চাঁপাডাঙার বউ

« <
/ 31
> »

ঘোঁতন আবার প্রশ্ন করিল, এখন বল্ তো কোন্ মাঠে বীজ পাড়ছে তোর ঘোট মুনিব?

–ওই তো গো আপনার কাছে কেনাকাড়াজোলের সেই বেঁকী বাকুড়ির মাথায়।

কাঁড়াজোলের মাঠ। এখানে ওখানে লোক হাল বহিতেছে। বৈশাখ মাস বীজ বুনিবার সময়। মহাতাপ লাঙল চালাইতেছিল। তাহার বলিষ্ঠ দেহের সকল শক্তিতে লাঙলের মুঠা চাপিয়া ধরিয়াছে। গরু দুইটা চলিয়াছে মন্থর গমনে।

কৃষাণটা কোদাল কোপাইয়া আলের মুখ কাটিয়া জল-নির্গমের পথ করিয়া দিতেছিল।

এমন সময় আসিয়া দাঁড়াইল ঘোঁতন। ডাকিল, মহাতাপ।

মহাতাপ মুখ তুলিয়া চাহিল, বলিল, ভাঙ খাবার দলে আমি নাই, যা!

–একটা বিড়ি খা।

–বকিস না, আমার সময় নাই। দু আড়া বীজ ফেলতে হবে আমাকে।

সঙ্গে সঙ্গে নাকে তালুতে ঘড়াত শব্দ করিয়া গরু দুইটাকে তাড়া দিয়া বলিল, অই-অই, বেকুব বেহুদা গরু কোথাকার। অই-অই, আবার শব্দ। কহিল—ক্যা-কা-ক্যা-ক্যা।

ঘোঁতন বলিল, ওড়ে দাঁড়া, শোন্। কথাটা বেশ ধমকের সুরেই বলিল।

—কি?

–বলি মানুষের কথা কটা রে?

–ক্যানে? কথা একটা। দু কথার মানুষ মহাতাপ নয়।

–তবে?

–কি তবে! মহাতাপ লাঙল ছাড়িয়া দিল এবার।

–তুই যে দাতাকৰ্ণ সেজে মাকে পাওনা ধান ছেড়ে দিয়ে এলি—

–হ্যাঁ হ্যাঁ। তোর মায়ের জন্যে দিয়েছি। তোর জন্যে নয়।

–বুঝলাম। তো তোর দাদা আবার ধান চায় কেন?

–কি?–তোর দাদা, কিপটে সেতাব–

—এক চড়ে তোর উঁত ভেঙে দেব ঘোঁতনা। কিপটে আছে আপন ঘরে আছে, তুই কিপটে বলবি ক্যানে?

—সে ধান চায় ক্যানে? পঞ্চায়েত ডাকে ক্যানে?

–যা যা, ঘর যা। সে আমি বড় বউকে বলে দোব। সে সব ঠিক করে দেবে।

–বড় বউকে বলে ঠিক করে দিবি? ফিক করিয়া হাসিয়া ফেলিল ঘোঁতন। ঘাড় নাড়িয়া খুব রসিকের মত হাসিয়াই বলিল, হা হ্যাঁ, তাই দিস। কথার শেষে সে আরও খানিকটা হাসিল।

মহাতাপ তাহার হাসি দেখিয়া ক্ষেপিয়া গেল, বলিল, হাসছিস যে? এই, তুই হাসছিস যে?

ঘোঁতনা বিজ্ঞের মত বলিল, হাসলাম। তা তুই রাগছিস ক্যানে?

—তু হাসবি ক্যানে? মহাতাপ আরও দুই পা আগাইল।

–ওই! ওই! সে পিছাইতে লাগিল।

মহাতাপ খপ করিয়া তাহার হাত চাপিয়া ধরিল—ব ব্যাটা ফড়িং, হাসিস ক্যানে? এমন করে হাসলি ক্যানে বল্–

–ছাড়্‌, ছাড়্‌ ছাড়্‌—ওরে বাপ রে।

নোটন ছুটিয়া আসিয়া বলিল, ছোট মোড়ল, ছাড়, ছাড়, ছোট মোড়ল—

দূর হইতে কণ্ঠস্বর ভাসিয়া আসিল-ঠাকুরপো!

দূরে একটি গাছতলায় বড় বউ কাদম্বিনী হাতে গামছায় বাঁধা জলখাবার লইয়া দাঁড়াইয়া ছিল; মাথায় বিড়ার উপর জলের ঘটি। মাঠে চাষের কাজের সময় চাষীদের বধূরাও মাঠে স্বামী। পুত্রের জন্য জলখাবার লইয়া যায়। সেতাব ভরা চাষের সময় ছাড়া চাষে খাটে না। হিসাবনিকাশ দেনাপাওনা বীজের ব্যবসা লইয়া তাহার অনেক কাজ। মহাতাপের চাষ লইয়া মাতন।

ছোট বউকে সমাদর করিয়া কাদু মাঠে বাহির হইতে দেয় না। তাহার উপর পাগলকে তো বিশ্বাস নাই; কোথায় মাঠেই ঝগড়া করিয়া বসিবে মানুর সঙ্গে। তাহার যদি মনে হয় গুড় কম কি মুড়ি নরম তাহা হইলে এক কাদু ছাড়া আর কাহারও সাধ্য নাই যে তাহাকে ঠাণ্ডা করিয়া বুঝাইয়া খাওয়াইতে পারে। মহাতাপের জন্য জলখাবার লইয়া আসিয়া গাছতলায় দাঁড়াইয়াই তাহার চোখে পড়িল ঘোঁতন দাঁড়াইয়া আছে, কি কথা বলিতেছে। কথা যে ধানের কথা তাহা বুঝিতে তাহার কষ্ট হইল না। মুহূর্ত পরেই মহাতাপের উচ্চকণ্ঠস্বরে সে চমকিয়া উঠিল। তাহারও মুহূর্ত পরে মহাতাপকে যুদ্ধোদ্যত দেখিয়া তাহাকে চিৎকার করিয়া না ডাকিয়া পারিল না।

মহাতাপ চমকিয়া তাহার দিকে চাহিল।

নোটন বলিল, বড় মুনিব্যান।

দূর হইতে কাদু বলিল, ছেড়ে দাও ঠাকুরপো। ছেড়ে দাও।

মহাতাপ ঘোঁতনকে ছাড়িয়া দিল, যা বেটা আলকাটার কাপ, আজ তোকে ছেড়ে দিলাম। ফের দিন তোকে কিলিয়ে কাঁঠাল পাকা পাকিয়ে দোব।

ঘোঁতন হাতে হাত বুলাইতে বুলাইতে চলিয়া গেল।

মহাতাপ গাছের তলায় গিয়া বসিল, ব্যাটা হাসে। দেখ তো কাণ্ড।

কাদম্বিনী বলিল, কি হল তাতে? হাসি তো ভাল জিনিস।

–ভাল জিনিস? ওই হাসি ভাল জিনিস? ভাল জিনিস তো গা জ্বলে যায় ক্যানে?

–নাও, ভিজে গামছায় গা মুছে ফেল। জ্বালা জুড়িয়ে যাবে। একটু বুদ্ধি কোরো। বুঝলে, সবতাতেই মারমূর্তি ভাল নয়।

—তুমি এই কথা বলছ? তোমার কথায় কখনও রাগি আমি?

বড় বউ জলের ঘটি আগাইয়া দিল–মুখ ধোও। হাত ধোও।

মহাতাপ হাতমুখ ধুইতে লাগিল।

বড় বউ বলিল, আমার কথায় রাগো না সে তো কথা নয়। পরের কথাতেই বা রাগবে কেন? ছিঃ! কি হল কি? ঘোঁতন হাসলেই বা ক্যানে?

–ক্যান! এবার মহাতাপ চেঁচাইয়া উঠিল—ক্যানে! তোমার নাম করে হাসল ক্যানে?

বড় বউ তাহার মুখের দিকে তাকাইল, ভ্রূ কুঞ্চিত করিয়া বলিল, আমার নাম করে?

–হ্যাঁ। আবার হাসছে যেন মদ খেয়ে আসছে। দাও মুড়ি দাও।

বলিয়া মুড়ির খোরাটা টানিয়া লইল। হস করিয়া জল ঢালিয়া দিল। গুড়ের বাটি হইতে চামচখানেক গুড় লইয়া মিশাইয়া দিল। তারপর বলিল, ব্যাটার হাত ভেঙে দিতাম।

বড় বউ কাদম্বিনী বিচিত্ৰ হাসি হাসিল।তার চেয়ে ওরা হাসুক। হাসতে দাও ওদের। পরের হাত ভেঙে তোমাকে ফ্যাসাদ বাধাতে হবে না।

প্রকাণ্ড হাতে মুড়ির গ্রাস তুলিতে গিয়া মহাতাপ বলিল, এমনি করে হাসবে ঘোঁতনা?

—যাঁর বিচারের ভার তিনিই বিচার করবেন। এতে আমার গায়ে ফোস্কা পড়বে না। কিন্তু ও আবার তোমার কাছে এসেছিল কেন?

ওই দেখ। ভুলে যেতাম এখুনি। তুমি সেই কেপনকে বোলে তো, আমি ঘোঁতনকে যে ধান ছেড়েছি সেটা এবার চাষে ফলিয়ে দোব–দোব–দোব!

বলিয়াই সে বড় বড় গ্রাসে খাইতে লাগিয়া গেল।

চাঁপাডাঙার বউ হাসিয়া ফেলিয়া বলিল, বড় মোড়ল বুঝি ছাড়বে না বলেছে?

খাইতে খাইতেই মহাতাপ বলিল, পঞ্চায়েত ডেকেছে। আজই সন্ধেবেলা।

চাঁপাডাঙার বউ ঘাড় নাড়িয়া বলিল, না-না-না। সে ঘোঁতনের জন্যে নয়। আজ পঞ্চায়েত বসবে–শিবকেষ্ট রামকেষ্টদের হাঁড়ি আলাদা হবে, বিষয় ভাগ হবে।

–উঁহুঁ, ঘোঁতন বলে গেল। কেপনের সর্দার লোক পাঠিয়েছিল।

চাঁপাডাঙার বউ ভ্রূ কুঞ্চিত করিয়া ভাবিয়া লইল।

মহাতাপ উত্তরের প্রতীক্ষা করিয়া বলিল, তুমি বোলো যেন!

–বলব। বলব। তুমি খাও।

–বাস। নিশ্চিন্দি তো?

–হ্যাঁ গো, হ্যাঁ।

–এবার এমন চাষ করব–দেখবে।

–কোরো। এখন খেয়ে নাও।

মহাতাপ বড় বড় গ্রাসে মুড়ি খাইতে লাগিল।

চাঁপাডাঙার বউয়ের বুঝিতে বাকি রহিল না ব্যাপারটা। সে মণ্ডলবাড়ির গৃহিণী, সেতাবও বর্ধিষ্ণু ব্যক্তি হিসাবে এখানকার পঞ্চায়েতের একজন মণ্ডল, গ্রামের সকল খবরই তাহাদের পক্ষে জানা স্বাভাবিক। রামকেষ্ট এবং শিবকে দুই ভায়ের মধ্যে বনিবনাও অনেক দিন হইতেই হইতেছে না। কাজেই তাহারা ভিন্ন হইতে চলিয়াছে। সেইজন্য—আজই সন্ধ্যায় পঞ্চায়েত বসিবার কথা। এই সুযোগ লইয়া সেতাব ঘোঁতনের ব্যাপারটাও পঞ্চায়েতের সম্মুখে উপস্থিত করিবার ব্যবস্থা করিয়াছে—কথাটা মুহূর্তে কাদম্বিনী বুঝিয়া লইল। ব্যাপারটা কাদম্বিনীর ভাল লাগিল না। সেতাবের উপর সে বিরক্ত হইল। এ কি? এই স্বভাবটা কি তাহার কোনোদিন যাইবে না? একদিন যখন অবস্থা খারাপ ছিল তখনকার কার্পণ্যের কথা সে বুঝিতে পারে। আজ এত কার্পণ্য কেন? তা ছাড়া মহাতাপ বুদ্ধিহীন হোক, সেও তো বাড়ির অর্ধেকের মালিক। তাহার অপমান হইবে যে! মহাতাপকে সে স্নেহ করে। মহাতাপ সরল, নিৰ্বোধ, মাথাতেও একটু ছিট আছে—তাহার উপর ভাঙ খায়, লোকের সঙ্গে মারামারি করিয়া আসে, জানোয়ারদের সঙ্গে লড়াই করিয়া আসে, সবই সত্যি। কিন্তু মৃত্যুশয্যায় মায়ের কথাটাও কি মনে পড়ে না। সেতাবের? চাঁপাডাঙার বউয়ের তখন পনের-ষোল বৎসর—মহাতাপের চোদ্দ–পনের, মৃত্যুশয্যায় শাশুড়ি বউকে ডাকিয়া বলিয়াছিল—বউমা, ওই পাগলকে তোমার হাতে দিয়ে গেলাম, তুমি ওকে দেখো।

মহাতাপকে ডাকিয়া মা বলিয়াছিল–বড় ভাজ আর মায়ে সমান। চাঁপাডাঙার বউয়ের কথা কখনও অমান্য করবি নে। ও আমার সাক্ষাৎ লক্ষ্মী।

সেতাবকে ডাকিয়া বলিয়াছিল—সবই তোমার ওপর ভার বাবা। বউমার অযত্ন কোরো না, ও-ই হল এ বাড়ির ঘরের লক্ষ্মী। তুমি বউমাকে দেখো; মহাতাপকে দেখো।

চাঁপাডাঙার বউ তাহার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করিয়াছে। সে প্রতিশ্রুতি রক্ষা শুধু কর্তব্যপালন নয়, তাহার সঙ্গে তাহার অন্তরের অকৃত্রিম স্নেহের যোগ আছে। বুদ্ধিহীন মহাতাপ আজও সেই ছেলেবেলার মত চাঁপাডাঙার বউকে অ্যাঁকড়াইয়া ধরিয়া থাকিতে চায়। তাহার ক্রোধ হইলে সে ভয়ঙ্কর হইয়া ওঠে। প্রতিশোধ না লইতে পারিলে সে মেঝের উপর মাথা কোটে। সেসময় তাহার সম্মুখে কেহ দাঁড়ায় না। দাঁড়ায় ওই চাঁপাডাঙার বউ। চাঁপাডাঙার বউ দাঁড়াইলেই মহাতাপের ক্রোধের মাত্রা কমিয়া আসে। সে-ই মুখ তুলিয়া

« <
/ 31
> »