- প্রথম পরিচ্ছেদ: দেবগ্রামের পথে
- দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: মহাতাপ কথাটা মিথ্যা বলে নাই
- তৃতীয় পরিচ্ছেদ: দিন কয়েক পরের কথা
- চতুর্থ পরিচ্ছেদ: দেখিতে দেখিতে বৰ্ষা নামিয়া পড়িল
- পঞ্চম পরিচ্ছেদ: ভাদ্র মাস পড়িয়া গিয়াছে
- ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ: ভাদ্র শেষ হইয়া গিয়াছে
- সপ্তম পরিচ্ছেদ: পূজা আসিয়া পড়িয়াছে
- অষ্টম পরিচ্ছেদ: পরদিন সপ্তমীর সকাল
- নবম পরিচ্ছেদ: নবমীর রাত্রিকাল
তখন? আর একবার বল দিকিন? কি ভাজের–মুখ বউয়ের মুখ–কি বলছিলে?
টিকুরীর খুড়ী হাসিয়া বলিল—তোমাদের বড় বউয়ের মুখখানি বড় সুন্দর রে, চাঁদের পারা। তাই বলছিলাম। তোর বউয়ের মুখ কিন্তু এত সুন্দর নয়, তাই বলছিলাম আমি।
মহাতাপ খুশি হইয়া গেল। সে উচ্চকণ্ঠে সমর্থন করিয়া বলিল, হাজার বার লক্ষ বার। এ তুমি ঠিক বলেছ। আমি বলি কি বলছ! না, এ তুমি ঠিক বলেছ। কিন্তু এবার গরু সামলে রেখো। তা বলে গেলাম। সে হনহন করিয়া মাঠে চলিয়া গেল। স্তব্ধ দ্বিপ্রহর তখন। মাঠে ধান। ভরিয়া উঠিয়াছে। নিড়ান চলিয়াছে। নিদারুণ রৌদ্রের মধ্যে ধানের ক্ষেতে হামাগুড়ি দিয়া আগাছা তুলিয়া চলিয়াছে চাষীরা। দূরে তখনও মাটিওয়ালীদের হক শোনা যাইতেছে। মাটি, মাটি চাই গো! মাটি, লাল মাটি–খড়িমাটি!
সেতাবের বাড়িতে সেদিন দুপুরে ঢেঁকিতে ভোলা কলাই কুটিয়া বেশম তৈয়ারি হইতেছিল। বেশম হইতে সেউই ভাজিয়া গুড়ে পাক করিয়া পূজার নাড় হইবে। দুই জন ভানাড়ী মেয়ে টেকিতে পাড় দিতেছিল, ঢেঁকির মুখে নাড়িয়া-চাড়িয়া দিতেছিল।
স্তব্ধ দ্বিপ্রহর বেলা, বাড়িটা নির্জন। বড় বউকে দেখা যাইতেছে না। এই নির্জনতার মধ্যে তাহারা গান গাহিতেছে। মানদা গাহিতেছে মূল গান, মেয়েগুলি গাহিতেছে ধুয়া।
মেয়েগুলি ধুয়া গাহিতেছিল–
আমার বাজুবন্ধের ঝুমকো দোলায়
বঁধুর মন তো দুলল না,
ও-তার সিথিপাটির লালমানিকের
ছটাতে চোখ খুলল না
হায় সখি, লাজে মরি লাজে মরি গো।
মানদা গাহিল—
আমার মন যে দোলন খেলে
ওতার বনমালার দোলাতে।
আমার মন সেই গেল ভুলে,
তারে এসে ভুলাতে।
ভানাড়ী মেয়েগুলি আবার ধুয়া ধরিল—
আমার বাজুবন্ধের ঝুমকো দোলায়
বঁধুর মন তো দুলল না!
হায় লাজে মরি লাজে মরি লাজে মরি সখি গো!
মানদা আবার গাহিল—
মন কাড়িতে এসেছিলাম
মন হারায়ে ঘর ফিরিলাম–
লাজে গলার চিক মাদুলি পড়ল ছিঁড়ে ধুলাতে।
সঙ্গে সঙ্গে ভানাড়ীরা ধরিল—
হায় লাজে মরি লাজে মরি লাজে মরি সখি গো।
মানদা আবার গাহিল—
খুলতে গেলাম বাজুবন্ধ বধন যে সেই খুলল না।
ভুলতে গেলাম তারে সখি ভুল যে মোকে ভুলল না।
কালনাগে ধরতে গেলাম–
কালীয়ারে জড়াইলাম–
মারতে গিয়ে অমর হলাম জ্বলতে জ্বলন জ্বালাতে!
–লাজে মরি লাজে মরি লাজে মরি সখি গো!
রাধাকৃষ্ণের লীলার স্পর্শ জড়াইয়া এমন ধরনের প্রেমের গান বাংলার পল্লী অঞ্চলে কালে কালে কালোপযোগী ভাষায় ছন্দে উপমায় রচিত হইয়া আসিতেছে। এ ভাব পুরনো হয় না। নূতন ভাষায় নবীন হইয়া দেখা দেয়। সকল কালেই পুরবধূরা এ গান–বাউল বৈরাগী পঁচালি দল, যাত্রার দলের গায়কদের কাছে শুনিয়া শিখিয়া লয়। কালে কালে এইভাবে নির্জন দ্বিপ্রহরে গাহিতে থাকে। ঘরে গায়—ঢেঁকিশালে, ঘাটে গায়—জলে গলা ড়ুবাইয়া, সখিরা মিলিয়া জল আনিবার পথে গায়।
গানের মধ্যেই দরজায় ধাক্কা পড়িল। কেহ শিকল বাজাইয়া দরজার ওপাশে সাড়া দিতেছে। মানদা সেদিকে তাকাইয়া বলিল, কে?
মেয়েলি গলায় সাড়া আসিল, একবার দরজাটা খোল।
মানদা ভানাড়ীদের একজনকে বলিল, দে তো লা খুলে।
মেয়েটি দরজা খুলিয়াই বলিল, অ। পুঁটি মোল্যান! মানদার দিকে তাকাইয়া বলিল, ঘোঁতন ঘোষের বুন গো! বলিয়া সরিয়া দাঁড়াইল।
পুঁটি বাড়ির ভিতর ঢুকিয়া বলিল, ওরে বাপরে। এ যে পুজোর ধুম পড়ে গিয়েছে যে! খুব কলাই কুটছ! খুব গান জুড়েছ!
মানদা মুখ চমকাইয়া বলিল, তা কুটছি। কিন্তু তুমি কি মনে করে হে? এই ভত্তি দুপুরে?
–বড় বউ কই? চাঁপাডাঙার দিদি? একটা কথা বলতে এসেছি।
মানদা তাহার মুখের দিকে চাহিয়া বলিল, কি কথা হে?
–না ভাই, সে আমি তাকেই বলব। আমার মা বলে পাঠিয়েছে, অন্য কাউকে বলতে বারণ করেছে।
–আমি জানি হে, আমি জানি। গয়না তো? টাকা?
—তা জানবে বৈকি ভাই। তুমি অর্ধেকের মালিক। জানবে বৈকি। তবে আমি চাঁপাডাঙার দিদিকে বলে যাই; তুমি তার কাছে শুনো। কই, দিদি কোথায়?
মানদা আঙুল দিয়া দেখাইয়া বলিল, ধান সেদ্ধ করছে, ওদিকের চালায়।
পুঁটি আগাইয়া গেল।
মানদা হাতের কুঁচিগাছটা লইয়া বলিল, ললাটে তিন ঝাঁটা মারতে মন হয়—তিন ঝাঁটা।
বাড়ির আর একদিকে খোভড়া চালায় উনান হাঁড়িতে ধান সিদ্ধ হইতেছিল। ছোট এক টুকরা উনান, সেখানে সিদ্ধ-করা ধান মেলা রহিয়াছে। একটি মজুর মেয়ে পায়ে পায়ে ধানগুলি টানিয়া ওলটপালট করিয়া ঘুরিয়া বেড়াইতেছিল। চাঁপাডাঙার বউয়ের কাপড়খানা ময়লা, ধোঁয়ায় কালো। গাছকোমর বাঁধিয়া কাপড় পরা। মাথায় ঘোমটা নাই। চুলগুলি রুখু দেখাইতেছে। এখনও স্নান হয় নাই। মুখচোখ আগুনের অ্যাঁচে এবং এখনও অস্নাত অভুক্ত বলিয়া শুকাইয়া গিয়াছে। একটু বেশি কালো দেখাইতেছে।
পুঁটি গিয়া একটু অবাক হইয়াই বলিল, তোমার কি অসুখ করেছে নাকি দিদি? এ কি মুখ হয়েছে তোমার? যেন বড় অসুখ থেকে উঠেছ? সে সকরুণ বিস্মিত দৃষ্টিতে কাদুর দিকে চাহিয়া দাঁড়াইয়া রহিল।
–পুঁটি? পুঁটিকে দেখিয়া বড় বউ একটু বিস্মিত হইয়া গেল।—এমন অসময়ে?
–মা পাঠালে তোমার কাছে। কিন্তু–
—সইমা? কেন রে? অসুখ শুনেছিলাম সইমায়ের—; শঙ্কিত হইয়া উঠিল সে। পুঁটি কি তবে টাকা-পয়সার জন্য আসিয়াছে।
—উঠেছে অনেক ভুগে। কিন্তু তোমার এমন চেহারা কেন?
এবার সলজ্জ হাসিয়া বড় বউ বলিল, উপোস কিনা আজ। তার উপর–
–উপোস। ইঁদপুজোর?
–না, আজ সংক্রান্তি। সংক্রান্তিতে কালীর উপোস করি।
–কালীর কবচ নিয়েছ বুঝি দিদি? ছেলের জন্যে?
–হবে না জানি, তবুও নিয়েছি। চাঁপাডাঙার বউ হাসিল–বড় বিষণ্ণ সে হাসিটুকু। উপবাসশুষ্ক মুখে ঠোঁটের সে হাসিটুকু অনাবৃষ্টি আকাশের বর্ষণহীন বন্ধ্যা মেঘের ক্ষীণ বিদ্যুৎ রেখার মতই বিশীর্ণ।
পুঁটি বলিল, তুমি কলকাতায় গিয়ে ডাক্তার দেখাও না কেন দিদি? ওই তো বাবুদের গায়ের রবীনবাবুর বউ কলকাতায় গিয়ে কি সব চিকিৎসা করালে—দিব্যি বছর না ঘুরতে ছেলে হয়েছে।
বড় বউ বলিল, ওসব বাবুদের যা হয় তাই কি আমাদের হয়, না সাজে? এখন কি বলেছে। সইমা ব?
পুঁটি বলিল—কেন কাদু দিদি, জামাই মোড়লের পয়সা তো অনেক। বাবুদের চেয়ে কম নয়। তবে কেন হবে না? না-না, তুমি ধর। তুমি কলকাতায় যাও।
কাদু বলিলটাকা খরচ করবে তোর জামাই মোড়ল? তার থেকে সে নতুন বিয়ে করবে!
পুঁটি সভয়ে যেন চাপা গলায় চিৎকার করিয়া উঠিল—না—কাদুদি না।
কাদু হাসিয়া ফেলিল পুঁটির এমন ভয় দেখিয়া। হাসিয়া বলিল—মরণ। ভয় দেখ ছুঁড়ীর। ভয় নেই, তাও পারবে না তোর জামাই মোড়ল। দুটো বউকে ভাত দিতে হবে না? তাতে খরচ কত জানিস?
পুঁটি স্তব্ধ হইয়া কাদুর মুখের দিকে চাহিয়া রহিল।
কাদু হাসিয়াই প্ৰশ্ন করিল–কি—এমন করে চেয়ে রয়েছিস কেনে?
পুঁটি বলিল–ব্যাটাছেলেদের জান না দিদি, ওদের ঝোঁক চাপলে–ওরা সব পারে।
–ব্যাটাছেলেদের খবর তুই এত জানলি কি করে লা?
যেন অপ্রতিভ হইয়া গেল পুঁটি। পায়ের নখ দিয়া মাটি খুঁটিতে খুঁটিতে বলিল চোখের উপর দেখছি দিদি।
—তোর দাদাকে?
–হ্যাঁ। আরও কতজন দেখছি।
—মরুক গে। যে যা করছে করুক। তোর কেপন জামাই মোড়ল আর যা করবে করুক এ কাজ করবে না। এখন সইমা কি বলেছে বল।
পুঁটি তাহার মুখের দিকে চাহিয়া ছিল, কাদুর শেষ কথায় চমকিয়া উঠিল—একটু আড়ালে চল দিদি।
—আড়ালে? আয়।
পুঁটিকে লইয়া সে একটা ঘরে ঢুকিল। জিজ্ঞাসা করিল, কি রে?
—জান কি না জানি না, তোমার স্বামীর সঙ্গে আমার দাদার আজকাল খুব মাখামাখি। হঠাৎ অঘটন ঘটেছে যেন। মোড়ল প্রায় যায় দাদার কাছে।
চমকিয়া উঠিল চাঁপাডাঙার বউ। কিন্তু সে বড় শক্ত মেয়ে। মুহূর্তে আত্মসংবরণ করিয়া হাসিয়া বলিল—তোর দাদার কাছে যায়? তাতে কি হল? তোর দাদার সঙ্গে এককালে আমার বিয়ের সম্বন্ধ হয়েছিল বলে, চিরকালই কি আক্রোশ থাকবে নাকি?
—তুমি আমার দাদাকে জান না চাঁপাডাঙার দিদি।
–দাদার ওপরে এত রাগ ক্যানে রে? বিয়ে দেয় না?
—মরণ আর কি, বিয়ের জন্যে ভাবি নে। কথাটা কিন্তু আমার নয়, মায়ের। মা বলে দিলে। দাদা বড় মোড়লকে ঠকাচ্ছে। রাখহরি দত্তের ছেলের সঙ্গে জোট করে ফাঁদ পেতেছে। দু ভরির গয়নার ভেতর লোহার তার ভরে, সীসের টোপা ফেলে, চার ভরি ওজন দেখিয়ে বাধা দিচ্ছে। মা বললে—আমার সইয়ের মেয়ে, তারপরে মহাতাপ এবার ধান ছেড়ে দিয়ে উপকার করেছে, তাতে এসব জেনেশুনে চুপ করে থাকলে আমার ধর্মে সইবে না। তোমার স্বামী সেই লোভে মজেছে দাদার সঙ্গে।
—সে তো ভাই স্যাকরাকে দেখিয়ে
