চাঁপাডাঙার বউ

« <
/ 31
> »

অবিবাহিত যুবতী বোন—ঘরের দরজা খুলিয়া বাহির হইয়া আসিল।কি, বলছ কি?

–এই মাছ কটা নিয়ে যা। বেশ করে ভাজি করবি। কিংবা ঝাল।

টিকুরীর খুড়ী বলিল, অ মা গো! পুঁটি? তোমার বুন। এ যে হাতি হয়ে উঠেছে?

খুড়ীর কথা গ্ৰাহ্য না করিয়া পুঁটি বলিল, আমি পারব না। হাঁড়ি চড়ে না, তার মাছভাজা? এ ঘরে তোমার মা ধুকছে জ্বরে, ওঘরে বউ খুঁকছে। তুমি বসে বসে তবলা পিটছ। আমি এত পারব না। তোমরা সবাই আমার হাতির গতরই দেখেছ।

–পুঁটি!–কড়াসুরে ঘোঁতন শাসন করিয়া উঠিল।

পুঁটি যাইতে যাইতে ফিরিয়া মাছ কয়টা কুড়াইয়া লইয়া বলিল, ভাজতে পারব না, পুড়িয়ে দিচ্ছি, খেয়য়া। ঘরে তেল নাই। আর ডাক্তার-কবরেজ যা হয় ডাক-মায়ের জ্বর খুব।

—ম্যালেরিয়া জ্বর, ওর আবার ডাক্তার-কবরেজ কি হবে? হু-হু করে উঠেছে, আবার খানিক পরে ছেড়ে যাবে। ইউনিয়ন বোর্ড থেকে মেপাক্রিন এনে দোব, খেলেই সেরে যাবে।

—ভাল, উদিকে ভাগীদার নেপাল কাহারের বউ এসে বসে আছে।

–ধান-টান দিতে আমি পারব না। সে বলে দেগা। ধান নাই তো দেব কোথা থেকে?

–ধান পরের কথা, এখন বেচন নাই। জমি চাষ হবে না। বেচন দেখে দাও গো।

–বেচন? বেচনই বা পাব কোথা আমি?

–তবে থাকবে তোমার জমি পড়ে।—বলিয়া পুঁটি ঘরে চলিয়া গেল।

—থাকুক গে! আমার কচুটা।—বলিয়া ঘোঁতন বুড়ো আঙুল দেখাইয়া দিল। তারপর খুড়ীকে বললে, খাই যেন একা আমি, বুঝলে খুড়ী? হুঁ। বলিয়া তবলায় অকারণে চাটি মারিয়া দিল।

–আমি চললাম বাবা। একটা তাগিদ দিস, বুঝলি?

বলিয়া খুড়ী উঠিয়া পড়িল।

 

আরও দিন পনের পর সেদিন বিকেলবেলা বেচারি পুঁটি আসিয়া উপস্থিত হইল বিপিন মোড়লের বাড়ি।

মোটা মোড়ল পায়ে সরিষার তেল মাখিতেছিল। তামাক সাজিতেছিল একজন কৃষাণ। পুঁটি আসিয়া দাঁড়াইল এক পাশে। বলিল, আমি একবার আপনার কাছে এলাম জ্যাঠা।

–কে? কে বল দেখি তুমি বাছা? চেনা-চেনা করছি, চিনতে ঠিক লারছি–

–আমি নবগেরেমের গোপাল ঘোষের কন্যে—

–গোপালের কন্যে? তুমি ঘোঁতনের ভগ্নী?

–হ্যাঁ।

–দেখ দেখি কাণ্ড। বড় হয়ে গিয়েছ। চিনতে পারছি।

–মা পাঠালে আপনার কাছে।

–বল, কি জন্যে পাঠালে?

–বললে পাঁচজন থাকতে বীচনের অভাবে আমাদের জমি চাষ হবে না?

–তোমাদের বীচন নাই? কি হল? তা তুমি এলে কেন? ঘোঁতন কই? ছি-ছি-ছি!

—তাকে তো জানেন। সে উ সব দেখবে না। আর তার সময়ও নাই। রেজেস্টারি আপিস ইউনিয়ন বোর্ড আপিসে সারাদিন কাজ তো। পুঁটি ক্ষীণ যুক্তিতে ভাইকে রক্ষা করিবার চেষ্টা করি।

–হুঁ, তা কতটা জমির বীচন চাই?

–দশ বিঘে জমি; তার বিঘে ছয়েক পুঁতেছে, চার বিঘে পড়ে আছে—বীচন নাই।

—তাই তো বাছা। আমার খানিক বীচন আছে, বাঁচবে, কিন্তু বেনো জমির জন্যে রাখতে হবে। তা—

—আমাদের কি হবে?

–ঘোঁতন হলে বলতাম, উপোস করে মরবে। তা সে কথা তো তোমাকে বলতে পারছি না। দেখি সেতাবের বীচন বাঁচবে, সেতাবের হিসেব মহাতাপের গতর–। তা সেতাব আবার ঘাড় পাতলে হয়? তুমি বাছা ওদের বড় বউকে গিয়ে ধর গা। নাঃ চল, আমিই যাই।

মোটা মোড়ল পথে নামিল। আপন মনেই বলিতে লাগিল, বুয়েছ মা, এই সেতাবের কত্তা বাবার নাম ছিল দয়াল মোড়ল, লোকে বলত দলু মোড়ল; আমার বাবার নাম ছিল পরেশ। দুজনা ছিল চাকলার মাথা। নবগ্যেরামে তখন লতুন ফেশান ঢুকেছে। দেখেশুনে দুজনে পরামর্শ করত আর বলত—দলো মলেই হল, আর পরশা মলেই ফরসা। তাও আমরা কিছু কিছু বজায় রাখলাম, এরপর সব খখা। উচ্ছন্ন দিলে। ইংরেজি ইস্কুলে ঢুকেবাবু হয়ে ফেল মেরে ঘর ঢুকছে; জমি বেচে-বেচে খাচ্ছে বসে।

সারা পথটাই বকিতে বকিতে সেতাবদের দরজায় হাজির হইল। দরজা হইতে ডাকিল–সেতাব? সেতাব রয়েছ? অ সেতাব?

বাড়ির বাহির-দরজায় বাহির হইয়া আসিল মহাতাপ, তাহার হাতে কা। ফরাত ফরাত শব্দে কাটা টানিতে টানিতে বাহির হইয়া আসিয়া মাতব্বর খুড়ো মোটা মোড়লকে দেখিয়াই অপ্ৰস্তুত হইয়া গেল। চট করিয়া কাসুদ্ধ হাতটা পিছনের দিকে করিল।

বিপিন বলিল, সেতাব কই?

মহাতাপের পেট-ভর্তি তামাকের ধোঁয়া, সে দম বন্ধ করিয়া বলিল, তামাক খান। বলিয়া কাটা বিপিনের হাতে দিয়া পিছন ফিরিয়া হুস করিয়া ধোঁয়া ছাড়িয়া দিল। এবং এতক্ষণে স্বচ্ছন্দ হইয়া বলিল, বসুন, উঠে বসুন।

দাওয়ার উপর উঠিয়া মোড়াটা আগাইয়া দিল। পুঁটি অদূরে পথের ধারে দাঁড়াইয়া ছিল।

বিপিন মোড়ল দাওয়ায় উঠিয়া মোড়ায় বসিয়া ডাকিল, এইখানে এস বাছা। অ পুঁটি!

মহাতাপ সবিস্ময়ে বলিল-পুঁটি! এই লাও, ঘোঁতনা তাড়িয়ে দিয়েছে নাকি?

পুঁটি ধীরে ধীরে আগাইয়া আসিল।

মহাতাপ বিপিনকে বলিল, তোমরা হুকুম দাও জেঠা, ঘোঁতনকে আমি কিলিয়ে সোজা করে দিই। বড়া বজ্জাত। নচ্চারটা বড় বজ্জাত। এ মেয়েটা ভাল। যা গালাগাল দেয় আর মারে ওকে–। আমি চোতপরবের সঙের সময় দেখে এসেছি।

বিপিন বলিল, তুই থাম্ মহাতাপ! ও তার জন্যে আসে নি।

মহাতাপ আগাইয়া গিয়া বলিল, তার জন্যে আসে নি! কই বলুক পুঁটি, বলুক কালীমায়ের। দিব্যি করে ঠাস ঠাস করে চড়িয়ে দেয় কি না? বলুক।

পুঁটি দায়ে পড়িয়াছে। সে না পারে স্বীকার করিতে না পারে প্রতিবাদ করিতে। স্বীকার করায় লজ্জা আছে, প্রতিবাদে কুণ্ঠা আছে, আশঙ্কা আছে; মহাতাপ তো নিজেই কালীর দিব্যি গালিয়া। চাক্ষুষ দেখার কথা চিৎকার করিয়া বলিবে এবং হয়ত শেষ পর্যন্ত বীচন দিব না বলিয়া বসিবে।

বিপিন মোড়ল প্রবীণ লোক। সে পুঁটিকে নতমুখ দেখিয়া বলিল, না রে বাপু, না। আজ ও অন্য কাজে এসেছে। ওদের জমির বীচন নাই। বীচন খোঁজ করতে এসেছে।

–হরিবোল! হরিবোল! মহাতাপ হাসিতে লাগিল।

–হাসছিস ক্যানে?

—বীচন হয় নাই তো! সে আমি জানতাম–প্রচুর কৌতুকে সে হাসিতে লাগিল।–তুষ ফেললে বীজ হয় খুড়ো? আমি জানতাম। ঘোঁতনের ভাগীদার নেপাল যেদিন বীচন ফেলে, সেইদিনই আমি বলেছিলাম। আমি বললাম, ই কি রে? এ যে সব তুষ! এতে বীজ হবে ক্যানে? নেপাল বললে আমি কি করব? ঘোঁতন ঘোষ বললে—যা হয় ওতেই হবে। আমি বললাম–দে তবে গোঁজ গোঁজায় নমো করে। মহাতাপ খুব হাসিতে লাগিল।

বিপিন বলিল, কিছু বীচন দিতে হবে। তোর তো নিশ্চয় আছে।

—হ্যাঁ। অহঙ্কার করিয়া মহাতাপ বলিল, জরুর আছে, আলবৎ আছে। কিন্তু ঘোঁতনকে নেহি দেঙ্গা

–দোব না বললে কি হয়? দিতে হবে। ডাক্, সেতাবকে ডাক্।

—সেতাব!-রাগিয়া উঠিল মহাতাপসেতাব কি করবে? সেতাব? মাঠে যতদিন বীচন। থাকবে ততদিন সেতাবের এক গাছ নেহি হ্যায় বাবা। সব মহাতাপের। বিলকুল। হা ধান কাটেগা, ঘরে আনেগা, ঝাড়াই করেগা, গোলায় তুলেগা, তারপর উ যা করেগা তা করেগা। মাঠকে মালিক হ্যাম হ্যায়—হাম। একবার ঘোঁতনার মায়ের কথায় ধান ছেড়ে দিয়েছি, সবাই বকেছে আমাকে। মহাদেবের পাট নিয়ে দশ টাকা চাঁদা দিয়েছি। উঁহুঁ, আর নেহি দেগা।

এবার পুঁটি বলিল, আমার মা-ই আমাকে পাঠিয়েছে মহাতাপদাদা। জমি পোঁতা না হলে আমরা খাব কি বল?

—খাব কি? শুধু তোরা খাবি? ঘোঁতন খাবে না? আগে ভাত বেড়ে তোত কে দিবি।

হঠাৎ বিপিন মোড়ল পুঁটিকে বলিল, চল, বাড়ির ভিতর চল। ডাক, চাঁপাডাঙার বউমাকে ডাক। বউমা তো তোমাদের আপনার গো। বউমার মা তোমার মা তো সই!

মহাতাপ ঘাড় নাড়িয়া বলিল, উঁহু, বড় বউয়ের শরীর খারাপ। সে শুয়ে আছে। উঁহুঁ।

 

সত্যই বড় বউ ঘরের মধ্যে শুইয়া ছিল। শরীর খারাপ বলিয়া শুইয়া আছে। আসলে টিকুরীর খুড়ীর সেই মর্মান্তিক কথা কয়টা বিষাক্ত তীরের মত তার মর্মস্থল বিধিয়া অবধি তাহাকে বিষণ্ণ ক্লান্ত করিয়া ফেলিয়াছে। কথা কয়টার বিষে তাহার অন্তর এমনই জর্জর হইয়া গিয়াছে। যে, সংসারের জীবনে যেন রুচি পর্যন্ত বিস্বাদ ঠেকিতেছে। অপর সকলের কাছে কথাটা গোপন করিবার অভিপ্ৰায়েই সে শরীর খারাপের অজুহাতে আপন ঘরে শুইয়া আছে। সে চুপ করিয়া। শুইয়া ছিল। মাথার দিকে জানালার ধারে বসিয়া সেতাব তামাক খাইতেছিল আর মৃদুস্বরে বকিতেছিল।

—একে বলে, এ তো ভারি বিপদ করলে তুমি! এ তো বড় ফ্যাসাদ! টিকুরীর খুড়ী কি বললে, আর তুমি গিয়ে শয্যা পাতলে! ওঠ–ওঠ।

–না। আমাকে জ্বালিয়ো না। আপনার কাজ দেখগে যাও।

–ওই! তুমি না খেয়ে পড়ে থাকবে, আর আমি কাজ দেখব? ওঠ ওঠ। কুকুরের কামড় হাঁটুর নিচে। টিকুরীর খুড়ী বললে,

« <
/ 31
> »