়া লইয়া আসিয়া নামাইয়া দেয়। সেতাব সব বুঝিয়া লইয়া হাঁকাহকি করে—কই সব, কই গো! ভাগীদাররা সব ঘুমুচ্ছে নাকি?
এবার তাদের বাড়িতে একটা আকস্মিক কলহ বাঁধিয়া উঠিয়াছে, তবু পূজা আসিবে না–এ কথা কল্পনা করিতে পারে নাই। চাঁপাডাঙার বউয়ের অবস্থাও বিপিন নিজে দেখিয়া আসিয়াছে; সেতাবও কথার মধ্যে অনেক কিছু বলিয়াছে, তাহার অবশ্য আজ বাহির হইবার কথা নয়, সামর্থও নাই। কিন্তু সেতাব আছে, ছোট বউ আছে।
বিপিন উঠিয়া দাঁড়াইল। ডাকিল—সেতাব!
রাস্তার উপর হইতে সেতাব উত্তর দিল—যাই।
—যাই নয়। বাড়ি যাও। পূজার সামিগ্যিরি আসে নাই। পাঠিয়ে দাও।
টিকুরীর খুড়ী হাকিয়া বলিল—তোমাদের ছোট বউকে পাঠিয়ে দিও, বুঝলে বাবা! বড়। বউকে পাঠিও না।
ঠিক সেই মুহূর্তেই চণ্ডীমণ্ডপের পিছন দিক দিয়া প্রবেশ করিল পুঁটি ও বড় বউ। পুঁটি স্নান করিয়াছে, বড় বউও স্নান করিয়াছে। পুঁটির হাতে পূজার সামগ্রীর ডালা। সে আসিয়া ডালা নামাইয়া দিল।
পুঁটিকে তাহার মা পাঠাইয়া দিয়াছে। পাঠাইয়াছে গুজবের কথাটা বলিতে। বলিয়াছে, লজ্জা করলে চলবে না। বলবি। কাদু আমার পেটের মেয়ের অধিক! কিন্তু কাদুর অবস্থা দেখিয়া পুঁটি। সেকথা বলতে পারে নাই। বলিয়াছে, পুজো দেখতে এলাম দিদি তোমার বাড়ি। কাদু পূজার সামগ্রীর ডালাটা তাহার হাতেই দিয়া সঙ্গে লইয়া আসিয়াছে।
বড় বউকে দেখিয়া সকলে অবাক হইয়া গেল। এত বড় ঘটনা গ্রামে চাপা থাকিবার কথা নয়, সেতাব নিজেই চেঁচামেচি করিয়াছে। ইহার পরও বড় বউ আসিয়া চণ্ডীমণ্ডপে সকলের সমুখে দাঁড়াইবে, এ কথা কেহ কল্পনা করতে পারে নাই।
পুঁটি পূজার ডালাটা নামাইয়া দিল। বড়
