চাঁপাডাঙার বউ

« <
/ 31
> »

গিয়াছে। কিন্তু–কিন্তু তাই বলিয়া কি তাহার হুকুমে ওই ঘোঁতনের মত পাষণ্ড উদ্ধত শয়তানকে পাওনা ছাড়িয়া দিতে হইবে। ঘোঁতনকে সে দু-চক্ষে দেখিতে পারে না। সেই স্কুলজীবন হইতে। মহাতাপের অপমান হইবে? মহাতাপ তাহার মায়ের পেটের ভাই। বিষয়-সম্পত্তি, এই ভূতের বেগার খাটা কাহার জন্য? তাহার নিজের জন্য? সে খায় কমুঠা? পরে কি? তাহার নিজের সন্তান আছে? সে খাটে মণ্ডলবাড়ির জন্য। সবই পাইবে মহাতাপের ছেলে মানিক। মানিকের যে ভাইয়েরা ইহার পর আসিবে তাহারা। চাঁপাডাঙার বউ ছাড়া অন্য কেহ হইলে সে এতদিন বংশরক্ষার জন্য আবার বিবাহ করিত। কিন্তু সেতাব তা করে নাই। তুমি সেটা মান না! ঘোঁতনকে পাওনা ছাড়িতে হইবে। রামকেষ্ট শিবকেষ্টদের জমি কিনিতে সে পাইবে না। তোমার কথায়? প্রতাপ মোড়ল মারা গেলে সম্পত্তি নিলামে উঠিয়াছিলরামকেষ্ট শিবকের বাপ হরেক মণ্ডল চাদর গায়ে দিয়া চটি পায়ে দিয়া সদরে গিয়া প্ৰতাপ মোড়লের খিড়কি পুকুরের অংশ কিনিয়াছিল। এখনও তাহারা সে পুকুরের অংশীদার। তোমার কথায় তাহাকে চুপ করিয়া থাকিতে হইবে! তুমি সেতাবকে ধর্ম-অধৰ্ম শিখাইতে আসিয়াছ! রাগে তাহার চুলগুলা ছিঁড়িয়া ফেলিতে ইচ্ছা হইতেছে।

বাহিরে আসিয়া গোয়াল-বাড়িতে দাঁড়াইল। ডাকিল, গোবিন্দে, গোবিন্দে! ওরে অ-গোবিন্দে! গোবিন্দে।

গোয়ালঘর হইতে গোবিন্দ বাহির হইয়া আসিল—কি বলছেন গো?

সে চোখ কচলাইতে লাগিল।

–ঘুমুচ্ছিলি?

–ঘুমুই নাই। বসে বসে ঢুলছিলাম।

–ঢুলছিলি?

–কি করব? বড় মনিব্যান না এলে তো দুধ দোয়ানো হবে না।

–তু এক কাজ কর। ছুটে যাবি রামকেষ্টদের বাড়ি, বুঝলি?

ঘাড় নাড়িয়া গোবিন্দ বলিল, হ্যাঁ।

–রামকেষ্টদের দুই কাকীকে জানিস তো?

–এই তো খানিক আগে এয়েছিল, তারাই?

–হ্যাঁ। তাদের যাকে পাবি ডাকবি, আড়ালে ডাকবি, বলবি—কেউ যেন না শোনে, বুঝলি?

–হ্যাঁ, চুপিচুপি বলব।

–হ্যাঁ। বলবি–বড় মুনিব বলে দিলে, তোমরা জমি চাইবে। বাস, বলে চলে আসবি।

বলিয়াই আপন মনে বলিল, তারপর আমি দেখছি। আমি কারুর কথা শুনি না। কাউকে গেরাহ্য করি না। বড় সব বড় বেড়ে গিয়েছে।

বলিতে বলিতে গোয়ালবাড়ি হইতেও বাহির হইয়া গেল।

 

চণ্ডীমণ্ডপের পঞ্চায়েত মজলিসে সেতাব আসিল সকলের শেষে। মজলিসের সকলে তাহারই প্রতীক্ষা করিতেছিল। প্রায় দশ-বার জন লোক বসিয়া আছে। পঞ্চায়েতের প্রধান মোটা মোড়ল বিপিন মণ্ডল স্থূলকায় মানুষ, গলায় তুলসীর মালা, কপালে তিলক। শান্তদর্শন লোকটি। তাহার আশপাশে বাকি লোক বসিয়া আছে। রামকেষ্ট ও শিবকেষ্ট দুই ভাই দুই বিপরীত দিকে বসিয়াছে। একটু দূরে বসিয়া আছে তাহাদের দুই বিধবা খুড়ী। মাঝখানে একটা হারিকেন জ্বলিতেছে।

চণ্ডীমণ্ডপের সামনে পথের উপরে জন চার-পাঁচ ছোকরা অন্ধকারের মধ্যে বিড়ি টানিতেছে। একজন বলিতেছিল, জমি তো মোট তিরিশ বিঘে। তাতে খুড়ীদিকে জমি দিতে গেলে ওদের থাকবে কি? অন্য একজন বলিল, ওরা ধরেছে, জমিই ওরা নেবে। সংসারে থাকা মানে অধীন হয়ে থাকা। সে ওরা থাকবে না।

–তা বললে চলবে কেন? ওদের দু ভায়ের কথা ভাবতে হবে তো?

–পঞ্চায়েত কি বলছে?

—মোটা মোড়ল না বলেছে। আর সবাই চুপ করেই আছে। সেতাব পাকু না এলে মুখ খুলবে না।

ঠিক এই সময়েই পিছনে শোনা গেল গলাঝাড়ার শব্দ। একজন বলিল, কে?

পথের বাঁক হইতে লণ্ঠন হাতে বাহির হইয়া আসিল সেতাব।

সকলে পরস্পরের মুখের দিকে চাহিল। একজন বলিল, সেতাবাদা!

সেতাব বলিল, আর সেতাবাদাঁতে কাজ নাই। পথ ছাড়।

একজন হাসিয়া বলিল, কি হল, মেজাজ এত খারাপ কেন?

সেতাব তাহাদিগকে অতিক্ৰম করিয়া চণ্ডীমণ্ডপের তালগাছের টুকরা দিয়া গড়া সিঁড়িতে পা দিয়া বলিল, সেতাব কারু কথা গেরাহ্য করে না, বুঝেছ? সে পেকো চামদড়ি কৃপণ—যা বল। ন্যায্য কথা সেতাব বলবেই, আর ন্যায্য দাবি পাওনা সে কড়াক্রান্তি কাউকে ছাড়বে না।

সে গটগট করিয়া উপরে উঠিয়া গেল। মেজাজটা সত্যই তাহার খারাপ হইয়া আছে।

মহাতাপ সন্ধ্যার সময় কাঁধে খোল লইয়া সংকীর্তনের দলে যোগ দিতে যাইবার পথে বাড়ির দুয়ারে প্রকাণ্ড একটা গোখুরা সাপ মারিয়াছে। বৈশাখ মাস, গোখুরা সাপকে পিতিপুরুষে ব্রাহ্মণ বলিত, তাহার উপর অনেক সাপ বাড়ির লক্ষ্মীর প্রহরী। সাপটা বাহির দরজার পাশ দিয়া যাইতেছিল। মহাতাপ একে মহাতাপ, তাহার উপর বৈকালে ভাঙ খাইয়াছে। সাপটাকে দেখিবামাত্র খোল নামাইয়া খামারের একটা বাঁশ লইয়া দুমদাম শব্দে দুই-তিনটা আঘাতেই শেষ। করিয়াছে। তিরস্কার করিলে বলিয়াছে, সাপ যদি লক্ষ্মীর পাহারা হয় তো মহাতাপও দিগ্গজ পণ্ডিত!

তারপর দুই হাতের বুড়া আঙুল নাড়িয়া বলিয়াছেকচু জান তুমি! এ বাড়ির লক্ষ্মীর পাহারা সাপ নেহি হ্যায়, মহাতাপ হ্যায়। এ বাড়ির লক্ষ্মী হল বড়াবউ, আর মহাতাপ মণ্ডল পাহারাদার!

সাপটাকে দেখাইয়া বলিয়াছে, ও বেটা লক্ষ্মীকে ডংশাতে এসেছিল। এখুনি বড় বউ আসত সন্ধ্যেতে বারদোরে জল দিতে। বাস্! ফেঁসা না-না করে লাগাত ছোবল!

বলিয়াই খোল লইয়া বাহির হইয়া গিয়াছে।

তাহার উপর পঞ্চায়েত আসরে আসিবার জন্য লণ্ঠনটি হাতে লইয়া পা-টি সবে বাড়াইয়াছে। অমনি আদরিণী বড় বউ টুক করিয়া পিছু ডাক দিয়াছে। সে ডাকার কত ঢং!

পিছু ডাকছি না। কিন্তু মনে করিয়ে দিচ্ছি আমার মাথার দিব্যি রইল!

সেতাব চমকিয়া উঠিয়াছিল। ভুরু কুঁচকাইয়া বলিয়াছিল–মানে?

হাসিয়া কাদু বলিয়াছিল—ওর আবার মানে থাকে নাকি? মাথার দিব্যি মানে মাথার দিব্যি।

–তা তো বুঝলাম। কিন্তু কিসের জন্যে?

কাদু উত্তর দিয়াছে—সত্যি যদি আমাকে ভালবাসতো কিসের জন্যে তা পঞ্চায়েতের আসরে যেতে যেতে ঠিক মনে পড়বে।

সেতাব চটিয়া উঠিয়াছিল—হেঁয়ালি সে ভালও বাসে না, বুঝিতেও পারে না। অথচ এই কাদুর অভ্যাস। কাদুর স্পৰ্ধা একেবারে আকাশে ঠেকিয়াছে। গায়ের অনেক মেয়ে আড়ালে আড়ালে বলে—মোড়লবাড়ির চাঁপাডাঙার বউ অহঙ্কারে যেন মটমট করছে। হেসে ঠেকার দিয়ে কথা কয় যেন বিন্দাবনের রাধা। সেতাবের মনে হইয়াছিল তাহারা মিথ্যা বলে না। সে উত্তরে বলিয়াছে—ভাল আমি কাউকে বাসি না; হ্যাঁ।

শুনিয়া কাদুর সে কি হাসি।—বেশ আর একবার বল—তিন সত্যি হোক।

–ক্যানে, মিছেমিছি তিন সত্যি করব ক্যানে? কি দায় পড়েছে!

সারাটা পথ সেতাব আপন মনে গজগজ করিতে করিতে আসিতেছে।

মজলিসের প্রান্তে গিয়া লণ্ঠন রাখিয়া প্ৰণাম করিল। তারপর মজলিসে গিয়া বসিল। বিপিন। তাহাকে দেখিয়াই বলিল, এস বাবা। তোমার অপেক্ষাতেই বসে আছি। নাও, তামাক খাও। কোটা সে আর একজনকে দিল। সে অপেক্ষাকৃত বয়স্ক ব্যক্তি। সে সেতাবের দিকে আগাইয়া দিল। সেতাব হুঁকোটা লইয়া মজলিস হইতে সরিয়া গিয়া পিছন ফিরিয়া টানিতে বসিল। টানিতে টানিতে বলিল, তারপর? কি ঠিক হল সব?

বিপিন বলিল, এ দিকে তো গোল কিছু নাই! জমি মাপজোক, হিসেবকিতেব সে সব তো হয়েই আছে একরকম। রামকেষ্ট শিবকেষ্ট, আপন আপন পছন্দ করেও নিয়েছে। বাসনকোসন ভাগ কাল সকালে হবে। এখন দুই খুড়ী বলছে—আমাদের খাবার মত জমি বার করে দাও।

শিবকেষ্ট বলিল, খেতে দিতে আমরা নারাজ নই। কিন্তু জমি দিতে গেলে আমাদের থাকবে কি?

এক খুড়ী বলিল, তা বাবা, তোমাদের সঙ্গে কি বউদের সঙ্গে আমাদের যদি না বনে?

বিপিন বলিল, ও কথা অনেক হল বউমা। আর থা। আমার বাপু জমি দেবার মত নাই।

যে মাতব্বর কাটা লইয়া সেতাবকে দিয়াছিল সে বলিল, আমি বলি কি, একটা ধান বরাদ্দ করে দেওয়া হোক, দুজনে দুই খুড়ীকে দেবে। আর দুই খুড়ীর থাকবার মত দুখানা ঘর, রান্নাঘর।

বিপিন বলিল, তা মন্দ কথা নয়। সেতাব, বল বাবা, কি বলছ?

সেতাব হুঁকাটা লইয়া মজলিসের মধ্যে ফিরিয়া বলিল, লেন, খান। বিপিন হুঁকাটা লইল। সেতাব বলিল, আপনাদের উপর আমার কথা বলা ঠিক নয় জেঠা। তবু না বললেও নয়।

একজন বিধবা বলিল, বল বাবা, তুমি হক কথা বল।

–হক কথাই বলব, যেন রাগ-টাগ কেউ করবেন না। ধান ঘর এসব আমার মত নাই। দেখুন, দু বছর পর যদি ধান বন্ধ করে, কি কোনো বছর যদি ভাল ফসল না হয়? দিতে না পারে?

বিধবা টিকুরীর খুড়ী বলিল, এই। বুদ্ধিগুণেই হা-ভাত, বুদ্ধিগুণেই খা-ভাত। পঞ্চায়েত বুঝে দেখুক।

ইন্দাশের খুড়ী সঙ্গে সঙ্গে সুর ধরিল, তার চেয়ে আমাদের দু জাকে পাঁচ বিঘে করে দশ বিঘে জমি আলাদা করে দাও বাবা, আমরাও নিশ্চিন্দি তোমরাও নিশ্চিন্দি। সাতখানা খাটের দড়িতে থাকব না।

—উঁহুঁ-উঁহুঁ। সেতাব ঘাড় নাড়িল। সাতখানা খাটের দুড়িতে থাকব না বললে কি হয়। খুড়ী? তোমাদের মুখে আগুন দেবে ওরা, তোমাদের মুখে জল দেবে,

« <
/ 31
> »