- প্রথম পরিচ্ছেদ: দেবগ্রামের পথে
- দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: মহাতাপ কথাটা মিথ্যা বলে নাই
- তৃতীয় পরিচ্ছেদ: দিন কয়েক পরের কথা
- চতুর্থ পরিচ্ছেদ: দেখিতে দেখিতে বৰ্ষা নামিয়া পড়িল
- পঞ্চম পরিচ্ছেদ: ভাদ্র মাস পড়িয়া গিয়াছে
- ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ: ভাদ্র শেষ হইয়া গিয়াছে
- সপ্তম পরিচ্ছেদ: পূজা আসিয়া পড়িয়াছে
- অষ্টম পরিচ্ছেদ: পরদিন সপ্তমীর সকাল
- নবম পরিচ্ছেদ: নবমীর রাত্রিকাল
কথা হইতেছিল।
বিপিন, সেতাব, রামকেষ্ট এবং আরও মোড়লেরা বসিয়া আছে। ঘোঁতনও আসিয়া জুটিয়াছে। চণ্ডীমণ্ডপে টিকুরীর খুড়ী এবং আরও দুই-তিন জন প্রবীণা মিলিয়া কেহ ঝাঁটা বুলাইতেছে, কেহ পূজার বাসনগুলিতে জল বুলাইতেছে অর্থাৎ ধুইতেছে। একজন খড়ের দড়িতে আমের শাখা পরাইতেছে। গোটা কয়েক ছেলে রঙিন কাগজ কাটিয়া শিকল তৈয়ারি করিতেছিল। একজন একখানা কাগজে মোটা হরফে লিখিতেছিল—যাত্রাভিনয়। একপাশে বসিয়া ছিল ঘোঁতন।
বিপিন বলিতেছিল, তা পূজার কটা দিন যাক। তারপরেতে ক্যানেল আপিসে চল। জল। যখন আসছে ক্যানেলে, তখন মাঠে এখনও খাল আসে নাই বলে জল দেবে না, ই তো হয় না। জল দেক। আমরা কোনো রকমে নিয়ে আসব।
ঘোঁতন বলিয়া উঠিল, সে দেবে না। পরম বিজ্ঞভরে সে ঘাড় নাড়িতে লাগিল।
বিপিন ঘাড় ঘুরাইয়া ঘোঁতনকে দেখিয়া বলিল, কে বটে? ঘোঁতন! ই, তাই বলি এমন বিজ্ঞ মানুষটা কে? ইউনিয়ন কোর্টের উকিল কিনা? আইন একেবারে ঠোঁটস্থ। দেবে না। ক্যানে দেবে না? তুই এখানে কোথা? অ্যাঁ?
সেতাব বলিল, ও আমার কাছে এয়েছে।
—তোমার কাছে তা বেশ। এসেছে বেশ করেছে। তাই সব কথার মধ্যে ও ক্যানে? আমাদের কথা আমরা বুঝব। সবতাতেই ওর পাক মারা চাই। দেবে না! চল সব জোট বেঁধে যাই। বলি, ক্যানেল যখন ধান বাঁচাবার জন্যে, তখন ক্যানে দেবেন না মশায়? না কি হে?
রামকেষ্ট-শিবকেষ্ট এবং অন্যান্য মোড়লেরা সায় দিয়া বলিল, সেই কথাই ভাল। গেরামসুদ্ধ লোক যাবে–
সেতাব উঠিয়া পড়িল। তার এসব ভাল লাগিতেছে না। তাহারও সংসার বিষ হইয়া গেছে।
সে ডাকিল, ঘোঁতন!
ঘোঁতন উত্তর দেবার পূর্বেই বিপিন বলিল, উঠলে যে সেতাব?
—কি করব? আমার জলে দরকার নাই। মরে যাক ধান, জ্বলে যাক মাঠ। যা হবে হোক। বুয়েছেন?
শিবকেষ্ট বলিল, সেতাবের জমিতে জল আছে। সে মহাতাপ করে রেখেছে আগে থেকে। ওর ভাবনা নাই।
—ওহে! বলিয়া সেতাব চিৎকার করিয়া উঠিল। তারপরই কিন্তু হঠাৎ থামিয়া গেল। বলিল, থাক সেসব কথা! আমার কথা আমার মনেই থাক্। বলিয়া সে খানিকটা চলিয়া গেল। কিন্তু একটা কথা মনে হতেই সে ফিরিয়া আসিয়া বলিল, হ্যাঁ, আর একটা কথা জ্যাঠা। আমার পরিবার তো পূজার বরণের ডালা ধরে; তা এবার অন্য লোক দেখুন। সে ধরবে না।
ওদিক হইতে টিকুরীর খুড়ী সর্বাগ্রে বলিয়া উঠিল, তা ভাল, তা ভাল বাবা। আমরা বলতে পারছিলাম না। এ সুমতিটি ভাল হয়েছে তোমার।
বিপিন দৃঢ়স্বরে বলিল, কি, বলছ কি গো টিকুরীর বউমা?
–ন্যায্য কথা বলছি। মোড়ল কি কালা নাকি? কানে কথা যায় না?
–না। যায় না। অন্যায় কথাগুলান বোলো না।
সেতাব বলিল, ন্যায়-অন্যায় বিচারে কি কাজ জ্যাঠা? তার দেহ ভাল নয়, মন ভাল নয়—
–ক্যান রে? মন ভাল লয় ক্যানে? মহাতাপ নিজের ছেলে বড় বউকে দিয়েছে শুনলাম, তবু মন ভাল লয়? বাবা রে, দেওরের কি ভালবাসা।
—খুড়ী! সেতাব কঠিন স্বরে বাধা দিয়া বলিল, মহাতাপের ছেলে আমি নেব ক্যানে? আমার কপালে থাকে।
–হবে না রে বাজার ছেলে কার্তিক ঠাকুরের বাবা এলে। চাঁপাডাঙার বউয়ের কেক ফলবে না।
বাধা দিয়া সেতাব বলিল, চাঁপাডাঙার বউয়ের কপালের নেনই তো একটি নেকন নয় খুড়ী। আমার কপালের একটা নেকনও তো আছে!
সেতাব হনহন করিয়া পথে নামিয়া গেল। ঘোঁতন বলিল-দাঁড়াও, দাঁড়াও!
সে সেতাবের সঙ্গ লইয়া বলিল-আচ্ছা কথাটা তুমি বলেছ! ঠিক বলেছ! পরের ছেলে নিয়ে নিজের সাধ মেটে? মেটে না। মেয়ের অদেষ্ট আর পুরুষের অদেষ্ট এক নয়। বিয়ে করবে তুমি পুঁটিকে? দেব। আমি দেব। বল তুমি।
সেতাব কথা বলিতে গেল কিন্তু পারিল না। অন্তর তাহার লালায়িত। কিন্তু চাঁপাডাঙার বউ! চাঁপাডাঙার বউ! সে? ওঃ সে যেন পাগল হইয়া যাইবে!
ঘোঁতন পকেট হইতে সিগারেট বাহির করিয়া নিজে একটা মুখে গুঁজিয়া একটা সেতাবকে দিল, বলিলখাও।
—সিগারেট?
–হ্যাঁ। লাও ধরাও।
সে দেশলাই জ্বালিল।
ঘোঁতন আবার বলিল—ওই যে বললে, ন্যায়-অন্যায় বিচারে কাজ কি জ্যাঠা? খুব বুদ্ধিমানের মত কথা বলেছ। কথাটা যখন পাঁচজনে বলছে, সন্দেহ যখন–
সেতাব বলিল চুপ কর ঘোঁতন! চুপ কর। ওরে তুই চুপ কর।
সে রাস্তায় নামিয়া পড়িল।
পথে নামিতেই দেখা হইল নোটনের সঙ্গে। নোটন বলিল—বড় মুনিব! ছোট মুনিব–
ছোট মুনিবের কথা আমি কিছু জানি না। সে চলিতেই লাগিল।
–সে চলে গেল
নোটনও সঙ্গ ধরিয়া পিছন হইতে কথা বলিতেছিল। মহাতাপ মদ খাইয়া মাঠ হইতে চলিয়া গিয়াছে। বলিয়া গিয়াছে, সে বিবাগী হইবে। নোটন কোনোমতেই তাহাকে ফিরাইতে পারে। নাই।
–যাক—যাক—যাক।
–ওগো, নেশা করে—
–করুক, মরুক; উচ্ছনে যাক, চুলোয় যাক। যা বলবার বল্গা বড় বউকে।
–তিনি কথা বললে না।
–তবে ছোট বউকে বলগা্।
–সেও বললে, জানি না।
–আমিও জানি না। বুঝলি! আমিও জানি না।
সেতাব আর কথা না শুনিয়া হনহন করিয়া চলিতে লাগিল।
ঘোঁতন ডাকিল, দাঁড়াও হে। দাঁড়াও।
সেতাব যেন ছুটিয়া পলাইতে চাহিতেছে। কোথায় সে তাহা জানে না।
মহাতাপ তখন প্রান্তরের মধ্যে একটা গাছতলায় শুইয়া ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল। নেশায় সে আচ্ছন্ন হইয়া পড়িয়াছে। তাহাদের বাড়িতেও সেই অবস্থা। বড় বউ তেমনিভাবে উপুড় হইয়া শুইয়া আছে। ছোট বউ আপনার ঘরে মানিককে লইয়া বসিয়া নীরবে কাঁদিতেছে। শরতের আকাশ নীল, মেঘের দু-একটা টুকরা মধ্যে মধ্যে ভাসিয়া যাইতেছে। বৃষ্টির কোনো লক্ষণ নাই।
অপরাত্ন গড়াইয়া আসিল। তবু বড় বউ উঠিল না, মানু বাহির হইল না, মহাতাপ ফিরিল না, সেতাবও সেই গিয়াছে—এখনও ফেরে নাই। ক্রমে সন্ধ্যা হইল। নির্মল নীল শরৎ আকাশ ষষ্ঠীর চাঁদের জ্যোৎস্না উঠানে, ঘরের চালে, গাছের শাখায় পল্লবে স্বপ্নলোকের শোভা জাগাইয়া ফুটিয়া উঠিল। সে আলো যেন স্বপ্নে দেখা রহস্যপুরীর আলোর মত স্পষ্ট অথচ আবছা আবছা অথচ স্পষ্ট। আকাশে ষষ্ঠীর চাঁদ, সন্ধ্যাতেই একেবারে সিকি আকাশ পার হইয়া ফুটিয়া ওঠে। যেন আকাশের নীল সায়েরের তলা হইতে মাথা তুলিয়া হাসিতে থাকে। চাঁদের আশপাশে তারা। ফুটিয়াছে। অসংখ্য সংখ্যা নাই, সীমা নাই, এক তারা উকিঝুঁকি, দুই তারা ঝিকিমিকি, তিন তারা ঘোর নামে, চার তারা পাখি থামে, পাঁচ তারা পঞ্চদীপ, ছয় তারা শাঁখ বাজে, সাত তারা সাতভেয়ে, আট তারা অরুন্ধতী, ন তারা অন্ধকার, দশ তারাতে একাকারগুনিতে গুনিতে দশ তারা ফুটিতেই অগুতি তারা ফুটিয়া ওঠে, আর গণনা করা যায় না। তাই উঠিল। তবু মণ্ডলবাড়িতে কেহ উঠিল না, আলো জ্বালিল না, রান্না চড়াইল না, বাহির দুয়ার খোলা হাঁ-হাঁ, করিতে লাগিল। ওদিকে চণ্ডীমণ্ডপে ষষ্ঠীর সন্ধ্যার দেবীর আবাহন অভিষেক হইয়া গেল, ঢাক ঢোল সানাই কঁসি বাজিয়া থামিয়া গেল। সেতাব সেখানকার কাজ সারিয়া এতক্ষণে বাড়ি ঢুকিল। ষষ্ঠীর আবছা জ্যোৎস্নায় স্তব্ধ বাড়িখানা যেন শোকাতুরা সদ্য বিধবার মত বিষগ্ন নিৰ্বাক। হইয়া অবগুণ্ঠন টানিয়া বসিয়া আছে। সেতাব ঘরে ঢুকিয়া থমকিয়া দাঁড়াইল। তাহার সর্বাঙ্গ জ্বলিয়া গেল। সে তীক্ষকণ্ঠে বলিয়া উঠিল।–এ কি!
কেহ উত্তর দিল না।
সেতাব আরও চটিয়া বলিল, বলি কাণ্ড-কারখানাটা কি? ঘরে আলো নাই। উনোন জ্বলে নাই, ষষ্ঠীকৃত্যের দিন। শুভদিন! সব মরেছে নাকি?
বড় বউ দাওয়ার উপর শুইয়া ছিল; সেতাব তাহাকে এতক্ষণে ঠাওর করিয়া তাহার কাছে আসিয়া দাঁড়াইল। বলিল—শুনতে পাও না?
কাদু ক্লান্তকণ্ঠে বলিয়া উঠিল, ওগো আর আমি পারছি না। আমাকে তুমি মায়ের কাছে পাঠিয়ে দাও।
–ভাল। দেব। তাই দেব। ভাল করেই দেব। তাই হবে।
বলিয়া সে উপরের সিঁড়ির দিকে পা বাড়াইল।
–একটা কথা বলি। যতক্ষণ আছি ততক্ষণ বলতে হবে।
–কি?
–মহাতাপ সেই দুপুরে না খেয়ে চলে গিয়েছে। সেই ফাটা মাথা নিয়ে। এখনও ফেরে নি।
–তার কথা আমি জানি না।
—তোমার মায়ের পেটের ছোট ভাই।
–আমার শত্রু; তা ছাড়া সে কচি খোকা নয়।
–জেনেশুনেও একথা বলছ তুমি?
—বলছি! বলছি! বলছি! সে আমার শত্ৰু, তুমি আমার শত্ৰু, ঘর দোর সব আমার বিষ। আগুন। শ্মশান।
বলিয়া সে চলিয়া গেল।
যাইতে যাইতে আবার ফিরিয়া আসিয়া বাহিরের দরজাটা বন্ধ করিল এবং হনহন করিয়া চলিয়া গেল।
মানদা আপনার ঘরে বন্ধ দরজার গায়ে স্থির হইয়া দাঁড়াইয়া সব শুনিতেছিল। বাঘিনীর মত চোখ দুইটা তাহার ক্রোধে জ্বলিতেছিল এবং সে ক্রোধের সবটাই গিয়া পড়িতে চাহিতেছে ওই বড়
