- প্রথম পরিচ্ছেদ: দেবগ্রামের পথে
- দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: মহাতাপ কথাটা মিথ্যা বলে নাই
- তৃতীয় পরিচ্ছেদ: দিন কয়েক পরের কথা
- চতুর্থ পরিচ্ছেদ: দেখিতে দেখিতে বৰ্ষা নামিয়া পড়িল
- পঞ্চম পরিচ্ছেদ: ভাদ্র মাস পড়িয়া গিয়াছে
- ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ: ভাদ্র শেষ হইয়া গিয়াছে
- সপ্তম পরিচ্ছেদ: পূজা আসিয়া পড়িয়াছে
- অষ্টম পরিচ্ছেদ: পরদিন সপ্তমীর সকাল
- নবম পরিচ্ছেদ: নবমীর রাত্রিকাল
বলিল, জবাবও তুমি দেবে না! চাঁপাডাঙার বউ!
এতক্ষণে চাঁপাডাঙার বউ বলিলবল।
–আমার পা ছুঁয়ে বল তুমি।
–কি!
—যা দেখেছি তা ভুল। যা বুঝেছি তা ভুল। বল, আমার পা ছুঁয়ে বল? ওঠ।
সে বড় বউয়ের হাত ধরিয়া রূঢ় আকর্ষণে টানিয়া তুলিল এবং নিজের পাখানা বাড়াইয়া। দিয়া বলিল, আমার পা ছুঁয়ে বল?
বড় বউ তাহার মুখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে চাহিয়া থামিয়া বলিল, না! তারপর উঠিয়া ধীরে ধীরে বাহিরে চলিয়া গেল। বাহিরে আসিয়া বারান্দায় শুইয়া পড়িল।
সামনে জ্যোৎস্না-ঝলমল পৃথিবী। আকাশে জ্যোৎস্না, গাছের পল্লবে জ্যোৎস্না। কিন্তু তাহার উপর একটা যেন ছায়া পড়িয়াছে। পূর্ব দিকে দিগন্তে মেঘ উঠিয়াছে, এক কোণে তাহারই ছায়া পড়িয়াছে—জ্যোৎস্না-আলোকিত পৃথিবীর উপর। মধ্যে মধ্যে বিদ্যুৎ চমকাইতেছে। সে চমক চকিত স্বল্প অস্পষ্ট। ইঙ্গিতস্পষ্ট প্রকাশ নয়।
শুইয়া শুইয়া কত কথাই তাহার মনে উঠিল। একবার মনে হইল সেতাবের পায়ে আছাড় খাইয়া পড়িয়া পা দুইটাকে জড়াইয়া ধরিয়া বলিবে—তুমি সত্যিই অন্ধ, তুমি সত্যিই অন্ধ। এই কথাটাই তোমার পা ছুঁয়ে আমি তোমাকে বলছি। আর শেষ মিনতি করছি, মেরেই ফেল আমাকে। মেরেই ফেল। কি করে এই মুখ নিয়ে চাঁপাডাঙায় গিয়ে দাঁড়াব আমি?
সেতাব ঘরের মধ্যে পায়চারি করিতেছিল। চিন্তায় সে অধীর অস্থির।
চাঁপাডাঙার বউয়ের উপর নিষ্ঠুর আক্রোশ যেন মুক্ত প্রবাহে বাহির হইবার পথ পাইতেছে। না। কোথায় যেন বাধা পাইয়া নিজের বুকে ফিরিয়া আসিয়া ধাক্কা মারিতেছে। কোনো মতেই সে অপরাধের পাহাড়টা উহার মাথায় চাপাইয়া দিয়া ছাড়িয়া দিতে পারিতেছে না। বড় বউ উপুড় হইয়া মুখ থুবড়াইয়া পড়িয়া গিয়া পিষিয়া যাইতেছে না। সে জলের ঘটি হইতে জল দিয়া মাথা ধুইয়া ফেলিল। তারপর শুইয়া পড়িল।
সব স্তব্ধ। রাত্রি শনশন করিয়া বহিয়া চলিয়াছে। অসংখ্য-কোটি কীটপতঙ্গ অবিরাম এক বিচিত্র ঐকতান বাজাইয়া চলিয়াছে। বাহিরে এক সময় একটা পাঁচা ডাকিয়া উঠিল। সেতাব। চমকিয়া উঠিল। কান পাতিয়া কিছু শুনিবার চেষ্টা করিল। কই, বড় বউয়ের নিশ্বাসের শব্দ শোনা যায় কই? সে সন্তৰ্পণে বিছানা ছাড়িয়া বারান্দার দিকের দরজার পাশে দাঁড়াইয়া উঁকি মারিয়া দেখিল।
আকাশের জ্যোৎস্না আভাস আসিয়া পড়িয়াছে। বারান্দার ভিতরে বারান্দার রেলিঙের খানিকটা পাশ পর্যন্ত জ্যোৎস্নই রহিয়াছে। সেখানে রেলিঙের ছায়া পড়িয়াছে। ভিতরটায় আবছা আলোঅ্যাঁধারি, তাহারই মধ্যে সাদা-কাপড়-ঢাকা বড় বউ নিথর হইয়া পড়িয়া আছে।
সে আবার আসিয়া বিছানায় শুইল। আবার উঠিল, একটা বালিশ তুলিয়া লইয়া জানালার ধারে রাখিয়া শুইয়া পড়িল। বাহিরে দিগন্তে মেঘ ঘন হইতেছে। বাতাস উঠিতেছে মৃদুমন্দ। সেই বাতাসে তাহার তন্দ্ৰা আসিল।
হঠাৎ তন্দ্ৰা ভাঙিয়া গেল। পায়ে যেন কিছুর স্পর্শ অনুভব করিতেছে সে। দেখিল, পায়ের তলার দিক হইতে চাঁপাডাঙার বউ সিঁড়ির দিকে মুখ ফিরাইয়া পা বাড়াইয়াছে। বারান্দার দরজাটা ঠিক পায়ের কাছেই। বারান্দা হইতে উঠিয়া আসিয়াছে বড় বউ। সিঁড়ি দিয়া নামিয়া চলিয়াছে। সেতাব চঞ্চল হইল না। সে স্থির হইয়া ঘুমন্তের মত পড়িয়া রহিল। বড় বউ নামিয়া গেল। সে উঠিয়া কান পাতিয়া রহিল। সিঁড়ির দরজাটা খুলিয়া গেল। এবার সে উঠিল, ঘরের এক কোণে কয়েকটা জিনিসের সঙ্গে ছিল একখানা দা। সে দাখানা লইয়া নামিয়া গেল।
মহাতাপ বাহিরের বারান্দায় পড়িয়া আছে। শুইবার আগে মানদাকে বলিয়াছে, শাসাইয়াছেনা, না। আমার ঘরে কাজ নাই। নে, তুই ঘর নে, দোর নে, বিষয় নে, আমি চাই না। এই বাইরে থাকছি রাতটার মত। কাল চলে যাব। নিশ্চয় চলে যাব।
বড় বউ সত্যই মহাতাপের বাড়ির দিকেই গেল। মাঝখানে উঠানে পঁচিল পড়িয়াছে। প্রায় হাত দুয়েক উঁচু পর্যন্ত গাথা হইয়া গিয়াছে। বড় বউ সন্তৰ্পণে পচিল পার হইয়া ওপারে দাওয়ার ধারে দাঁড়াইল। মহাতাপ বারান্দাতেই শুইয়া আছে। বারান্দার গায়ে খোলা দরজার ভিতর মিটমিটে লণ্ঠনের স্বল্পালোকিত ঘরে মানদা মানিককে লইয়া শুইয়া আছে, দেখা যাইতেছে। বড় বউ দাওয়ায় উঠিল। মহাতাপের মাথার কাছে একটি ছোট পুঁটুলি নামাইয়া দিয়া দ্রুতপদে। বারান্দার ওই প্রান্তে খিড়কির দরজা দিয়া বাহির হইয়া গেল।
মহাতাপও ভাল করিয়া ঘুমায় নাই। বড় বউয়ের দরজা খোলার শব্দে সে জাগিয়া উঠিল, তাকাইয়া দেখিল—একটি মূর্তি বাহির হইয়া গেল; অঙ্কুটস্বরে সে সবিস্ময়ে বলল, বড় বউ? সে হাতে ভর দিয়া উঠিয়া গেল। দেহে তাহার জ্বর রহিয়াছে। হাতে একটা কি ঠেকিল। সে সেটা লইয়া টিপিয়া দেখিল। এ কি? টাকা? গয়না? বড় বউয়ের দ্রুত অনুসরণ করিল। সে বুঝিয়াছে, সে বুঝিয়াছে। বড় বউয়ের মতলব সে বুঝিয়াছে।
সে বাহির হইয়া গেল।
সঙ্গে সঙ্গে মানদাও বাহির হইয়া আসিল বারান্দায়। খোলা খিড়কির দরজার দিকে চাহিয়া দেখিল সে। একটু হাসিল, তারপর সে অনুসরণ করিল।
এবার উঠানে নামিয়া আসিল সেতাব। তাহার হাতের দাখানা জ্যোৎস্নায় ঝলকিয়া উঠিল।
মহাতাপ খিড়কির দরজার বাহির হইয়া চারিদিকে চাহিয়া দেখিল। কয়টা গাছের তলায় অন্ধকার, তাহার ওপারে জ্যোৎস্নালোকিত পৃথিবী। ভরা পুকুরটা জ্যোৎস্নায় ঝকমক করিতেছে। চাঁদ পুকুরের জলে চাদমালা হইয়া কাঁপিতেছে।
পুকুরের ঘাটে দাঁড়াইয়া বড় বউ।
বড় বউ বসিল। কাপড়ের অ্যাঁচলের ফালি ছিঁড়িয়া ফেলিল। সে মরিবার জন্য আসিয়াছে। সে জলে ড়ুবিয়া মরিবে। কাপড়ের ফালি দিয়া পা দুইটিকে বাঁধিবো বুকের কাপড়ে একখানা ইট। শুইয়া শুইয়া সে অনেক ভাবিয়াছে। ছিঃ! ছিঃ! কোন্ মুখে সে চাঁপাডাঙায় ফিরিয়া যাইবে? লোকে শুধাইলে কি বলিবে?
সে সঙ্কল্প করিয়াই বাড়ি হইতে বাহির হইবার সময় তার গায়ের গহনা কয়খানা এবং গোপন সঞ্চয় শ দুয়েক টাকা পুঁটুলি বাঁধিয়া মহাতাপের মাথার শিয়রে নামাইয়া দিয়া আসিয়াছে। তাহার ছিল অনেক। সবই স্বামিত্বের দাবিতে সেতাব লইয়াছে। সে একটি কথাও বলে নাই। এই সামান্যটুকু সে মহাতাপকেই দিয়া যাইবে। মহাতাপকে বঞ্চিত করিয়াছে সেতাব।
বড় বউ পায়ে বাঁধন দিতেছিল।
গাছের তলার ছায়া হইতে মহাতাপ আসিয়া দাঁড়াইল। ডাকিল-বড় বউ!
চাঁপাডাঙার বউ চমকিয়া উঠিল। তাহার দিকে তাকাইয়া অস্ফুটস্বরে বলিল, মহাতাপ!
মহাতাপ বলিল, তুমি জলে ড়ুবতে এসেছ বড় বউ?
বড় বউ অবোধকে ছলনা করিতে চাহিল-কে বললে? আমি ঘাটে এসেছি ভাই। শরীরটা বড় জ্বলছে। চান করব।
—না।—ঘাড় নাড়িয়া মহাতাপ বলিল, আজ তুমি আমাকে ঠকাতে পারবে না। পায়ে তুমি দড়ি বাঁধছ! আমার মাথার শিয়রে তুমি গয়না-টাকা ফেলে দিয়ে এলে। আমি তখুনি বুঝেছি।
বড় বউ বলিল, আমি এই কলঙ্ক মাথায় নিয়ে চাঁপাডাঙায় কোন্ মুখে ফিরে যাব ভাই? তুমি কেন এসে এই সময়ে সামনে দাঁড়ালে মহাতাপ?
—আমি চলে যাচ্ছি। আমি কিছু বলব না। তুমি তাই মর। ওরা যে এমন ভাবে, তা আমি বুঝতে পারতাম না। তোমার গয়না-টাকা তুমি নাও। অ্যাঁচলে হাত না বেঁধেই ড়ুবে মর তুমি। যার পাওনা সে নেবে।
সে ফিরিতে উদ্যত হইল।
—মহাতাপ! দেও!
মহাতাপ ফিরিল। বড় বউ বলিল, ও তোমার পাওনা। তোমার দাদা তোমাকে ফাঁকি দিয়েছে।
আমি নিয়ে কি করব? তুমি ড়ুবে মর। আমিও চলে যাব ঘর থেকে। তুমি চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গে আমিও পথ ধরতাম।
–না, না। ও কথা বলতে নেই। মানুর কি হবে? মানিকের কি হবে!
—সে ওই জানে।-হাতখানা উপরের দিকে তুলিয়া দিল।তুমি যে ঘরে থাকবে না, সে ঘরে আমি থাকব না।
বড় বউ নিজেও আজ সচকিত হইয়া উঠিল। বিরক্ত হইল। ছিছি, ছিছি! কঠিন কণ্ঠেই বলিল, কিন্তু ক্যানে? ক্যানে তুমি আমার জন্যে ঘর ছাড়বে মহাতাপ? তোমার বউ, তোমার ছেলে, তোমার ঘর, তোমার বিষয়–
—আঃ! তুমিও তাই বলছ? হা-হা-হারে। সে যেন হাহাকার করিয়া উঠিল। তারপর আবার বলিল—শুধু বউ বেটা বিষয় নিয়ে ঘর হয়? মা না থাকলে হয়, মা থাকতে তাকে ছেড়ে বউবেটা নিয়ে ঘর? আমার মা বলে গিয়েছে, বড় ভাজ তোর মা। ছেলেবেলায় খেলাঘরে তুমি মা হতে আমি ছেলে হতাম—মনে নাই? বলে নাই লক্ষ্মণের কথা, সীতার কথা?
সে ছবি মুহূর্তে মনের মধ্যে ভাসিয়া উঠিল; সে কি ভুলিবার?
মনে হইল, সেই সেকালের যুগেই যেন ফিরিয়া গিয়াছে।
মহাতাপ আবার বলিল, মরণকালে মা তোমাকে বলে নাই–বউমা, মহাতাপ আমার পাগল, ও মা ছাড়া থাকতে পারে না তুমি ওর মা হয়ো? তোমার ছেলে-পুলে থোক, কিন্তু ঐ তোমার বড় ছেলে। বলে নাই? মনে নাই?
–আছে ভাই।
মনে আছে কেন, এই মুহূর্তে চোখের সম্মুখে ভাসিতেছে।
শুধু তাহারই নয়, শুধু মহাতাপেরই নয়, সেতাবের
