চাঁপাডাঙার বউ

« <
/ 31
> »

বউ গাল পাড়ছে শোন গিয়ে। যত শাপশাপান্ত একরত্তি মানিকের ওপর। কেন তুমি এমন করে মেরে আসবে?

–নিজে তাল কেটে আমাকে তালকানা বলবে কেন? আমি তালকানা? ও আমাকে বললে। আমি ছাড়ি না কাটি?

–হ্যাঁ, তুমিই তালকানা, তোমার তাল কেটেছিল, আমি বলছি। নাও, মার আমাকে দেখি।

–বড় বউ! ভাল হবে না বলছি!

–নাও, মার না।

—তুমি ছোট বউ হলে সে দিতাম এতক্ষণ।

মানদা ফোঁস করিয়া উঠিল, কই, মার না দেখি।

—দেখবি?

বড় বউ দাওয়া হইতে উঠানে নামিল,—কাল সকালে আমি চলে যাব তোমাদের বাড়ি থেকে। তোমাদের দুই ভায়ের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হবে। তারও হবে। মহাতাপের দিকে চাহিয়া বলিল—তোমারও হবে। দুই ভাইয়ে যা খুশি করবে। এই রাতদুপুরে দুদিক থেকে দুই ভায়ের ওপর গাল পড়ছে। ওদিকে রামকেষ্টদের বাড়ি থেকে, এদিকে রাখালের বউ। আমি আর পারব। না, আমি আর পারব না।

বলিয়া চাঁপাডাঙার বউ ঘরে ঢুকিয়া গেল।

মানদা বলিল, নাও, হল তো। গোসাঘরে খিল পড়ল তো। আর খাবেও না, সাড়াও দেবে না, কাঠ হয়ে পড়ে থাকবে।

সেতাব এবার আসিয়া ঘরে ঢুকিল; সে আর থাকিতে পারে নাই। সে বলিতে বলিতেই ঢুকিল, একে বলে, এতো বড় ফেসাদ। একে বলে, ঘোরালে লাঠি, ফেরালে কোতকা সেই বিত্তান্ত! আরে বাপু, আমার অন্যায়টা কি হল? তুমি যা বললে, তাই করে এলাম। জমি ধান সব দেওয়া বাতিল করে দুই বউকে দুই ভায়ের ভাগে ভাগ করে দিলাম। তাতেই গাল দিচ্ছে টিকুরীর খুড়ী। রামকেষ্ট নয়। তা আমি কি করব? ঘোঁতনার ওপর নালিশ তুলে নিলাম

মহাতাপ উঠানে ভাম হইয়া দাঁড়াইয়া ছিল, সে হঠাৎ বলিয়া উঠিল, তোমার মনোবাঞ্ছাই পূৰ্ণ হোক–চললাম আমি।

সেতাব ব্যস্ত হইয়া বলিল, অই—অই–ওরে, চললি কোথা? ওরে। অঃ, এ গোয়ারগোবিন্দকে নিয়ে কি করি বল তো? ওরে। সেতাবও বাহির হইয়া গেল।

বাহির হইতে মহাতাপ বলিল, সেই রাখলার কাছে চললাম। তার পায়ে ধরে নাকে খত দিয়ে নাকের চামড়া তুলে দিয়ে আসছি।

মানদা ব্যস্ত হইয়া ডাকিল, দিদি! দিদি! শুনছ?

বড় বউ আবার বাহির হইয়া আসিল।

মানু বলিল, ওই আবার গেল, বারণ কর।

–না। যাক। রাখাল প্রবীণ মানুষ, গাঁজা খায়, কিন্তু কখনও কারুর মত করে না। ধার্মিক লোক। তার কাছে মাপ চেয়ে আসুক। রাখালের বউয়ের শাপশাপান্ত আর শুনতে পারছি না।

মানদা ফোঁস করিয়া উঠিল—আর টিকুরীর খুড়ীর শাপশাপান্ত? বড় মোড়লকে পাঠাও পায়ে ধরতে।

চাঁপাডাঙার বউ বলিল, বড় মোড়ল ন্যায়বিচার করে এসেংহ মানু। অন্যায় তো করে নি। টিকুরীর খুড়ীই অন্যায় করে শান্ত করছে। সে শাপান্ত আমাদিগকে লাগবে না। আর সে গাল তো দিচ্ছে বড় মোড়লকে আমাকে। তা দিক, মানিকের অকল্যাণ না হলেই হল।

 

শিবকেষ্ট রামকেষ্ট পালদের বাড়ির একাংশে পথের ধারে দাওয়ার উপর বসিয়া টিকুরীর বউ উচ্চকণ্ঠে গাল দিতেছিল। কিছুদূরে শিবকেষ্ট রামকে দাঁড়াইয়া আছে। আর কয়েকজন জুটিয়াছে। তাহাদের মধ্যে ঘোঁতন রহিয়াছে। দাঁড়াইয়া জটলা করিয়া বিড়ি টানিতেছে।

পল্লীগ্রামে সেই ছড়ার মত বাঁধা গালিগালাজ-অভিসম্পাত। তাহার বাধুনি বিচিত্র, সুর বিচিত্র।

টিকুরীর বউ বলিতেছিল, সব্বস্বান্ত হবে, পথে দাঁড়াবে, ফকির হবে, জমিদার মহাজনে ড়ুগড়ুগি বাজিয়ে যথাসৰ্বস্ব নিলেম করে নেবে। টিনের চাল ঝড়ে উড়ে যাবে, পাকা মেঝে ফেটে চৌচির হবে। সাপখোপের আড়ত হবে। অকালে মরবেন, বিনা রোগে ধড়ফড়িয়ে যাবেন-ওই আদুরী গিদেরী পরিবার চাঁপাডাঙার বউয়ের দশা আমার মত হবেন।

ওপাশ থেকে ঘোঁতন বলিয়া উঠিল, তা হবে না খুড়ী, তা হবে না। ও শাপ দিও না। ফলবে না, ফলবে না।

টিকুরীর বউ ফোঁস করিয়া উঠিল—কে রে, বলি তুই কে রে মুখপোড়া ভঁ্যাদড়? তুই কে?

ঘোঁতন হাসিতে হাসিতে আসিয়া দাঁড়াইল।—মুখখানা আমার কালো বটে খুড়ী, কিন্তু পোড়ে নাই; মেচেতা পড়েছে। আমি ঘোঁতন।

—ও। ইংরেজি-পড়া বাবু, যাত্রার দলের কাপ। তা তুই তো বলবিই রে? তোকে ধান। ছেড়ে দিয়েছে, নালিশ তুলে নিলে।

–নিলে সাধে! আমি ঘোঁতন ঘোষ। হোৎ-তা-তা লাঙল-ঠেঙানো বুদ্ধি নয় আমার। আমি কলকাঠি টিপতে জানি। পাকাল মাছের পেটে কেঁচোর বাসার খবর জানি আমি। বুঝেছ! আমার নামে নালিশ করবে?

—তুই আমার হয়ে একটা নালিশ ঠুকে দিতে পারিস? পাপরের দরখাস্ত না কি বলে। টাকাকড়ি লাগে না, অনাথ গরিব বলে।

–বললেই পারি। ঘোঁতন কাউকে ডরায় না।

–তা হলে বোস্। আমি গালটা দিয়ে নিই। মনের ঝালটা মিটিয়ে নিই।

—তা লাও। ওদিকে রাখালের বউও খুব জুড়েছে-ওলাউঠো হবে, না হয়ত রাজকাশ হবে। লোহার গতর ভেঙে যাবে। ছেলে মরবে। বউ ভিক্ষে করবে

সুর ধরিয়া সঙ্গে সঙ্গে টিকুরীর বউ শুরু করিল, করবে, ভিক্ষে করবে, দোরে দোরে হরিবোল বলে ওই চাঁপাডাঙার বউ

হঠাৎ চমকিয়া টিকুরীর বউ বলিল, কে র‍্যা?

অন্ধকার পথে একটা দুনী মাথায় করিয়া যাইতেছিল নোটন।

–আমি গো, নোটন।

–নোটনা। তা মাথায় কি? দুনী নাকি? এত রেতে দুনী নিয়ে কি করবি?

–হ্যাঁ গো। আকের জমিতে হেঁচন দিতে হবে।

শিবকেষ্ট বলিল—চুপ কর খুড়ী। সেতাবদের কৃষেণ নোটন-ও সব শুনে গেল। বলবে তে গিয়ে সব মুনিব-বাড়িতে।

দুই হাতের বুড়া আঙুল নাড়িয়া বুড়ি বলিল-বয়েই গেল—বয়েই গেল। আমার বেগুন বাড়ি ভেসে গেল! শুনবে! শোনবার জন্যেই তো বলছি! আমি কি ভয় করি নাকি কাউকে?

তখন সেতাবের বাড়িতে দাওয়ার উপর পিঁড়িতে বসিয়া রাখাল ভাত খাইতেছে। সঙ্গে বসিয়াছে—মহাতা ও সেতাব। পরিবেশন করিতেছে চাঁপাডাঙার বউ। সে অম্বল পরিবেশন করিতেছিল। সকলেই তালুতে টোকা মারিয়া খাইতেছিল এবং সঙ্গে সঙ্গে বলিতেছিল, আঃ!

রাখাল বলিল, আর একটু দাও, বউমা, আর একটু! বেড়ে বেঁধেছ! খাসা হয়েছে!

সেতাব বলিল, তা হলে কি হবে! কাঁচা তেলের গন্ধ উঠেছে। এত করে নাকি তেল দেয়! হুঃ?

মহাতাপ বলিল, তেল বেশি হয়েছে, তেল বেশি হয়েছে! তেল নইলে রান্না হয় নাকি?

রাখাল বলিল, আরে, ওই তেলেই তো অম্বলের সৈরভ…সুবাস! নেশার মুখে যা লাগছে, সে কি বলব, অম্রেত যেন। আর তেমনি কি রান্নার তাক। বেঁচে থাক মা সুখে থাক, সংসারের কল্যাণ হোক। খেয়ে মুখটা জুড়ল। পোড়া আর ধরা আসেদ্ধ আর নুনচড়া খেয়ে জিভে যেন চটা ধরেছিল!

চাঁপাডাঙার বউ বলিল, সব আমাদের ছোট বউয়ের রান্না।

–বা-বা-বা! বলিহারি বলিহারি! তা হবে না কেনে? মহাতাপ যে ছোকরা বড় ভাল, বড় ভাল ছোকরা! আমাকে বড় মেরেছে ভাঙের নেশার মুখে। তা মারুক! ভুল করেছে। আবার গিয়ে তো বললে রাখালদাদা, দোষ হয়েছে। তা আমিও বললাম, বাস্ বাস্; ঠিক আছে। ভাগ্যে পঞ্চায়েতে নালিশ করি নাই! বুয়েচ, হাতের তীর ছাড়তে নাই। ছাড়লেই বাস, ভ্যাক করে বিঁধে যাবে। তাই তো আমার পরিবারকে তখন থেকে বলছি—এমন করে গাল দিস না, দিস না। তা বুয়েচ, আমাকে মানুষ বলেই গণ্যি নাই। তোমরা কিছু মনে কোরো না-ওর কথায় কিছু হয় না। বুয়েচ? তা সেও ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছে। মহাতাপ বললে, খেতে হবে, আজই রেতে। তা আমি দোনোমনো করছিলাম, কিন্তু সে-ই বললে—সে কি, ডাকছে হাত ধরে, যাবে না কি? বুয়েচ। তা পেট খুব ভরল। খুব।

মানদা আসিয়া দুধের বাটি নামাইয়া দিল।

—আবার কি?

–দুধ।

এমন সময় বাহিরে ধম করিয়া একটা শব্দ উঠিল। সকলেই চকিত হইয়া উঠিল। মহাতাপ খাবার ছাড়িয়া উঠিয়া লাফাইয়া নামিল।

—কে?

ওপাশ হইতে সাড়া আসিল, আমি গো ছোট মুনিব।

মহাতাপ বাহির হইয়া গেল।

খামার-বাড়িতে নোটন দুনীটা সশব্দে ফেলিয়াছে, শব্দটা তাহারই।

মহাতাপ বলিল–দুনী আনলি?

–না আনলে? তোমার মন তো বিন্দাবন, যদি বাঁশি বাজে তো রেতেই বলবেচ যাব, লাগাব দুনী! তোমার কিলকে বড় ভয়!

—দাঁড়া রে বাবা, খোল কুটে রেখেছে কি না দেখি!

–সে বড় মোল্যান ঠিক রেখেছে। কাজে তার ভুল হবে না।

আর খোল তো এসেছে কাল বিকেলে। আজ কুটলে কখন? বড় বউ–অ বড় বউ?

ফিরিয়া আসিয়া বাড়িতে ঢুকিল। তখন সেতাব-রাখালের খাওয়া হইয়া গিয়াছে। তাহারা হাত মুছিতেছে।

রাখাল বলিতেছে, তা তুমি পালদের বাড়িটা ভাগ করে ভাল করেছ সেতাব। ঠিক করেছ। বউ দুজনকে ভাগ করে দুজনার ঘরে দিয়েছ, ন্যায্য করেছ। হু! তা নইলে জমি দিলে বেচেঘুচে পালাত। বেশ করেছ। তা হলে আমি যাই। বুয়েচ? আর ওই আমার

« <
/ 31
> »