চাঁপাডাঙার বউ

« <
/ 31
> »

আমি বুঝব। এই কাগজখানা দিবি।

রাখালটা বলিল, তা হলে এখুনি যাই। নইলে ঘোঁতন মুড়ি খেয়ে বিড়ি টানতে টানতে বেরিয়ে যাবে, আর সেই ভাত খাবার বেলা পর্যন্ত পাব না।

ঘোঁতনের বাড়ি গোপডাঙায়। ঠিক পাশের গ্রামে।

এই গ্রাম ও আধাশহর লক্ষ্মীপুরের মাঝখানে গোপডাঙা–ছোট একখানি গ্রাম। লক্ষ্মীপুরেরই কাছাকাছি বেশি। লক্ষ্মীপুর অনেকদিনের সমৃদ্ধ গ্রাম। ব্রাহ্মণ-কায়স্থ-প্রধান সমাজ। গোপডাঙার টানটা চিরকাল ঐ দিকেই বেশি। ব্রাহ্মণ এবং কায়স্থ বুদ্ধিজীবী ভদ্রলোকেরা গোপডাঙার চাষীদের এবং গোপদের উৎপনের পুরনো খরিদ্দার। গোপডাঙার তরিতরকারি এবং দুধ, দুই লক্ষ্মীপুরের অন্নকে পঞ্চাশ না-হোক বেশ কয়েক প্রকার ব্যঞ্জনে সমৃদ্ধ করিয়াছে। এবং গুড় ও দুধ সহযোগে পরমানু না হোক পায়সানে পরিণত করিয়াছে। শুধু তাই নয় এই গ্রামের চাষীরাই। বরাবর ব্রাহ্মণ কায়স্থদের জমিজেরাত ভাগে ঠিকায় করিয়া আসিয়াছে। এবং সেকালে ইহা হইতেই তাহাদের দু-চার জন বছরে নিজের খামারে একটা মরাই-ও বাঁধিয়াছে আবার অজন্মার বছরে ঠিকার ধান শোধ না করিতে পারিয়া খতও লিখিয়াছে। খতের আসল, সুদে বাড়িয়া। তাহাদের পৈতৃক জমি বিক্রয় করিতে বাধ্য করিয়াছে। এ সব পুরনো কথা। তাহার পর মাঝে একটা সময় আসিয়াছিল যখন লক্ষ্মীপুরের ব্রাহ্মণ-কায়স্থ-বাঁড়ুজ্জে মশায়, মুখুজ্জে মশায়, বোস মশায়, ঘোষ মহাশয়ের সকলেই ও-সব উপাধি ছাড়িয়া বাবু মশাই ইলেন; ঘরে ঘরে তক্তপোশ-ফরাসের বদলে চেয়ার-টেবিল হইল, টোল পাঠশালা উঠিয়া গল, ইংরিজি ইস্কুল হইল, বাবুরা শহরে চাকরি ধরিল। উকিল হইল, মোক্তার হইল, ডাক্তার হইল। শরবত ছাড়িয়া চা ধরিল, হুঁকার সঙ্গে সিগারেট ঢুকিল, তখন লক্ষ্মীপুরে খানসাম র চাহিদাটা বাড়িয়া গেল। এই সময় গোপডাঙার অনেকে চাষের মত অভদ্র কাজ ছাড়িয়া এই শৌখিন কাজে ঢাকিল। ছোট বড় করিয়া চুল ইহারাই প্রথম ঘটিল, চাদরের বদলে কামিজ আমদানি করিল। কাছেই বক্রেশ্বর নদী ইহার পর বক্রেশ্বর নদী দিয়া অনেক জল বহিয়া গেল। শুধু বহিয়াই গেল না, বন্যায় চারিপাশ ড়ুবাইয়া দিয়াও গেল। চাষের জমিতে পলিও পড়িল, বালিও চাপিল। সেতাবদের গ্রাম নয়নপুরের চাষীরা বালি-পড়া জমির বালি তুলিল, পলি-পড়া জমিতে সোনা ফলাইল। কিন্তু গোপডাঙার চাষীরা চাষ একেবারে তুলিয়া না দিলেও ওই জীবিকার উপর আস্থা হারাইল। তাহারা চাষের সঙ্গে এটা ওটা ব্যবসায়ে হাত দিল। কেহ নবগ্রামে দোকান করিল। মুদির দোকান, বিড়ির দোকান ইত্যাদি এবং ছেলেদের ইস্কুলে ভর্তি করিয়া দিল। দুই চারটি ছেলে ম্যাট্রিক পাস করিল, একজন এম এ পাস করিল, একজন বি-এল হইল এবং গোপডাঙার বাস উঠাইয়া কর্মস্থল শহরে চলিয়া গেল। ঘোঁতনের বাবা গোপাল ঘোষ নিজে চাষবাসের সঙ্গে পাইকারি অর্থাৎ ধানের দালালির কাজ ধরিয়াছিল। লক্ষ্মীপুরের বণিকদের কাছে টাকা লইয়া গ্রামে গ্রামে ধান কিনিত এবং সেই ধান গাড়ি বোঝাই করিয়া বণিকদের গদিতে পৌঁছাইয়া দিত। কিছু লাভ থাকিত দরের মাথায়, আর কিছু থাকিত ওজনের মাথায়। খরিদ্দারের ঘরে হাতের টিপে যে ওজনটা সে লাভ করিত—সেইটার দাম মিলিত। ইহার উপর আছে কিছু ঢলতা—কিছু আছে। ঈশ্বরের নামে বৃত্তির ভাগ। ঘোঁতনকে ইস্কুলে দিয়াছিল। ঘোঁতন ও সেতাব কয়েক ক্লাস একসঙ্গে পড়িয়াছিল। ঘোঁতন ছেলে মন্দ ছিল না, সেতাবের মত সে এম্‌কে অ্যাম, একে অ্যান, একে অ্যাল বলিত না। চোস্ত উচ্চারণ ছিল তার। লক্ষ্মীপুরের বাবুদের ছেলেদের সঙ্গে ফুটবল খেলিত, স্কুলে ডিবেটিং ক্লাবে ডিবেট করিত। ভাল আবৃত্তি করিতে পারি। লক্ষ্মীপুরের থিয়েটার ক্লাবের রিহারস্যালের দিন হইতে অভিনয়ের দিন পর্যন্ত নিয়মিত আড়ালে-আবডালে থাকিয়া শুনিত, শিখিত। ক্লাবের লাইব্রেরি হইতে নাটক নভেল পড়িত। লোকে বলিত ছেলেটির ভবিষ্যৎ আছে। মাস্টাররাও আশা করিতেন, ঘোঁতন অন্তত সেকেন্ড ডিভিশনে পাস করিবে। মন দিয়া পড়িলে ফার্স্ট ডিভিশনেও যাইতে পারবে।

হয়ত পারিত। কিন্তু গোপাল ঘোষ মরিয়া সব গোলমাল হইয়া গেল। ঘোঁতন বন্ধাশূন্য অশ্বের মত ধাবমান রইল। ফার্স্ট ক্লাসে উঠিয়া সে প্রেমে পড়িয়া গেল। মনে মনে সে বেশ কিছুদিন হইতেই প্রেমে পড়িয়াছিল। স্থানীয় মাইনর গার্লস স্কুলের মাইনর ক্লাসের ছাত্রীদের প্রত্যেকটিকেই কিছুদিনের জন্য প্ৰিয়তমা ভাবিতেছিল। কিন্তু জাতের বাধা বা অন্য বাধা স্মরণ করিয়া সে কথা প্রকাশ করিতে পারি না। নিজের খাতায় তাহাদের নাম লিখিত এবং খুব যত্নের সঙ্গে কাটিত। হঠাৎ প্রকাশ্যে প্রেমে পড়িবার সুযোগ জুটিয়া গেল। স্থানীয় সবরেজেষ্ট্রি আপিসেই তাহাদের স্বজাতি এক কেরানী আসিল—এবং তাহার বড় মেয়েটি মাইনর ক্লাসে ভর্তি হইল। লম্বা ধরনের শ্যামবৰ্ণ মেয়ে, বয়স বোধহয় তের-চৌদ্দ; কিন্তু ঘোতনের প্রেমে পড়িবার পক্ষে তাই যথেষ্ট। মাইনর ক্লাসে পড়ে; বেণি ঝুলাইয়া ফেরত দিয়া কাপড় পরিয়া স্কুলে যায়—সুতরাং ইহার চেয়ে অধিক আয়োজন আর কী হইতে পারে লক্ষ্মীপুরে। ঘোঁতন প্রেমে পড়িল, মেয়েটির বাপের সহিত আলাপ করিল। তাহাদের বাড়িসুদ্ধ নিমন্ত্ৰণ করিয়া বাড়ি আনিয়া খাওয়াইল। এই সময়েই উমেশ মণ্ডল কাদম্বিনীর বিবাহের জন্য তোক পাঠাইল। ঘোঁতন তাহাকে সোজা না বলিয়া দিয়া বিবাহ ভাঙিয়া দিল। সবরেজেস্ট্রি অফিসের কেরানীবাবুটি ভীরু। কন্যাদায়গ্রস্ত লোক, সেও ঘোঁতনকে পছন্দ করিল। মাস্টাররা বলেন—ছেলে মন্দ নয়। বাহিরে তো খুব চটপটেস্মার্ট। বাড়ি-ঘরদেরও খারাপ নয়। সুতরাং আকারে ইঙ্গিতে সেই ইচ্ছাই প্রকাশ করিল।

ঘোঁতন খুব উৎসাহিত হইয়া পরীক্ষা দিয়া আসিল। শহরে পরীক্ষা দিয়া ফিরিবার সময় সেলুনে চুল ছটিয়া এক টিন গোল্ডেন বার্ডসাই নামক সিগারেট মিকশ্চার কিনিয়া বাড়ি ফিরিল এবং একদা শুভলগ্নে কেরানীবাবুর মাইনর-পড়া চতুর্দশ কন্যা নীহারিকাকে বিবাহ করিয়া ফেলিল। কিন্তু পরীক্ষার ফল বাহির হইলে দেখা গেল যে গেজেটে থার্ড ডিভিশন অবধি কোথাও ঘোঁতনচন্দ্রের নাম নাই।

ঘোঁতন বলিল—শালারা সব!

শ্বশুর বলিল–আবার ভাল করে পড়।

ঘোঁতন বলিল–না, ও গোলামি লেখাপড়া আমি আর করব না।

ঘোঁতন তখন লক্ষ্মীপুরের থিয়েটারে পার্ট পাইয়াছে। সামনে মাসখানেক পরেই অভিনয়। লক্ষ্মীপুরের ক্লাবের নিয়মানুসারে কোনো স্কুলের ছাত্র পার্ট করিতে পায় না। স্কুলে আবার ভর্তি হইতে হইলে পার্ট ছাড়িতে হইবে। সুতরাং ঘোন কিছুতেই রাজি হইল না, উপরন্তু শ্বশুরের সঙ্গে ঝগড়া করিয়া শ্বশুরের বাসার পথে হাঁটা বন্ধ করিল এবং কিছু জমি বিক্রয় করিয়া লক্ষ্মীপুরের গোলাম দর্জির সঙ্গে বখরায় একটা কাটা কাপড়ের দোকান করিল, এবং ইউনিয়ন কোর্টে পেটি মামলার তদ্বির আরম্ভ করিল। কিছুদিনের মধ্যে কাটা কাপড়ের দোকানের ভাল কাপড়গুলার জামা পরিয়া দোকানটা গোলামকে বেচিয়া দিল বটে কিন্তু মামলার তদ্বিরে তাহার কৃতিত্ব প্রতিষ্ঠিত হইল। থিয়েটারেও সে সুনাম অর্জন করিল।

শ্বশুর মেয়ের বাপ, তাহার ইচ্ছা যাই থাক, মনের ইচ্ছা মনে চাপিয়া জামাইয়ের কাছে নতি তাহাকে স্বীকার করিতে হইল, সে জামাইকে বলিল—তুমি তা হলে আর একটা কাজ কর। মামলার তদ্বিরের সঙ্গেই চলবে। সবরেজেষ্ট্রি আপিসে আমি রয়েছি, তুমি সবরেজেষ্ট্রি আপিসে টাউটের কাজ কর। শনাক্ত দেওয়া, দলিল লেখার কাজ কর। তা হলে মধ্যে মধ্যে যখন নকলের জন্যে একস্ট্রা হ্যান্ড দরকার হবে সে কাজও বলে-কয়ে করে দিতে পারব।

এ প্রস্তাবে ঘোঁতন রাজি হইল। এবং এ ব্যাপারেও সে কৃতিত্ব প্রদর্শন করিল। কানে কলম গুঁজিয়া বড়তলায় ঘুরিতে লাগিল। কিছুদিন পর লক্ষ্মীপুরের সাহাদের পঞ্চানন সাহার সঙ্গে জুটিয়া একটা যাত্রার দলও খুলিয়া বসিল। পঞ্চানন সাহা লক্ষ্মীপুরের থিয়েটারে দূত-প্রহরী ছাড়া পার্ট পায় না, অথচ তাহার ধারণা ভাল পার্ট পাইলে নিশ্চয়ই নাম করিতে পারে। মধ্যে মধ্যে এ লইয়া ক্লাবে ঝগড়াঝাটিও করিত পঞ্চানন। হঠাৎ এই ঝগড়া একদিন চরমে উঠিয়া গেল এবং পঞ্চানন ক্লাব ছাড়িয়া দিল। কয়েকদিন পর শোনা গেল, পঞ্চানন সাহা যাত্রার দল খুলিতেছে। পঞ্চাননের পয়সা আছে, যথেষ্ট পয়সা, সে হাজার দুয়েক খরচ করিয়া পোশাক, চুল, বাদ্যযন্ত্রপাতি কিনিয়া ঘোঁতনকে ডাকিয়া বলিলবামুন-কায়েতদের সঙ্গ ছাড়া ও বেটারা আমাদিগকে দূত-প্রহরী সাজিয়ে নিজেরা রাজা-উজির সাজে। আমার দলে আয়, রাজা-উজির সব আমরাই সাজব এখানে। ঘোঁতন আনন্দে জুটিয়া গেল।

পঞ্চাননের দল প্রথমেই পালা ধরিল নাগযজ্ঞ এবং নায়ক তক্ষক নাগের পার্ট দিল ঘোঁতনকে। ঘোঁতন তক্ষক নাগের পার্টে এমন ফেঁসফোঁস করিয়া ফেঁসাইল যে লোকে বাহবা দিল খুব। ঘোঁতন নিজেও খুশি হইল, সত্য বলিতে পালাও জমিল।

বছর খানেক পর পঞ্চাননের শখ মিটিল, হাজার খানেক টাকা লোকসান দিয়া দল তুলিয়া দিল। তুলিয়া দিবার সময় ঘোঁতন বলিলপঞ্চানন-দাদা, দল তুলে দেবে? কিন্তু

–কিন্তু কি? আমার শখ মিটেছে।

–তা হলে আমাকে দিয়ে দাও ওগুলো। আমাদের শখ এখনও আছে।

–কিন্তু টাকা যে অনেক লেগেছে ঘোঁতন।

—তা লেগেছে। কিন্তু পঞ্চানন অপেরায় তোমার নামটা তো থাকবে। আমি টাকা কিছু

« <
/ 31
> »