চাঁপাডাঙার বউ

« <
/ 31
> »

তাহার দিকে তাকায়। চাঁপাডাঙার বউ বলে, ছি! ছি!

মহাতাপ প্রথমটায় প্রতিবাদ করে।

বড় বউ আবার বলে, ছি! ছি! তোমার জন্যে ছি-ছি করে সারা হলাম। চিরকালই কি তুমি ছেলেমানুষ থাকবে?

মহাতাপ এবার নিজের দিকের ন্যায়কে প্রবল করিয়া তুলিতে চেষ্টা করে। বড় বউ বলে, সব বুঝেছি। অন্যায় ওদেরই। কিন্তু সংসারে যে সয়—সেই মহাশয়।

মহাতাপ শান্ত হয়।

মহাতাপের বিবাহও সে-ই দিয়াছে। মানদা তাহারই জ্ঞাতিকন্যা।

মানদা মেয়েটি দেখিতে বড় ভাল। তাহার উপর কাজ কর্মে এমন পারঙ্গম মেয়ে চাষীর বাড়িতেও বিরল। শুধু সেতাবই কি সব ভুলিয়া গেল? দিন দিন পয়সা পয়সা করিয়া সে কি হইতে চলিল।

চাঁপাডাঙার বউয়ের সদাহাস্যময়ী মুখখানি বিষ হইয়া গেল। স্বামীর এই আচরণের সংবাদে মর্মাহত হইল। মহাতাপ এ বাড়ির অর্ধেকের মালিক, তাহার বুদ্ধি নাই কিন্তু তাহার সবল শরীরের পরিশ্রমেই জমির ধানে এ বাড়ির খামার উথলিয়া ওঠে। শুধু তাই নয়—তাহাদের সন্তান নাই, ওই মহাতাপের ছেলে মানিকই এ বংশের উত্তরাধিকারী।

বিষণ্ণ মন লইয়াই সে বাড়ি ফিরিল।

খামার-বাড়িতে কতগুলা কুমড়ার লতা মাচায় উঠি-উঠি করিতেছে, সেতাব একখানা কোদাল লইয়া সেগুলোর গোড়ায় চারা করিয়া দিতেছে। পঁচিলের গোড়ায় হুঁকা-কল্কে ঠেকানো রহিয়াছে।

তাহার অনতিদূরে বসিয়া আছে রামকেষ্ট ও শিবকেষ্টর দুই বিধবা খুড়ী। বয়স চল্লিশবিয়াল্লিশের কাছাকাছি ইন্দাশের বউ ও টিকুরীর বউ। দুই জনেই উবু হইয়া বসিয়া আধঘোমটা দিয়া কথা বলিতেছে, এক জন একটা লাঠি দিয়া মাটিতে দাগ কাটিতেছে।

এক জন বলিতেছে, শিবকেষ্ট রামকেষ্ট ভেন্ন হবে বাবা, তোমরা পঞ্চায়েত মিলে ভাগ করে দিচ্ছ; কিন্তু আমাদের কি হবে, বল?

সেতাব একটু রূঢ়স্বরেই বলিল, সে একা আমাকে বললে কি হবে?

—মোটা মোড়ল তোমাকেই বলতে বললে বাবা। বললে, তোমরা বাপু সেতাবের কাছে। যাও। বয়স ছোট হলেও তার কথাই বিকুবে। তার অবস্থা ভাল। বলতে হেন লোক নাই যে সেতাবের কাছে ধান হোক টাকা হোক ধারে না। শিবকেষ্টদেরও দেনা রয়েছে।

সেতাব কোদালটা রাখিল, বলিল, মিছে কথা বুড়ি, মিছে কথা। দুনিয়া হয়েছে নেমখারামের দুনিয়া। বুঝলে বুড়ি, নেমখারামের দুনিয়া। এই দেখ, ওই ঘোঁতন—সে-ই যাত্রার দলের আলকাটার কাপ, তাকে পঞ্চায়েতে আসতে বলেছিলাম, তা সে বলেছে—নেহি যাঙ্গা।

বউ দুটির এক জন বলিল, শিবকেই রামকে তা বলতে পারবে না বাবা। তোমার ঘরে তমুসুদে বাঁধা। তুমি বললে—তোমার কথা অমান্যি করতে পারবে না।

সেতাব গিয়া হুঁকা-কল্কেটা তুলিয়া লইল, টানিতে টানিতে আসিয়া বলিল, তা তোমরা বলছ কি? কথাটা কি?

চাঁপাডাঙার বউ ইহার মধ্যে কখন আসিয়া ঢুকিয়াছিল। সে আগাইয়া আসিয়া বলিল, কথা আর কি? বিধবা বউ, তাদের খাবার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। তা না করে দিলে হবে ক্যানে? তাহলে তোমরা কিসের পঞ্চায়েত?

এক জন বিধবা বলিল, এই হয়েছে। বউমা এসেছে। বল মা, তুমি বল তো। তুমি বলে দাও সেতাবকে।

সেতাব তাড়াতাড়ি বলিল, আহা, তাই তো বলছি গো! তোমরা কি চাইছ তা বল? বলি আলাদা করে থাকতে চাও, না, ওদের সংসারে থাকতে চাও, তা বলতে হবে তো।

এক জন বিধবা বলিল, আলাদা হলেই তো ভাল বাবা। স্বাধীন মতে থাকতে পাই।

সেতাব উৎসাহের সঙ্গেই বলিল, তাই হবে। আলাদাই থাকবে। দুজনকে খানিকটা করে জমি দিতে হবে দুই ভাইকে।

অন্য বিধবা বলিল, তাতে মোটা মোড়লের মত নাই। বলেছে, সে বলতে পারব না বাপু। তোমরা দুদিন পর কাউকে জমি বিক্রয় কর–

সেতাব বলিয়া উঠিল, করে তো করবে।

চাঁপাডাঙার বউ বলিল, না। মোটা শ্বশুর ঠিক বলেছে। তাতে সংসার নষ্ট হবে। খুড়ীদিগেও তো ভাবতে হবে-সংসার শ্বশুরের সংসার, স্বামীর সংসার। রামকেষ্ট শিবকেষ্টই তো খুড়ীদের জল দেবে! তোমরা তা কোরো না খুড়ী, তোমাদের অধর্ম হবে।

–কিন্তু হতচ্ছেদ্দা করবে যে বউমা!

—ছেদ্দা কেউ কাউকে আপনা থেকে করে না খুড়ী, ছেদ্দা করাতে হয়। তুমি যার বাড়িতে থাকবে তাকে যদি পেটের ছেলের মত ভালবাস, তার সংসারে নিজের সংসার বলে খাটো তবে ছেদ্দা না করে সে যাবে কোথায়?

সেতাব ইতিমধ্যে কয়েকবার হুঁকায় ব্যর্থ টান দিয়া ধোঁয়া বাহির করিতে না পারিয়া বসিয়া কল্কেটা ঝাড়িয়া ফেলিয়া তামাক সাজিতে বসিয়াছিল। এবং মধ্যে মধ্যে বিরক্তভাবে আপন মনেই হুঁঃ-হুঁঃ করিতেছিল। চাঁপাডাঙার বউয়ের কথাটা শেষ হইতেই সে বলিল, তাই যা হয় হবে খুড়ী, যা হয় পঞ্চজনে করা যাবে। সন্ধেবেলায় এসো বুঝলে? উ তোমরা বললেও হবে না, চাঁপাডাঙার বউ বললেও হবে না। আমরা পঞ্চজনে বুঝেসুঝে যা হয় করব। হ্যাঁ, সে যা হয়। হবে। সন্ধেবেলাতে এসো চণ্ডীমণ্ডপে।

—তাই আসব বাবা।

বিধবা দুই জন চলিয়া গেল। তাহারা চলিয়া যাইতেই সেতাব সেইদিকে তাকাইয়া দেখিয়া আপন মনেই বলিল, এই মেয়েলোকের মুড়লি আমি দুচক্ষে দেখতে পারি না।

বড় বউ বিধবা দুইটির পিছন পিছন দরজা বন্ধ করিতে গিয়াছিল। দরজা বন্ধ করিয়া ঘুরিয়া দাঁড়াইয়া বলিল, তা পারবে কেন? খুড়ীদিগে জমির ভাগ বার করে দিয়ে জমিটা কিনে নেবার মতলবে ঘা পড়ছে বুঝি? সেই মতলব মনে এসেছে? ডি ছি ছি!

সেতাব ধরা পড়িয়া গেল। হঠাৎ সেই মতলবই তাহার মাথায় গজাইয়া উঠিয়াছিল, বোধ করি মতলবের কথাটা নিজের কাছেও ভাল করিয়া পরিষ্কার হয় নাই। ঠিক যেন রোগসংক্রামিত দেহের প্রথম অবস্থার মত! কেহ বলিয়া দিলে বুঝিতে পারে—তাই তো, শরীরটা অসুস্থই তো হইয়াছে। চাঁপাডাঙার বউ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ঠিক ধরিয়াছে তাহাকে। সে চমকিয়া উঠিল। সেই চমকানির ধাক্কায় হাতের কঙ্কেটা উল্টাইয়া গেল, কোটা পড়িয়া গেল। সে চাঁপাডাঙার বউয়ের দিকে তাকাইয়া বলিল, তোমার দিব্যি, এই হুঁকো ছুঁয়ে বলছি।

চাঁপাডাঙার বউ বলিল, আমি মরে গেলেই বা তোমার কি? আর হুঁকো ছুঁয়ে মিথ্যে বললেই বা সংসারে কি হয় শুনি?

সেতাব অপ্রতিভ হইয়া বলিল, হুঁকো ছুঁয়ে বললেই বা কি হয়? তুমি মরে গেলেই বা আমার কি?

–হ্যাঁ গো! বল না কি হয়?

সেতাব আছাড় মারিয়া হ্ৰকাটা ভাঙিয়া ফেলিল, বলিল, হুঁকোর কিছু না বলেছে! এই নে।

—এইবার কোদাল নিয়ে আমার মাথাটা কাটো!

সেতাব চিৎকার করিয়া উঠিল, চাঁপাডাঙার বউ! যা-তা বোলো না বলছি।

চাঁপাডাঙার বউ খুব গম্ভীরভাবে বলিল, পরের ঘর ভাঙতে যেয়ো না। তোমার নিজের ঘর ভেঙে যাবে।

সেতাব এবার হাত জোড় করিয়া বলিল, জোড়হাত করছি চাঁপাডাঙার বউ, তুমি থাম তুমি থাম।

চাঁপাডাঙার বউ সঙ্গে সঙ্গে গড় হইয়া প্ৰণাম করিল, বলিল, তুমি হাতজোড় করলে, আমি। তোমাকে পেনাম করছি। প্রণাম সারিয়া উঠিয়া বলিল, আরও একটা কথা তোমাকে বলি। ঘোঁতন ঘোষের ধান মহাতাপ ছেড়ে দিয়েছে, তুমি তবু লোক পাঠিয়ে পঞ্চায়েতে ঘোঁতনকে ডেকে পাঠিয়েছ। ভাল কর নি। ও-কথা আর তুলো না।

সেতাব চঞ্চল হইয়া উঠিল, বলিল, ইয়েকে বলে, ই তো ভারি ফেসাদ জুড়ে দিলে! পাওনা ধান ছেড়ে দেব?

চাঁপাডাঙার বউ বলিল, মহাতাপের মানের চেয়ে ধান বড় হল? তার অপমান হবে।

–বোকা পেয়ে তাকে ঠকিয়ে নিলে, তাতে অপমান হয় না আর–

—না, হয় না। যে দান করে সে দাতা। দাতার বোকা বুদ্ধিমান নাই। মহাতাপ দান করেছে। তাকে যদি খাটো করতে চাও, তবে আমি উপোস দেব বলে দিলাম।

বলিয়া সে হনহন করিয়া বাড়ির ভিতর ঢুকিয়া গেল।

সেতাব নিজের মাথার চুল খামচাইয়া ধরিয়া বসিয়া রহিল। হঠাৎ সে চিৎকার করিয়া বলিয়া উঠিল, আমি মানি না, মানি না। কারুর কথা আমি মানি না। আমি সেতাব মোড়ল। বলিয়া সেও বাহির হইয়া চলিয়া গেল।

চাঁপাডাঙার বউকে সে ভয় করে। আবার তাহাকে নহিলে তাহার একদণ্ড চলে না।

চাঁপাডাঙার বউ যেন তাহার বুকের ভিতরটা দেখতে পায়। কোনো কথা তাহার কাছে গোপন থাকে না। তার উপর তার কাটাকাটা কথা। সেতাব থই পায় না। আবার বিচিত্র চাঁপাডাঙার বউ, সে তার বাপের মৃত্যুকালে দেওয়া হাজার টাকা দামের গহনা সেতাবের হাতে দিয়া হাসিয়া বলে টাকার অভাবে তুমি নিলেমে লক্ষ্মীপুরের বাবুদের চরের জমিটা কিনতে পারছ না, জমিটা হাতছাড়া হলে তোমার দুঃখ হবে। কিনে ফেল জমিটা। পরে আমাকে টাকা দিয়ো।

লক্ষ্মীপুরের বাবুদের চরের জমি—সোনা-ফলানোচর। সেখানে এক-একটা তরমুজ হয়। পাঁচ সের ওজনের। সেই জমি কেনার পর মণ্ডলবাড়ি আবার পূর্বের শ্ৰী ফিরিয়া পাইয়াছে। আগের অবস্থাকেও ছাড়াইয়া

« <
/ 31
> »