- প্রথম পরিচ্ছেদ: দেবগ্রামের পথে
- দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: মহাতাপ কথাটা মিথ্যা বলে নাই
- তৃতীয় পরিচ্ছেদ: দিন কয়েক পরের কথা
- চতুর্থ পরিচ্ছেদ: দেখিতে দেখিতে বৰ্ষা নামিয়া পড়িল
- পঞ্চম পরিচ্ছেদ: ভাদ্র মাস পড়িয়া গিয়াছে
- ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ: ভাদ্র শেষ হইয়া গিয়াছে
- সপ্তম পরিচ্ছেদ: পূজা আসিয়া পড়িয়াছে
- অষ্টম পরিচ্ছেদ: পরদিন সপ্তমীর সকাল
- নবম পরিচ্ছেদ: নবমীর রাত্রিকাল
পারতে। এমন মিষ্টি কথাগুলি বলিলেও তাহার কণ্ঠস্বর কেমন বিরস। কেমন যেন বেসুর বাজিতেছে।
সেতাব চঞ্চল হইয়া উঠিল, বলিল, সইমা।
–বাবা।
–ঘোঁতনের ছেলে কাঁদছিল দেখে গেলাম, তা বলি–
—তা ছেলেদের দিলেই হত। এই বাজার। তার ওপর, কিছু মনে কোরো না, তোমার ভাই-ভাজ নিয়ে সংসার
–ভাই-ভাজ! সেতাব রাগিয়া উঠিল।–ভাই-ভাজের কি আছে এতে? আমি দেব আমার অংশ থেকে। তার ছেলে আছে। আমার ছেলে নাই, পুলে নাই। আমার খাবে কে? কি করব আমি? কি দরকার আমার যুগিয়ে?
—কাদুকে বলেছ বাবা?
—কাদুকে? চমকাইয়া উঠিল সেতাব। মাথা হেঁট করিয়া ঘাড় নাড়িয়া জানাইলনা, তাহাকেও বলে নাই।
—তুমি বাবা, আমার আর পুঁটির কাপড় দু জোড়া নিয়ে যাও।
–নিয়ে যাব?
–হ্যাঁ।
–মা! চিৎকার করিয়া উঠিল ঘোঁতন।
মা তাহাতে দমিল না। বলিল—কথা হবে বাবা। হবে নয়—হয়েছে। টিকুরীর বউসে থামিয়া গেল। একটু পর যেন শক্তি সঞ্চয় করিয়া বলিলটিকুরীর বউ আমাকে কাল বলছিল, সেতাব খুব আসছে যাচ্ছে। কনেও খুঁজছে। তা-পুঁটিকে। আবারও সে থামিয়া গেল।
সেতাব বিস্ফারিত দৃষ্টিতে ঘোতনের মায়ের দিকে চাহিয়া রহিল। এই কথাটাই যেন তাহার একান্তভাবে মনের কথা অথচ এই মুহূর্তের পূর্বেও তাহার মন কথাটি হাতড়াইয়া পায় নাই। হ্যাঁ, সে সন্তান চায়। কাদু বন্ধ্যা; সে তাহার প্রতি একান্তভাবে অনুরক্ত আসক্ত তাহার প্রতি প্রেমপ্রীতিতে অভিষিক্ত স্ত্রী নয়। কাদু মহাতাপ মহাতাপ করিয়া সারা। তাহার প্রথম যৌবন অর্থোপার্জনের নীরস কৃচ্ছ্বসাধনের মধ্যে উপবাসী রহিয়া গিয়াছে। বহুজনের বঞ্চনায় কৈশোরে সে নিষ্ঠুর আঘাত পাইয়া সংসারকে কুটিল অবিশ্বাসী হিসাবেই দেখিয়াছে। ঘোঁতন তাহার মনে সন্দেহ জাগাইয়া দিয়াছে। টিকুরীর খুড়ী তাহাতে বাতাস দিয়াছে। অবিশ্বাস তাহার জাগিয়াছে। এই লগ্নে পুঁটি আসিয়া তাহার সামনে দাঁড়াইয়াছে। যুবতী মেয়ে। বিবাহ হয় না। বড় দুঃখী। এই তো ইহাকে বিবাহ করিলে এ তাহাকে পরম কৃতজ্ঞতায় অ্যাঁকড়াইয়া ধরিবে। আজ সব কথাগুলি এক কথায় পরিষ্কার হইয়া গেল। সে বলিতে গেল—চোখ তাহার জ্বলজ্বল করিয়া উঠিল—বলিতে চাহিল–হা। আমি পুঁটিকে চাই। আমি আমার সবসব তাহাকে দিব।
কিন্তু বলা হইল না।
ঠিক এই সময়েই সেতাবের রাখাল গোবিন্দ ছুটিয়া আসিয়া বলিল, মোড়ল মশায়, শিগগির আসেন। বাড়ি চলেন।
–ক্যানে রে, কি হল? প্রশ্ন করিল ঘোঁতন।
সেতাব বলিল, কি হবে? নিশ্চয় সেই আমার জন্ম-শত্ৰু কিছু করেছে। ভাই তো নয়–জন্ম-শত্ৰু আমার। চিরদিন জ্বালিয়ে খেলে। সে-ই কিছু করেছে।
—হ্যাঁগো। মাঠে একেবারে ফাটাফাটি লাগিয়ে দিয়েছে। নিজের মাথা ফেটেছে। এই রক্ত পড়েছে। আর মীরবন্ধের শেখেদের দুজনার মাথা ফাটিয়েছে। সেও রক্ত-গঙ্গা। জল নিয়ে। মারামারি।
সেতাব চিৎকার করিয়া উঠিল, মরুক মরুক, নয়ত ধরে নিয়ে নিয়ে যাক। আমি জানি না, কিছু জানি না।
বলিয়া হনহন করিয়া অগ্রসর হইল।
এত বড় কাটার কারণ যেটি, সেটি শুনিতে সামান্য মনে হয়, কিন্তু চাষার জীবনে তাহা অসামান্য, তাহার গুরুত্ব অনেক বেশি।
কারণ, জল চুরি।
মহাতাপ নিজের মুখেই বলিল, কাল রাত এক প্রহর পর্যন্ত ধরে অমরকুঁড়ির বেঁকে বাকুড়িতে আল-ছাপুছাপু জল করেছি আমি। আঙুল দিয়ে মেপে দেখেছি, আল ছাপতে দু আঙুল বাকি ছিল। সেই জল চুরি করে নেবে শেকের পো? বললাম, তো বলে ক্ষ্যাপামি করিস না, বাড়ি যা। চাঁপাডাঙার বউ ভাত বেড়ে রেখেছে, খা গা। ধরলাম টুঁটি চেপে তো হায়দার মাথায় বসিয়ে দিলে পাঁচনের বাড়ি। আমি মহাতাপ! সেই পাঁচন কেড়ে নিয়ে দিলাম দু ভাইয়ের। মাথা পিটিয়ে ফাটিয়ে।
মহাতাপ তখন বাড়িতে বসিয়া বড় বউয়ের পরিচর্যা লইতেছিল। ভাল করিয়া রক্ত ধুইয়া গদাফুলের পাতা বাটিয়া চাপান দিয়া ন্যাড়া দিয়া বাঁধিয়া দিতেছিল। মানদা জল দিয়া রক্তাক্ত দাওয়াটা ধুইয়া ফেলিতেছিল।
সেতাব গম্ভীর মুখে দাঁড়াইয়া শুনিতেছিল। মহাতাপের কথা শেষ হইতেই বলিল—বেশ করেছ, খুব করেছ। এইবার ফৌজদারি মামলা হোক। যাও জেলে। একটা পয়সা আমি খরচ করব না। সে আমি বলে দিলাম।
–তা বলে আমার জল চুরি করে নেবে?
–জল চুরির প্রমাণ হয় নাকি? জলের গায়ে নাম লেখা থাকে নাকি?
–ও জল পেল কোথা থেকে?
–যেখান থেকে পাক। তুই কোথা পেলি? গাড়োল, মুখ্যু পাগল কোথাকার!
বড় বউ এবার বলিল, দেখ, এমন করে ওকে তুমি যা মুখে আসে তাই বোলো না। তোমাকে বারণ করছি আমি। সহোদর বড় ভাই তুমি, তোমার মুখে এ সব বলতে বাঁধছে না? ছি-ছি!
মহাতাপ বড় বউয়ের হাত দুখানি পরম আবেগের সহিত জড়াইয়া ধরিয়া বলিল, যার বড় বউ নাই তার কেউ নাই।
মুহূর্তে সেতাব যেন জোর পাইল; সে জ্বলিয়া উঠিল। চাঁপাডাঙার বউকে বলিল–তোমাকেও ছি, তোমাকেও ছি, তোমাকেও ছি! বুঝলে! বলিয়া কাপড়ের বান্ডিলটা ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দিয়া চলিয়া গেল।
কণ্ঠস্বরে চমকিয়া উঠিল কাদু। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ভ্রূ কুঞ্চিত করিয়া স্বামীর গমনপথের দিকে কিছুক্ষণ চাহিয়া রহিল, তারপর মহাতাপকে বলিল, ছাড়, তোমার জন্য দুধ গরম করে আনি। যাও, ঘরে গিয়ে শোও একটু। মানু, নিয়ে যা ওকে।
বড় বউ রান্নাশালে আসিয়া উনানে দুধের বাটি বসাইয়া দিয়া চুপ করিয়া বসিয়া রহিল।
মহাতাপ ঘরে আসিয়া বিছানায় শুইয়া আপন মনেই বলিল, চামারের নেতার আমি একদিন নিকেশ করে দেব।
পাশের বিছানায় মানিক শুইয়া ছিল। মানু তাহার চাপাপড়া হাতখানা সরাইয়া দিতেছিল। চামার কথাটা সে শুনিতে পায় নাই। নেতার মারিয়া দিবে শুনিয়াই সে ভাবিল—তাহাকে বলিতেছে মহাতাপ। এ সংসারে পোড়াকপালী মানদা ছাড়া এত সহজে নেতার আর কাহার মারিবে সেই চকিতে ঘাড় ফিরাইয়া তীক্ষকণ্ঠে প্রশ্ন করি, কার?
-কার আবার ওই চামারের কেপনের, ওই বড় বউয়ের স্বামীর। ওই আমার, দাদার, তোর ভাসুরের।
—তোমাকেও ছি! বুঝলে?
–তোমার নেতারভি এক রোজ মার দেগা। হ্যাঁ!
বড় বউ কথাগুলি সিঁড়ি হইতেই শুনিতেছিল, বলিল, কি যা তা বলছ? তোমার জন্যে কি আমি শান্তি-স্বস্তি এক দণ্ড পাব না মহাতাপ? নাও, দুধটা খেয়ে ফেল।
–না। দুধ খাব না আমি। ভাত দাও। মছলি আওর ভাত। কাল পলুইয়ে ধরা মাছ আছে। মনে পড় গিয়া। মাছের মাথা আর ভাত। লে আও।
চাঁপাডাঙার বউ বলিল, মানু, ভাত এনে দে।
বলিয়া সে ফিরিল। মহাতাপ তাহার আঁচলটা ধরিয়া বলিল, নেহি, উ হামকো ছি করতা। উসকে হাতমে নেহি খায়েগা। তুমি এনে দাও ভাত।
চাঁপাডাঙার বউ বলিল, ছাড়, আঁচল ছাড়।
তাহার গম্ভীর কণ্ঠস্বরে মহাতাপ আঁচল ছাড়িয়া দিয়া বলিল, কি, হল কি তোমার, বলতে পার?
—কিছু হয় নি, মাছ আজ ছোব না আমি। মানু এনে দিক্।
বলিয়া নামিয়া গেল।
মহাতাপ চিৎকার করিয়া উঠিল, ছোঁবে না ক্যানে? তুমি বিধবা হয়ছ, না, খড়দার মাঠাকরুন হয়েছ? মাছ ছোঁবে না?
সিঁড়ির মধ্যধাপ হইতেই উত্তর আসিল—আজ ষষ্ঠী।
—ষষ্ঠী?
মানদা মুখ বাঁকাইয়া এবার বড় বউ চলিয়া যাওয়ার সুযোগ পাইয়া স্বামীর কাছে আসিয়া বলিল, হা হ্যাঁ, ষষ্ঠী। ছেলে, বংশধর। চাই না? ছেলের জন্যে কি করছে দেখ না। গলায় এই এক ঝোলা মাদুলি। নিত্য উপোস, কানা নাকি?
মহাতাপ আজ রাগ করিল না। সে এক মুহূর্তে বিষণ্ণ বেদনায় অভিভূত হইয়া স্থির দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিল। কিছুক্ষণ অস্কুটস্বরে সে বলিল ছেলে! সন্তান! সীয়ারাম, সীয়ারাম! একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিল সে।
মানদা বলিল, বড় দরদ বড় বউয়ের জন্যে? এইবার বোঝ।
আবার একটু দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া মহাতাপ বলিল, তুই ঠিক বলেছিস মানু, আমি বুঝতে পারতাম না। একটু পর বলিল, আমি তো একটু ক্ষ্যাপাটে বটে! মাথা তো একটু খারাপ।
–একটু? কিন্তু এইবার আক্কেল হল তো?
–হ্যাঁ, হল। আর একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া বলিল, নেহি। ই হাম নেহি বুঝা!
–এখন যদি বুঝে থাক, তবে সময়ে বিধান কর। বুঝলে?
—কি করি বল্ তো মানু?
—কি করবে? তাও বলে দিতে হবে আমাকে? দাদাকে গিয়ে সোজা জিজ্ঞাসা কর, ঘোঁতনের সঙ্গে শলা করে কত টাকার গয়না বাধা রেখেছে বল? এ পর্যন্ত কত টাকার ধান বেচেছে, হিসেব দাও।
–বিষয়? মহাতাপ ঘৃণাভরা তিক্ত দৃষ্টিতে মানদার মুখের দিকে চাহিয়া বলিল, শিব-শিবশিব! এতক্ষণ ব্যাড়র ব্যাড়র করে হল বিষয়!
মানদা বিস্ময়ে হতবাক হইয়া স্বামীর দিকে চাহিয়া রহিল। মহাতাপ তাহাকে সিঁড়ি দেখাইয়া দিয়া বলিল, বেরিয়ে যা, আমার সামনে থেকে তুই বেরিয়ে যা। আমার সারা অঙ্গ জ্বলে যাচ্ছে। বেরিয়ে যা। বিষয়।
—বেরিয়ে? মানদা ফোঁস করিয়া
