- প্রথম পরিচ্ছেদ: দেবগ্রামের পথে
- দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: মহাতাপ কথাটা মিথ্যা বলে নাই
- তৃতীয় পরিচ্ছেদ: দিন কয়েক পরের কথা
- চতুর্থ পরিচ্ছেদ: দেখিতে দেখিতে বৰ্ষা নামিয়া পড়িল
- পঞ্চম পরিচ্ছেদ: ভাদ্র মাস পড়িয়া গিয়াছে
- ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ: ভাদ্র শেষ হইয়া গিয়াছে
- সপ্তম পরিচ্ছেদ: পূজা আসিয়া পড়িয়াছে
- অষ্টম পরিচ্ছেদ: পরদিন সপ্তমীর সকাল
- নবম পরিচ্ছেদ: নবমীর রাত্রিকাল
আপন মনে?
–উ কিছু লয়। কি বলছ? মাথা চুলকাইতে লাগিল।
–কিছু নয়! এক দুই তিন, এক দুই তিন-বলে নাচছিলি আর বলছিস–কিছু নয়?
এবার গোবিন্দ বলিল, লাচ শিখছিলাম গো! যাত্তার দলে সখী সাজব কিনা? লাও এখন কি বলছ বল!
—যাত্তার দলে সখী সাজবি? তা হলে সে খুব যাত্তার দল।
–উঁহুঁ! ঘোঁতন ঘোষ মশায়ের দল। দেখবে এবার কেমন গায়েন করে।
–ঘোঁতন ঘোষের দলে ঢুকেছিস?
বড় বউ স্থির দৃষ্টিতে ছেলেটার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। ধারণা করিতে চেষ্টা করিল, ব্যাপারটা কি? তাহার যেন একটা সন্দেহ হইল।
রাখালটা অস্বস্তিতে পড়িয়াছিল। সে বলিল, বল, ক্যানে গো!
চাঁপাডাঙার বউ বলিল, শাওন মাস থেকে তোর জবাব হল গোবিন্দে। তাকে আর কাজ। করতে হবে না। মাসের শেষে মাইনে–বলিয়াই মনে হইল—গোবিন্দ মাইনে পাইবে না। পূজা পর্যন্ত তাহার মাহিনা সে অগ্রিম লইয়া রাখিয়াছে। আবার একবার তাহার দিকে স্থির দৃষ্টিতে চাহিয়া বলিল,এইজন্যেই তুই সন্ধ্যার আগে পালাস? আবার একটু চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল—ঘোঁতন। তোকে আমাদের বাড়ির কথা জিজ্ঞাসা করে, না গোবিন্দে? কি জিজ্ঞাসা করে?
গোবিন্দ কিছু বলিবার পূর্বেই ছোট বউ এক আঁচল মাছ লইয়া প্রবেশ করিল।অ দিদি। পাড়ার ছেলে জুটে সব ধরে নিলে মাছগুলা। খলবল করে বেড়াচ্ছে—এক শো, দু শো
–করুক। তুই তো নেচেকুঁদে এলি জলে কাদায়।
–এই দেখ কত মাছ ধরেছি!
আঁচল খুলিয়া সে ঝরঝর করিয়া মাছগুলো ফেলিয়া দিল। মানিক বাঁশিটা বাজাইয়াছিল। নেহাত ছোট মাছ নয়, গত বছরের পোনা কোনোেটা এক পোয়া কোনোেটা তিন ছটাক! কাতলাগুলো পাঁচ পোয়া হইয়াছে।
চাঁপাডাঙার বউ ঘোতনের কথা বাদ দিয়া গোবিন্দকে বলিল, গোবিন্দ, শিগগির যা। যতক্ষণ আছিস কাজ করতে হবে তো। যা!
পুকুরটা ভাগের পুকুর। তবে সেতাবদের অংশই বেশি। সেতাব কিনিয়া কিনিয়া অংশটাকে প্রায় দশ আনার কাছাকাছি করিয়া ফেলিয়াছে। পুকুরটা তাহার বাড়ির কাছে, হেফাজত করিতে সে-ই করে। সেতাবের পর মোটা অংশ বিপিন মোড়লের; প্রায় সোয়া তিন আনা অর্থাৎ পাঁচ ভাগের এক ভাগ। অবশিষ্ট এগার পয়সার মধ্যে ভাগী আছে অনেক কয়জন। রামকেষ্ট এবং শিবকেষ্টর তিন পয়সা রকমের ভাগ আছে। সেটা অবশ্য সেতাবের কাছে ঋণদায়ে আবদ্ধ। শিবকেষ্টর ভাগের খুড়ী টিকুরীর বউ মাছ বাহির হইতেছে এবং ছেলের পাল মাছ ধরিতেছে সংবাদ পাইয়া গাছকোমর বাঁধিয়া ছুটিয়া আসিয়া পথের উপর দাঁড়াইয়া ছেলের দলের উপর গালিগালাজ বর্ষণ করিতে শুরু করিল।
—বলি অ ড্যাকরার, অ আল্পেয়েরা, অরে অ আবাগেরা, আবাগীর পুতেরা, বলি পরের লুটেপুটে খেয়ে কদিন বাঁচবি রে। ওলাওঠো হয়ে মরবি রে, ধড়ফড়িয়ে মরবি। পুকুরে শিবকেষ্টর দেড় পয়সা অংশ, আমার দেড় পয়সা ভাগ দিয়ে যা বলছি। বলি পালাচ্ছিস যে! আমি বুঝি দেখতে পাচ্ছি না? আমার চোখ নাই? ঢেলা ছুঁড়ে মারব, ঢেলা ছুঁড়ে মারব বলছি। পরের পুকুরের মাছ বেরিয়েছে—বড় মজা, ভাজা খাবি, ঝোল খাবি, অম্বল খাবি, খাবি খেয়ে মরবি, ওলাউঠা হয়ে মরবি, অম্বলশূল হবে–
কয়েকটা ছেলে পথের ধারের গাছের আড়াল হইতে উঁকি মারিতেছিল। তাহাদের দেখিয়া টিকুরীর বউ বলিল, যাবি কোথা? পথ আগলে দাঁড়িয়েছি আমি। দে বলছি আমার ভাগের মাছ, দে।
একটা ছেলে তাহাকে জিভ কাটিয়া ভ্যাঙচাইয়া বলিল, দে! দে বললেই দেব? মাঠে মাছ। ধরেছি; তোমাদের পুকুরের মাছ তা কে বললে? গায়ে নেকা আছে?
–ওরে খালভরা! নেকা নাই, কিন্তু মাছগুলো কি আকাশ থেকে পড়ল?
–তা কি জানি? ওই তো বড় মোড়লের মোটা ভাগ, তাদের ছোট বউ তো কিচ্ছু বললে না?
আর একটা ছেলে বলিল, সি এক আঁচল ধরে নিয়ে গেল—সের দরুনে।
টিকুরীর বউ এবার জ্বলিয়া উঠিল। অ্যাঁ? ওরা নিয়ে গেল? যাই, আমি যাই একবার। আগে তোরা মাছ দিয়ে যা! দে—দে—মাছ দে। দে।
হঠাৎ একটা বড় গাছের আড়াল হইতে রাখাল পাল বাহির হইয়া আসিয়া আঁচল হইতে মাছ কয়েকটা বাহির করিয়া ফেলিয়া দিয়া বলিল, ওই লে। লে তোর মাছ।
টিকুরীর বউ তাড়াতাড়ি মাথায় কাপড় দিতে চেষ্টা করিল কিন্তু গাছকোমর বাঁধা কাপড় খুলিল না। সে পিছন ফিরিয়া দাঁড়াইল। অ মাগো! এ কে গো? পালেদের ফাঁকলা?
—ফাকলা। আমার নাম ফাঁকলা? ক্রুদ্ধ হইয়া উঠিল রাখাল।
—তা ভাসুরের নাম করব নাকি?…তুই যে সম্পর্কে ভাসুর হস মিন্সে। বুড়ো মিন্সে ছেলের পালের সঙ্গে মাছ ধরতে এয়েছে। নোলাতে ছেঁকা দাও গিয়ে!
রাখাল মুহূর্তে ধ্বনির প্রতিধ্বনির মত জবাব দিল গরম গরম মাছভাজা খেয়ে তুমি নোলাতে ছেকা নিয়ে মা, তুমি হেঁকা নিয়ে। নোলাতে আরও গাল ফুটবে, তপ্ত খোলায় খইয়ের মত ফুটবে।
হনহন করিয়া চলিয়া যাইতে যাইতে রাখাল আবার ফিরিয়া দাঁড়াইল। বলিল, মরে তুমি মেছো পেত্নী হবে, মাছ মাছ করে বিলে বিলে চবাং চবাং করে ঘুরে বেড়াবে, সারা অঙ্গে সেঁক ধরবে। তা আমি বলে দিলাম। বলিয়া সে চলিয়া গেল।
ছেলেগুলা এই অবসরে সুটসুট করিয়া পালাইতেছে। টিকুরীর বউ এবার ঘুরিয়া দাঁড়াইল, মাথায় সে এতক্ষণে ঘোমটা দিতে পারিয়াছিল এবং রাখাল পালের গমনপথের দিকে চাহিয়া বলিল, মরে যাও, তুমি মরে যাও, অপঘাতে যাও, মাছ বলে সাপ ধর, সাপের কামড়ে জ্বলে পুড়ে মর। পেরেত হও। আপন জ্বালাতে তুমি দাপাদাপি করে বেড়াও।
মাছ কয়টা কুড়াইতে সে কিন্তু ভুলিল না। মাছ কয়টা কুড়াইতেছিল। এমন সময় মাঠের খাবার লইয়া বড় বউ বাড়ি হইতে বাহিরে আসিয়া থমকিয়া দাঁড়াইল। সে বলিল, কি হল গা টিকুরীর খুড়ী?
মাছ কুড়াইতে কুড়াইতেই মুখ তুলিয়া চাঁপাডাঙার বউকে দেখিয়া টিকুরীর খুড়ী বলিল, এই যে! মোড়ল-গিন্নি! ভামিনী আমার!
মাছ কুড়াইয়া সোজা হইয়া দাঁড়াইল। বলিল, তোমাদের ছোট বউ নাকি সাজার পুকুরের পাঁচ সের মাছ ধরে ঘরে ঢুকিয়েছে?
চাঁপাডাঙার বউ অবাক হইয়াও হাসিয়া কৌতুকরে বলিল, পাঁচ সের? দাঁড়িপাল্লা দিয়ে। ওজন করলে কে খুড়ী?
—দাঁড়িপাল্লা দিয়ে ওজন করলে কে খুড়ী! ওজন করবে কে? বলি ওজন করবে কে? আমি কি মেছুনী নাকি?
চাঁপাডাঙার বউ এবার বিব্রত হইল, সে জানে ইহার জের অনেক দূর যাইবে। সে তাই বলিল, সে আবার কখন বললাম তোমাকে?
–বললে না? তো কি বললে? ও-কথার মানে কি হয়?
—তা জানি না। ছোট বউ কতকগুলো মাছ ধরে এনেছে। মাঠে ছড়িয়ে পড়েছিল। সে মাছ। ঘরে আছে, তোমার ভাগ তুমি নিয়ে যাও।
–যাবই তো। ভাগের ভাগ হকের ধন। এ আমার ভাইকে ফাঁকি দিয়ে পুঁটলি-বাধা ধন নয়। নেবই তো ভাগ।
—কি বলছ খুড়ী যা-তা?
–ঠিক বলছি। দেওর-সোহাগী, দেওরকে সোহাগের মানে আমরা বুঝি না, না? কিন্তু ওতে নিজেই ফাঁকি পড়ে, বলি, ঠকিয়ে জমানো ধন ভোগ করবে কে? বলি হল একটা কোলে? ওই জন্যেই ছেলে নেনা, যেমন সেতাব—তেমনি তুমি।
এবার চাঁপাডাঙার বউ গম্ভীরভাবে বলিল, থাম টিকুরীর খুড়ী।
টিকুরীর খুড়ী থামিয়া গেল। চমকাইয়া উঠিয়াই থামিল। চাঁপাডাঙার বউয়ের কণ্ঠস্বরে যেন কি ছিল; সে যেমন অলঙ্ঘনীয়—তেমনি ভর্ৎসনাপূর্ণ।
সেই কণ্ঠস্বরেই চাঁপাডাঙার বউ বলিয়া গেল, তুমি যা বললে তা যদি সত্যি হয়, তবে ভগবান আমার মাথায় যেন বজ্ৰাঘাত করেন। আর যদি মিথ্যা হয় তারও বিচার তিনি করবেন। কোনো শাপান্ত আমি করব না।
ফিরিল সে, ফিরিয়া উচ্চকণ্ঠে ডাকিল, মানু! মানু!
মানু বাড়ির ভিতর হইতেই সাড়া দিল, কি বলছ?
—এই টিকুরীর খুড়ীকে ওদের মাছের ভাগ দিয়ে দে। যাও খুড়ী, তোমার ভাগ তুমি নাও গে। মানুও সে মূর্তি সেথায় দেখিয়া অবাক হইয়া গেল। কোনো একটা কথাও মুখে ফুটিল না। মাছ সে। বড় ভালবাসে। সেই মাছ ফেরত দিবার আদেশের বিরুদ্ধেও কোনো কথা তাহার ফুটিল না।
কথা কটা বলিয়া চাঁপাডাঙার বউ আবার ফিরিল এবং আপন পথে গরবিনীর মতই চলিয়া গেল।
গ্রাম্যপথে তখন চাষীর ঘরের মেয়েরা স্বামী-পুত্রের বাপ-ভাইদের খাবার লইয়া মাঠে চলিয়াছে। কাকালে ঝুড়ির মধ্যে কাসার খোরায় মুড়ি গুড় ইত্যাদি। বৃষ্টিতে যাহাতে সেগুলি ভিজিয়া না যায়, তাহার জন্য তাহার উপর আর একটি ঝুড়ির আবরণ। এক হাতে জলের ঘটি। তাহারা আগে চলিতেছে। চাঁপাডাঙার বউয়ের আজ দেরি হইয়া গিয়াছে। কিন্তু তবুও সে চলিবার। গতি ত্বরিত করিতে পারিতেছে না। তাহার বুকের ভিতরটা যেন কেমন করিতেছে, গা যেন ভারি। হইয়া উঠিয়াছে। টিকুরীর খুড়ী তাহার
