চাঁপাডাঙার বউ

« <
/ 31
> »

দোব। আড়াইশো।

শেষ পর্যন্ত চারশো টাকায় রফা করিয়া পঞ্চানন সাহাকেই বিঘা দুয়েক জমি সাতশো টাকায় বেচিয়া ঘোঁতন দলের সরঞ্জাম কিনিল এবং বাড়িতে সামনের চাষের সরঞ্জামের ঘরখানার মেঝে বাঁধাইয়া—দেওয়ালে কলি ফিরাইয়া—বাহিরে পঞ্চানন অপেরার সাইনবোর্ড খাটাইয়া দেখিয়া শুনিয়া বলিল–O. K. ঠিক হয়েছে।

প্রথম বছর দুই-তিন জমজমাট আসর চলিয়াছিল ঘোঁতনের। তখন যুদ্ধ মিটিয়াছে কিন্তু বাজারে তখন অঢেল কাগুজে টাকা। তাহার পর মন্দা পড়িয়াছে। ঘোতনের যাত্রার দলে লোকসান। যাইতে শুরু করিল। ওদিকে রেজেষ্ট্রি অফিসে মন্দা পড়িল। ঘোঁতনের স্ত্রী চার-পাঁচ বছরে তিনটি সন্তান প্রসব করিয়া সংসার বৃদ্ধি করিল, নিজে রোগে পড়িল। বোন পুঁটি বড় হইয়া পনের পার হইয়া পড়িল ষোল বছরে। মা মেয়ের বিবাহের জন্য তাগিদ দিলেও ঘোঁতন চঞ্চল হইল না। স্পষ্ট বলিয়া দিল—আমার টাকা নাই। ইহার মধ্যে আরও বিঘা তিনেক জমি নিলাম হইয়া গেছে। ঘোঁতন আপিল করিয়াছে। তাহার উপর পর পর দুবছর অনাবৃষ্টিতে ফসল নাই। ঘোঁতন করিবেই বা কি? গত বছর সেতাবের কাছে ধান লইয়াছিল। ভরসা করিয়াছিল ওই পাগল মহাতাপের। পাগলটাকে যাত্রার দলে। ঢুকাইতে পারিলে পার্টের লোভ দেখাইয়া অন্তত বছরের খোরাকির ধানটার সংস্থান হয়। কিন্তু যাত্রাটাত্রা মহাতাপ বোঝে না। তার চেয়ে সে সঙ ভালবাসে, সংকীর্তন ভালবাসে। বায়া তবলার চেয়ে খোল বাজাইতে তাহার উৎসাহ বেশি। এবার সেইজন্য মহাতাপকে গাজনের সঙে শিব সাজাইয়াছিল। দশ টাকা দাও লইয়াছে। আবার ধান ছাড়িয়া দিলাম বলিয়া লিখিয়াও লইয়াছে।

***

রাখালটা যখন সেখানে গিয়া পৌঁছিল, তখন ঘোঁতনের মা ঘরের দাওয়াটা মাটি দিয়া নিকাইতেছে। ঘোঁতন চায়ের একটা বাটি লইয়া তক্তপোশের উপর বসিয়া আছে। এক হাতে একটা জ্বলন্ত বিড়ি। রুখু চুলগুলা উড়িতেছে। চোখে উদাস দৃষ্টি। সে ভাবিতেছিল পার্টের কথা।

রাখালটা আসিয়া বলিল, ঘোষবাবু মশায়!

—কে? তাহার দিকে ঘোঁতন তাকাইল।সেতাব মোড়লের রাখাল না তুই?

–হ্যাঁ গো। এই কাগজটা দিলে মুনিব। তোমাকে যেতে বলেছে একবার।

কাগজটা দেখিয়া ঘোঁতন দতে দত টিপিয়া ক্রুদ্ধ মুখভঙ্গিসহকারে বলিল, এক কিলে বেটার দাঁত কটা ভেঙে দোব। নোটিশ এনেছে, পঞ্চায়েতের নোটিশ! ভাগ, ভাগ বলছি! ভাগ!

রাখাল বলিল, তা আমি কি করব? ওই! আমাকে পাঠালে–। ওই–

বলিতে বলিতে সে পিছাইতে শুরু করিল।

ঘোঁতন চায়ের বাটি হাতে উঠিয়া দাঁড়াইল। বলিল, বেটা ছুঁচোর গোলাম চামচিকে ঘোঁতনের মা ত্রস্ত হইয়া বলিল, ও ঘোঁতন, ওরে! কি হল রে?

—কিপটে কঞ্জুস পেকো সেতাবের রাখাল বেটা নোটিশ নিয়ে এসেছে। পঞ্চায়েতের নোটিশ। I don’t care-ওরে বেটা বলে দিবি, ঘোঁতন ঘোষ dont care I mean does not care.

মা আবার বলিল, ঘোঁতন!

ঘোঁতন বলিল, আমি মাছে পোকা পড়িয়ে দেব। হুঁ, হুঁ,–আমি ঘোঁতন ঘোষ। আমি হোৎ-তা-তা লাঙল ঠেলি না। আকাট মুখ্যু নই আমি। সেতাব মোড়লের বাড়ির কীর্তি ফাঁস করে দোব, গুপ্ত বিন্দাবনের পালা লিখে ছড়িয়ে দেব।

মা এবার কঠিন স্বরে বলিল, ঘোঁতন, তোর মুখ খসে যাবে, ও কথা বলিস নে। ঘোঁতন কি বলিতে চাহিতেছে মুখ খুলিবামাত্র সে তাহা বুঝিয়াছে।

ঘোঁতন ভেঙাইয়া বলিল, আ মলো যা। তোর দরদ উথলে উঠল যে?

তুই যা বলছি, তা আমি বুঝেছি। চাঁপাডাঙার বউ সতীলক্ষ্মী। মহাতাপ বোকা হোক, মুখ হোক, তোর মত ফেশানদুরস্ত ভদ্দনোক না সাজুক, বড় ভাল ছেলে। আমি চোখের জল ফেলে। নিজের দুঃখের কথা বললাম তো এক কথায় পাওনা ধান ছেড়ে দিলে—

–দিলে? এই তো সেতাব মোড়ল পঞ্চায়েতের নোটিশ দিয়েছে।

—দিক। সে যখন বলেছে তখন সেতাব কখনও কথা ফেরাবে না। তার উপর কাদু আছে। সে আমার সইয়ের মেয়ে।

–না। ফেরাবে না। একটা আধপাগলা মুখ, একটা উল্লুক, একটা পাঠাতে আর মহাতাপে কোনো তফাত নাই। ঘরে খাবার আছে, সম্পত্তি আছে, তারই জোরে আমাদের চেয়ে তার খাতির। সব কলঙ্ক ঢাকা পড়ছে।

মা এবার মাটি-গোলার হাড়িটা হাতে লইয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। মৃদু অথচ দৃঢ়স্বরে বলিল, দেখ ঘোঁতন, অন্যায় কথা বলিস না! তোর যেমন পাপ মন তেমনি কূটবুদ্ধি। তত তোর মনে হিংসে। অমৃতিকে তুই বিষ বলছিস। ছি। ছি।

—যাও, যাও, মেলা ফ্যাঁচফ্যাঁচ কোরো না বলছি। বিড়ি টানিয়া ঘোঁতন খানিকটা ধোঁয়া উড়াইয়া দিল—আমি হাঁড়ি ব্রেক করে দোব বাবা। হুঁ হুঁ।

বলিয়া সে হাঁটু দোলাইতে লাগিল।

মায়ের দাওয়া নিকানো শেষ হইয়াছিল। মাটি-গোলা হাঁড়িটা হাতে লইয়া সে দাওয়া হইতে নামিয়া পাচিলের গায়ে সদর দরজা দিয়া বাড়ির ভিতরে ঢুকিতেছিল, ঘোঁতনের কথা শেষ হইতেই সে ঘুরিয়া দাঁড়াইল। বলিল, তোমার হাঁড়ি যে ভেঙে আটকুচি হয়ে আছে বাবা। চাঁপাডাঙার মেয়ে কাদুর সঙ্গে তোমার বিয়ের সম্বন্ধ ছেলে বয়েস থেকে; তুমি বাবা যাচা লক্ষ্মীকে ফিরিয়ে দিয়ে বিয়ে করলে নিজে পছন্দ করে। বউমা ভাল, নিন্দে করব না বাবা, কিন্তু সবেরই তো পয় আছে ভাগ্যি আছে; তোমার বউয়ের ভাগ্যি বলতে কিছু নাই। তা ছাড়া ধন্যি বাপের মেয়ে, বাপ সেই যে–আলতানুটি শাকেরকুটি দিয়ে বিয়ে দিয়ে চলে গেল এখান থেকে আর খোঁজ করলে না। আর কাদুর বাপ মরবার সময় মেয়েকে দিয়ে গেল এতগুলি গহনা। আজ কাদুকে দেখে দশখানা গাঁয়ের লোকের চোখ জুড়োয়। বলে মরি মরিকি লালিত্যি! এ রাগের কথা—লোকে না জানুক, আমি জানি। এতে তোমার অকল্যাণ হবে বাবা। আমার সইয়ের মেয়ে সে আমার মেয়ের তুল্য। বিয়ে যখন হয় নাই-তখন তাকে বোন ভাবা উচিত তোমার। কিন্তু তুমি–প্রৌঢ়া আক্ষেপের সঙ্গে ঘাড় নাড়িয়া একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিল।

ঘোঁতন এবার হঠাৎ ক্রুদ্ধ হইয়া হাতের চায়ের বাটিটা ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দিল এবং দাওয়া হইতে রাস্তায় নামিয়া হনহন করিয়া চলিয়া গেল। হঠাৎ দাঁড়াইয়া ঘুরিয়া বলিল, চিরকালের ঘরজ্বালানী পরলোনী যে তুমি। কাদু তোমার সইয়ের মেয়ে—সে তোমার পেটের ছেলের চেয়ে। আপন! তার জন্যে আমার উপর রাগ। ফু-ফু! ফু!

রাস্তায় নামিয়া খানিকটা আসিয়াই সে দেখিল, সেতাবের রাখাল ছোঁড়াটা একটা আমগাছের তলায় দাঁড়াইয়া গাছে ঢেলা মারিয়া আম পাড়িতেছিল। ঘোঁতন তাহাকে দেখিয়া ডাকিল, এই ছোঁড়া, শোন্ তো। এই! তাহার মাথার মধ্যে একটা মতলব খেলিয়া গেল।

ছোঁড়াটা ছুটিতে উদ্যত হইতেই ঘোঁতন একটা ঢেলা তুলিয়া বলিল, পালাবি তো ঢেলা মেরে ঠ্যাঙ খোঁড়া করব তোর। শোন্।

ছোঁড়াটা থমকিয়া দাঁড়াইল। ঘোঁতন আগাইয়া আসিয়া বলিল, তার ছোট মনিব কোথা? একবার ডেকে দিতে পারি?

–ছোট মুনিব মাঠে।

–মাঠে?

–হুঁ। বীজ বুনতে গিয়েছে।

ঘোঁতন চলিয়া যাইতে উদ্যত হইল। কয়েক পা অগ্রসর হইয়া ঘুরিয়া দাঁড়াইয়া বলিল, বিড়ি খাবি?

–বিড়ি? দেবেন আপুনি? সত্যি?

–এই নে না।

একটা বিড়ি তাহাকে দিয়া নিজে একটা বিড়ি মুখে পুরিয়া দেশলাই জ্বালিয়া ধরাইয়া, নিজের ধরানো বিড়িটা রাখালটার বিড়িতে ঠেকাইয়া দিয়া বলিল, টান।

রাখালটা হুস করিয়া ধোঁয়া ছাড়িয়া দিল।

ঘোঁতন বলিল, হাঁ রে, তোদর ছোট মুনিব আর বড় মুনিবে নাকি ঝগড়া হয়?

–দিন রাত। সেই যে বলে, সাপে নেউলে।

–কেন বল্ তো?

—ছোট মুনিব মানুষটা যে কেমন গো। লোকের কাছে ঠকে আসে। লোককে পাওনা-গোণ্ডা ছেড়ে দেয়। টাকা হাতে পেলেই খরচ করে দেয়। এই বড় মুনিবের রাগ। আর ছোট মুনিবের রাগ, বড় মুনিব কেপন। বড় মুনিব বকে। সবচেয়ে বেশি রাগে, মোল্যানকে বকে বলে।

–হুঁ। বড় মোল্যানের সঙ্গে মহাতাপের খুব মাখামাখি–না রে?

—ওরে বানাস। বড় মোল্যান ছাড়া কথা নাই ছোট মুনিবের। সে যা বলবে তাই বেদবাক্যি।

—তোদের ছোট মোল্যান রাগ করে না?

–করে না আবার? করে, মাঝে মাঝে ফোঁসফোঁস করে। তা ছোট মুনিব বলে—নেহি মাংতা হ্যায়, চলে যা বাপের বাড়ি। বড় মোল্যান আবার বকে ছোট মুনিবকে। ছোট মোল্যানকেও বকে খুব।

–হুঁ। একটু ভাবিয়া লইয়া ঘোঁতন বলিল, ভাল ছেলে তুই—তোকে আমার যাত্রার দলে একটা পার্ট দোব। বুঝলি? করবি?

বার বার সে ঘাড় নাড়িল। মনে মনে মাকে ব্যঙ্গ করিল। চাঁপাডাঙার বউয়ের উপর মায়ের বড় দরদ। অথচ রাখাল ছোঁড়া কি বলিয়া গেল? তাহার মানে কি? নয়ানপুরের যত সব ভেড়ার দল—সেতাব-মহাতাপের অবস্থাকে ভয় করিয়া মুখ খুলিতে সাহস করে না। দেওর-ভাজের মাখামাখিরও একটা সীমা আছে। রাখালটাকে হাত করিয়া ঠিক খবরটা বাহির করিবে সে।

আজকালকার ভাল ভাল উপন্যাসে নরনারী-তত্ত্বের জীবন-রহস্য সে জলের মত বুঝিতে। পারিয়াছে।

ছেলেটা খুশি হইয়া ঘাড় নাড়িল।

« <
/ 31
> »