- প্রথম পরিচ্ছেদ: দেবগ্রামের পথে
- দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: মহাতাপ কথাটা মিথ্যা বলে নাই
- তৃতীয় পরিচ্ছেদ: দিন কয়েক পরের কথা
- চতুর্থ পরিচ্ছেদ: দেখিতে দেখিতে বৰ্ষা নামিয়া পড়িল
- পঞ্চম পরিচ্ছেদ: ভাদ্র মাস পড়িয়া গিয়াছে
- ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ: ভাদ্র শেষ হইয়া গিয়াছে
- সপ্তম পরিচ্ছেদ: পূজা আসিয়া পড়িয়াছে
- অষ্টম পরিচ্ছেদ: পরদিন সপ্তমীর সকাল
- নবম পরিচ্ছেদ: নবমীর রাত্রিকাল
শ্রাদ্ধ করবে ওরা। বুড়ো বয়সে অসুখ করলে ওদেরই তোমাদের সেবা করতে হবে। তোমাদের শ্বশুর-স্বামীর বংশ। ভাসুরের ছেলে, স্বামীর ভাইপো। তোমাদের গর্ভের সন্তান নাই; ওরাই তোমাদের সন্তান। আমি বলি, জমি দেওয়াও নয়, ধান দেওয়াও নয়, দুই খুড়ী দুই ভাসুরপোর ঘরে মায়ের মতন থাকবে, তেমনি যত্ন-আত্যি করবে, নাতিনাতনী নিয়ে ঘর করবে, এরা সেবা করবে, ছেদ্ধা-ভক্তি করবে, বাস।
বিপিন বলিয়া উঠিল, ভাল ভাল ভাল। এর চেয়ে আর ভাল কথা হতে পারে না। গোবিন্দ। গোবিন্দ! হরিবোল হরিবোল।
সেতাব বলিল, পৃথক হলেই পৃথক। মা বেটায় পৃথক হলে মা বেটা পর হয়। আবার পুরকে আপন করলে পরই আপন হয়। শিবকেষ্ট রামকেষ্ট পৃথক হচ্ছে, কেন হচ্ছে জানি না। তা হচ্ছে। হোক। কিন্তু তোমরা খুড়ীরা দু ভাগকে চার ভাগ করে সংসারটার সর্বনাশ করে দিয়ো না।
অন্য একজন বলিল, বা বাস্। এর ওপর আর কথা নাই। হরিবোল হরিবোল।
আর একজন বলিয়া উঠিল, তাই বটে। হরিবোল হরিবোল!
মজলিসের মধ্যে গুঞ্জন উঠিল।
ওদিকে ঠিক এই সময়ে বাহিরের রাস্তা হইতে কোন একজনের চিৎকার শোনা গেল–বিচার করুক পঞ্চায়েত, এর বিচার করুক। গরিব বলে আমার মান-ইজ্জত নাই? পঞ্চায়েত–
বলিতে বলিতেই গায়ের চাদরখানা কোমরে জড়াইতে জড়াইতে আসিয়া উপস্থিত হইল রাখাল পাল। বিশ্বামিত্রের মত ক্রোধী শীর্ণকায় রাখাল আসিয়া বসিয়াই মাটিতে একটা চাপড় মারিয়া বলিল, পঞ্চায়েত এর বিচার করুক। মজলিসটা স্তব্ধ হইয়া গেল।
সেতাব বলিল, কিসের বিচার রে বাপু? হঠাৎ যে একেবারে গগন ফাটিয়ে চেঁচাতে লাগলি!
রাখাল বলিল, চেঁচাবে না? আলবৎ চেঁচাবে। পঞ্চায়েত বিচার করবে কি না বলুক!
বিপিন মোড়ল এবার বলিল, কি হল তাই বল?
—আমাকে মারলে। ঠাস করে এক চড়! এই গালটা দেখ, পাঁচটা আঙ্গুলের দাগ বসেছে। সে লণ্ঠনটা তুলিয়া লইয়া নিজের গালের পাশে ধরিল।
—আঃ, তাই তো রে; কে মারলে—
—ওই ওরই ভাই। সে আঙুল দিয়া সেতাবকে দেখাইয়া দিল।
–মহাতাপ? সেতাব প্রশ্ন করিল।
–হ্যাঁ—হ্যাঁ—হ্যাঁ।
সেতাব মাথা হেঁট করিয়া বলিল, কি বিপদ হয়েছে যে আমার!
বিপিন প্রশ্ন করিল, এমনি মারলে তোকে মহাতাপ? মহাতাপ রাগী বটে, খানিকটা অবোধও বটে, কিন্তু এমনি কেন তোকে মারবে রাখাল?
–নাম সংকেত্তনের দলে আমি বাজাচ্ছিলাম। রাখাল পালের সঙ্গে খেলে কে হাত দিতে পারে বলুক পঞ্চায়েত। আমি হক মেরে বলছি, পাঁচখানা গায়ে কে আছে তা বলুক।
–নাই। তাই হল। সে কথা থাক। কি হল তাই বল।
রাখাল বলিল, তাই হল লয়। ডাক কে আছে? ডাক। একটু চুপ করিয়া রহিল। বোধ করি, কেহ তাহার এই আত্মশ্লাঘার উত্তরে সাড়া দেয় কি না দেখিবার জন্যই চুপ করিয়া রহিল। তাহার পর বলিল, আমাকে বলে, তাল কাটছে। নিজে ভাঙ খেয়ে তাল কাটছে। তার ঠিক নাই। আমি বললাম, তোর কাটছে। তা গায়ের জোরে বলে, না, তোর। আমি বললাম, মহাতাপ, ক্ষ্যাপামি করিস তোর বউয়ের কাছে বউদির কাছে, এখানে করি না। এই আমার গালে বসিয়ে দিলে এক চড়।
বিপিন বলিল, তুই বউ বউদির কথা তুললি কেন?
—কি, হয়েছে কি? বলি তাতে কি হয়েছে কি? তোমরা বিচার করবে কি না বল?
সেতাব বলিল, হবে, বিচার হবে। নিশ্চয় হবে। বস্ তুই। আগে এই কাজ শেষ হোক। তারপর হবে।
—তারপর হবে?
–হ্যাঁ। বস্ তুই।
–বসব? বসতে হবে?
–হ্যাঁ রে, তামাক খা।
–নেহি মাংতা হ্যায়। চাই না বিচার আমি চাই না।
বলিয়া রাখাল হনহন করিয়া চলিয়া গেল। বাহির হইতে বলিল, বড়লোক কিনা? নিজের ভাই কিনা? বেমক্কা চড় খেয়ে যদি মরে যেতাম আমি?
বিপিন বলিল, গাঁজা খেয়ে খেয়ে রাখালের মেজাজে আগুন ধরেই আছে। মহাতাপকে সাবধান কোরো সেতাব। ভাঙ খেতে ওকে দিয়ো না।
সেতাব দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া বলিল, আমার হয়েছে মরণ। বুঝলেন? আমার কথা কি শোনে?
–চাঁপাডাঙার বউমাকে বোলো, তাকে খুব মানে শুনেছি।
হঠাৎ সেতাব বলিয়া উঠিল, আমি যাই, হতভাগাকে একবার দেখি–
—বোসো, বোসো। মাথা খারাপ কোরো না। এদের কাজটা সেরে দাও বাবা।
সেতাব আবার বসিল। বলিল, এর আর সারাসারি কি বলুন? দুই খুড়ী দুই ভায়ের ভাগ। কে কাকে নেবে বলুক। খুড়ীরাও বলুক।
যে ব্যক্তি সেতাবকে কা দিয়াছিল সে বলিল, ছোট খুড়ী ইন্দেশের বউ তো ছোট ভাই রামকেষ্টর সম্পর্কে শাশুড়ি হয়। রামকেষ্টর বউ তো ভাইঝি হয়!
রামকেষ্ট বলিল, তা হোক। ছোট খুড়ীর টান দাদার ছেলেদের ওপর। ভাইঝিকে দশটা কড়া কথা না বলে জল খায় না।
ইন্দেশের বউ বলিয়া উঠিল, আর তোমার বউ মুখে ময়দা লেপে চুপ করে শোনে, না? একেবারে ভাল মানুষের পিতিমে। আমাকে বলে না? বলে কি বাবা সকল—তবে ভাইঝির কথা বলি শোন। লুকিয়ে চাল ধান বেচে পয়সা করে। আমি বলি, সাজার সংসারে চুরি করিস না। ভাগী ভঁড়িয়ে খেতে নাই। তাই রাগ বাবা। সেদিন নিজের ছেলেকে একটা বশি কিনে দিলে। তা শিবকেষ্টর ছোট ছেলেটা কাঁদতে লাগল। আমি বললাম, একেও একটা কিনে দে। পয়সা তো সাজার সংসারের পয়সা, মুখ বেঁকিয়ে চলে গেল। আমি বাবা তাকে একটা বাঁশি কিনে দিয়েছি।
হ্যাঁ, তা দিয়েছি। ছেলেটি আমার কাছে থাকতে ভালবাসে। এই রাগ।
সেতাব বলিল, বেশ বেশ। তা হলে খুড়ী শিবকেষ্টর সংসারেই থাকবে।
—তাই থাকব। সেই ভাল।
–আর মেজ খুড়ী টিকুরীর বউ রামকেষ্টর সংসারে থাকবে। বুঝলে গা খুড়ীরা?
টিকুরীর খুড়ী বলিল, বুঝলাম বাবা, খুব বুঝলাম। এমন বোঝা আর বুঝি নাই কখনও। আঃ, মরি মরি মরি।
—তার মানে?
–মানে? তুমি বাবা দুমুখো সাপ। এক মুখে কামড়াও এক মুখে ঝাড়। তাই হল। তোমরা পঞ্চায়েত, যা বলবে তাই হল।
বলিয়া সে উঠিয়া চলিয়া গেল।
সেতাব ডাকিল, খুড়ী! অ খুড়ী।
বিপিন বলিল, উই উঁহুঁ! ডেকো না। যাক। ভাগ করতে গিয়ে সবাইকে সন্তুষ্ট করা যায় না। বাবা। থাক। এখন শিবকেষ্ট, রামকেষ্ট, ইন্দেশের বউমা, এই যা হল—তাতে তোমরা মোটামুটি খুশি তো?
শিবকে বলিল, আমার আপত্তি নাই।
–রামকেষ্ট?
–আমি মশায় যা করে দেবেন তাতেই রাজি।
ইন্দেশের বউ বলিল, আমি মেনে নিয়েছি বাবা, আমি মেনে নিয়েছি।
সেতাব উঠিল। আমি তা হলে উঠলাম জেঠা।
বিপিন বলিল, তা তোমার সেটা কি করে হবে? ঘোঁতনের সেইটা। ঘোঁতন তো আসে নাই।
সেতাব বলিল, সেসে আমি ছেড়ে দিলাম। বুঝেছেন? সে ছেড়ে দিয়েছি। মহাতাপ যখন ছেড়ে দিয়েছে, তখন ও-কথা থাক। তবে বলতে চেয়েছিলাম, ঘোঁতন আমাকে আঙ্গুল দেখাবে ক্যানে? বুঝেছেন? আর পাগলকে শিব সাজাবার লোভ দেখিয়ে দশ টাকা চাঁদাই বা নিয়েছে। ক্যানে? তারই জন্যে। বলুন না দশজনে এ জোচ্চুরি কি না! আচ্ছা, আমি চললাম জেঠা।
সে বাহিরে আসিয়া আবার একটি প্রণাম করিয়া লণ্ঠনটি হাতে করিয়া বাহির হইয়া গেল।
সেতাব বাড়ির দরজায় আসিয়াই চাঁপাডাঙার বউয়ের উচ্চ কণ্ঠস্বর শুনিতে পাইল। বাড়ির ভিতরে চাঁপাডাঙার বউ কাহাকে তিরস্কার করিতেছে।
তোমাদের দু ভায়ের জ্বালায় হাড়ে কালি পড়ে গেল। নিন্দে শুনে কান পচে গেল।
সেতাব দরজা খুলিয়া গোয়াল-বাড়িতে প্রবেশ করিল, তাহার পর খামার-বাড়িতে ঢুকিল। এবার মহাতাপের কণ্ঠস্বর শোনা গেল। সে বলিল, আমি তোমাকে জ্বালাব? আমি তোমার হাড়ে কালি পড়ালাম?
–পড়াও না?
–কক্ষনও না। সে পড়ায় তোমার স্বামী কুচুটে পাকাটি চামদড়ি কেপন—
–ছি ছি মহাতাপ।
–আর ওই ছোট বউ। ওই কুঁদুলী, ওই ঘ্যানঘেনানী, ওই দুটু সরস্বতী।
মানদার কণ্ঠস্বর শোনা গেল, ও মা গ—অ! বলে সেই দরবারে হেরে বউকে মারে ধরে। আমাকে নিয়ে পড়লে কেন?
সেতাব বাড়ি ঢুকিয়াই আলোটি কমাইয়া দিয়া খামার-বাড়িতে চুপ করিয়া বসিল।
বাড়ির ভিতরে তখন মানদা ঘর হইতে বাহির হইয়া আসিয়া বলিল, খবরদার বলছি, আমাকে নিয়ে কথা বলবে না বলছি।
চাঁপাডাঙার বউ বলিল, মানু, তুই চুপ কর।
—কেন? চুপ করব কেন? আমাকে নিয়ে পড়ল কেন?
মহাতাপ বলিল, পড়বে না? তুই তো আজ আমাকে ভাঙ খাওয়ালি। তুই কিনে আনিয়ে বেটে শরবত করে রাখিস নি, বললি নি? বলুক বড়গিনি; সারাদিন ভূতের মত খাটো, বরাবরের অভ্যেস না খেলে বাঁচবে কেন? ভাঙ খেলে আমার চড়াত করে রাগ হয়ে যায়। দিলাম চড়িয়ে রাখালের গালে।
—এখন রাখালের
