- প্রথম পরিচ্ছেদ: দেবগ্রামের পথে
- দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: মহাতাপ কথাটা মিথ্যা বলে নাই
- তৃতীয় পরিচ্ছেদ: দিন কয়েক পরের কথা
- চতুর্থ পরিচ্ছেদ: দেখিতে দেখিতে বৰ্ষা নামিয়া পড়িল
- পঞ্চম পরিচ্ছেদ: ভাদ্র মাস পড়িয়া গিয়াছে
- ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ: ভাদ্র শেষ হইয়া গিয়াছে
- সপ্তম পরিচ্ছেদ: পূজা আসিয়া পড়িয়াছে
- অষ্টম পরিচ্ছেদ: পরদিন সপ্তমীর সকাল
- নবম পরিচ্ছেদ: নবমীর রাত্রিকাল
বুকে যেন শেল ঘঁড়িয়া মারিয়াছে। সে আঘাতে তাহার সর্বাঙ্গ কাঁপিতেছে। সব বল যেন ফুরাইয়া গিয়াছে। সে গ্রামপ্রান্তরের একটা গাছতলায় আসিয়া দাঁড়াইল। আর চলিতে পারিবে না।
পিছন হইতে একটি মেয়ে আসিয়া তাহাকে দেখিয়া থমকিয়া দাঁড়াইল। চাঁপাডাঙার বউ মাঠের দিকে মুখ ফিরাইয়া দাঁড়াইয়া ছিল। বেদনার্ত অন্তরের সঙ্গে বিস্তীর্ণ প্রান্তরের বোধ করি একটা নিবিড় যোগাযোগ আছে। মন এমন ক্ষেত্রে শূন্য বিস্তৃতির দিকে চাহিয়া সান্ত্বনা পায়। একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিল কাদম্বিনী। এই বিস্তীর্ণ জলভরা মাঠও মাসখানেকের মধ্যে সবুজ ফসলে ভরিয়া উঠিবে না!
মেয়েটি তাহাকে দেখিয়া বলিল—বড় মোল্যান।
চাঁপাডাঙার বউ মুখ ফিরাইল-ইহার মধ্যে কখন তাহার চোখ হইতে জলের ধারা গড়াইয়া আসিয়াছে।
মেয়েটি সবিস্ময়ে বলিল, কাঁদছ তুমি বড় মোল্যান?
চাঁপাডাঙার বউয়ের খেয়াল হয় নাই যে, তাহার চোখ হইতে জল গড়াইতেছে। কথাটা শুনিয়া সে দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া চোখ মুছিতে চেষ্টা করিল। দুই হাত আবদ্ধ, কাজেই মুখখানি নিজের কাঁধের কাপড়ে খুঁজিয়া চোখের জল মুছিয়া চাহিল।
মেয়েটি জিজ্ঞাসা করিল, কি হল গো মোল্যান?
বিষণ্ণ হাসিয়া চাঁপাডাঙার বউ বলিল, বড় মাথা ধরেছে মা। শরীরটা কেমন করছে আমার।
সে আবার মুখ ফিরাইল।
সামনেই বিস্তীর্ণ কৃষিক্ষেত্র। বর্ষণের মধ্যে কর্ষণ চলিয়াছে। মাঠে মাঠে হালগুরু আর মানুষ। চাষীর পেশিবহুল দেহ সামনে ঝুঁকিয়া পড়িয়াছে, গরুগুলি কাধ টান করিয়া লাঙল টানিয়া চলিতেছে। কতক লোক আলের উপর কোদাল কোপাইয়া চলিয়াছে। বীজক্ষেতের মধ্যে হাঁটু গাড়িয়া বসিয়া বীজচারা তুলিতেছে।
মধ্যে মধ্যে বীজের বোঝা মাথায় করিয়া চাষী চলিয়াছে রোয়ার ক্ষেত্রের দিকে। পরিপাটি। কাদা-চাষ-করা-জমিতে মেয়ে-পুরুষ মিলিয়া ধানচারা রোপণ করিতেছে। চারিদিক ব্যাঙের কোলাহলে মুখর। কাদা-চাষকরা জমির চারপাশে কাক নামিয়াছে—পোকামাকড়ের আশায়। দুই। একটা কাদাখোঁচা এখানে ওখানে ঘুরিতেছে। কালো মেঘের গায়ে সাদা বকের সারি উড়িয়া চলিয়াছে মাঝে মাঝে। মেঘমেদুর দিনটির সঙ্গে ক্লান্ত বিষণ্ণ চাঁপাডাঙার বউ যেন একাত্মতা অনুভব করিতেছিল।
যে মেয়েটি চাঁপাডাঙার বউয়ের সঙ্গে কথা বলিতেছিল সে তাহার মুখের দিকে চাহিয়া সহানুভূতির সঙ্গে বলিল, দেহ ভাল নেই তো এই জলে ভিজে এলে ক্যানে মা? ছুটকীকে পাঠালেই হত।
চাঁপাডাঙার বউ বলিল, অমরকুড়ির পানে যাস যদি নয়ানের মা, তবে আমাদের ওদিকে ডেকে দিস বলিস এখানে দাঁড়িয়ে আছি আমি। আর যেতে পারছি না।
–দোব—দোব। ছেবার তো নয় মা, নইলে আমি নিয়ে যেতাম।
—তার চেয়ে বড় মোড়লকে বলিস। মহাতাপ চাষ ছেড়ে আসতে রাগ করবে। বড়কে বলিস, সে এসে নিয়ে যাবে।
অমরকুড়ি অর্থাৎ অমরকুণ্ডু। ধান সেখানে মরে না। সেখানেই তখন সেতাবদের চাষ চলিতেছিল।
চাষের সময় সেতাবও চাষে খাটে। কঠিন কাজগুলো তেমন সে পারে না, তবে অন্য সকল। কাজই করে। কোদাল কোপায়, বীজচারা পোঁতে, কাদা-চাষ-করা জমিতে কোনো ঠাঁই উঁচু হইয়া থাকিলে, সেও পায় করিয়া ঠেলিয়া সমান করিয়া দেয়।
সেতাবের চাষ বড়। দুইখানা হাল। হাল দুইখানার কাজ শেষ হইয়াছে; লাঙল খোলা অবস্থায় হাল কাঁধে লইয়া গরু চারিটা ঘুরিয়া ঘাস খাইতেছে। কয়েক জন সাঁওতাল মেয়ে ধান। পুঁতিতেছে। মহাতাপ কোদাল কোপাইতেছে। সেতাব হুঁকা হাতে জমির এধার হইতে ওধার পর্যন্ত ঘুরিয়া উঁচু জায়গাগুলি পায়ে বসাইয়া দিতেছে।
নয়ানের মা জমির কাছে আসিয়া দাঁড়াইল।
চাঁপাডাঙার বউয়ের দেহ খারাপ, আসিতে পারিবে না শুনিয়া সেতাব উদ্বিগ্ন চিত্তেই আলপথে হাঁটিতেছিল। গাছতলায় উপস্থিত হইয়া সে দেখিল, চাঁপাডাঙার বউ চুপ করিয়া যেন মাটির পুতুলের মত বসিয়া আছে।
সেতাব বলিল, নয়ানের মা বললে—দেহ খারাপ তোমার?
চাঁপাডাঙার বউ বলিল, হ্যাঁ। সঙ্গে সঙ্গে চোখের জলের বাঁধ ভাঙিয়া গেল।
–ওই–ওই, একে বলে, তা হলে জলে ভিজে এলে ক্যানে? ম্যালেরিয়ার সময়—দেখি, কপাল দেখি! সে কপালে হাত দিতে গেল।
চাঁপাডাঙার বউ কপাল সরাইয়া লইয়া বলিল, না।
—এই দেখ, না ক্যানে? দেখি।
–না, কিছু হয় নি আমার।
–একে বলে, এ তো ভ্যালী বিপদ রে বাবা।
–লোকের কথা আমি আর সইতে পারছি না।
—এই দেখ। কে আবার কি কথা বললে তোমাকে? কে? কার ঘাড়ে তিনটে মাথা? বল, আমি দেখছি তাকে। মহাতাপকে বললে—
–না, সে শুনবে বলে তোমাকে ডেকে পাঠিয়ে এখানে এনেছি আমি। লোকে বলছে। মহাতাপকে ঠকিয়ে তুমি পুঁজি করছ। কেন তুমি মহাতাপকে সব কথা বল না?
—তোমাকেই বলি নাকি আমি?
–তাতে ক্ষেতি হয় না। কিন্তু–
—সে আমি বুঝব; সে আমার মায়ের পেটের ভাই। তাকে বলি—আর সে পাড়াসুদ্ধ গেরামসুদ্ধ বলে বেড়াক। কিন্তু কে কি বললে—আমার দিব্যি দিয়ে বলছি বলতে হবে তোমাকে।
–দিব্যি দিলে?
–দিলাম।
–বললে টিকুরীর খুড়ী।
টিকুরীর খুড়ী তখন সেতাবদের বাড়ির দাওয়াতে বসিয়া মানদার সঙ্গে মাছ ভাগ লইয়া বেশ একটা ঝগড়া পাকাইয়া তুলিয়াছিল। উঠানে মাছ ভাগ করা পড়িয়া আছে। এদিকে অনেকগুলি—সেটা সেতাবদের ভাগ, আর এক জায়গায় বিপিনের অর্থাৎ মোটা মোড়লের ভাগ, সেটা সেতাবের ভাগ হইতে কিছু কম হইলেও নেহাত কম নয়, আর কয়েকটি ভাগে কোনোটিতে দুইটি কোনোটিতে তিনটি এমনি। গোবিন্দ মাছ ভাগ করিতেছে।
মানিকের হাতে একটি মাছ। সে মাছটি লইয়া টিপিতেছে।
টিকুরীর খুড়ীর ভাগ ওই তিনটি মাছওয়ালা ভাগের একটা ভাগ। মাছ তিনটি তুলিতে তুলিতে বলিল, ভাগী ভঁড়িয়ে খেতে নাই বাছা, তাতে মঙ্গল হয় না। বুঝেছ? খেয়ো না তা। তোমার একটা ছেলে। ভাসুরের কাছে জায়ের কাছে ও বিদ্যা শিখোনা। ফল দেখেছ তো? তোমাদের স্বামীস্ত্রীকে ঠকিয়ে গোপনে পুঁজি অনেক করেছে ওরা। কিন্তু হয়েছে? বলি একটা সন্তান হয়েছে চাঁপাডাঙার বউয়ের? মাছসুদ্ধ হাত দুটা সে মানদার মুখের কাছে নাড়িয়া দিল।
মানদা কি বুলিবে খুঁজিয়া না পাইয়া বলিল, মিছে কথা বলছ কেনে?
–মিছে কথা! মিছে কথা! গায়ের লোককে শুধাও গা। দেওর-সোহাগী আমার। মরণ তোর দেবীপুরের বউ! কিছু বুঝিস নে তুই। শোনগে, ঘোঁতন ন্যাকাপড়া-জানা ছেলেভদ্দর নোক—সে কি বলে শোনগে। বলে, দেওর-ভাজ আমরা আর দেখি নাই কখনও। নতুন দেখছি। মর তুই মর ছুঁড়ী! তুই মর্।
সে চলিয়া যাইতেছিল।
গোবিন্দ এবার বলিল, অই, অই, তুমি রাখাল পালের কাছে যে মাছ কটা নিলে, সে কটা ভাগ কর এইবার। ওগো ও মোল্যান–অই! মানিকের মা, বল না গো। অ ছোট মোল্যান! এই ওর কোঁচড়ে ভরা রয়েছে গো।
মানদা থরথর করিয়া কাঁপিতেছিল—কণ্ঠস্বর তাহার রুদ্ধ হইয়া গিয়াছে। তবু সে বিচিত্র স্থির দৃষ্টিতে টিকুরীর খুড়ীর গমনপথের দিকে চাহিয়া রহিল।
টিকুরীর খুড়ী কিন্তু মাছগুলি লইয়া শিবকেষ্টর বাড়ি গেল না। এই জলের মধ্যেই সে গিয়া উঠিল ঘোঁতনের বাড়িতে। ঘোঁতন তাহার মামলা করিয়া দিবে বলিয়াছে। সেই জমি ভাগের মামলা।
সেদিন সাবরেজেষ্ট্রি আপিস বন্ধ। তাহার উপর বর্ষার দিন। ঘোঁতন দাওয়ার উপর বসিয়া বাঁয়া-তবলা লইয়া পিটিতেছিল। গান তাহার বড় আসে না। তবলাতেই তাহার সঙ্গীতপ্রিয়তার আবেগ নিঃশেষিত হয়। ধা তিন-ধা-ধতিন ধা। তে রে কেটে-মুখে বোল বলে আর তবলা বাজায়। তবে বক্তৃতায় সে মজবুত! শকুনি, কলি, তক্ষক প্রভৃতি কয়টা পার্টে তাহার খুব নাম।
খুড়ী ঘোতনের দাওয়ায় মাছগুলি ঢালিয়া দিয়া বলিল, লে বাবা ঘোঁতন, ভেজে খাস। খুড়ী চাপিয়া বসিল।
ঘোঁতন খুশি হইয়া বাজনা বন্ধ করিয়া বলিল, এ যে লহনা পোনা খুড়ী।
—হেঁ বাবা। পেলাম, তা বলি ঘোঁতনকে দিয়ে আসি। তা আমার মামলার কি করলি বাবা?
–করেছি খুড়ী। ঠুকে দিয়েছি দরখাস্ত লিখে দিয়েছি সেতাব মোড়ল বিপিন মোড়ল গং প্রভৃতি পঞ্চায়েতবর্গ ঘুষ খাইয়া বিধবাদের সম্পত্তি ঠকাইয়া শিবকেরামকেষ্ট গংকে দিয়াছে। একেবারে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে। ইংরিজিতে দরখাস্ত লিখে দিয়েছি।
বলিতে বলিতেই হেঁট হইয়া একটা মাছ তুলিয়া লইয়াই বলিল, মাছ উঠেছে বুঝি পুকুর থেকে বেড়ে টাটকা মাছ। ভাজি যা হবে! পুঁটি, পুঁটি, অ পুঁটি!
খুড়ী বলিল, সাজার পুকুরের মাছ, বুয়েচ বাবা, মাঠে একেবারে ময়লাপ। মহাতাপের বউ সের দরুনে ধরে ঘরে ঢুকিয়েছে। তা যদি বলতে গেলাম বাবা তো চাঁপাডাঙার বউয়ের ঠেকার কি? আমিও টিকুরীর বেটী, আমি খুব শুনিয়ে দিয়েছি। মুখে মুখে বলে দিয়েছি—বলি দেওরসোহাগী আমার, ঘরের ভাগী ভঁড়িয়ে খেয়ে তোমার তো একটা হল না। আবার শেষে পাড়ার শরিকদের ফাঁকি? ওদের ছোট বউকে বলে এসেছি। গলায় দড়ি তোর। দেওর-ভাজ আর পৃথিবীতে নাই? তা কাকে বলছ? ছুঁড়ী ভাবলী।
ঘোঁতন বলিল, তুমিও ভাবলী খুড়ী, তুমিও ভাবলী।
–আমি ভাবলী?
ঠিক এই সময়েই পুঁটি–ঘোঁতনের
