- প্রথম পরিচ্ছেদ: দেবগ্রামের পথে
- দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: মহাতাপ কথাটা মিথ্যা বলে নাই
- তৃতীয় পরিচ্ছেদ: দিন কয়েক পরের কথা
- চতুর্থ পরিচ্ছেদ: দেখিতে দেখিতে বৰ্ষা নামিয়া পড়িল
- পঞ্চম পরিচ্ছেদ: ভাদ্র মাস পড়িয়া গিয়াছে
- ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ: ভাদ্র শেষ হইয়া গিয়াছে
- সপ্তম পরিচ্ছেদ: পূজা আসিয়া পড়িয়াছে
- অষ্টম পরিচ্ছেদ: পরদিন সপ্তমীর সকাল
- নবম পরিচ্ছেদ: নবমীর রাত্রিকাল
উঠিল—বেরিয়ে যাব ক্যানে? আমি ছেলের মা, এ। আমার ছেলের ঘর।
–হাম ছেলের বাবা। আর বেরিয়ে যাবি আর ভাল বলবি। বলিয়া ঘাড়টি ধরিয়া তাহাকে সিঁড়িতে বসাইয়া দিয়া আসিল। আসিয়া মানিকের মাথার শিয়রের কাছে জানালার ধারে বসিয়া বাহিরের দিকে চাহিয়া রহিল।
নিচে বড় বউ ক্লান্ত দেহে বিষণ্ণ অন্তরে দাওয়ার উপর আঁচল বিছাইয়া শুইয়া ছিল। শুইয়া ছিল ঠিক নয়, অন্তরের দুর্বিষহ আবেগের আলোড়ন সংবরণ করিবার জন্য উপুড় হইয়া পড়িয়া ছিল। সে আর পারে না, পারিতেছে না। এমন সময় মানদা দ্রুতপদে সিঁড়ি বাহিয়া নামিয়া। আসিয়া বড় জাকে এইভাবে পড়িয়া থাকিতে দেখিয়া থমকিয়া দাঁড়াইল। নিরুপায় দুরন্ত ক্ৰোধ যেমন মানুষ সর্বংসহ পৃথিবীর বুকে পা ঠুকিয়া জাহির করে, কখনও বা মাথা ঠুকিয়া নিজের কপাল ফাটাইয়া শান্ত হয় আঘাত করে মাটিকেই, রক্তাক্ত করে মাটিকেই তেমনি ভাবেই মানদা বড় জায়ের উপর সব ক্রোধ সব ক্ষোভ দিয়া আঘাত করিল। বলিল, তুমিই—তুমিই আমার কপালে আগুন ধরিয়ে দিলে। তুমি।
বড় বউ তেমনিভাবে পড়িয়া থাকিয়াই উত্তর দিল, দিনরাত চোখের জল ঢেলেও যে নেবাতে পারছি না, কি করব ব?
বলিতে বলিতে সে উঠিয়া বসিল। চোখের জল তখনও গড়াইয়া পড়িতেছিল।
মানু আজ প্রায় ক্রোধে জ্ঞান হারাইয়াছে। সে চিৎকার করিয়া বলিয়া উঠিল, এখন হয়েছে। কি? অনেক কাঁদতে হবে। অনেক কাঁদতে হবে তোমাকে।
মানদার চিারেই বোধ করি একসঙ্গে দুই দিক হইতে সেতাব ও মহাতাপ দুই ভাই আসিয়া হাজির হইল। সেতাব আসিয়াছে বাড়ির বাহির হইতে; মহাতাপ উপর হইতে নামিয়া আসিয়াছে। মহাতাপের কোলে মানিক।
সেতাব তীক্ষকণ্ঠে বলিল, এক দণ্ড শান্তি দেবে না তোমরা? এত অশান্তি কিসের? কাঁদছ? তুমি কাঁদছ? কেন কাঁদছ শুনি?
মহাতাপ স্থির দৃষ্টিতে চাহিয়া দাঁড়াইয়া ছিল। সে হঠাৎ গতি সঞ্চয় করিয়া বড় বউয়ের কাছে আসিয়া কোলের মানিককে প্রায় বড় বউয়ের কোলে ফেলিয়া দিয়া বলিল, এই নাও, ছেলের জন্যই যদি এত দুঃখু তোমার, তবে এই নাও। আমার ছেলে তোমাকে দিলাম। নাও।
মানদা চিৎকার করিয়া উঠিল, নানা-না। আমার ছেলে—
মহাতাপ পথরোধ করিয়া দাঁড়াইল–না।
সেতাব অধীর পদক্ষেপে আসিয়া বড় বউয়ের কোলের মানিককে তুলিয়া লইয়া মানদা ও মহাতাপের কাছে নামাইয়া দিয়া বলিল, না। পরের ছেলে আমি চাই না। ভগবান যদি আমাকে দিয়ে থাকে, তবে সে আমি পাব। আমার হবে।
বলিয়া সে বাহির হইয়া গেল।
বড় বউ তাহাকে ডাকিল, শান, শান, যেয়ো না।
–কি? সেতাব ফিরিয়া দাঁড়াইল।
বড় বউ বলিল, আমাকে তুমি খালাস দাও।
সেতাব বলিল, বাঁচি বাঁচি, তা হলে বাঁচি আমি।–বলিয়া সে চলিয়া গেল।
বড় বউ উঠিল এবং খিড়কির পথের দিকে পা বাড়াইল।
মহাতাপ বলিল, কোথা যাবে তুমি?
বড় বউ বলিল, সর। পুকুরে ড়ুব দিয়ে আসি।
বলিয়া পাশ কাটাইয়া সে বাহির হইয়া গেল। মহাতাপ তাহাকে অনুসরণ করিতে উদ্যত হইয়া ডাকিল, বড় বউ!
মানদা বলিল, আদিখ্যেতা কোরো না। ড়ুবে মরবে না।
মহাতাপ মানদার দিকে ফিরিয়া বলিল, তোরা সাপের জাত। তোরা সাপের জাত। বিষ ছাড়া তোদের কিছুই নাই। জীবনটা জ্বালিয়ে দিলি। বলিস বড় বউকে, তোর কামড় সয়েও ছিলাম। ওর কামড় সইল না। আমি চললাম। এ বাড়িতেই আর আসব না আমি। দু চোখ যেদিকে যায় চলে যাব আমি। হে শিবো! হে ভগবান
বলিতে বলিতে সে চলিয়া গেল।
গেল সে খিড়কির পথেই। পুকুরঘাটে তখন বড় বউ স্তব্ধ হইয়া দাঁড়াইয়া ছিল। ভরা পুকুরের দিকে তাকাইয়া ছিল সে। ডান হাতের মুঠায় চাপিয়া ধরিয়াছিল গলার কবচ মাদুলিগুলি।
দূর হইতে মহাতাপ তাহাকে দেখিয়া বলিল, আমি চললাম? আর আমি ফিরব না।
বড় বউ তাহার দিকে ফিরিয়া চাহিল, কথা বলিতে পারিল না।
মহাতাপ যাইতে যাইতেই বলিল, না। ছেলে—ছেলে তোমার হোক। তাই নিয়ে তুমি সুখে থাক। আমি চললাম। কি দরকার তোমার আমাকে?
সে চলিয়া গেল। বড় বউ দাঁড়াইয়া রহিল। মুখে তাহার বিচিত্ৰ হাসি ফুটিয়া উঠিল; তারপর সে সজোরে টান দিল হাতে ধরা কবরে মুঠায়; কবচ-বাধা সুতার ডোরটা পট করিয়া ছিঁড়িয়া গেল। কবচগুলা সে জলে ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দিল। সেখানে একটা টুপ করিয়া শব্দ তুলিয়া কবচগুলি জলে ড়ুবিয়া গেল। তারপর সে ধীরে ধীরে জলে নামিল। হাঁটু-জলে নামিয়া একবার থমকিয়া দাঁড়াইল। চোখ দিয়া তাহার জল গড়াইতেছিল।
মহাতাপ দুই চোখ যেদিকে যায় সেই দিকেই চলিবার সংকল্প লইয়াই বাহির হইয়াছিল। আধপাগল মানুষ। সে আজ গভীর আঘাত পাইয়াছে। বড় বউ তাহার ছেলেবেলার খেলার সঙ্গী। দশ-এগার বছরের কাদম্বিনী শ্বশুরঘরে আসিয়া দেওরের সঙ্গে খেলাঘরে খেলা করিত—সে সাজিত মা, মহাতাপ সাজিত ছেলে। কাদাধুলার ভাত ব্ৰাধিয়া দেবরকে খাইতে দিত। উঠানের একটা খাল অংশকে পুকুর কল্পনা করিয়া সেখানে মহাতাপকে স্নান করাইয়া দিত। ছোট অ্যাঁজলায় শূন্যকে জল কল্পনা করিয়া তাই মহাতাপের মাথায় ঢালিয়া দিয়া মুখে বলিত পুস হুলুস।
ছেঁড়া ন্যাকড়ায় গা মুছাইয়া দিত।
এক একদিন মারিত। মহাতাপ কাঁদত এবং কান্না থামাইয়া হঠাৎ চাঁপাডাঙার বউয়ের ঘাড়ে ঝাঁপাইয়া পড়িয়া উল্টা মার মারিত।
মহাতাপের মা আসিয়া বলিত, কি হল?
কাদু লজ্জায় চুপ করিয়া থাকিত।
মহাতাপ বলিত, আমাকে মারলে।
—তুমি কি করেছিলে?
–বলেছিলাম ভাত খাব না। ও মা সেজেছে কিনা!
–ও! তুমি ছেলে, ও মা!
–মা না কচু! ছাই! ছাই! ছাই!
–না-না-না। ও বলতে নাই, ও বলতে নাই। বড় ভাজ মায়ের মত। মত নয়–মা।
–ওইটুকু মেয়ে আবার মা হয়?
–হয়। লক্ষ্মণের চেয়ে সীতা বয়সে ছোট ছিলেন, তবু সীতা লক্ষ্মণের মায়ের চেয়ে বেশি। জান?
শুধু কি এই খেলা! কত খেলা তাহারা খেলিয়াছে—তাহার কথা একটা পালাগানের চেয়েও বেশি। সে ফুরায় না। লিখিতে গেলে রামায়ণ মহাভারত হইবে বোধহয়, বলিতে গেলে রাত ফুরাইয়া যায়। এইভাবে একসঙ্গে কতদিন কাটিয়াছে। তাহার উপর এতদিন নিঃসন্তান অবস্থায় মহাতাপকে নিবিড় ভালবাসায় জড়াইয়া থাকিয়া, আজ হঠাৎ সে ভালবাসাকে খাটো করিয়া তুচ্ছ করিয়া সন্তানকামনাকে বড় করিয়া তোলার সংবাদে মহাতাপ মর্মান্তিক দুঃখ পাইয়াছে।
সে নিজেদের স্বজাতি জ্ঞাতিগোষ্ঠীর পাড়া বাদ দিয়া আসিয়া উঠিল গ্রামপ্রান্তে বাউরিদের পাড়ায়। বাউরিপাড়া পার হইয়া আসিয়া উঠিল মাঠের প্রান্তে।
আশ্বিন মাসে ধানের জমিতে কানায় কানায় জল প্রয়োজন। কিন্তু সারা আশ্বিন জল নাই, মাঠ শুকাইয়া গিয়াছে। মাঠের মধ্যে উৎকণ্ঠিত চাষীরা কোদাল কাঁধে ফিরিতেছে। মহাতাপের ওই মাঠের মধ্যেই ঘুরিবার কথা। এই সকালবেলাতেও সে ঘুরিয়াছে; মারপিট করিয়া মাথা ফাটাইয়াছে। কিন্তু আর তাহার সে ইচ্ছা নাই। পাগল, মাঠের সীমানার প্রান্তে একটা গাছে চড়িয়া ডালে বসিয়া পা ঝুলাইয়া গান ধরিল–
এ সংসারে কেবা কার মন,
কেবা তোমার তুমি বা কার?
আমার আপন জনা যে জন
কে জানে হায় ঠিকানা তার?
দুই কলি গাহিয়াই তাহার কি মনে হইল। সে লাফ দিয়া নামিয়া পড়িল এবং হনহন করিয়া আলপথ ধরিয়া হটিয়া আসিয়া নিজের জমিগুলি যেগুলিতে সে দিনরাত্রি পরিশ্রম করিয়া দুনীতে তুলিয়া জল ভরিতেছিল, সেই জমিগুলির বাঁধ পায়ে লাথি দিয়া ভাঙিয়া দিল। জল বাহির হইতে লাগিল। সে সোল্লাসে চিৎকার করিয়া উঠিল—বিষয়! বিষ—বিষ! যা! বিষ বেরিয়ে যা! ধান মরে যাক! মরে যাক!
চারিপাশের মাঠেও চাষীরা অবাক হইয়া গেল। ছোট মোড়লের এ কি মতি! ইহাদের অধিকাংশই মজুর-শ্ৰেণী লোক, ধান বচাইবার জন্য মাঠে আসিয়া বুক দিয়া পড়িয়াছে। পুকুরে পুকুরে দুনী বসাইতেছে। নালা কাটিতেছে। খাওয়াদাওয়া মাঠেই, মাঠেই রাত্রি কাটিবে। কড়া পচাই মদের ঊড়ে চুমুক দিতেছে, কড়া তামাক টানিতেছে আর খাঁটিয়া চলিয়াছে। মহাতাপদের কৃষাণ নোটনও মাঠে ছিল। সে ছুটিয়া আসিল। সে মদের হাঁড়িতে চুমুক দিতেছিল, সেটা হাতে করিয়াই সে ছুটিয়া আসিয়া বলিল, ছোট মোড়ল। ছোট মোড়ল!
মহাতাপ বলিল, যাক যাক, বিষ বেরিয়ে যাক।
নোটন হাঁড়িটা আলের উপর রাখিয়া ভাঙা আল বাঁধিতে লাগিল। মহাতাপের নজর পড়িল হাঁড়িটার দিকে। সে হাঁড়িটা তুলিয়া নাক সিঁটকাইয়া মুখ ঘুরাইতে বাধ্য হইল। আবার জোর করিয়া মুখ ফিরাইল। সে খাইবেই।
নোটন সবিস্ময়ে বলিল, কি, হচ্ছে কি? মদ খাবা নাকি?
—খাব। খাব।
–এই দেখ, বাড়িতে বকবে।
–বাড়ি? আমি আর বাড়ি যাব না।
বলিয়া চুমুক দিল ভাঁড়ে।
ওদিকে চণ্ডীমণ্ডপে প্রতিমা তুলিয়া মোড়লেরা একদিকে পূজার আয়োজন করিতেছিল, অন্যদিকে জমিতে জলের
