- প্রথম পরিচ্ছেদ: দেবগ্রামের পথে
- দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: মহাতাপ কথাটা মিথ্যা বলে নাই
- তৃতীয় পরিচ্ছেদ: দিন কয়েক পরের কথা
- চতুর্থ পরিচ্ছেদ: দেখিতে দেখিতে বৰ্ষা নামিয়া পড়িল
- পঞ্চম পরিচ্ছেদ: ভাদ্র মাস পড়িয়া গিয়াছে
- ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ: ভাদ্র শেষ হইয়া গিয়াছে
- সপ্তম পরিচ্ছেদ: পূজা আসিয়া পড়িয়াছে
- অষ্টম পরিচ্ছেদ: পরদিন সপ্তমীর সকাল
- নবম পরিচ্ছেদ: নবমীর রাত্রিকাল
নালিশ করিয়া প্রতাপের সম্পত্তি ক্রোক করিয়া বসিল।
প্ৰতাপ মণ্ডল হককের মানুষ ছিল। নামেও প্রতাপ কাজেও প্রতাপ ছিল। গ্রামের মাতব্বর, জমিদারের মণ্ডল, ইউনিয়ন বোর্ডের মেম্বার অনেক কিছু ছিল। গ্রামের কাছেই আধাশহর লক্ষ্মীপুরের ব্যবসায়ী মহাজন বাবুলোকদের কাছেও খাতির ছিল। মনটা ছিল উদার, মানুষটা ছিল দুর্দান্ত। বাড়িতে চাষের ধুম ছিল। লক্ষ্মীপুরের বাবুরাও অনটনের বর্ষায় তার কাছে ধান বাড়ি অর্থাৎ ধার লইত। হঠাৎ প্ৰতাপ মণ্ডল ব্যবসায়ে নামিয়া বসিল। নামিল নামিল এমন ব্যবসায়ে। নামিল যাহার সঙ্গে তাহার কোনো পরিচয় নাই। ইউনিয়ন বোর্ডের সেক্রেটারি জগাই পাঠককে শূন্য বরাদার করিয়া ঠিকাদারির কাজে নামিয়া পড়িল।
সালটা তখন ১৯২৬-২৭ সাল। সবে দেশে ইউনিয়ন বোর্ড হইয়াছে। প্রতাপ মণ্ডলের বোর্ডে হঠাৎ বছরের শেষাশেষি খবর আসিল—সরকার পানীয় জল সরবরাহের জন্য ইন্দারা করিতে টাকা দিবেন; শর্ত ইউনিয়ন বোর্ডকে এক-চতুর্থাংশ টাকা দিতে হইবে। এক-একটা ইন্দারার প্রায় পাঁচশো করিয়া টাকা খরচ, অর্থাৎ ইউনিয়ন বোর্ডকে একশো পঁচিশ আন্দাজ দিতে হইবে। প্রতাপ নিজের গ্রামে ইন্দারার জন্য চাঁদা তুলিতে চেষ্টা করিল কিন্তু পায়ে অনেক ধুলা মাখিয়া হাঁটাহাটি করিয়া পঁচিশ টাকা কয়েক আনার বেশি চাঁদা তুলিতে পারি না। এই সময় জগাই পাঠক তাহাকে পরামর্শ দিল—মোড়ল এক কাজ কর। ইন্দারাটা তুমি ঠিকে নিয়ে নাও। ঠিকাদারির একটা লাভ আছে তো, সেই লাভে ও টাকা উঠে যাবে! আমি দেখেশুনে সব ঠিক করে দেব।
ভয়ে ভয়েই প্রতাপ কাজে নামিল। কিন্তু ইন্দারাটা শেষ হইতেই ভয় কাটিয়া উৎসাহে মাতিয়া উঠিল। ঠিকা অর্থাৎ কনট্রাক্ট হইতে যাহা লাভ হইয়াছে তাহা দেয় সিকি টাকার বেশ কিছু উপরে উঠিয়া গিয়াছে। লোকাল কন্ট্রিবিউশান অর্থাৎ স্থানীয় চাঁদার দাবি ছিল সিকি অর্থাৎ শতকরা পঁচিশ, সেই স্থানে লাভ দাঁড়াইল শতকরা পঁয়ত্রিশ টাকা। বিল আদায় করিয়া নগদ পঞ্চাশ টাকা প্রতাপের হাতে তুলিয়া দিয়া সেক্রেটারি পাঠক বলিল দশ টাকা পুজো দিয়ে মোড়ল, পনের টাকা আমার, পঁচিশ টাকা তোমার।
প্রতাপের চোখ দুটো জ্বলিয়া উঠিল।
পাঠক বলিল, ইন্দারার কাজে তবু লাভ কম। রাস্তার ঠিকে কি সাঁকোর ঠিকে যদি হত না—তবে দেখতে অর্ধেক খরচ আর অর্ধেক লাভ। টাকায় টাকা। করবে ঠিকের কাজ? ইউনিয়ন। বোর্ডের নয়, ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের ঠিকে নেবে?
প্রতাপ কথা বলতে পারিল না, সেক্রেটারি পাঠকের মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। পাঠক চতুর লোক, তাহার উপমা দিয়া লোকে বলে—মৃগেল মাছ। পাক কাটিয়া চলে আবার সমানে ভাসিয়া সাঁতারও কাটে। প্রতাপের দৃষ্টির অর্থ তাহার বুঝিতে দেরি হইল না। পুকুরের জলের মধ্যে ভাসমান টোপের সম্মুখে মাছ স্থির হইয়া পাঁড়াইয়াছে। হাসিয়া পাঠক বলিলরাস্তার কাজ পাথর কুড়িয়ে জমা করা আর কাকর কেটে তোলা, তারপর গরুর গাড়িতে বয়ে ফেলা। আলমপুরের বাবুদের জমিদারিটাই রাস্তার কাজের পয়সায়। কাঁচা পয়সা হে! তারপর দশ টাকা ওভারসিয়ারের পকেটে খুঁজে দিলে মাপ বাড়িয়ে বিশ টাকা পাইয়ে দেবে তোমাকে। লেগে যাও। আমি বরং সব দেখেশুনে দেব তোমার। আমাকে দিয়ে কিছু। শূন্য বরাদার করে নিয়ো।
কথাগুলার একটাও মিথ্যা বলে নাই পাঠক। আলমপুরের বিখ্যাত জমিদারবাড়ির অভ্যুদয় এই রাস্তার কাজে কন্ট্রাক্টারি হইতেই। প্রায় একশো বছর আগে দুইটা জেলায় বড় বড় রাস্তাগুলো তৈয়ারি ও মেরামতের কাজ ছিল তাহাদের একচেটিয়া। এই ঠিকাদারির লাভ হইতেই আলমপুরের চৌধুরীরা তিরিশ হাজার টাকা আয়ের জমিদারি কিনিয়া পেশা চাষের পরিবর্তে দলিলদস্তাবেজে পেশা জমিদারি লিখিতে শুরু করিয়াছিলেন। আর ওভারসিয়ারের পকেটে খামে পুরিয়া টাকা দেওয়ার গল্প না জানে কে? বাইসিক্ল চড়িয়া হেটকোট পরিয়া সে-ওভারসিয়ার বাবুদের সে দেখিয়াছে। ইউনিয়ন বোর্ডের মেম্বার হইয়া তাহাদের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় হইয়াছে। সুতরাং–
সুতরাং সে নামিয়া পড়িল। এবং নামিয়াই সে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটিতে শুরু করিল। প্রথম বছরে লাভ হইল এক হাজার টাকার কিছু বেশি। প্রতাপ মূলধন লইয়াছিল তিন হাজারের কিছু কম। তিন হাজারে এক হাজার লাভ। দ্বিতীয় বৎসরে মূলধন বাড়াইয়া সে আট হাজার তুলিল; একটা ঘোড়া কিনিল, খান তিনেক সেকেন্ড হ্যান্ড বাইসিক্ল কিনিল এবং পাঠকের এক শালা ও এক ভাইপোকে কাজ দেখিবার জন্য মাসিক তিরিশ টাকা বেতনে কর্মচারী নিযুক্ত করিল। চার-পাঁচ জন সাঁওতাল সর্দার অর্থাৎ গ্যাঙ সর্দার, তিন জন গরুর গাড়ির সর্দার, এক জন রাজ মজুরদের। সর্দার নিযুক্ত করিয়া শোরগোল করিয়া কাজ জুড়িয়া দিল। নিজে ঘোড়ায় চড়িয়া ঘুরিতে লাগিল। পাঠক ঘুরিত একখানা নতুন বাইসিক্লে। প্রথম বছর তিনেক নিজের বাড়িতে ছিল সকল কাজের কর্মকেন্দ্র, বাইরের চাষের ঘরটাতেই চুন, সিমেন্ট, গাঁইতি, কোদাল, খাপত্র থাকিত; চতুর্থ বৎসরে নবগ্রামে ঘরভাড়া করিয়া আপিস বসাইয়া দিল। খাতায় পত্রে বাহিরের কাজ চলিতে লাগিল। পাঠক সদর শহরে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড আপিসে বিল হিসাব ইত্যাদি লইয়া মাসে পনের দিনের বেশি থাকিতে হয় বলিয়া সেখানে একটা ঘরভাড়া লইল।
প্রতাপ মোড়ল মোড়ল উপাধি ছাড়িয়া ঘোষ উপাধি কায়েম করিল। গ্রামের জ্ঞাতিকুটুম্বদের সঙ্গে ঝগড়া না করিয়াও পর হইয়া পাঁড়াইল। পোশাকে পরিচ্ছদে কথায় বার্তায় সে হইয়া গেল আর এক মানুষ। দলিলদস্তাবেজে সে পেশা চাষের বদলে পেশা ব্যবসায় লিখিতে আরম্ভ করিল। বাড়িতে প্রতাপের স্ত্রী শঙ্কিত হইল। প্রতাপ তাহাকে প্রায়ই বলিত, একটু সভ্য হও। চাষীর পরিবার যখন ছিলে তখন যা করেছ যা পরেছ যা বলেছ সেজেছে। এখন ভদ্রলোকের চালচলন শিখতে হবে। ও গোবর দেওয়া, কাপড় সেদ্ধ করা এসব ছাড়! মধ্যে মধ্যে বলিত, এখানকার ঘরবাড়ি যা আছে থাক, নবগ্রামে গিয়ে নতুন বাড়ি করব। অন্যদিকে ইউনিয়ন বোর্ডের সভ্যপদের উপর বক্রব্যঙ্গদৃষ্টি হানিয়া ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের সভ্য হইবার আয়োজন করিল। এমন সময় হঠাৎ একদা সে কোথা হইতে টাইফয়েড ধরাইয়া আনিয়া বিছানায় শুইল। এবং চব্বিশ দিনের দিন মারা গেল। প্রতাপের স্ত্রী জগাই পাঠককে ডাকিয়া বলিল পাঠক মশাই, কি হবে?
পাঠক বলিল—তাই তো? আমি তো মাথায় হাত দিয়ে বসে গিয়েছি বাপু। হাজার দুয়েক টাকা না হলে তো সব অচল।
প্রতাপের স্ত্রী চমকিয়া উঠিল।
পাঠক যাহা বলিল তাহা এই। একটা বড় সাঁকোর ঠিকা ছিল, সাঁকোও হইয়াছে কিন্তু সেটা ফাটিয়া গিয়াছে। রাস্তার ঠিকায় কাকর পাথর যাহা মজুত করা হইয়াছে নতুন ওভারসিয়ার তাহার মাপ ঠিক দেয় নাই। প্রায় ছয় আনা পরিমাণ কাটিয়া দিয়াছে। বিল সমস্ত আটক পড়িয়াছে। এদিকে গাড়োয়ান, কুলি, রাজমিস্ত্রিদের তিন সপ্তাহের মজুরি বাকি। তহবিল শূন্য।–এখন অন্তত হাজার টাকা চাই। এ সময় বিপদের সময়। টাকার কথা মুখে আসে না। কিন্তু না বললেও নয়। গাড়োয়ান কুলি রাজমিস্ত্রিদের কথা শুনে আমার হাত পা পেটের ভেতর সেঁদিয়ে গিয়েছে। তারা বলাবলি করছে আমাকে ধরে মারবে আর—হুঁ।
বার দুই ঢোক গিলিয়া বলিল—আর বলছে দল বেঁধে এসে বাড়িতে তোমাদের চেপে বসবে। না খেয়ে তো তারা খাটতে পারবে না।
প্রতাপ জ্ঞাতি-কুটুম্ব ছাড়িয়াছিল, গ্রামের লোকও সরিয়া দাঁড়াইয়াছিল, প্রতাপের মৃত্যুর পর তাহারা প্রকাশ্যে শত্রুতা না করিলেও সাহায্য করিতে এক পা আগাইয়া আসিল না। নিজেদের বাড়ির দাওয়ায় বসিয়া অধিকাংশ লোকই বলিল—এ হবে তা তো জানা কথা।
*****
সেসব দিনের কথা সেতাবের মনে আছে। বাপ প্রতাপ মণ্ডলের ঠিকাদারির জমজমাট আমলে সেও বাপের মত নিজেকে এ গ্রামের সকল ছেলে হইতে পৃথক বলিয়া ভাবিতে শুরু করিয়াছিল। আর মহাতাপ একেবারে প্রায় আদুরে গোপাল বনিয়া গিয়াছিল। ছেলেবেলা হইতেই মহাতাপ সরল চঞ্চল। বাপের অবস্থার আকস্মিক উন্নতিতে সে আদর পাইয়া হইয়া উঠিয়াছিল দুর্দান্ত।
সবই মনে আছে সেতাবের।
ইউনিয়ন বোর্ডের সেক্রেটারি পাঠক সেদিন যে বলিয়া গেল গাড়িওয়ালারা ও মজুরেরা দল বাঁধিয়া পাওনার জন্য আসিবে এবং গোলা ভাঙিয়া ধান বিক্রি করিয়া টাকা উসুল করিয়া লইবে সে কথা সে মিথ্যা বলে নাই। একদিন সত্যই তাহারা আসিল। সঙ্গে আসিল প্রতাপের জ্ঞাতিভাই ধানের পাইকার গোপাল ঘোষ; ওই ঘোঁতন ঘোষের বাপ। সেতাব মহাতাপের মা তখন বউ মানুষ, বয়সও অল্প, তিরিশও হয় নাই; সেদিন সে ঘোমটা খুলিয়া গিয়া দাঁড়াইল মোটা মোড়লের বাড়িতে। মোটা মোড়ল ধর্মভীরু মানুষ এবং ভাল মানুষ। প্রতাপের সঙ্গে ইদানীং তাহার কথাবার্তা বড় একটা ছিল না। মোটা মোড়ল গ্রাম সম্পর্কে দাদা বলিয়া কয়েকবার প্রতাপকে সৎপরামর্শ দিতে চাহিয়াছিল, কিন্তু প্রতাপ সে কথার উত্তরে বলিয়াছিল—আমার উন্নতিতে বুক সবার টাটিয়ে গেল তা আমি জানি। পরামর্শ আমি কারুর চাই না। মোটা মোড়ল এ উত্তরে
