- প্রথম পরিচ্ছেদ: দেবগ্রামের পথে
- দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: মহাতাপ কথাটা মিথ্যা বলে নাই
- তৃতীয় পরিচ্ছেদ: দিন কয়েক পরের কথা
- চতুর্থ পরিচ্ছেদ: দেখিতে দেখিতে বৰ্ষা নামিয়া পড়িল
- পঞ্চম পরিচ্ছেদ: ভাদ্র মাস পড়িয়া গিয়াছে
- ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ: ভাদ্র শেষ হইয়া গিয়াছে
- সপ্তম পরিচ্ছেদ: পূজা আসিয়া পড়িয়াছে
- অষ্টম পরিচ্ছেদ: পরদিন সপ্তমীর সকাল
- নবম পরিচ্ছেদ: নবমীর রাত্রিকাল
বাদ লইয়া থাকে।
সেতাব ইঁদপূজার বেদির স্থানটার পাশে দাঁড়াইয়া ছিল। মোটা মোড়ল চণ্ডীমণ্ডপের কিনারায় বসিয়া মোটা একটা কায় তামাক খাইতেছিল। চণ্ডীমণ্ডপে একখানি একমাটি-করা দশভুজা প্রতিমা শুকাইতেছে। এখনও মুণ্ড বসানো হয় নাই। কতকগুলা উলঙ্গ অর্ধউলঙ্গ ছেলে ঘুরিতেছে এদিক ওদিক। তাহার সঙ্গে মানিকও রহিয়াছে। গোবিন্দ রাখালটা তাহাকে লইয়া আসিয়াছে। মানিককে নামাইয়া দিয়া সে ইন্দ্র-দেবতার বেদিটা গড়িতেছে। দশ-হাত-লম্বা দারুময়-দেহ দেবতাটি একটা বিরাটকায় ফড়িংয়ের মত ঠ্যাং উল্টাইয়া পড়িয়া আছে। মূর্তিটার মধ্যে মূৰ্তিত্ব নাই, নাক কান চোখের বালাই নাই। দশ-হাত-লম্বা একটা বৃক্ষশাখা, ছালটা তুলিয়া দেওয়া হইয়াছে, একদিকে মাথায় ঢেঁকির মত ছোট দুইটা কাঠের সঙ্গে খিল পরাইয়া গাঁথা; ওই ছোট কাঠ দুইটাকে বেদিতে পুঁতিয়া দেবতাকে টোকো দিয়া উন্নত এবং ঊর্ধ্বশির করিয়া পূজার সময় খাড়া করা হইবে।
চণ্ডীমণ্ডপের সামনে গ্রাম্য রাস্তা। রাস্তার উপর দিয়া চাষীরা চলিয়াছে। কয়েকটি মেয়ে ঝুড়ি করিয়া লাল মাটি লইয়া চলিয়াছে। কয়েক জনের মাথায় খড়িমাটি। তাহারা হাকিতেছিল লাল মাটি লেবে গো, লাল মাটি।
খড়িমাটিওয়ালা হাকিল—খড়িমাটি চাই, ঘর নিকুবার খড়িমাটি! দুধের মত অং লবেন। খড়িমাটি!
চণ্ডীমণ্ডপ হইতে খানকয়েক বাড়ির পরে শিবকেরামকেষ্টর বাড়ি। শিবকেষ্টর বাড়ির দাওয়া হইতে টিকুরীর খুড়ী উঁকি মারিয়া মুখ বাড়াইয়া সমান জোরে হাকিয়া প্রশ্ন করিল, কি লা? কি?
—মাটি গো, মাটি।
–লাল মাটি, খড়িমাটি।
খুড়ী মুখ ভ্যাঙাইয়া বলিল, মাটি গো মাটি! লাল মাটি। খড়িমাটি! মাটি নিয়ে কি বুকে চাপাবে নোকে? মাটি গো মাটি! ঘরে চাল সেজে না (অর্থাৎ সিদ্ধ হয় না), লোকে তা বোঝে না। ঘরে ধান নাই, চাল নাই, খাবার নাই; যার ঘরে ধান ছিল লেবি না মেরি করে নিয়ে গেল (লেভিপ্রথা)। যার আছে সে লুকিয়ে রেখেছে। ঘর নিকুবে! লোকে রঙ করবে! মরণ!
—তা মাটি না লিলে মোরা খাব কি?
—কি খাবি তা আমি কি জানি? আমি কি খাব, পঞ্চায়েত ভেবেছে? জমি দিয়েছে আমাকে? সেই পাপেই হচ্ছে এসব। গতবারে পোকা লেগেছিল ধানে। এবারে শুকোতে যাবে। শুকিয়ে যাবে, ধান ফুলোবে না। ফুললে শুকিয়ে তুষ হবে। আর জল হবে না। আর জল হবে না। ঠায় দাঁড়িয়ে ধান মরবে। দেখবি! টিকুরীর বউ যেন নাচিতেছিল। সর্বাঙ্গ দোলাইয়া সুর টানিয়া টানিয়া কথা বলিতেছিল। আনন্দ যেন তাহার ধরিতেছে না।
মাটিওয়ালী মেয়েগুলা তাহার ভঙ্গি দেখিয়া হাসিয়া ফেলিল। একজন ঠিক তাহারই মত সুর করিয়া বলিলতা হবে না মোল্যান, আর সিটির জো নাই। ক্যানেল এয়েছে। মৌরক্ষী বেঁধেছে। পাকা দেওয়াল দিয়ে গো, লোহার ফটক বেঁধে। ফটক বন্ধ করলেই জল চলে আসবে।
—আসবে না, আসবে না, আসবে না; ঘোঁতন বলেছে আসবে না। খালের ভেতর গোঙাল পড়ে জল চলে যাবে পাতালে। লয় তো বাঁধ ভেঙে যাবে। লয় তো সি জলে ধান বাঁচবে না। বাঁচলে পচে যাবে, লয় তো পোকা লাগবে। ধান হবে না, তুষ হবে। ঘোঁতন বলেছে।
একটি মেয়ে বলিল, ঘোঁতন ঘোষের অমনি কথাই বটে! বলে, হরিনামের নিকুচি করি আমি।
খুড়ী খাক করিয়া উঠিল—ঘোঁতন ঘোষের অমনি কথাই বটে! ঘোঁতন নেকাপড়া জানে। বিদ্যে আছে পেটে। হোত-ত্যা-ত্যা করে না। এক লজরে ধরতে পারে। আমাকে সেদিন বলেছিল, ভাবলী। রেগেছিলাম আমি। হুঁ বাবা। তা ভাবলীই হলাম আমি। ভাজের গায়ে গুড় মাখিয়ে চেটে খায়! মা গো! কোথায় যাব! বলিতে বলিতে হঠাৎ সে থামিয়া গেল। কণ্ঠস্বর খাটো করিয়া বলিল, অ-মা! মহাতাপ আসছে যে। গোঁত গোঁত করে আসছে দেখ, বুনো শুয়োর আসছে। অমা, হারামজাদী রাঙীকে ধরে আনছে ক্যানে। এই মরেছে। সঙ্গে আবার মোটা মোড়ল।
সে ঘরে ঢুকিয়া গেল। মেয়ে কয়টা এ উহার মুখের দিকে চাহিয়া চলিতে শুরু করিল। একজন হাকিয়া উঠিল—মাটি চাই মাটি, রাঙা মাটি, খড়িমাটি।
মহাতাপ একটা গরুর গলায় দড়ি বাঁধিয়া লইয়া আসিতেছিল; সোজা টিকুরীর খুড়ীর বাড়ির সামনে আসিয়া দাঁড়াইয়া হাকিয়া বলিল, তোমার গরু আমি খোঁয়াড়ে দিতে চললাম। গরু ভগবতী না হলে, এ যদি ছাগল-ভেড়া হত তো ওকে মেরে ফেলতাম আমি।
পিছনে পিছনে মোটা মোড়ল বিপিনও আসিয়াছিল। সে গরুর দড়িটা হাতে লইয়া বলিল, চেঁচাস নে। যা বলবার আমি বলছি।
—তুমি কি বলবে? আমার এক ভিলি আকের নেতা মেরে দিয়েছে। কিছু রাখে নাই। ওটা গরু, আর মালিক হল বিধবা মেয়েছেলে, আমি কি করব বল দিকিনি?
নিজের চুলগুলা টানিয়া কঠিন আক্ৰোশে ক্ষোভে বলিয়া উঠিল, আমার চুল ছিঁড়ে মাথা ঠুকতে ইচ্ছে হচ্ছে। আমার অমল ভাল আক, লকলকে কষকষে হয়ে উঠেছিল—
বিপিন ডাকিল, টিকুরীর বউ! বেরিয়ে এস বাছা। শোন!
টিকুরীর বউ বাহির হইয়া আসিয়া বলিল, কি শুনব? আমি কারু কথা শুনি না। সব মিছে। কথা। আমার রাঙীকে আমি কখনও বাঁধি না। দিব্যি মাঠে ঘুরে চরে এসে ঘরে ঢোকে। আমি বিধবা মানুষ, আমি বেঁধে খেতে দিতে পাব কোথা? যারা ফসল আজ্জায়, তারা বেড়া দেয় না ক্যানে? ক্ষেতে যখন যায় তখন হেটহেট করে তাড়িয়ে দেয় না ক্যানে?
বিপিন বলিল, তুমি ক্ষেপেছ নাকি? কি সব বলছ—
–ঠিক বলছি। দাও, আমার গরু দাও। আমি ভাসুর বলে খাতির করব না। আমি মোড়ল বলে মানব না। খোঁয়াড়ে দেবে। অঃ!
সে আগাইয়া গেল গরুটা বিপিনের হাত হইতে ছাড়াইয়া লইবে বলিয়া। মহাতাপ অবাক হইয়া এতক্ষণ খুড়ীর দাপট দেখিতেছিল। সে এবার হাঁক দিয়া উঠিল, কভি নেহি! দাও, গরু দাও। বলিয়া ঝটকা মারিয়া দড়িটা বিপিনের হাত হইতে কাড়িয়া লইল।-খোঁয়াড়ে দেব আমি।
গরুটাকে সে টানিতে লাগিল।
টিকুরীর খুড়ী গাছকোমর বাঁধিয়া বলিল, ওরে, আমি তোর পরিবারের মত ম্যানমেনে নই। তোর হাঁকারিকে আমি ভয় করি না–
সে আগাইয়া গিয়া মহাতাপের হাত হইতে গরুটা ছিনাইয়া লইবার জন্য প্রস্তুত হইল। মহাতাপ গ্রাহ্য করিল না। সে টানিতে লাগিল গরুটাকে।
–আয়, আয়।
টিকুরীর খুড়ী বলিয়াই চলিয়াছিল—আমি ঘরের কোণে চোখের জল ফেলব না। লাজের চড় গাল পেতে খেয়ে মনের দুঙ্গু মনেই রাখব না। আমি দরখাস্ত করব। হ্যাঁ, দরখাস্ত করব। এখুনি ঘোঁতনের কাছে যাব।
তাহার কথা শেষ হইতে না হইতে শিবকেষ্ট টলিতে টলিতে বাহিরে আসিয়া দাঁড়াইয়া হাতজোড় করিয়া বলিল, মহাতাপ! ভাই! আমি হাতজোড় করছি, মিনতি করছি। আমার জ্বর, ঘরে পয়সা নাই, ধানচালও নাই। খোঁয়াড়ে দিলে, ছাড়াতে হবে আমাকে। নবগ্রাম হাঁটতে হবে। পয়সা লাগবে। আমার দশা দেখ। গরুটা ছেড়ে দে ভাই।
মহাতাপ থমকিয়া দাঁড়াইয়া গেল।
বিপিন বলিল, দে, গরুটা ছেড়ে দে বাবা।
মহাতাপ বলিল, আহা-হা শিবে, তু যে মরে যাবি রে! অ্যাঁ! আহা-হা-হা রে, কি দশা হয়েছে তোর?
শিবকেষ্টর দাঁড়াইয়া থাকিবার ক্ষমতা ছিল না, সে উপুড় হইয়া বসিয়া হাঁটুর উপর কনুই। রাখিয়া দুই হাতে মাথা ধরিয়া বলিল, জ্বরে একেবারে হাড় ভেঙে দিলে রে! তিনখানা কথাতে কাঁপন থামে না। গরুটা ছেড়ে দে ভাই।
খুড়ী আগাইয়া আসিয়া মহাতাপের শিথিল হাত হইতে গরুর দড়িটা টানিয়া লইয়া বলিল, দেবে আর ভাল বলবে। দেবে না?
মহাতাপ গরুটা ছাড়িয়াই দিল, বলিল, আজ ছেড়ে দিলাম শিবের মুখ চেয়ে। ফের দিনে কিন্তু ছাড়ব না।
খুড়ী বলিল, শিবের মুখ চাইতে হবে না। যার মুখ চাইলে ধর্ম হবে, তার মুখ চেয়ে দেখ গে! ভাজের মুখ থেকে চোখ সরিয়ে নিজের পরিবারের মুখের পানে তাকাগে যা। শিবের মুখ। মরণ!
খুড়ী গরুটা লইয়া চলিয়া গেল।
বিপিন মোড়ল শিবকেষ্টকে বলিল, টিকুরীর বউকে নিয়ে বিপদ হল শিবু! ওকে সাবধান করিস-কথাগুলি ভাল কথা নয়। বলিয়া চলিয়া গেল।
শিবকেষ্ট মাথার উপর হাতটা উল্টাইয়া দিল। সে কি করিবে?
মহাতাপ হাত বাড়াইয়া শিবকেষ্টকে বলিল, ওঠ, আমাকে ধরে ওঠ।
শিবকেষ্ট ধীরে ধীরে উঠিল।
মহাতাপ তাহাকে ঘরে পৌঁছাইয়া দিয়া বাহির হইয়া আসিয়া হঠাৎ থমকিয়া দাঁড়াইল। খুড়ী যেন কী কথাটা বলিয়া গেল! কি ভাজের মুখ! পরিবারের মুখ! কি সব বলিল। শিবকেষ্টর অবস্থা দেখিয়া সে তখন এমনই অভিভূত হইয়াছিল যে, কথাটা ঠিক শুনিয়াও বুঝিবার চেষ্টা করে নাই। এতক্ষণে কথাটা মনে হইল। কি বলিল? সে হাকিয়া ডাকিল—এই, এই খুড়ী, এই বিষমুখী টিকুরীর খুড়ী! বলি শুনছ?
খুড়ী ঘরের ভিতর হইতে উত্তর দিল—কেন রেড্যাকরা? বলি বলছিস কি?
—কি বললে কি
